সাহিত্য

দর্পণে বিম্বিত ছবি

কানিজ আমেনা প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০১-২০২০ ইং ০০:১৫:২১ | সংবাদটি ৭২ বার পঠিত

প্রেম চির অম্লমধুর একটি শব্দ। নারী-পুরুষের শাশ্বত সম্পর্কের একটি বিশেষ নাম হলো প্রেম। যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন প্রেম থাকবে। যুগে যুগে প্রেমের অমর প্রতীক হয়ে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, চণ্ডিদাস-রজকিনী, রোমিও-জুলিয়েট এই নামগুলো। সেই চিরন্তন প্রেমের অনুভূতি থেকে লিখিত একগুচ্ছ পঙক্তিমালার সমাহার হলো রোমান্টিক কবি আবু জাফর মো. তারেক এর কাব্যগ্রন্থ ‘দর্পণে বিম্বিত ছবি’। আর এই গ্রন্থের মাধ্যমে প্রচারবিমুখ নিভৃতচারী কবির মনের কিছু একান্ত অনুভূতি অবশেষে কবিতাপ্রেমী পাঠকের সামনে আলোর মুখ দেখলো।
সর্বমোট চল্লিশটি কবিতার মধ্যে অধিকাংশই বিরহের কবিতা। কথায় আছে ‘প্রেমে বিরহ থাকলেই প্রেম না কি সার্থক হয়।’ ‘কল্পনার রাজহংসী' শিরোনামের কবিতাটি বইটির প্রথম কবিতা। কবি এখানে তার প্রেমিকাকে রাজহংসী রূপে কল্পনা করেছেন যে রাজহংসী সারাদিন সরোবরে সাঁতার কাটে। স্বচ্ছ জলের স্বচ্ছ পরিবেশে তার বাস, মাটির ধূলাবালি, কাদা, মলিনতা তার গায়ে লাগে না। তা দেখে কবিরও একান্ত ইচ্ছা জাগে সরোবরে নেমে রাজহংসীর পাশে সাঁতার কেটে কেটে এভাবেই যদি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতেন! ‘তুমি আসতে যদি’ কবিতায় কবির মনের একান্ত আকুতি ফুটে উঠেছে। তার মানসপ্রিয়া তার জীবনে এলে এ জীবন ‘শিশির-ঝলমলে রোদের ভোর', 'সাত রঙা রংধনু সাজানো আকাশ’, ‘জোছনা ছড়ানো রাত’, ‘সুখের অনাবিল ঝরনাধারা আর ‘ফুলে ফুলে সাজানো বাগান’-এ পরিণত হতো। একই রকম আকুতি ফুটে ওঠেছে ‘তুমি আসবে কবে’ কবিতাতেও। মনের মানুষটি জীবনে এলে গ্রীষ্মকালের পরিবর্তে বর্ষাকাল আসবে, শুকিয়ে যাওয়া নদীতে বান ডাকবে, শুন্য উঠান সোনালি ফসলে ভরে যাবে, ভগ্নহৃদয় আবারো ফুরফুরে আমেজে সজীব হয়ে ওঠবে। আহ! কী রোমান্টিক! এমন আকুতি এমন আহ্বান কি ভালোবাসার মানুষটি উপেক্ষা করতে পারে? ‘এক অপ্সরীর ছবি’ কাব্যে শেষের পঙক্তিতে পাঠকের জন্য একটি চমক অপেক্ষা করছে। প্রথমে মনে হতে পারে প্রেয়সীর রূপবন্দনায় রচিত হয়েছে এই কাব্য। লাবণ্যময় শুভ্র গণ্ডদেশ’, ‘কপোলের কৃষ্ণ তিলক’, ‘চকচকে শুভ্র দন্ত’ ‘রাতুল রাঙা ঠোঁট’, ‘শ্রাবণের ঘন মেঘদল সদৃশ দিঘল কৃষ্ণকুঞ্চিত চুল’, ‘কাজল কালো ভুরু’, ‘মৃগতুল্য আঁখি’, ‘কোকিলের মত মিষ্টি কণ্ঠ', সেই সাথে ‘গাত্রে নীলাম্বরি’! অথচ শেষ লাইনগুলোতে এসেছে, কিন্তু হায়! অবশেষে চিনেছি গূঢ় ছবি/ জেনেছি তার আসল পরিচয়/ উজ্জ্বল তনুর আড়ালে লুকিয়ে আছে পঙ্কিল হৃদয়/’ মনে প্রশ্ন জাগে এখন, বাস্তবে যারা আসলেই পংকিল হৃদয়ের অধিকারী, তাদের বাহ্যিক রূপটা কি বিপরীতভাবে এমন লাবণ্যময় আর স্নিগ্ধ হতে পারে? মন যার কলুষতায় পূর্ণ চেহারাতেও সেই কালিমার ছাপ কিছু না কিছু পড়ে বৈকি!
‘তোমায় ভুলবো কেমন করে’ কবিতাতে কবির বিরহী মনের ছবি ফুটে ওঠেছে। মনের মানুষটিকে বারবার ভুলার চেষ্টা করেও ভুলতে পারছেন না। ফুলের সুবাস, প্রজাপতির উড়ে যাওয়া, কোকিলের মিষ্টি সুরের গান, নজরুলের গানের প্রিয় কলি, সেই বারান্দা, সানবাঁধানো ঘাট সর্বত্র মানুষটির স্মৃতি ছড়ানো। তাই ভুলতে চাইলেও বারবার তারই ছবি ভেসে ওঠে মনের মুকুরে। ‘কোকিলা পাখি’ কবিতায় কবি বনের কোকিলকে ডেকে বলছেন, কোকিল তো বারোমাস গহিন বনে বাস করে ও মিষ্টি সুরে গান গায়। তিনি যে দুঃখের সাগরে ডুবে আছেন, সেটা এই বসন্তের কোকিল কী করে বুঝবে? ‘কী ক্ষতি হত’ কবিতার শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় কবি এখানে তাকে ভালোবাসতে রাজী হলে কোন ক্ষতি হত কি না এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যার প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন তার কোন ক্ষতি হত কি না তা কবি জানেন না তবে এতে স্বয়ং কবির যে অনেক লাভ হতো তা কবিতার ছত্রে ছত্রে বোঝা যায়। যেমন- ‘তবে আমার জন্য এক নতুন পৃথিবী সৃষ্টি হতো’, ‘তবে আমার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের উদয় হতো’, ‘তবে আমার কাননে এক অপূর্ব সুন্দর ফুল ফুটতো’। অর্থাৎ কৃপণতা না করে ‘ভালোবাসি’ কথাটা একটু বললেই তা কবির জন্য এক বিশাল প্রাপ্তির ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতো। তবে এটাও ঠিক ভালোবাসা এমন এক আবেগ যার উপর মনের জোর খাটে না। এ হচ্ছে এক স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতি।
‘চন্দনা’ একটি পদ্য কবিতা যাতে ছন্দে ছন্দে চন্দনা নামের মেয়েটির প্রশংসা গাওয়া হয়েছে। নামটি মেয়ের চন্দনা/ দেখতে মোটেই মন্দ না/... বৃথা খুঁজি তার উপমা/ সেই মেয়ে যে নিরুপমা/’। ‘তুমি চলে গেছ বলে’ কবিতাটিও একটি বিরহের কবিতা। ভালোবাসার মানুষটি চলে গেছে বলেই এখন আর কবির পৃথিবীতে বসন্ত আসে না, পাখিরা আর গান গায় না, ভোরের শিশির আর ঝলমল করে না, পূর্ণিমার চাঁদ আর জোছনা বিলায় না, রংধনু আর সাতরং ছড়ায় না, সুরভিত বাগানে আর সুবাসিত ফুল ফোটে না। মাঠঘাট ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, নদী হারিয়ে ফেলেছে তার নাব্যতা, নদীর বুকে জেগেছে ধূ ধূ বালুচর। ঘর হারিয়ে পথিক আজ নেমেছে পথে। তবুও জীবনযুদ্ধে বিদ্যমান পরিস্থিতির কাছে হার স্বীকার করে ভালোবাসার অনেক মানুষই অনেক সময় হারিয়ে যায়। তাকে ধরে রাখা যায় না। যারা ধরে রাখতে পারে তারা নিঃসন্দেহে অনেক সৌভাগ্যবান। সেই সাথে ভালোবাসার মানুষটিকে আজীবন ধরে রাখার জন্য চাই অনেক দৃঢ় মনোবল। ‘আমি তুমি’ ছোট্ট একটি পদ্য কবিতা বা বলা যায় ছড়া। ‘আমি হলাম চুম্বকের উত্তর মেরু/ তুমি হলে দক্ষিণ/ একটুখানি তফাৎ রেখে কেন্দ্রের টানে/ পরস্পরকে করছিলাম প্রদক্ষিণ/ হঠাৎ তুমি ছিটকে পড়লে/ জীবন হলো গতিহীন।’ কবি এখানে তার নিজেকে ও তার প্রেমিকাকে চুম্বকের উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর সাথে তুলনা করেছেন। এই বিপরীত ধর্মী দুই মেরুর মাঝে সর্বদা আকর্ষণ বিদ্যমান থাকে।
‘ধূমকেতুর পুচ্ছে আলোর নাচন’ শিরোনামের কবিতাটি সমগ্র কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ব্যতিক্রমধর্মী একটি কবিতা। এটা এককভাবে কোন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নয়, বরং সাধারণভাবে একজন কবির মানসিকতাকে আলোকপাত করে রচিত হয়েছে। কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইন থেকেই তা বোঝা যায়, ‘ফুলের গায়ে মলিনতা/ কোন কবিরই কাম্য নয়/ সুন্দরই কবির আরাধ্য/ কবির প্রতিটি শব্দই/ ফুলের এক একটি পাঁপড়ি/ প্রতিটি কবিতাই/ এক একটি রঙিন ফুল/ ফুল সুন্দরের প্রতীক। পৃথিবীর সৌন্দর্যকেই ফুল ধারণ করে/ কবি তো ফুল ফোটাতেই পছন্দ করেন।/ তার দ্বারা ফুল হবে ধূসর মলিন/ এ অসম্ভব।’
কথাগুলো খুব সুন্দর। ধ্বংস নয়, সৃষ্টি করাই একজন কবির কাম্য, কবির কাজ। সুন্দরের জয়গান, মানবতার জয়গান করাই কবির ধর্ম। শেষের পঙক্তিগুলোতে কবি বলেছেন, ‘আমার জীবন আকাশ হয়তো ক্ষণিক/ আঁধারে ছেয়ে গেছে/ আঁধার ভেদ করে একদিন/ ধূমকেতুর আর্বিভাব ঘটবে/ সবাই বিমুগ্ধ হয়ে দেখবে/ ধূমকেতুর পুচ্ছে। আলোর নাচন।’ কবির এই কথাগুলো মনে আশা জাগানিয়া কথা। মানুষের জীবনে সুখের পর দুঃখ আসে, আবার দুঃখের পর সুখ। তাই দুঃখ এলে হতাশ হয়ে ভেঙ্গে না পড়ে ধৈর্য ধরতে হবে, নতুন দিনের সূর্যোদয়ের অপেক্ষা করতে হবে।
‘দর্পণে বিম্বিত ছবি’ বইটি প্রকাশ করেছে সিলেটের বাসিয়া প্রকাশনী। প্রকাশকাল অমর একুশে বইমেলা ২০১২। ৩ ফর্মার এ বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ষাট টাকা, যুক্তরাজ্যে তিন পাউন্ড। প্রচ্ছদ করেছেন মুহাম্মদ লুৎফুর রহমান।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT