উপ সম্পাদকীয়

ফেসবুক ও আমাদের সন্তান

ফাতিহুল কাদির সম্রাট প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০১-২০২০ ইং ০০:১৬:৪৩ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

মার্ক জাকারবার্গ স্বীকার করেছেন, ফেসবুক উদ্ভাবন ছিল একটা ভয়ংকর ভুল। সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলও ডিনামাইট আবিস্কার করেছিলেন মূলত নির্মাণকাজের জন্য পাথর ভাঙা এবং মাইনিংয়ের প্রয়োজনে। কিন্তু তিনি জীবদ্দশাতেই দেখেছিলেন ডিনামাইট দিয়ে মনুষ্যজাতি হত্যার নির্মম উৎসব। অনুতপ্ত হয়ে তিনি তার ডিনামাইট বাণিজ্যের অর্থ দিয়ে নোবেল পুরস্কার চালু করে গেছেন। পরমাণু শক্তির ধ্বংসলীলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মানুষ দেখেছে; কিন্তু পরমাণু বোমা বানানোর পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও চলেছিল একসঙ্গে। আসলে কোনো বস্তু কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ফেসবুকের পেছনে রয়েছে ইন্টারনেট। ইন্টারনেট ছাড়া বর্তমান বিশ্ব পুরোপুরি অচল। ইন্টারনেটে যেসব কন্টেন্ট ভেসে বেড়ায়, তার কোনো কোনোটি পরমাণু অস্ত্রের চেয়ে কম ক্ষতিকর নয়। পর্নোগ্রাফি, অশ্লীল সাইট, পতিতাবৃত্তি, মানব ও অর্থ পাচার নেটওয়ার্ক, নোংরা সাহিত্য প্রভৃতিতে নেটদুনিয়া সয়লাব। কিন্তু তার পরও ইন্টারনেট ছাড়া আজকের দুনিয়া অচল। এটি বিজ্ঞানের এক আশীর্বাদ বলেই প্রমাণিত। ফেসবুকের আজ যে সমালোচনা, তা মূলত ব্যবহারকারীদের অবিমৃশ্যকারিতার ফল। জাকারবার্গ হয়তো জানতেন না যে, সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমটি মানুষের নেশার উপকরণ হয়ে দাঁড়াবে।
ফেসবুক আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে অনেক হারিয়ে যাওয়া মুখ। দেশের নানা প্রান্তের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কজাল তৈরি হয়েছে ফেসবুকের কল্যাণে। এমন কিছু অসাধারণ মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে, যাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সম্ভাবনা ছিল শূন্য। ফেসবুকের সাহচর্যে অনেকে দু-কলম লেখার তাগিদ ও সাহস পেয়েছেন। সমাজের অসঙ্গতি সম্পর্কে সচেতন হতে পারছেন, সমাজ শোধনের উপায় নিয়েও ভাবছেন। আমার দু-একজন ছাত্রছাত্রী তাদের ভাবনাগুলো কী সুন্দর করেই না প্রকাশের সামর্থ্য অর্জন করেছে!
প্রায় এক যুগ আগে যখন বাসায় ইন্টারনেটের ব্রডব্যান্ড কানেকশন নিই, তখন স্মার্টফোন-নেট-কম্পিউটার ছিল সীমিত। আমার বড় ছেলেটা সবে ক্লাস এইটে পড়ে। ছোটটা নিতান্তই ছোট। স্ত্রীর আশঙ্কা ছিল, বাড়ন্ত ছেলেটা নেটের জগতে ডুবে মরবে। আমার মত ছিল, প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার মানে পেছনে পড়ে যাওয়া। আমরা সন্তানের মূল্যবোধ এমনভাবে তৈরি করেছি যে, ভালোমন্দের মিশেল থেকে কেবল ভালোটাকেই নেবে। যদি তাকে নেট থেকে বিযুক্ত রাখি, তাহলে বরং নেটদুনিয়া নিয়ে কৌতূহল বাড়বে। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ সহজাত। তাই সে তার বন্ধুদের বাসায় গিয়ে নেট ঘাঁটবে, নয়তো টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে সাইবার ক্যাফের খুপরিতে বসে সময় কাটাবে।
পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে কম্পিউটারে বসেছিলাম। তাকে বুঝিয়ে দিলাম, নেটজগতে পৃথিবীর কোন কোন জঘন্যতম উপাদানের পাশাপাশি আছে কত সুন্দর সুন্দর জিনিস। ইচ্ছা করলে সে সত্য ও সুন্দরের সবক নিতে পারে আবার ইচ্ছা করলেই পারে নোংরা দুনিয়ায় ডুবে যেতে। সে নেটশক্তিকে জ্ঞানশক্তির উপলক্ষ করতে পারে; আবার করতে পারে নির্জ্ঞান হওয়ার উপায়। তাকে বললাম, সিদ্ধান্ত তোমার। একা বা বন্ধুদের সঙ্গে সাইবার ক্যাফেতে যাবে না। যা করার বাসাতেই করো। সুখের বিষয়, নেটদুনিয়া নিয়ে আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত করেছিল আমার ছেলে।
জাকারবার্গ ইচ্ছা করলেই ফেসবুক বন্ধ করতে পারবেন না আর। তিনি ফেসবুকে তার ভাগের ৯৯ শতাংশ শেয়ার দান করেছেন দাতব্য কাজে। এখন আমাদের ওপর মূল দায়িত্ব বর্তেছে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি ফেসবুককে ভালো কাজে ব্যবহার করব, না মন্দ কাজে। সন্তানদের ফেবুদুনিয়া থেকে আটকে রাখব নাকি তাদের যৌক্তিক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করব। মনে রাখতে হবে, ফেসবুক নিষিদ্ধ করে লাভ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। পরিমিত, যৌক্তিক ও ইতিবাচক ব্যবহারকেই নিশ্চিত করতে হবে। পারিবারিক মূল্যবোধ ও সংহতি রক্ষার জন্য আমাদের সময় দিতে হবে। পরিবারকে করে তুলতে হবে আনন্দময় এবং বন্ধুত্বঘেরা। যাতে সন্তানরা ফেসবুকে নয়, আমাদের বুকেই খুঁজে পায় ভালোলাগা ও ভালোবাসার দুনিয়া।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT