উপ সম্পাদকীয়

বিপন্ন নদনদী ও খালবিল

এম. লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০১-২০২০ ইং ০০:৩৮:০১ | সংবাদটি ৮১ বার পঠিত

বাংলাদেশ হলো খালবিল ও নদীমাতৃক উর্বর পলিবাহিত শস্যময় দেশ। চারদিকে খালবিল, নদনদী, সাগর আর পাহাড় পরিবেষ্টিত প্রাকৃতিক দৃশ্য ধারণ করে বহির্বিশ্বে রাণীর আসন দখল করে রেখেছে। বাংলাদেশ নদীনালা ও খালবিলের দেশ । প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর এ দেশে রয়েছে ছোটবড় মিলে অসংখ্য নদনদী ও খালবিল। একসময় নদনদী ও খালবিল ছিল যাতায়াতের প্রধান পথ। হৃৎপিণ্ডে ধমনী যে গুরুত্ব বহন করে, নদনদী এবং খালবিল বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে সেরূপ গুরুত্ব বহন করে। এক দিকে তখন রাস্তাঘাট এখনকার মতো এত উন্নত ছিল না, অন্য দিকে নৌপথে যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহন তুলনামূলক বিচারে ছিল সস্তা। সড়ক, রেল ও নৌপথ-এই তিনটি পথের মধ্যে নৌপথেই সবচেয়ে বেশি লোক যাতায়াত করে এবং পণ্য পরিবহনও এ পথে সর্বাধিক। কিন্তু দেশের নদনদী এবং খালবিলের অবস্থা খুবই করুণ। এগুলোর বেশির ভাগই আজ হাজামজা এবং নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে শুকনো মওসুমে এর বেহাল দশা প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়। তখন নৌপথের যানবাহনগুলো কখনো চরে আটকে পড়ে, আবার কখনো ঘুরপথে চলাচল করতে হয়। এতে অর্থ ও সময় নষ্ট হয়।
নদনদীগুলো চর পড়া ও নাব্যতা হারানোর সবচেয়ে বড় কারণ ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব। ১৯৭২ সালে তৎকালীন সরকারের সম্মতি নিয়ে পরীক্ষামূলক স্বল্পকারের জন্য ভারত সরকার ফারাক্কা বাঁধ চালুর কথা বলে তাকে স্থায়ী রূপ দেয়। শুকনো মওসুমে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-নগরবাড়ী ঘাটে গেলে দেখা যায় একসময়ের প্রমত্তা পদ্মায় জেগে ওঠা অসংখ্য চর ফারাক্কার নিষ্ঠুর ছোবলের সাক্ষী হয়ে আছে। এ কারণে দীর্ঘশ্বাস আসে-হায়রে পদ্মা। ভারতের অন্যান্য বাঁধও বাংলাদেশের কৃষি, মাছচাষ এবং জীববৈচিত্র্যের অনেক ক্ষতি করছে। আর স্বাধীনতাপূর্ব এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন সরকারের আমলে সবুজ বিপ্লব ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ নদনদীগুলোর ভালোর চেয়ে মন্দই করেছে বলে অনেকের অভিমত। ফারাক্কাসহ অন্য সব বাঁধের প্রভাব শুধু নদনদীর ওপরই পড়েনি, নদনদীর ওপর নির্ভরশীল খালবিলের ওপরেও পড়েছে। শুকনো মওসুমে খালগুলো একেবারেই পানিশূন্য থাকে, নদনদীর ওপর নির্ভরশীল খালবিলের ওপরেও পড়েছে। শুকনো মওসুমে খালগুলো একেবারেই পানিশূন্য থাকে, কোনো কোনো খালবিল শুকিয়ে যাওয়ায় সেচকাজ ব্যাহত হয়, ফলে ফসল উৎপাদনে পানির সমস্যা দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো শুকনো খাল আগাছায় ভরে গেছে। আর কোনো কোনো খালে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে খালের এক পাড়ে রাস্তা এবং অপর পাড়ে ফসলি জমি। লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে ফসলি জমিতে বেড়ে উঠছে ঘরবাড়ি। এসব খালে বাঁধ দিয়ে যাতায়াতের পথ বানিয়েছে। কোথাও কোথাও খালের কিছু অংশ দখল করে প্রভাবশালীরা দোকানঘর বানিয়েছেন। এর ফলে এসব খালে নৌচলাচল চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। এসব বেআইনি কাজ দেখার জন্য মনে হচ্ছে কেউ নেই। অথচ স্থানীয় প্রশাসনের এগুলো নজরে আসার কথা এবং জনগণের ব্যবহারের পথ তথা সরকারি জায়গা রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জোর যার মুল্লুক তার। আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের দূরদর্শিতার অভাবে অপরিকল্পিতভাবে খালে স্লুইস গেট নির্মাণ করায় নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আর কোনো খালের উৎসমুখে বাঁধ নির্মাণ করায় শুধু নৌচলাচলই বন্ধ হয়নি, পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ায় প্রচুর কচুরিপানা জমেছে। এসবের ফলে খালগুলো জোঁক ও মশার জন্মস্থানে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে বরিশাল এলাকায় এসব সমস্যার উদ্ভব হয়েছে বেশি। কেননা বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহারের উপযুক্ততা যথাযথভাবে যাচাই না করে তৎকালীন সরকারের পানিসম্পদমন্ত্রীর জেলায় বরিশাল ইরিগেশন প্রজেক্ট (বিআইপি) নামে একটা সংস্থা সৃজনকরত এ ধরনের অনেক স্লুইস গেট নির্মাণ করে। ফলে নৌচলাচল বন্ধ হওয়ায় এর বিরুদ্ধে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পযর্টনমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনেক আন্দোলন হয়েছে। পরে অবশ্য বিআইপি বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর এসব কারণে খালে নৌচলাচল বন্ধ হওয়ায় কৃষকেরা অর্থকরী ফসল আখ ও পাটচাষ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
পানির সাথে জীবন, জীবিকা, পরিবেশ, প্রতিবেশ, ব্যবসায়, বাণিজ্য প্রভৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই জীব ও জীবিকার প্রয়োজনে তথা সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে পানির উৎসগুলো পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে এগুলো সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে পরিবেশসচেতন কয়েকটি সংগঠন। এসব সমস্যার আগু সমাধানে কালক্ষেপণ করার কোনো অবকাশ নেই। কারণ নদনদী ও খালবিল বাংলাদেশের ধমনী, যার মধ্য দিয়ে এর অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালিত হয়। নদনদী ও খালবিলের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে নাড়ির সম্পর্ক। তাই প্রকৃতির পরিবেশ ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে আসুন আমরা জীবন বাঁচাই, বাঁচাই এদেশের নদনদী ও খালবিল। ফিরিয়ে দেই তাদের যৌবন আর ধাবমান স্রোত। এটাই সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়াক নাগরিক মহলে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বিশ্ব অর্থনীতিতে করোনা ভাইরাসের প্রভাব
  • হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে গাফিলতি
  • আসছে বর্ষা : প্রস্তুতি কতটুকু
  • হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের অরণ্য
  • সর্বত্র মানুষ গড়ার শিক্ষা চাই
  • সাধারণ গ্রন্থাগার
  • বিশ্বে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি : কীসের ইঙ্গিত
  • বাঙালির হৃদয়ের ভাষা বাংলা
  • নৈতিকতা ও জাগ্রত মূল্যবোধ ছাড়া সোনার বাংলা গড়া সম্ভব নয়
  • উহান সিটি কি ব্যাংকরাপ্টেড হচ্ছে!
  • পড়িলে বই আলোকিত হই
  • জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য
  • জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি পুনর্গঠন ও কিছু প্রত্যাশা
  • চাই মানসম্পন্ন বই
  • প্রসঙ্গ : রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • করোনা ভাইরাস
  • মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ আল আজাদ
  • শহীদ মিনার সাহসী কথা বলে
  • একুশে ফেব্রুয়ারি
  • ভাষা আন্দোলন এবং একুশে
  • Developed by: Sparkle IT