পাঁচ মিশালী

হাওরের দেশে

মুশাহিদ বিন মুছাব্বির প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০১-২০২০ ইং ০০:৩৬:২০ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত

ভ্রমণ করতে কার না ভালো লাগে। সময় এবং সুযোগ পেলে সকলেই বেড়াতে চান। একসময় ঘোরাঘোরীকে নিতান্তই বিলাসিতা মনে করা হতো। এখন আর সেই দিন নেই। আর্থিক সক্ষমতা ও তথ্যপ্রবাহের সুবিধা থাকায় অনেকেই বেড়াতে যাচ্ছেন। দেশের উত্তর পূর্ব সীমান্ত ঘেরা হাওরের রাজধানী হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ জেলা। শুধু হাওর নয় জীব বৈচিত্রের সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ নদী, পাহাড় আর শৈল্পিক কারুকার্যে ভরপুর এ জেলা। আর সুনামগঞ্জ শহর তো সিলেটের বেশ নিকটে। কর্মস্থল থেকে ছুটি পাওয়ায় ভাবছিলাম কোথায় যাওয়া যায়। অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিলাম সুনামগঞ্জ। নতুন সফরসঙ্গী নাজিম সানী ও আশফাককে নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। ৩৬৬৯ বর্গ কি.মি আয়তনের এ জেলার নামকরণ হয়েছে মোঘল সিপাহী সুনাম উদ্দিনের নামানুসারে। সুনাম উদ্দিনের আঞ্চলিক রুপ ছিল সুনামদি। এক যুদ্ধে বীরোচিত কৃতিত্বের জন্য সম্রাট কর্তৃক কিছু ভূমি সুনামদিকে পুরষ্কার প্রদান করা হয়। তাঁর দান স্বরূপ ভূমিতে তার নামেই সুনামগঞ্জ বাজারটি স্থাপিত হয়। ১৮৭৭ সালে এটি মহকুমা হলেও ১৯৮৪ সালে জেলার মর্যাদা পায়।
সিলেট শহর থেকে যাত্রা করে পথিমধ্যেই পাগলা মসজিদ দেখে নিলাম। সদর উপজেলার পাগলা ইউনিয়নে পাগলা বাজারের পাশেই প্রাচীন এ মসজিদের অবস্থান। দোতলা এ মসজিদটির উপরে কারুকার্য খচিত ৩টি গম্বুজ ও চারকোনে ৪টি ছোট মিনার আছে। প্রাচীন এ মসজিদে নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে যে কেউ অভিভূত হবেন। তারপর আমরা গেলাম সুনামগঞ্জ শহরে। সুরমা নদীর তীরে গড়ে উঠা হাসন রাজার বাড়ীটি এখন জাদুঘরে রূপ দেয়া হয়েছে। ১৮৫৪ সালে সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী গ্রামে এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী। তাঁর ব্যবহৃত নানান দ্রব্য সামগ্রী, কবিতা ও গানের পান্ডুলিপি সহ অনেক কিছু স্থান পেয়েছে এ জাদুঘরে। ১৯২২ সালে মৃত্যুবরণ করলে তাঁকে সমাহিত করা হয় শহরের তেঘরিয়া এলাকায়। তারপর আমরা চলে গেলাম জেলা শহর থেকে ২০ কি.মি দূরে তাহিরপুর উপজেলায়।
ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের কোলঘেষে গড়ে উঠা তাহিপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান। ১০টি মৌজা নিয়ে অবস্থিত এই টাঙ্গুয়ার হাওর স্থানীয়দের কাছে ৯ কুড়ি বিল আর ১৩ কুড়ি কান্দা হিসেবে পরিচিত। ১১ বর্গ কি.মি দৈর্ঘ্য আর ৭ কি.মি প্রস্থের মধ্যে ৫১ টি বিল নিয়ে গঠিত এই টাঙ্গুওয়ার হাওর। হাওর পারের ৮৮টি গ্রামের মানুষের জীবন জীবিকা এ হাওরকে ঘিরেই। শীতের শুরুতেই টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়। শীত শেষে অতিথি পাখি ফিরে যায় নিজ দেশে। এই পাখির সাথে বিচরণ করে দেশী পাখিও। পাখির আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্য সংকট, চোরা শিকারীদের নির্বিচারে পাখি নিধনের কারণে এদের সংখ্যা কমছে বলে অনেকের ধারনা। পাশাপাশি ভারতের মেঘালয় সীমান্তে ইউরেনিয়াম খনি প্রকল্পে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণে হাওরের মাছ ও পাখির বিচরণ এখন ঝুকিপূর্ণ বলে অনেকে মনে করেন। প্রশাসনিকভাবে হাওর রক্ষার কর্মসূচী গ্রহণ করায় পর্যটকেরা আশায় আছে। তারপরে নয়নভরে দেখে নিলাম হাওরের প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্য। দেখলাম প্রতিটি বাড়ীর পাশে পানি আর পানি। প্রায় ১০০ বর্গ কি.মি আয়তনের এ হাওরে আছে ১৫০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ১৫০ প্রজাতির মাছ, ২০০ প্রজাতির অতিথি পাখি এবং ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণী। পর্যটনের দিক থেকে এই হাওর পছন্দের শীর্ষে অবস্থান করছে। পাশাপাশি আছে পাকনার হাওর, হালির হাওর, নালুয়ার হাওর, শনির হাওর, মাটিয়াল হাওর সহ প্রায় ৪ শতাধিক হাওর। ‘হাওর’ শব্দটি সায়র (সাগর) থেকে এসেছে। আর এই হাওরের (সাগর) রূপ দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থীদের সমাগম হয়। পাশাপাশি যাদুকাটা নদীর তীরে ১০০ বিঘারও বেশী জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে শিমুলবাগান। বসন্ত কালে একসাথে ২০০ শিমুল গাছ পাপড়ি মেলে। নদীর ওপারে মেঘালয়ের পাহাড় আর ওপারে রক্তিম ফুলের সমারোহ। মধ্যখানে যাদুকাটা নদী। অগণিত পাখির কলকাকলীতে মুগ্ধ ও মোহনীয় পরিবেশ আর কী হতে পারে।
শুস্ক মৌসুমে সারী সারী গাছের সবুজ পাতার সুনিবিড় ছায়া পর্যটকদের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিবে। একেক ঋতুতে একক রূপ। বর্তমান দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ হচ্ছে। বছরে প্রায় ৮০ লক্ষ পর্যটক ঘুরে বেড়ায় দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে। এ জেলার পর্যটন শিল্পকে কাজে লাগাতে পারলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব। যা গত বছর ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর দুই দিন ব্যাপি টাঙ্গুয়ার হাওরে “জল জোসনার” আয়োজন করায় ব্যাপক সাড়া পড়েছিল। সুনামগঞ্জে আরো দেখলাম মাটির মসজিদ, সুখাইর রাজবাড়ী, গৌরারং জমিদার বাড়ী, ধলমেলা ইত্যাদি। তবে ‘ধল মেলা’ দেখতে হলে ফাল্গুন মাসের প্রথম বুধবার যেতে হবে। আর ‘বারুনী মেলা’ বসে চৈত্র মাসে তাহিরপুর। এর মেলাগুলো খুবই উপভোগ্য।

শেয়ার করুন
পাঁচ মিশালী এর আরো সংবাদ
  • লজিং জীবন
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • একটি কুসুম ফলে
  • শিশুদের ভালবাসায় সিক্ত দানবীর
  • কবিতা
  • হায়রে বাংলা ভাষা
  • স্বাধীন
  • ৬৪টি জেলা ঘুরেছেন সিলেটের ফাহিম
  • জন্মভূমির টানে
  • তাজমহল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • প্রকৃতির হাতছানি
  • সাংবাদিক জিয়া খালেদের চলে যাওয়া
  • ব্যারিস্টার নাজির ফ্রিডম অব দ্য সিটি অব লন্ডন সম্মাননায় ভূষিত
  • প্রাচীন বাংলার রাজধানী পানামনগরে একদিন
  • বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে
  • কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ
  • চলতি পথের সরস বচন
  • লিথিসি’র ‘ভাইবে রাধারমণ’-এ মুগ্ধ শিলচর
  • Developed by: Sparkle IT