উপ সম্পাদকীয়

আপন শ্রম ও মেধা ভাগ্য নির্মাণের নিয়ামক

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০১-২০২০ ইং ০০:১৮:২৮ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত

বলা হচ্ছে বাংলাদেশ উন্নয়নের সোপান ধরে এগোচ্ছে। সারাদেশের মানুষ সংবাদটি শুনে আবার প্রচার মাধ্যমে দেখতে পেয়ে যারপর নাই আহ্লাদিত। দেশবাসী উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে চায়। বর্তমানে জিনিসপত্রের দাম লাগামহীন আবার ঝোপ বুঝে কোপ মারার দল সিন্ডিকেট গড়ে মানুষের নাভিশ্বাস তোলায় ব্যস্ত। আমার মতো মূর্খদের উৎকণ্ঠা আর জিজ্ঞাসা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উচ্চমূল্যের রহস্যটা কি! এখানে অর্থনীতিবিদদের মতো আমরাও একটি বিশ্লেষণে যেতে চাই। সারাদেশে উন্নয়নের জোয়ার চলছে। নির্মাণ আর স্থাপনা বিনির্মাণ জাতীয় কার্যক্রম চলছে অবারিতভাবে এবং সারা দেশব্যাপি। এ জাতীয় নির্মাণ বা উন্নয়ন প্রকল্প বাবদ দেদার অর্থ ব্যয় হচ্ছে যেটি জাতীয় অর্থনীতিকে স্ফীত করে তুলছে। যদিও বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়েছে কিন্তু চুড়ান্তভাবে কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন না হওয়াতে বিনিয়োগকৃত অর্থ উৎপাদন খাতে সংযোজিত হতে পারছে না। বাজারে অর্থপ্রবাহ প্রচুর কিন্তু নির্দিষ্ট উৎপাদন খাত এখনও সচল নয় তাই মানুষের হাতে অর্থ আছে যদিও উৎপাদনের মাধ্যমে সেটির সমন্বয় সাধিত হয় নাই। এ কারণে অর্থব্যয়ে কেউই কার্পণ্য করতে চাইছে না। ফলস্বরূপ দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
আমাদের দেশে কৃষি বিপ্লব সাধিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এটি কিন্তু একটি নীরব বিপ্লব। আপন চাহিদা মেটাতে নিজ মেধা ও শ্রম ব্যবহার করে একজন কৃষক জমিতে ফসল উৎপাদন করেছে। আমাদের দেশের অজস্র নদীনালা খালবিল দিয়ে প্রবাহিত পানির সাথে বাহিত হয়ে আসছে প্রচুর পরিমাণ পলি। এ সকল পলি আসছে সুদূর হিমালয় পর্বত থেকে। নতুবা পার্শ্ববর্তী দেশের নানা ধরনের পাহাড়, টিলা থেকে। বাহিত পলিমাটি আমাদের জমিকে উর্বরতা দিচ্ছে। ফসলের প্রাচুর্য আসছে পলির কারণে আবার ভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে ভিন্ন জাতীয় ও গুণসমৃদ্ধ পলি মাটির প্রাচুর্যের কারণে। এ জাতীয় পলির আস্তরণ ভূস্তরের পরিবর্তন ঘটানোর সাথে সাথে উৎপাদিকা শক্তিরও পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। সে কারণে আজ আমাদের দেশে একই জমি ব্যবহার করে সাম্বাৎসরিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। ভিন্ন দেশীয় বা ভিন্ন জাতের ফলমূল উৎপাদিত হচ্ছে আমাদের দেশে। আজকাল একজন কৃষককে খুবই অভাবগ্রস্থ এমন অবস্থায় দেখতে পাওয়া বেশ মুশকিল। এমনকি যে সকল কৃষক একেবারেই ভূমিহীন তারাও আপন আঙ্গিনায় বিদেশী ফলমূলের চাষাবাদ করছে। ড্রাগন ফল নামক একটি সুস্বাদু খাদ্য উপাদানের নামই আমাদের দেশে এতোকাল এসে পৌঁছুতে পারে নাই আজ সেই ফলটি সরাসরি এসে হাজির হয়েছে আমাদের কৃতি কৃষককূলের কর্মতৎপরতার কারণে। এমনতরো নানাবিধ ফল আমাদের ভূমিতে উৎপাদিত হচ্ছে যেগুলি এই কয়েক বছর আগেই উচ্চমূল্যে এবং প্রাপ্তিতা সাপেক্ষে সংগ্রহ করা হতো। মরুভূমিতে উৎপাদনক্ষম ফলাদিও এখন অনায়াসে আমাদের দেশের ভূমিতে উৎপাদিত হচ্ছে।
হাল আমলে আমাদের দেশের কৃষকদের রুচির আমূল পরিবর্তন ঘটছে। তারা নানাধরনের ফুল উৎপাদন করছে, পরিচর্যা করছে এবং সফলভাবে বাজারজাতও করছে। তথ্যমতে কয়েক হাজার পরিবার ফুল নির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনায় স্বনির্ভর হয়েছে। শ্রমিক হিসাবে এই ফুল চাষে অংশ নিচ্ছে কয়েক লক্ষ মানুষ। অলস হাত এখন কর্মীর হাতে পরিণত হয়েছে, অলস মস্তিষ্ক এখন মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে, দূরের রুচিকে এখন ঘরের রুচিতে পরিণত করার কলাকৌশল শিখে ফেলেছে আমাদের দেশের সর্বশ্রেণির কৃষক সমাজ। আজকে সমাজের প্রয়োজন কৃষকদের। আগেকার ধ্যান ধারণা এখন পাল্টে গেছে। আমাদের কৃষকরাই সমাজ গঠনের কারিগর এটা এখন সর্বস্বীকৃত বিষয়। নানা ধরনের ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে কৃষি ভিত্তিক কর্মকান্ডকে ঘিরে। এখন কৃষকরাই নিজেদের ব্যাংক হিসাব খোলা ও পরিচালনায় উৎসাহ বোধ করছে। জাতীয় অর্থনীতির মেরুদন্ডটি কোথায় লুক্কায়িত আছে সেটি আর এখন বলে দিতে হয় না। সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে।
বাংলাদেশে প্রোটিন এর দারুন অভাব বলে একটি কথাই চালু হয়ে গিয়েছিল। আজ সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পথে। গবাদি পশু থেকে শুরু করে হাঁস-মুরগির খামার সৃষ্টি হচ্ছে অহরহ। শিক্ষিত তরুণরাই মূলত এগুলির ধারক বাহক। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তারা সারাদেশে আধুনিক পশুখামার গড়ে তুলছে। নানাধরনের সংস্কার মোকাবেলা করে এবং নানা বাধাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে শিক্ষিত তরুণ তরুণীরা এখাতে এগিয়ে এসেছে। আমদানী নির্ভর মাংস ব্যবস্থাপনাকে অকার্যকর করে দিয়ে আজ বাংলাদেশকে মাংস রফতানিকারক দেশে পরিণত করার দৃঢ় শপথে তারা আপন কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারিত করছে। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে মাংস সরবরাহকারী পাওয়া যাচ্ছে সর্বত্র।
বাংলাদেশের নানা প্রচার মাধ্যমে বারবার বলা হচ্ছে দেশে নগরায়নের পরিধি বাড়ছে। অন্যদিকে একদল বলছেন চিরাচরিত গ্রাম্য জীবন ব্যবস্থা বিনষ্ট করার উদ্যোগটি সঠিক হবে না। আসলে কর্ম, চাহিদা আর উৎপাদন এই তিনটির সমাহার ঘটেছে বিভিন্ন গ্রামেগঞ্জে। এর ফলে মানুষের চাহিদায় ও রুচিতেও পরিবর্তন আসছে অতি দ্রুত। তাই আপনাআপনি গড়ে উঠছে নতুন বিপনী বিতান। সরবরাহ হচ্ছে নতুন শিল্পসম্ভার। প্রাত্যহিক চাহিদা মেটাতে শুরু হয়েছে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা এবং সেই নাগরিক সুবিধার পাশাপাশি মানানসই রুচির বিকাশ ঘটছে তথাকথিত অজ পাড়াগাঁয়ে। আপন ভূবন প্রতিষ্ঠিত করতে গ্রামে গঞ্জে গড়ে উঠছে বহুতল ভবনসমূহ। সকল সুখলাভ নিশ্চিত করতে প্রায় সকল পরিশ্রমী উৎপাদক তার পণ্যটিকে মানসম্মত করে বাজারজাত করছে অতি উৎসাহ ভরে। এতে ফললাভ ঘটছে ইতিবাচকভাবে। এতোকিছু বললাম কিন্তু পেছনের বা আড়ালের কথাটি রয়ে গেল অনুল্লেখ্য হয়ে। দেশে একটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সকল মহলের কাছেই কাংঙ্খিত। লুটেরা তার আইন নিজ হাতে তুলে নেয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে সকলেই সুরক্ষা চায়। চাঁদাবাজি আর বখরা আদায়ের প্রবণতা রোধ করতে হবে যেকোন মূল্যে। সকল উৎপাদন ব্যয়ের সাথে চাঁদা, পথ খরচ, পুলিশ খরচ জাতীয় অপব্যয় আর অনৈতিক কর্মকান্ড আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যেমন কারণ ঘটায় তেমনি জনঅন্তোষ সৃষ্টিতে প্রধান নিয়ামকের ভূমিকার উদ্ভব ঘটায়। দেশকে শান্তির সুশীতল ছায়াতলে আনতে হলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে অতি ন্যায়নিষ্ঠতার সাথে, তেমনি পারস্পরিক সহমর্মীতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে যে কোন মূল্যে। আগর ফেরদৌস বররুয়ে জমিনস্ত।
লেখক : শিক্ষক, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT