পাঁচ মিশালী

সুন্দরবনে তিনরাত

চৌধুরী ইসফাকুর রহমান কুরেশী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০১-২০২০ ইং ০০:৩৫:৪৫ | সংবাদটি ৮৪ বার পঠিত


(পূর্ব প্রকাশের পর)
আমরা রাতে খাবার শেষে জাহাজে ঘুমপাড়ানী গান শুনে শুনে গভীর ঘুমে ডুবে যাই। মংলা হতে পশুর নদী দিয়ে জাহাজ যাত্রা করল। এই নদীটি আর বিশাল। বিস্তার তিন মাইলের কম হবেনা। জাহাজ যতই সামনে যাচ্ছে নদী তত প্রসারিত হচ্ছে। সারারাত ঘরঘর আওয়াজ করে জাহাজ এগিয়ে গেল। শেষরাতে নদী আর নদী নেই, যেন এক চিকন উপসাগর। এই সাগরখাড়ির এপারে টাইগার পয়েন্ট এবং ওপারে হিরন পয়েন্ট। ভোর চারটায় কড়মড় আওয়াজ করে মাঝসাগরে জাহাজ নোঙর করল। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। আমরা জেগে উঠে নামাজ পড়ি, ডাইনিঙে গিয়ে নাস্তা করি। সময় দ্রুত পার হয়। ছয়টা বাজার আগেই সবাই ট্রলারে উঠে যাই।
টাইগার পয়েন্টে ছয় কিলোমিটার হাঁটার খবরে নুরজাহান ভয় পেয়ে যান। কিন্তু পরদিন বাচ্চারাও সেখানে যাচ্ছে দেখে তার সাহস জন্মে। তিনিও ট্রলারে উঠেন। টাইগার পয়েন্টে নেমে আমাদের বেশ জুরছে হাঁটার ব্যায়াম হয়। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত্রি হয়। সবার মধ্যে একটি রাত্রিভীতি কাজ করে, সবাই দল বেঁধে যান, আমি পিছনে থেকে স্ত্রী-পুত্রকে পাহারা দিয়ে হাঁটি। বাঘ এসে রাতে পানি খায় এমন একটি পানা পুকুরের পাশ দিয়ে যাই। চারপাশে কেওড়া, গেওয়া ও গরান বন। খালপারে ঘন গোলপাতার জঙ্গল। নারকেলের মত গোলফল ঝুলে আছে।
দীর্ঘ হাঁটার পর এক সাগরপারে সিডর ঝড়ে উপড়ে পড়া বৃক্ষবনে এসে আমাদের যাত্রা শেষ হয়। সাগর সৈকতটি বালির নয়, কাদার। কাদামাটির সৈকতে কেউ যায়না, জুতা কর্দমাক্ত করার ইচ্ছে কারও থাকেনা। আমরা সাগরের পারের বনে হটাহাটি করি। বনটির নাম সুন্দরবন, শৈশবে ভাবতাম বনটি নাজানি কি সুন্দর, তাই নামটি হয়েছে সুন্দরবন। কিন্তু বয়স বাড়ার পর জানতে পারি এখানে সুন্দরী নামক এক ধরনের বৃক্ষ প্রচুর জন্মে, এই বৃক্ষের নামেই বনটির নাম হয়েছে সুন্দরবন। সুন্দরী বৃক্ষ দেখতে চাইলেও কেউ আমাকে দেখাতে পারেনি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে নিয়মিত সুন্দরবনে যাতায়াতকারী গাইডও বনবৃক্ষদের নাম বলতে পারেননি। আমরা বাঙ্গালীরা বৃক্ষ সম্পদে এক অতি সমৃদ্ধ জাতি, অথচ এই বৃক্ষদের নাম জানার গরজ আমরা খুব একটা অনুভব করিনা।
টাইগার পয়েন্ট হতে সকাল ৯টায় আমরা জাহাজে ফিরে আসি। এবার ব্রেকফাস্ট করে আমরা সবাই কটকা অভয়ারণ্যে চলে যাই। সৈকত হতে হেঁটে হেঁটে সামান্য ভিতরে গিয়েই প্রাকৃতিক অরণ্যে প্রচুর মায়াহরিণ ও চিত্রল হরিণের দেখা পাই। মায়াহরিণ গাঢ় হলুদ বর্ণের কিছু শিংবিহীন, কিছু ডাল শিংযুক্ত। চিত্রল হরিণ হলুদ কিন্তু সারা শরীরে সাদা রঙের বৃত্ত বৃত্ত ছিটা রয়েছে। এরা বনে দল বেঁধে হাঁটছে, গাছের পাতা চিবুচ্ছে। হরিণের প্রিয় খাবার গরানপাতা চিবিয়ে দেখি আমাদের কচি চাপাতার স্বাদ। অরণ্য ঘুরে সৈকতের বালিতে হেঁটে ফেরার সময় কিছু শামুক ও ঝিনুক কুড়িয়ে নেই। মাদার বৃক্ষের ছায়া দিয়ে জাহাজে ফিরি।
সৈকতটি হিরন পয়েন্ট, কেউবা বলেন হরিণ পয়েন্ট। নদীতীরে তিনচারটি জেটি, একটি জেটি দিয়ে সুন্দর একটি সৈকতে আমরা অবতরণ করি। পাশে বনবিভাগের অফিস ও আবাসিক এলাকা। মাটি হতে পাঁচ ফুট উপরে পাকা মাচাং বাড়ি এবং অফিস ঘর। একটু এগিয়ে গিয়েই হরিণের চিড়িয়াখানা। এখানেও বুনো বাদরের পাল বাঁদরামি করছে। একজন কৃষক ছোট ছোট ঘাসের আটি বিক্রি করছে। পর্যটকরা আটি আটি ঘাস কিনে হরিণের সামনে ধরলেই হরিণেরা প্রতিযোগিতা করে ঘাস খেয়ে নিচ্ছে। হিরন পয়েন্টের শেষপ্রান্তে একটি খাবার জলের পুকুরে যাই। বনবিভাগের অফিস ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র চোখে পড়ে। শেখ হাসিনা এখানে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন স্মারক স্থাপন করেছেন। কয়েকটি বাঘের মূর্তি কাছেই স্থাপিত রয়েছে।
এবার জাহাজটি একটি স্বর্গবনের পাশ দিয়ে সাগরের দিকে ছুটে যায়। অরণ্যে ঘড়িয়াল ঘুমাচ্ছে, পাখিরা উড়ছে। চরায় বক ও জলচর পাখিরা দাঁড়িয়ে আছে। দূর সাগরে সাদা গাংচিলেরা দলবেঁধে ঝাপ দিচ্ছে, উড়ে যাচ্ছে। নদীর জল ও সাগরের জলের একটি সীমান্তরেখা চোখে ভেসে ওঠে। একদিকে নদীর সামান্য ঘোলাজল, অন্যদিকে সাগরের পরিস্কার নীলজল। বিকেলে শীতের সূর্য মিঠা মিঠা রোদ বিলাচ্ছে। আমি ছাদের উপর চেয়ারে বসে সাগরের অপরূপ রূপ দেখে নিচ্ছি। এই সময় তীর ছাড়া এক ঢেউয়ের রাজ্যে জাহাজ প্রবেশ করে। জাহাজের চারপাশে জল আর জল, ঢেউ আর ঢেউ, বাতাস আর বাতাস শনশন করছে। সৃষ্টির এত রূপলাবণ্য উপভোগ করে আমার শ্রবণ দর্শন এবং স্পর্ষ ইন্দ্রিয় এসময় মহান স্রষ্টার গুণগানে মুখর হয়ে ওঠে। সুন্দর বিকেলটা এই সাগরের মাঝেই কেটে যায়। আসলে এই সাগরসন্ধ্যা ছিল আমার জীবনের এক সেরা আনন্দকাল। রক্তিম সূর্যটা সামনের সাগরের জলে আস্তে আস্তে যেন নিজেকে হারিয়ে দিল।
গাইড এবার ডাক দেন, ট্রলারে আসুন দুবলার চর যাবো। দুবলারচর সাগরপারে। সামনে উত্থাল সাগর। আমরা লাইফ জ্যাকেট পরে নেই। ট্রলারে বসেই শুটকির ঝাঝালো গন্ধ এসে নাকে লাগে। এখানে মাঝে মাঝে ছনের ঘর, ঘরের চারপাশে মাঠের পর মাঠ জুড়ে কেবল শুটকি শুকানো হচ্ছে। দুবলার চর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শুটকি পল্লী। এখানে প্রায় লক্ষাধিক লোক শুটকি শিল্পে কাজ করেন। শীতকাল সমাপ্ত হলে লোকেরা এই দুবলার চর ছেড়ে নিজনিজ বাড়িঘরে চলে যান। শীতের জমজমাট দুবলার চর গ্রীষ্মকালে বিরানভূমিতে পরিণত হয়। সবার সাথে আমিও দুবলারচর হতে কিছু লুইট্যা ও বাশপাতা শুটকি কিনে নেই। রাতের অন্ধকারে যখন ট্রলারে ফিরি, তখন দূরের বাতিঘরে আলো জ্বলছে। লোকে বলল এই বাতিঘরের ধারে সাগর সৈকতে প্রতি বছর রাসমেলা ও পুণ্যস্নান হয়। হাজার হাজার মানুষ তখন সমবেত হন গভীর অরণ্যের এই সমুদ্রপারে। ২৮ ডিসেম্বর দিনটা খুব আনন্দেই চলে গেল। ‘দুবলার চরের উপখ্যান’ নামে আমি একটি ছোটগল্প লিখেছিলাম। আমার ধারণা ছিল এটি একটি প্রাচীন জনপদ, এসে দেখলাম আমার সেই কল্পনা সম্পূর্ণ ভুল, এটি একটি মৌসুমি শুটকি পল্লী মাত্র। সারাদিনের হাঁটাহাঁটিতে ক্লান্ত শ্রান্ত সবাই জাহাজে এসে ডিনার সেরে বিছানায় গাত্রফেলা মাত্রই নিদ্রারাজ্যে হারিয়ে যান।
২৯ ডিসেম্বর সকালবেলা সাগর সৈকতের কাছে নোঙর করা জাহাজে তিনজন সংগ্রামি নারী একটি ডিঙ্গি নিয়ে হাজির হন। তাদের একজন মাঝি ও দুইজন ডাব বিক্রেতা। আমরা ডাব কিনি, তারা ছুলিয়ে দেয়। ডাব খাওয়া শেষে নারকেলের পাতলা আঁশ কেটে দেয়। তাদের একডিঙ্গি ডাব এই জাহাজেই শেষ হয়ে যায়। ব্রেকফাস্ট শেষে জাহাজ নোঙর তুলে উজান যাত্রা শুরু করে। গতরাতে ঘুমের মধ্যে এই পথে আসি, এবার দিনের আলোয় ফিরছি। পাশের খালের গর্তে দুইটি ভোদড় জলে স্থলে লাফ দিচ্ছে। বিশাল পশুর নদীর দুপারের জলেভাসা নয়নাভিরাম অরণ্যের সৌন্দর্য্য দেখে দেখে জোহরের দুরাকাত কসর নামাজ পড়ে নেই। সাফারের পর আমাদেরকে করমজল স্পটে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে খালপারের জেটিতে ট্রলারের প্রচন্ড ভীড়। আমরা জেটিতে নেমে প্রচুর লোকজনের দেখা পাই। দুই তিনজন বিদেশী পর্যটকও চোখে পড়ে। এই স্পটটি মংলার বেশ কাছে, তাই মানুষ সহজে নৌকায় করমজল আসতে পারেন। এখানে রয়েছে কৃত্রিম কুমির প্রজনন কেন্দ্র। একটি কুমিরের পুকুর, সেই পুকুরপারে নিরবে শুয়ে একটি বড় কুমিরকে রোদ পোহাতে দেখি। অনেক কুমিরছানা দেখে আমরা মাটি থেকে তিন ফুট উপরে সেতুর মত করে নির্মিত কাটের মাচাংপথে সুন্দরবনের ভিতর প্রায় এক কিলোমিটার পথ ঘুরে আবার ফিরে আসি করমজল স্পটের খালপারের ঘাটে। এখানেই আমাদের সুন্দরবন ভ্রমণ সমাপ্ত হয়।
জাহাজে একজন বললেন আপনাদের সিলেটে অনেক সুন্দর সুন্দর পর্যটন স্পট আছে। জেফার জবাবে বলল, অনেক স্পট আছে সত্য, কিন্তু খুলনায় সুন্দরবন একাই একশ। এখানে সাগর, নদী, বিচ, অরণ্য, নৌবিহার সব একসাথেই হয়ে যায়। দশহাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের ৬০% বাংলাদেশে, বাকী ৪০% রয়েছে ভারতে। আসলে এই ছয়হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবন বাংলাদেশের অহংকার। আমাদের সিলেট ও সুনামগঞ্জ এই দুইজেলাকে যদি জনশুন্য করে অরণ্যে পরিণত করা হয় তাহলে আয়তনে সুন্দরবনের প্রায় সমান হবে। বনটি খুলনা, সাতক্ষিরা ও বাঘেরহাট জেলার অধিক দখল করে আছে। বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলাতেও বনটির বিস্তার রয়েছে। এই সুন্দরবন দক্ষিণের সাগর হতে আসা ঘূর্ণিঝড়ের প্রচন্ড থাবা চীনের প্রাচীরের মত প্রতিহত করে জনপদকে রক্ষা করে। ঘূর্ণিঝড় সিডরকে আটকাতে গিয়ে গাছপালা উপড়ে বনটি একেবারে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। যদি সুন্দরবন না থাকত তাহলে খুলনা সাতক্ষিরা বাঘেরহাটের যে কি দশা সিডর ঘটাতো তা ভাবাই যায়না। সুন্দরবনে আদিমকাল হতেই জলদস্যুদের রাজত্ব চলে আসছে। আধুনিককালেও এই বনদস্যুদের উৎপাত বন্ধ হয়নি। ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, জেলেদেরে ধরে নিয়ে মুক্তিপণ আদায়, বন্য প্রাণী নিধন ইত্যাদি অপকর্মে এসব বনদস্যুরা জড়িত। গাইড বললেন আমাদের জাহাজ যে জলপথ দিয়ে যাবে সেই পথে জলদস্যু নেই। তাছাড়া বনদস্যুরা সাধারণতঃ পর্যটকদের উপর কোন হামলা করেনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতি বনদস্যুদের সুন্দরবনে টিকে থাকা কঠিন করে দিয়েছে। কোস্টগার্ড ও র‌্যাবের অবিরাম অভিযান ও ক্রসফায়ারে তারা হয়ত মারা পড়ছে, নয়ত আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে বাধ্য হচ্ছে।
জাহাজ এবার মংলার পাশ দিয়ে রূপসায় চলে আসে। বিকেল ৬টায় জাহাজ খুলনায় চলে আসে। পূবালী ব্যাংক খুলনার অঞ্চল প্রধান কামরুজ্জামানকে ফোন করলে তিনি একটি গাড়ি দেন। আমরা নামতে চাইলে জাহাজের ক্যাপ্টেন বললেন আমরা রাতের খাবার খাইয়ে আপনাদেরকে রাত ৯টায় নামিয়ে দেব। ৭টায় রান্না হয়ে গেলে আমরা খাবার নিয়ে জেলঘাটে নেমে ব্যাংকের গাড়িতে চড়ে সারাটা খুলনা শহর ঘুরে বেড়াই। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, হাদিস পার্ক, অপূর্ব সুন্দর রেলস্টেশন, শিল্পনগরী সব গাড়িতে বসে দেখে নেই। রাতে অঞ্চলিক অফিসে বসে জাহাজের খাবার খেয়ে গ্রীনলাইন বাস কাউন্টারে হাজির হই। (সমাপ্ত)

 

শেয়ার করুন
পাঁচ মিশালী এর আরো সংবাদ
  • লজিং জীবন
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • একটি কুসুম ফলে
  • শিশুদের ভালবাসায় সিক্ত দানবীর
  • কবিতা
  • হায়রে বাংলা ভাষা
  • স্বাধীন
  • ৬৪টি জেলা ঘুরেছেন সিলেটের ফাহিম
  • জন্মভূমির টানে
  • তাজমহল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • প্রকৃতির হাতছানি
  • সাংবাদিক জিয়া খালেদের চলে যাওয়া
  • ব্যারিস্টার নাজির ফ্রিডম অব দ্য সিটি অব লন্ডন সম্মাননায় ভূষিত
  • প্রাচীন বাংলার রাজধানী পানামনগরে একদিন
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ
  • চলতি পথের সরস বচন
  • লিথিসি’র ‘ভাইবে রাধারমণ’-এ মুগ্ধ শিলচর
  • Developed by: Sparkle IT