পাঁচ মিশালী

বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে

উর্দু থেকে বাংলা অনুবাদ : সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০১-২০২০ ইং ০০:৩৫:০৪ | সংবাদটি ২১২ বার পঠিত

[মুহাম্মদ বদর মুনির, সত্তর-আশির দশকে পাকিস্তানের সাংবাদিকতায় অত্যন্ত আলোচিত-সমালোচিত এক নাম। তাঁর জন্ম, শৈশব এবং কৈশোরের কিছুদিন গিয়েছে ভারতে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লালু প্রসাদ জাদব ছিলেন তাঁর কৈশোরের ক্লাস-বন্ধু। ১৯৪৭-এ ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তানের জন্মলগ্নে পরিবারের সাথে পাকিস্তান আসেন। কৈশোর, যৌবন কিংবা কর্মজীবনে তাঁর বন্ধুদের তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের অনেক হাই প্রফাইল ব্যক্তি রয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহিদ-বুদ্ধিজীবি অনেক ছিলেন তাঁর বন্ধু। লেখালেখির শুরু ছোটবেলা থেকেই। পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় দৈনিক সদা-এ আম পত্রিকায়। সাংবাদিকতা পেশায় আসেন তৎকালিন উর্দু পত্রিকা দৈনিক জমিনদার-এ। তিনি কাজ করেছেন ইমরোজ, আকরাম, শাহাব, এশিয়া ইত্যাদি দৈনিক পত্রিকায়। সাপ্তাহিক আইন, নেদা, নেদা-এ খিলাফত, নওয়া-এ ওয়াক্ত, ফ্যামেলি, এমন কি বাংলাদেশের দৈনিক ইত্তেফাকেও নিয়মিত লিখেছেন। রাজনীতিতে তিনি এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে আওয়ামীলীগে। আওয়ামীলীগই তাঁর প্রথম ও শেষ রাজনৈতিক দল। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনের সময় তিনি আওয়ামীলীগের সকল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাব আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ওল-পাকিস্তান আওয়ামীলীগের মজলিসে আমেলার সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাকিস্তান আন্দোলন, পাকিস্তান-বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ইত্যাদি নিয়ে তাঁর প্রচুর গবেষণা কিংবা স্বক্ষীধর্মী লেখা রয়েছে। তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনি সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতে কার্পণ্য করেননি। উর্দু-ই তাঁর মূল ভাষা। বঙ্গমন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি যেভাবে দেখেছেন এবং জেনেছেন তা নিয়ে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে উর্দুতে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা ‘জেয়সা কেহ ময় জানতাহু শেখ মুজিবুর রহমান’ গ্রন্থ। লেখকের প্রায় পঁচিশ বছরের কর্মের ফসল দু’শত ছিয়াশি পৃষ্ঠার এই বই। বইটিতে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি উপমহাদেশীয় রাজনীতির অনেক নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান সফরকালে বইটি করাচির উর্দু বাজার থেকে খরিদ করেছিলাম এবং ইচ্ছে ছিলো অনুবাদ করবো, কিন্তু করা হয়নি। অবশেষে মুজিববর্ষ উপলক্ষে দৈনিক সিলেটের ডাকের সাহিত্য সম্পাদক ফায়যুর রাহমানের অনুরোধে অনুবাদের কাজে হাত দেয়া। আশা করি সাংবাদিক মুহাম্মদ বদর মুনির-এর এই গ্রন্থ থেকে আমরা ইতিহাসের অনেক উপাদান পাবো। Ñঅনুবাদক]
প্রাককথা
বিশ শতাব্দীতে বিশেষ যে ব্যক্তিরা দৃশ্য-অদৃশ্য থেকে নিজ জাতির ইতিহাস পরিবর্তন এবং নতুন ইতিহাসের সূচনা করেছেন তারা সবাই বিভিন্ন শ্রেণীর সাথে সম্পর্কিত। সোভিয়েত ইউনিয়নের লেনিন, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, চীনের মাউসেতুং, পাকিস্তানের কায়দে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্না, ভারতের গান্ধী, বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমানÑঐতিহাসিক এই ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বিশ^যুদ্ধের আগের বছর বাঙালের এক প্রান্তিক জেলা ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ায় এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবার ছিলো। ফলে তিনি লালিত-পালিত কিংবা শিক্ষা-দিক্ষা নিয়েছেন ধর্মীয় নিয়মে। যখন তাঁর বয়স চার তখন তিনি পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ি প্রথমে কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে স্কুলে ভর্তি হন। মেট্রিক পাশের পর কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি শিক্ষার পাশাপাশি মুসলিম রাজনীতিতে অংশ নিতে শুরু করেন। কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে মুসলিম ছাত্র লীগের পাঁচ প্রতিষ্ঠাতার অন্যতম একজন শুধু তিনি নয়, তিনি ছিলেন এই সংগঠনের মূল প্রাণ। এই সংগঠন বাঙালে মুসলিমলীগের অঙ্গ সংগঠন ছিলো। বাঙালে এই সংগঠনের সাথে সকল মুসলিম ছাত্রদেরকে জড়িত করার ব্যাপারে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে সাহায্য পৌঁছাতে এই সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগে অংশগ্রহণ করেন। তখন মুসলিমলীগের সাংগঠনিক শক্তি দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছিলো না। নেতাদের সাংগঠনিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার জন্য ছিলো এই দুর্বলতা। বাঙালে তখন ছিলো মুসলিমলীগের শাসন, শাসনের ভেতর ছিলো অনেক দুর্বলতা। এই দুর্বলতাগুলোই মুসলিমলীগের শক্তি ক্ষয় করে। বাঙালে মুসলিমলীগের সমস্যার জন্য তখন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনকে শুধু নির্বাচন থেকে দূরে নয়, দেশ থেকেও দূরে সুইজারল্যান্ডে অবসরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিলো। খাজা সাহেবের অনুপস্থিতিতে মুসলিমলীগের সমস্ত দায়িত্ব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উপর এসে যায়। সেই সময়ে বাঙালের সফলকাম নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক মুসলিমলীগের শক্তি বিরোধীতা শুরু করেন। তাঁর বিরোধীতার জন্য ময়দান ছিলো নাজুক। এই নাজুক পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুসলিমলীগের নির্বাচনী কাজে মুসলিম ছাত্রলীগ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ১২১টি মুসলিম আসনের মধ্যে ১১৬টি আসনে মুসলিমলীগ বিজয়ী হয় এবং কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টে শ-এর অধিক আসন লাভ করে। এদিকে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে মজলুম মুসলমানদের সাহায্যার্থে পাঠনায় প্রথম পৌঁছেন বাঙালীরা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিবুর রহমান দলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নিকটতম হয়ে যান। অতঃপর আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠিত হলে প্রাদেশিক সভাপতি মাওলানা ভাসানীকে এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্বাচিত করা হয়। (সঠিক তথ্য হলো, আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা দু’জন সহ-সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে একজন ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান)।
শেখ মুজিবুর রহমানের সমস্ত জীবন গিয়েছে আন্দোলন-সংগ্রামে। তাঁর জীবনের মূল উদ্দেশ্যই ছিলো সাধারণ মানুষের সুখ-আনন্দ। অতঃপর পরিস্থিতি তাঁকে বাঙালের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় করে। সাবেক পশ্চিম পাকিস্তান, যা বর্তমানে পাকিস্তান, এখানে শেখ মুজিবের কর্ম ও ব্যক্তিত্বকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে এখানের মানুষের মনে বাঙালের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়েছে। আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে শেখ সাহেবকে খুব কাছ থেকে এবং দূর থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তাঁর প্রতি আমার মানবিক দূর্বলতা যেমন ছিলো, তেমনি পরিস্থিতিগত কারণে ভয়ও ছিলো। শেখ মুজিব বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব দেখাতেন এবং শত্রুর সাথে শত্রুতা। এখানে তার কোন ত্রুটি ছিলো না। যা তাঁর অন্তরে আসতো তা তিনি মুখ দিয়ে প্রকাশে কোন কষ্ট অনুভব করতেন না।
১৯৬৫-এর যুদ্ধ এবং লাহোরে বিভিন্ন জাতির সম্মেলনে যোগদানের পর শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে বেশ পরিবর্তন দেখা দেয়। ইতোমধ্যে তাঁর বিশ^াস হয়ে যায় যে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা কোনভাবেই বাঙালীর নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। জেনারেল আজম খান, মালিক গোলাম জিলনী, কর্ণেল আবিদ হোসাইনের জবানবন্দী অন্যকিছু বলে। তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে যায় কীভাবে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কাজ হয়েছে; আগরতলা ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরও আওয়ামীলীগকে অবজ্ঞা করা হয়েছে, শেখ মুজিবের উপর গাদ্দারীর অপবাদ দেওয়া হয়েছে, সামরিক শাসনের অধিনে গোপনে মামলা পরিচালনা করা হয়েছে। এই মামলার কার্যক্রম যেভাবে চালানো হয়েছে তাতে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান-এর জমিদারী প্রমাণের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এই সময় শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আমার বারবার দেখা হয় এবং কখনো তা নিয়ে বিস্তারিত আবার কখনও সংক্ষেপে আলোচনা হয়। ধীরে ধীরে আমার মানসিকতায় পরিবর্তন আসে এবং শেখ মুজিব এবং আওয়ামীলীগের প্রতি পূর্ণ বিশ^াস অর্জিত হয়। আওয়ামীলীগ আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ রাজনৈতিক দল। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনের সময় আমি আওয়ামীলীগের সকল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে আমি পাঞ্জাব আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ওল-পাকিস্তান আওয়ামীলীগের মজলিসে আমেলার সদস্য ছিলাম। এই সময় শেখ সাহেবের পরামর্শ সমূহ আমাকে দিক নির্দেশনা দিয়ে চালিয়েছে। আমি জানি, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আওয়ামীলীগকে শুধু রাজনৈতিক দল হিসাবে তৈরি করেননি, বরং তা ছিলো একটি পরিবার, সদস্যদের একের প্রতি অন্যের প্রেম ছিলো।
আমরা সাধারণত মৃত্যু বার্ষিকিতে স্মরণ সভায় একত্রিত হই। আমার এই লেখা বলা যেতে পারে মৃতের স্মরণে। আমার এক সম্মানিত বন্ধু, কিছু সাথী এবং নেতাদের স্মরণের প্রতিধ্বনি। অনুমানিক ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। আমার প্রিয় বন্ধু এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিক শহিদুল্লাহ কায়সার হাসতে হাসতে জিজ্ঞাস করলো, ‘সাংবাদিকরা কখন সত্য লিখা উচিত’? আমি বললাম; যখন তার কিছুতে লাভ-ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।’ কায়সার আমার বক্তব্য শোনে খুব নারাজ হলেন। এরপরই মুহাম্মদপুরের সেই ঘটনা ঘটে গেলো, যেখানে শহিদুল্লাহ কায়সার সহ ঢাকার প্রায় দু’শ বুদ্ধিজীবিকে শহীদ করা হয়, যার মধ্যে ডাক্তার, উকিল বিভিন্ন পেশার লোক ছিলেন। আমার বিশ্বাস, যখন কায়সারের শাহ রগের কাছে খঞ্জর রাখা হয় তখন সে আমার উপর থেকে নারাজি দূর করে নিয়েছিলো। সম্ভবত তা ছিলো একাত্তরের ১৫ এবং ১৬ ডিসেম্বর রাতের ঘটনা। এই রাতে কিংবা তার পাশাপাশি সময়ে আমি আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব থেকে বঞ্চিত হয়েছি। কায়রোর নিকটে ‘পি আই এ’-এর বড় রকমের দুর্ঘটনার মতো আমার জন্য তা ছিলো মর্মান্তিক। এই ঘটনায় আমার অনেক বন্ধু ও সাথী প্রাণ হারিয়েছে। কথা কোথায় থেকে কোথায় পৌঁছে গেলো। শুরু করেছিলাম এই লেখা বিষয়ে, আর এই সূত্রে কায়রো থেকে মুহাম্মদপুর পৌঁছে গেছি।
সম্মানিত পাঠক, এই লেখা বই হয়ে অনেক আগে আপনাদের হাতে পৌঁছার কথা ছিলো। কিন্তু কায়সার এবং অন্যান্য বন্ধুদের মৃত্যুর স্মরণ অতঃপর শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপরিবারে মৃত্যুর কারণে আমি শুধু আতংকিতই নয়, বরং কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলাম। বন্ধুদের আশা ছিলো আমি শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিত্ব নিয়ে একটি বই লেখি। তাদের আশাকে পূর্ণ করতে এক দীর্ঘ সময় যাওয়ার পর এই বই আপনাদের সামনে (১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে) উপস্থাপন করতে পেরেছি। এতে যা আছে সবই আমার স্মৃতি থেকে; আমি নিজে যা দেখেছি এবং বন্ধুদের কাছ থেকে যা জেনেছি। অতঃপর জনাব আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমানের শ্রদ্ধেয় মা-বাবার সাথে আমি পৃথক পৃথক কথা বলেছি। তখন শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক আইনের অধিনে মামলার হাজিরা হিসাবে লাইলপুর (বর্তমান ফয়সলাবাদ) জেলে ছিলেন। এই লেখা তৈরির জন্য পূর্ব পাকিস্তান থাকতে এবং বাংলাদেশ হওয়ার পর আমি শেখ মুজিবুর রহমানের মা এবং বাবার সাথে দেখা করতে ক’বার টুঙ্গি পাড়া গিয়েছি। তাঁর মায়ের কথা ছিলো তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত জন্মস্থান দেখবে না ততক্ষণ পর্যন্ত গরী (মুজিব)-এর ব্যাপারে কি লিখবে? আমি মুরুব্বীর নির্দেশ পালনার্থে ক’বারই টুঙ্গি পাড়া যাই। আমি দেখেছি সেই ঘর যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম।
মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৭ মার্চ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে। মার্চ মাস এমনি বাংলাদেশের আবহাওয়া পরিবর্তনের শেষ মাস। এরপর বাংলাদেশে শুরু হয় অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং ঝড়-ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম। আমি যতবার শেখ সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করেছি ততবার অনুভব করেছি তাঁর স্বভাবে মার্চের সমস্ত বৈশিষ্ট্য এবং দুর্বলতা। তিনি উদার, কোমল, বিবেচনাসম্পন্ন স্বভাবের ছিলেন। আবার প্রয়োজনে তিনি কারো কারো সাথে রাগাম্বিত হতেন, তবে পরে সেই ব্যক্তির সাথে আবার মেহেরবান হয়ে যেতেন। মাফ করাটাও তাঁর অভ্যাসে ছিলো। তিনি গেয়ে গেয়ে নিজের কথা বলতেন। মাঝেমধ্যে শৈশবের কথা বর্ণনা করতেন। কখনও কখনও ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র থাকাকালিন সময়ের বর্ণনা দিতেন। সেই সময় তিনি মুসলিম রাজনীতির প্রাণ ছিলেন। তাঁর সাথী জহুরুদ্দিন, ফজলুল কাদের চৌধুরী, মসিউর রহমান, আনোয়ার, শাহ আজিজুর রহমান, আবিদ জাফরী প্রমুখ ছিলেন মুসলিম ছাত্র লীগের সদস্য এবং বিভিন্ন আন্দোলনে তারা শরিক হতেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে শেখ সাহেবের আদর্শিক সম্পর্ক ছিলো। মুসলমানদের জন্য তাঁর হৃদয় সর্বদাই ব্যাকুল থাকতো; তা পৃথিবীর যেখানেই হোক। তিনি শিক্ষার সাথে রাজনীতিতেও পূর্ণাঙ্গ সক্রিয় ছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি জীবনবাজি রেখে কাজ করেছেন। এটা এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যা আপনারা এই লেখায় পরবর্তিতে জানতে পারবেন। শেখ মুজিবকে নিয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। বক্তব্যে, সেমিনারে, বই-এ অনেক কথা বলা হয়েছে। এগুলোতে একের সাথে অন্যের ভিন্নতা রয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানে পা থেকে মাথা পর্যন্ত তাঁকে অপরাধী প্রমাণিত করার চেষ্টা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে এর বিপরীত। আমার ছোটবেলার মুসলিম পরিবারগুলোর ঐতিহ্য অনুযায়ি আমি কোরআনের নাজেরা এবং শেখ সাদীর গুলিস্তা-বুলিস্তা পড়েছি। তিনি বুস্তার মধ্যে কেচ্ছার মতো করে একটি বাস্তাব কাহিনী বর্ণনা করেছেন; এক ভদ্রলোক একদিন শয়তানকে স্বপ্নে দেখলো। সে দেখলো শয়তান অত্যন্ত সুন্দর এবং স্পষ্টভাষী। স্বাপ্নিক আশ্চার্যাম্বিত হলো। শয়তান তখন তাকে জিজ্ঞাস করলো, তুমি আমাকে দেখে এত পেরেশান কেন? সে উত্তর দিলো, আমি পড়েছি এবং শোনেছি তুমি ধূসরবর্ণ, তোমার চেহরা খুবই ভয়ংকর। দৃশ্যত তুমি আবর্জনাযুক্ত এবং তোমার মধ্যে দুর্গন্ধ বুদবুদ করছে। কিন্তু এখন দেখছি তুমি একেবারে উল্টো, কারণ কি? শয়তান ভদ্রলোকের কথা শোনে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে হাসে এবং বলে, ‘আমার শত্রু মানুষের হাতে কলম, সে যা চায় তা লিখতে পারে, আমি অসহায় কি করতে পারি?’ এখানে পশ্চিম পাকিস্তানের অবস্থা তাই। শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যাপারে খুব কম সঠিক তথ্য উপস্থাপিত হচ্ছে। আমাদের জাতির মানসিকতা হলো আমরা সর্বপ্রথম কোন দুর্বলকে চিহ্নিত করি। অতঃপর সারাজীবন আমাদের খারাপ রাগ ও ধারণার পাথর নিক্ষেপ করতে থাকি। শেখ সাহেবের সাথেও এমন কিছু হয়েছে। যদি কেউ বাস্তবতা বর্ণনা করতে চায় তখন তার দিকেও ঐ সমস্ত খারাপী নিক্ষেপ করে অপপ্রচার কিংবা নির্যাতন শুরু হয়ে যায়। জীবনে এই অবস্থায় প্রত্যেক মানুষ নিজকে মৃত্যুর মুখোমুখি ভাবতে বাধ্য হয়। অথবা নিজের মনে মৃত্যুর ফেরেস্তার ডাক শোনতে পায়।
আমি বাস্তব ঘটনা বর্ণনার সিদ্ধান্ত এজন্যই নিয়েছি যে, এই বক্তব্য দিয়ে শেখ সাহেবের কেউ উপকার কিংবা অপকার করতে পারবে না। কারণ তিনি দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছেন এবং আমাদের জাতী তাঁর সম্পর্কে জানতেও বেশ আগ্রহী। আমার উদ্দেশ্য বুদ্ধিমানদের ঐ শ্রেণী যারা প্রত্যেক জাতির মধ্যে থাকেন এবং বাস্তববাদীদের দিকে তারা চেয়ে থাকেন। তা ছাড়া আমাদের ইতিহাসের চেহারাকেও সংশোধিত করাও আমাদের উপর ফরজ। যে জাতি নিজের ইতিহাসকে বিকৃত করে সে মূলত নিজেকেই বিকৃত করে। আগামীদিনের ঐতিহাসিকরা যখন লিখবে তখন নিজেদের নেতাদের অবস্থা অনুভব করতে পারবে এবং তারা আমাদের বক্তব্য শোনে তাদের বিচারিক ফয়সালা দিবে। তারা শেখ সাদীর সেই স্বপ্ন দেখার প্রয়োজন অনুভব করবে না। আমাদের আবেগ প্রবণদের কাছ থেকে শত্রুরা অনেক উপকৃত হয়েছে। তারা আমাদের হাত দিয়ে আমাদের ইতিহাসকে বিকৃত করিয়েছে এবং আমাদেরকে সত্য অনুভব বা চিন্তা থেকে স্বেচ্ছায় সরে যেতে বাধ্য করেছে। দূর যেতে হবে না, পাকিস্তান

শেয়ার করুন
পাঁচ মিশালী এর আরো সংবাদ
  • লজিং জীবন
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • একটি কুসুম ফলে
  • শিশুদের ভালবাসায় সিক্ত দানবীর
  • কবিতা
  • হায়রে বাংলা ভাষা
  • স্বাধীন
  • ৬৪টি জেলা ঘুরেছেন সিলেটের ফাহিম
  • জন্মভূমির টানে
  • তাজমহল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • প্রকৃতির হাতছানি
  • সাংবাদিক জিয়া খালেদের চলে যাওয়া
  • ব্যারিস্টার নাজির ফ্রিডম অব দ্য সিটি অব লন্ডন সম্মাননায় ভূষিত
  • প্রাচীন বাংলার রাজধানী পানামনগরে একদিন
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ
  • চলতি পথের সরস বচন
  • লিথিসি’র ‘ভাইবে রাধারমণ’-এ মুগ্ধ শিলচর
  • Developed by: Sparkle IT