উপ সম্পাদকীয়

অর্থনীতির বড়ো চ্যালেঞ্জ : খেলাপি ঋণ

সুমন বনিক প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০১-২০২০ ইং ০১:৩৫:৩৯ | সংবাদটি ৮৬ বার পঠিত

একরাশ স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হলো ২০২০ সাল। অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে এদেশের অর্থনীতির সাম্পান। উন্নয়ন সাম্পানের পালে লেগেছে নতুন নতুন প্রকল্পের হাওয়া। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। সেই পর্যায় থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা বাংলাদেশ অর্জন করেছে। ২০২৪ সালের মধ্যে এই উত্তরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। অর্থনীতিতে বাংলাদেশ বর্তমানে-৪১ তম দেশ এবং দ্রুত বর্ধনশীল দেশে পঞ্চম। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২০ সালে ভারত ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় স্থানে থাকবে। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে থাকবে মালদ্বীপ ও নেপাল আর ২.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হার নিয়ে সবার নীচে থাকবে পাকিস্তান। বর্তমানে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৩ শতাংশ আর মাথাপিছু আয় ১৯০৯ ডলার। আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ ৩৩ বিলিয়ন ডলার। দেশের মোট জাতীয় আয় যেমন বেড়েছে, তেমনি মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশুমৃত্যু রোধ, গড় আয়ু বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন চোখে পড়ার মতো। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন সহ বিশ্ব অর্থনীতিবিদগণ বাংলাদেশের এই অর্জনে ভূয়সি প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের রোল মডেল।
চাঁদেরও নাকি কলঙ্ক আছে, আছে কালো দাগ। ঠিক তেমনি বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝলমলে চাঁদে আছে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় খেলাপি ঋণের ছোপ ছোপ কালো দাগ। তাই দেশের অর্থনীতির গতি ধারাকে চাঙ্গা রাখতে হলে খেলাপিঋণের কালো দাগ মুছে ফেলতে হবে। তা নাহলে এতোসব অর্জন ধরে রাখা যাবে না। মুখ থোবড়ে পড়বে উন্নয়নের রথযাত্রা। শঙ্কার জায়গাটি এখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১.৯৯ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতে অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে চলেছে শ্রেণীকৃত ঋণ। ২০০৯ সালে শ্রেণীকৃত ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে শেষে তা বেড়ে হয় ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। আর গত সেপ্টেম্বরে এসে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের প্রায় ১২ শতাংশ। এখানে খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। তাহলে মোট খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। তবে আই. এম. এর হিসেবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকিং সেক্টরে একি ভয়াবহ রূপ! এ অবস্থায় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা কতটুকু দুরহ তা সহজেই অনুমেয়। খেলাপি ঋণের প্রভাব এতটাই ভয়াবহ যে এর প্রভাবে ব্যাংকিং সেক্টর ছাড়াও অর্থনীতির অন্যান্য চলক সমূহে ঋণাত্মক প্রভাব ফেলে। খেলাপি ঋণের চাপ গিয়ে পড়ছে নিয়মিত ঋণের ওপর। এর ফলে বেড়ে যাচ্ছে ব্যাংকের তহবিল খরচ, যার প্রভাবে সুদ হার বাড়ছে। সুদ হার বাড়ায় ব্যবসা পরিচালনা খরচ বাড়ছে। বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। যা রপ্তানী বাণিজ্যে প্রভাব ফেলছে। রপ্তানী ব্যয় বাড়ছে। রপ্তানী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। চলতি অর্থ বছরে রপ্তানীতে সাড়ে সাত শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। খেলাপি ঋণের কারণে বেসরকারি খাতে ব্যাংকের ঋণের প্রবাহও কমে আসছে। একটি ঋণ যখন খেলাপি বা শ্রেণীকৃত ঋণে পরিণত হয় তখন সেই ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে হয়, যা ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কার্যক্রমে আঘাত করে সেই সঙ্গে ব্যাংকের মুনাফার সক্ষমতা হ্রাস পায়। পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি পায় যা পরোক্ষভাবে ঋণের সুদের হারে প্রভাব বিস্তার করে। খেলাপিঋণের প্রভাব অনেকটা চক্রাকারে ঘটে। খেলাপিঋণ বেড়ে যাওয়ার অর্থই হল বিনিয়োগ আটকে যাওয়া। এই বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকে কর দিতে হয়, ব্যাংকে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়, সুদ স্থগিত থাকে, মুনাফা হ্রাস পায়, নতুন ঋণ প্রদান হ্রাস পায়, যা আমানতের ওপর চাপ পড়ে। এসব প্রত্যেকটি ঘটনাই ব্যাংকিং কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। খেলাপী ঋণ শুধু ব্যাংকে নয়, পুরো অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
আমাদের কাছের কয়েকটি দেশের খেলাপি ঋণের একটি পরিসংখ্যান দেখলে আমাদের অবস্থানটা আরো একটু দৃষ্টিবদ্ধ হবে। ভারতে বর্তমানে খেলাপি ঋণ প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাকছি। দক্ষিণ কোরিয়ায় ০.৭ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১.৬ শতাংশ, নেপালে ২.৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ৮.৮ শতাংশ, ভিয়েতনামে ২ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৩.৪ শতাংশ আর বাংলাদেশে ১২ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম চলছে।
ভারত একটি বৃহৎ রাষ্ট্র এতো বিশাল অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ সে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরে আঘাত হেনেছে। ভারতের জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। তাহলে বুঝতে হবে খেলাপি ঋণের আঘাত আমাদের অর্থনীতিতে কতটুকু বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। নেপালের মতো দেশে ঋণ খেলাপিরা পাসপোর্ট সুবিধা পান না। চীনে ঋণ খেলাপিদের বিমানে ওঠার নিষেধাজ্ঞা আছে। আমরা স্বপ্ন দেখি- আমরা একদিন মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশ হবো। অর্থমন্ত্রী এরকম স্বপ্ন দেখান। মালয়েশিয়ার খেলাপি ঋণ মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ। তাই আমরা স্বপ্ন দেখে ঘুমাতে চাই না, জেগে উঠতে চাই। স্বপ্নের বাস্তবরূপ দেখতে চাই। দেশের অর্থনীতিকে খেলাপি ঋণের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করতে না পারলে আমাদের স্বপ্নস্বপ্নেই হারিয়ে যাবে। তাই খেলাপি ঋণ কমানো আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড়ো চ্যালেঞ্জ।
লেখক : কবি, ব্যাংকার

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT