উপ সম্পাদকীয়

নারী নিপীড়ন প্রসঙ্গ

মোঃ আব্দুল ওদুদ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০১-২০২০ ইং ০৩:৩৭:৩৫ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

পৃথিবীতে সবক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রত্যেক নারী পুরুষের জন্য অবশ্যই মা ও বোনের সমতুল্য। কিন্তু কিছু নরপশুদের জন্য নারীরা নিরাপদ নন। এদের কারণে ধর্ষণ একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন পত্রিকায় ও টেলিভিশনে ধর্ষণের খবর দেখতে পাওয়া যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক ধর্ষণের ঘটনা অজানা থেকেই যাচ্ছে। অনেক ধর্ষণের ঘটনা গ্রাম্য সালিশের নামে ধামাচাপা দেয়া হয়। মিডিয়াতে যে সমস্ত ঘটনা প্রকাশ পায় সাময়িক সময়ের জন্য আমরা কিছু কিছু আন্দোলন ও প্রতিবাদ করে থাকি। তারপর আর কোন সক্রিয় ভূমিকা রাখি না। আমার ধারণা ধর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের আইন না থাকা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর সাংবাদিক সম্মেলনে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ২০১৯ সালে ধর্ষিত ১৪১৩ জন ও যৌন হযরানীর শিকার ২৫৮ জন নারী। উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা ১৮ নারী। এছাড়া ধর্ষণ করার পর ৪৮৭ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে প্রথমেই ধর্ষকের শাস্তির জন্য মৃত্যুদন্ডের আইন করতে হবে। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সবাইকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। অভিভাবকদের সব সময় সন্তানের উপর কড়া নজর রাখতে হবে যে, তার ছেলে মাদক আসক্তের মাধ্যমে বখাটে জীবন-যাপন করছে কি-না, চরিত্রহীন বখাটে ছেলেদের সাথে চলাফেরা ও মেলামেশায় জড়িত কি-না। ছেলেদেরকে পিতা-মাতার উচিত সব সময় পরামর্শ দেওয়া ভাল বন্ধু-বান্ধবদের সাথে চলফেরা করার জন্য। অশ্লীল পত্র-পত্রিকা ও বইয়ের ব্যবসা আইন করে বন্ধ করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ধর্ষণের বিরুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষককে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতা আচার-আচরণ সঠিক পথে নিয়ে আসার গুরুদায়িত্ব সম্মানিত শিক্ষকদের নিতে হবে। শিশুকাল থেকে ছেলেদেরকে ভাল শিক্ষা দেওয়া যায় তবে অন্যায় অবিচার থেকে অনেকটা দূরে রাখা সম্ভব। তবে সর্বক্ষেত্রে ধারাবাহিক গতিশীলতা রক্ষা করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষক যেই হউক সেই অপরাধীকে বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সবার মনুষ্যবোধকে জাগ্রত করার মাধ্যমে যার যার অবস্থান থেকে বাস্তব সম্মত সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সমাজ থেকে ধর্ষণ প্রবণতা কমে আসবে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক-হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস এবং দালালরা প্রায় ২ লক্ষ মা-বোনকে ধর্ষণ করেছিল। সেই জঘন্যতম স্মৃতি আমরা আজও ভুলতে পারছিনা। আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধররাও ভুলতে পারবে না।
একটি পরিসংখ্যানে জানা যায় যে, ২০০১ সাল হতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধর্ষিত হয়েছেন ১৩,৬৩৮ জন। এর মধ্যে গণধর্ষণ ২,৫২৯ টি। ধর্ষণের শিকার হতে বাদ যায়নি শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক মহিলাও। এই সময়কালে ৬,৯২৭ জন শিশু ধর্ষিত হয়। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় প্রায় ১,৪৬৭ জনকে। ধর্ষকের অপমান ও লজ্জা সহ্য করতে না পেরে ১৫৪ জন আত্মহত্যা করেন। সাধারণত ধর্ষণের এই তথ্য সংগ্রহ করা হয় পুলিশের নিকট মামলা বা থানায় অভিযোগ ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের উপর নির্ভর করে। উল্লেখিত ধর্ষণের সংখ্যার বাইরেও অসংখ্য শিশু নারী বৃদ্ধা ও প্রতিবন্ধী সারাদেশে ধর্ষিত হয়ে থাকেন। সেই সমস্ত ধর্ষিত নারীরা মান, ইজ্জত ও সম্মানের ভয়ে ধর্ষণের কথা প্রকাশ করেন না। এতে দুঃশ্চরিত্র লোকদের ধর্ষণের ক্ষেত্রে আর বেশি সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে। উচ্চ শিক্ষিত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সর্বোচ্চ শিক্ষা নিয়েও ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানী করেন। ধর্মীয় শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিরা ধর্ষণে জড়িত। হতদরিদ্র ড্রাইভার ও হেলপাররাও ধর্ষক হয়ে উঠেছে।
গত ১৪ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সাবেক মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু এমপি বক্তব্য রাখতে গিয়ে ধর্ষণের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড দাবি করেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনে বন্দুক যুদ্ধে গুলি করে মেরে ফেলার দাবিও জানান। পরে এই সংসদ অধিবেশনে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ এমপিও তার বক্তব্যে একই দাবি জানিয়েছেন। পরে একই সংসদ অধিবেশনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য সাবেক মাননীয় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ এমপিও তাদের সাথে একমত পোষণ করে বক্তব্য রাখেন। তাদের বক্তব্যে বলেন যে, মাদকের ব্যাপারে যদি সাথে সাথে শেষ করে দেওয়া যায়, তাহলে ধর্ষণের মত আরো খারাপ কাজ করলে কেন ক্রসফায়ারে দেওয়া যাবে না। চলতি এই অধিবেশনে তিনি আর বলেন, ভারতে একবার বাসে এক নারী ডাক্তারকে ধর্ষণ করা হয়। পরে সেখানে ওই ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার করে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হয়। তারপর ভারতে ধর্ষণের ঘটনা কমে যায়।
সুতরাং, ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের আইন করলে নরপিশাচরা ধর্ষণের মত জঘন্য কাজে লিপ্ত হবে না, এটাই সবার বিশ্বাস। বাংলাদেশ হোক একটা ধর্ষণমুক্ত দেশ।
লেখক : মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, রাজনীতিক।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT