উপ সম্পাদকীয়

শুদ্ধি অভিযানের শুদ্ধতা

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০১-২০২০ ইং ০০:৩৮:৩৫ | সংবাদটি ২৩২ বার পঠিত

বছর শেষ হলে, সে বছরের সালতামামি করতে হয়। পুরনো বছরের ভুল শুদ্ধের হিসাব করে, নতুন পরিকল্পনায়, শুদ্ধতার শপথ নিয়ে এগুতে হয়। এটাই হলো, শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ, মানুষের তৈরী সংগঠন, মানুষের নির্বাচিত সরকারের স্বাভাবিক কর্মধারা। গণতান্ত্রিক সরকার জন আকাংখা পূরণের জন্য সব সময় সতর্ক থাকে। সরকার যেমন জনগণের মনোভাবকে মূল্যায়ন করে, জনগণও তেমনি গভীরভাবে সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে থাকে। জনগণের পর্যবেক্ষণের যোগফল পরবর্তী নির্বাচনে ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়। জনগণের আদালতে, জনগণের বিচারিক কার্যক্রমে সরকারকে উত্তীর্ণ হতে হয়। যে সরকার প্রতি মুহূর্তে জনআকাংখা বাস্তবায়নে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন, সে সরকারই ততো গণমুখী। জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জন্য গণমুখী সরকার সব সময় প্রস্তুত থাকে। নির্বাচনের পূর্বে ঐ যে “সেবা করার সুযোগ দানের” আকুল আবেদন, শাসন কালে জনগণের সেবক হিসাবে তাঁর প্রতিফলন যদি না হয়, জনগণ কিন্তু তাঁর জবাব দিতে কার্পণ্য করে না পরবর্তী নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে।
রাষ্ট্রের মালিকানা থাকে জনগণের আর জনগণের মতামতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকে সরকার। ভোটকেন্দ্রিক এই যে গণতন্ত্র তাও কিন্তু আদর্শ গণতন্ত্র নয়। আদর্শ গণতন্ত্রে, সরকার মেয়াদ পূর্তির পূর্বেও ক্ষমতা হারাতে পারে, যদি জনগণের পক্ষ থেকে সংসদ সদস্যদের অধিকাংশ মনে করেন যে সরকার কোন বিশেষ বিষয়ে কিংবা সকল বিষয়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কার্যক্রম করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে এরকম ব্যর্থতার কারণে মেয়াদ পূর্তির পূর্বেই সরকারের পতন ঘটে এবং এরকম পতন ঘটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। জনগণের আস্থা হারালে সরকার অনেক ক্ষেত্রে আস্থা ভোটের অপেক্ষা না করে নিজ থেকেই পদত্যাগ করে থাকে। এরকম উদাহরণ হরহামেশাই আমরা বৃটেন, জাপান ইত্যাদি দেশে দেখে থাকি। গণতন্ত্রের মর্মবাণীকে সম্মান প্রদর্শন করে এ সমস্ত দেশের সরকার পদত্যাগ করে থাকে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এ ক্ষেত্রে আরও সুদৃঢ় হওয়ার সুযোগ পায়, জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতার ফলে গণতন্ত্র সে সমস্ত দেশে আরও শক্তিশালি হওয়ার সুযোগ পায়। জবাবদিহিতা মানে জনগণকে চালকের আসনে বসিয়ে দেশ শাসন করা। এরকম অবস্থাতে একটি দেশ তাঁর সার্বিক উন্নয়নকে টেকসই করার অপার সুযোগ পেয়ে থাকে।
স্বৈরতন্ত্র কিংবা ছদ্মবেশী গণতন্ত্র জনমতকে তেমন তোয়াক্কা করেনা। কারণ জনমতের উপর ভিত্তি করে তারা টিকে থাকে না। তারা যখন কোন কর্ম পরিকল্পনা করে থাকে, তাঁর উদ্দেশ্য থাকে দুর্নীতির মাধ্যমে অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন। আমাদের দুর্ভাগ্য স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমরা প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, আমাদের গণতন্ত্র ভোট কেন্দ্রিক গণতন্ত্র। একবার নির্বাচিত হলে জবাবদিহি ছাড়াই আমাদের সরকারগুলো পূর্ণমেয়াদে শাসনকর্ম পরিচালনা করে থাকে। এ ছাড়া অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসন আমাদেরকে বারবার শুদ্ধ গণতন্ত্র চর্চার দিকে নয়, অশুদ্ধ স্বৈরশাসনের পথে নিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। এরকম উদাহরণ পঁচাত্তরের পর থেকে আমরা বহুবার দেখে এসেছি।
স্বৈরশাসন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের গ্রহণকে অবজ্ঞা করে চলে। স্বৈরশাসক ক্ষমতায় এসে কিছু চমক তৈরি করে, এ গুলোকে পলিটিক্যাল স্ট্যান্টবাজি বলা হয়ে থাকে। পলিটিক্যাল স্ট্যান্টবাজি হিসাবে একজন শাসককে দেখেছি সাইকেল চালিয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে যেতে। জ্বালানি তেলের সাশ্রয় করার এই যে মিথ্যা প্রদর্শনী পরবর্তীতে ক্ষমতায় থাকাকালীন ও পতনের পর তাঁর দুর্নীতির খতিয়ান দেখে সাইকেল চালিয়ে অফিসে যাওয়ার স্ট্যান্টবাজি তাঁর প্রতি মানুষের অশ্রদ্ধা বাড়িয়েছে অনেক গুণ। পাকিস্তান আমলে স্বৈরশাসকদের স্ট্যান্টবাজি ছিলো আরও চমকপ্রদ, সদরে আলা, প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খান ক্ষমতায় এসেই, তরুণ যুবকদের লম্বা চুল ছোট করার ফরমান জারি করেন, চুল ছোট না করলে প্রকাশ্য রাজপথে তরুণ, যুবকদের চুল কেটে দেয়ার দায়িত্ব নিত তাঁর আজ্ঞাবাহী সৈনিকেরা। এ ছাড়াও বাড়ির সামনের আবর্জনা পরিষ্কারের মতো জনপ্রিয় কাজের পরিকল্পনা তারা হাতে নিতেন। এ ধরনের স্ট্যান্টবাজি করার উদ্দেশ্য থাকে, তারা যে মহৎ কর্ম করার উদ্দেশ্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন জনগণের সামনে এ ধরনের ভাবমূর্তি তৈরি করা। দুঃখের বিষয় হল, তাদের গোপন উদ্দেশ্যকে তারা শেষ পর্যন্ত গোপন রাখতে সমর্থ হতেন না। ধীরে ধীরে, ক্ষমতার দাপট, অপশাসন, দুর্নীতির বিষয়গুলো ম্যাজিশিয়ানের মতো তাদের থলে থেকে বেরিয়ে আসতো। মুখোষের অন্তরালের মুখ যখন বেরিয়ে আসতো, তখন জনগণের আদালতে বিচারের সন্মুখীন হতে হতো তাদের। তাদের পরিণাম যে কতো দুর্বিসহ হয়েছে, ইতিহাস তাঁর স্বাক্ষী আছে।
ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া হলো অনেক, সালতামামির যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম সে কথাতে আবার ফিরে আসি। দু হাজার ঊনিশের অর্থাৎ ফেলে আসা বছরের সালতামামি করলে নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে প্রশংসিত কাজের তালিকার উপরের দিকে থাকবে শুদ্ধি অভিযান। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি যখন, শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়, আশাবাদী মানুষেরা নড়ে চড়ে বসেন। বুক বেধে সবাই সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে, শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা মনে করেন স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী দল জনগণের মনের কথা বুঝতে পেরে এরকম সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০১৯ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর যুবলীগের ঢাকা, দক্ষিণ শাখার, সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে শুদ্ধি অভিযানের সূচনা ঘটে। শুদ্ধি অভিযান শুরু হয় ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি, আধিপত্য বিস্তার সহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে। এ সমস্ত অপরাধের কিছু কিছু যখন সংবাদপত্রে উঠে আসতো, দেশপ্রেমিক, শান্তি প্রিয় মানুষেরা অনেকেই ভাবতেন এ গুলো বন্ধ হওয়া উচিত। জনগণ যখন দেখলো ক্ষমতাসীন সরকার জনগণের মনোভাব বুঝতে পেরে নিজেরাই এরকম অভিযান শুরু করেছেন, সরকারকে সকলেই ফুলমার্কস দিতে শুরু করেন। এরপর জনগণ বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করে সরকার জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি “দুর্নীতির “ প্রতি জিরো টলারেন্সকে সম্মান দেখিয়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর মইনুল হক সহ অনেক কাউন্সিলরকে গ্রেপ্তার করে বিচারের সম্মুখীন করে। সর্বশেষ বিস্ময় ছিলো, ঢাকা মহা নগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটসহ এগারজন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আওয়ামী ঘরানার নেতাদের গ্রেপ্তার। এদের অনেকেই মনে করেছিলেন, তারা সবসময় ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকতে সক্ষম হবেন। সরকার তাঁর কার্যক্রম দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, অপকর্ম করলে সবাইকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। শুধুমাত্র সরকারী দলেই যে এরকম অন্ধকারের কুশীলবরা ছিলেন তা কিন্তু বলা যাবে না, সকল দলেই কিছু না কিছু অপকর্মের হোতাকারি যেমন টেন্ডারবাজ, আধিপত্য বিস্তারকারী কিছু না কিছু দুর্বৃত্ত শ্রেণীর লোক ছিলেন। সরকার যখন স্ব-উদ্যোগে নিজেদের ঘর থেকে দৃষ্টান্ত স্থাপনে ব্রতী হলেন, সাধারণ নাগরিকেরা কিছুটা হলেও এরকম পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলে মনে করলেন।
সম্প্রতি যখন জাতীয় সংবাদপত্রে দেখতে পেলাম, “অভিযান থেমে গেছে, অভিযুক্তরা ফিরছেন” এরকম সংবাদ দেখতে পেয়ে মনে হলো, আবার বোধ হয় আমাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হলো, নাকি আমরা শুদ্ধি অভিযানের নামে যে সাহসী পদক্ষেপ অবলোকন করেছিলাম তা’ ছিলো আমাদের দিবা স্বপ্ন, বিভ্রমের মধ্যে পড়ে গেলাম আমরা অনেকেই। এর মধ্যে যখন দেখলাম পালিয়ে যাওয়া একজন অভিযুক্ত ফিরে এসে কাউন্সিলার পদে লড়ছেন, বুকটা আবার কেঁপে উঠলো। সু-স্বপ্ন কিংবা প্রচন্ড প্রত্যাশা যখন “সকলই গরল ভেলে” পরিণত হয় তখন মানুষ’ আশাহতের বেদনায় দুমড়ে , মুচড়ে যেতে থাকে। জনগণ কিছুটা হলেও শুদ্ধি অভিযানের গতি নিয়ে বিভ্রমে আছে, জনগণের মনের কথাটি বুঝতে পেরে, সরকারের এ মেয়াদের প্রথম বছর পূর্তি উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের আশ্বস্থ করলেন, “ভরসা রাখুন, শুদ্ধি অভিযান চলতে থাকবে। “আমরা অবশ্যই ভরসা রাখতে চাই, আমরা চাই আমাদের এ পর্যন্ত সমস্ত অর্জনকে সংহত করতে। আমরা যখন মাথা পিছু আয়ের ক্ষেত্রে, জাতীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য লাভ করছি, প্রসব কালে মাতৃমৃত্যুর হার দ্রুত গতিতে কমে যাচ্ছে। আমাদের শিশুদের প্রায় সবাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে পারছে, এরকম সময়ে, কিছু মানুষের দুর্নীতি, অপকর্মের দ্বার খুলে দিয়ে উন্নয়নের গতিকে আমরা রুদ্ধ করবো কেনো।
আমরা আশা করবো, শুদ্ধি অভিযানের শুদ্ধতা রাখতে সরকার কার্পণ্য করবে না। “দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো” গণমুখী সরকারের এটাই থাকে মূল আদর্শ। এই আদর্শকে বাস্তবায়নের জন্য যখন “নিজেদের ঘর থেকে “দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে উদ্যোগী হয় সরকার, সে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা, ভালোবাসা বাড়তে থাকে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সকল দলই জনগণের এরকম ভালোবাসা পাওয়ার কাঙ্গাল থাকে , আমরা আশা করি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও জনপ্রিয় এবং আস্থাভাজন হওয়ার এরকম সুযোগকে হাত ছাড়া করবে না। এরকম ক্ষেত্রে সরকারের দ্বিধান্বিত হওয়ার অবকাশ নেই। দুর্বলদের রক্ষা করতে সরকার নিজেদের শক্তির উপর ভর করেই এগিয়ে যাবে, এ ক্ষেত্রে শুভশক্তি সম্পন্ন মানুষ সবসময় সরকারের পাশে থাকবে। আমাদের বিশ্বাস সরকার এবং সরকারী দলের সাহস ভবিষ্যৎ সরকার সমূহকে স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে গতিপথ নির্ধারণে সহায়তা করতে সক্ষম হবে। আমরা তাকিয়ে থাকলাম সরকারের সাহসী পদক্ষেপের সুফল ভোগের প্রত্যাশায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজগবেষক।

 

 

 

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বিশ্ব অর্থনীতিতে করোনা ভাইরাসের প্রভাব
  • হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে গাফিলতি
  • আসছে বর্ষা : প্রস্তুতি কতটুকু
  • হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের অরণ্য
  • সর্বত্র মানুষ গড়ার শিক্ষা চাই
  • সাধারণ গ্রন্থাগার
  • বিশ্বে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি : কীসের ইঙ্গিত
  • বাঙালির হৃদয়ের ভাষা বাংলা
  • নৈতিকতা ও জাগ্রত মূল্যবোধ ছাড়া সোনার বাংলা গড়া সম্ভব নয়
  • উহান সিটি কি ব্যাংকরাপ্টেড হচ্ছে!
  • পড়িলে বই আলোকিত হই
  • জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য
  • জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি পুনর্গঠন ও কিছু প্রত্যাশা
  • চাই মানসম্পন্ন বই
  • প্রসঙ্গ : রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • করোনা ভাইরাস
  • মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ আল আজাদ
  • শহীদ মিনার সাহসী কথা বলে
  • একুশে ফেব্রুয়ারি
  • ভাষা আন্দোলন এবং একুশে
  • Developed by: Sparkle IT