উপ সম্পাদকীয়

মাটির উৎকর্ষ ও সংরক্ষণ সাধন সরকার

প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০১-২০২০ ইং ০৩:৩৮:৫২ | সংবাদটি ১১০ বার পঠিত

ভূপৃষ্ঠের ওপরের নরম আবরণকেই সাধারণত মাটি বলা হয়। জলবায়ু ও জৈব পদার্থের সমন্বয়ে রূপান্তরিত শিলার ওপর গাছ জন্মানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয় এ মাটিতে। এ মাটিই উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন। মাটির মধ্যে চারটি উপাদান বিদ্যমান : অজৈব বা খনিজ উপাদান (৪৫ শতাংশ), বায়ু (২৫ শতাংশ), পানি (২৫ শতাংশ) এবং জৈব পদার্থ (৫ শতাংশ)। মাটির উপাদানগুলোর মধ্যে সবসময় বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে। মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ হলেও এ জৈব পদার্থ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জৈব পদার্থ মূলত উদ্ভিদ ও প্রাণিজ উপাদান থেকেই গঠিত। মাটির নাইট্রোজেনের উৎস হচ্ছে এ পদার্থ। যদিও মাটিতে কোনো বিষাক্ত পদার্থ থাকলে নাইট্রোজেন তা দূর করে থাকে। মাটির উৎকর্ষ বা গুণগতমান ঠিক রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাটির উপাদান ঠিক না থাকলে মাটির গুণগতমানও ঠিক থাকে না। তথ্য মতে, পৃথিবীর ১০ শতাংশেরও কম ভূমি চাষাবাদের অন্তর্গত। বাংলাদেশে মোট জমির প্রায় ৫২ শতাংশ এলাকায় চাষাবাদ করা হয়। এ অল্প পরিমাণ ভূমিও আমরা পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার ও চাষাবাদ করতে পারছি না! বিভিন্নভাবে মাটির দূষণ ঘটছে, মাটির ক্ষয় হচ্ছে। পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে মাটি সংরক্ষণ করতে না পারলে সেই মাটি থেকে সুফল পাওয়া যায় না। শুধু প্রাকৃতিক কারণে শিলা-খনিজের চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ায় মাটি ক্ষয় নয়, মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্টও এক ধরনের মাটি ক্ষয়। প্রাকৃতিকভাবে মাটি ক্ষয় সাধারণত দুভাবে হয়ে থাকে। ১. স্বাভাবিক বা ভূতাত্ত্বিক মাটি ক্ষয়, ২. ত্বরান্বিত মাটি বা ভূমিক্ষয়। এছাড়া মানুষের নানাবিধ কর্মকা-ের ফলে ব্যাপকভাবে মাটি ক্ষয় হচ্ছে। সজীব ও অজীব দূষক দ্বারা মাটির নানাভাবে দূষণ ঘটছে। জীব-সংক্রান্ত দূষণ, পরিপোষক দূষণ, অজৈব পদার্থজনিত দূষণ, জৈব পদার্থজনিত দূষণ, অ্যাসিড দূষণ, প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণ, তেজস্ক্রিয় দূষণ, বর্জ্যরে দূষণ, কীটনাশক দূষণ ইত্যাদি। শিল্পকারখানার কঠিন বর্জ্যরে কারণে মাটি ব্যাপকভাবে দূষিত হয়ে থাকে।
মাটি দূষণ ও ক্ষয়ের প্রভাব মানবজীবনে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কেননা আমাদের খাদ্য উৎপাদন, জীবনাচরণ ও বেঁচে থাকা কোনো না কোনোভাবে মাটির ওপরই নির্ভরশীল। মাটি দূষণ হলে তার প্রভাব মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীকোষে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভারী ধাতুর (পারদ, সিসা, ক্যাডমিয়াম) বিষক্রিয়ার প্রভাব মস্তিষ্কের কোষের বিনাশ ও রক্তচাপ বৃদ্ধি করে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্তিকার অপসারণে মৃত্তিকা বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আবাসস্থলও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মাটির উৎকর্ষ বৃদ্ধির জন্য মাটিদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও মাটির ক্ষয় রোধ করে মাটি সংরক্ষণ করা দরকার। এতে খাদ্য উৎপাদনের ভারসাম্য থাকার পাশাপাশি মানুষ স্বাস্থ্যগত সুফলও পাবে। তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় ২৫ ধরনেরও বেশি মাটি দেখা যায়। এক এলাকার মাটি ক্ষয় ও দূষণ অন্য এলাকার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। বায়ুদূষণ ও পানিদূষণের থেকে ভয়াবহ হচ্ছে মাটিদূষণ। কঠিন বর্জ্য মাটিদূষণের প্রধানতম কারণগুলোর একটি। প্রধানত তিনটি উপায়ে মাটিদূষণ রোধ করা সম্ভব। ১. আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে, ২. প্রযুক্তিগত উপায়ে ও ৩. ব্যক্তিগত উপায়ে। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে প্লাস্টিক-পলিথিনসহ কঠিন বর্জ্যরে ব্যবহার কমানো সম্ভব। প্রযুক্তিগত উপায়ে কঠিন বর্জ্য পদার্থ সংগ্রহ করে তা রিসাইক্লিং বা প্রক্রিয়াজাত করে মাটির দূষণ যেমন রোধ করা সম্ভব, তেমনি রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে সার, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরি করার মাধ্যমে বর্জ্য সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার মাধ্যমে দূষণ রোধ করা সম্ভব। অবিশ্লেষ্য পদার্থ যেমন পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি এর রিসাইক্লিং প্রায় প্রতিটি দেশে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বহু আগে থেকেই। বিশ্বে প্লাস্টিক ও পলিথিন জাতীয় দ্রব্যের সর্র্বোচ্চ ব্যবহার করে অতঃপর রিসাইক্লিং করা হয়। বাংলাদেশের যশোরে শহরের বর্জ্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে তারপর তা থেকে জৈবসার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বর্জ্য সম্পদে পরিণত করা এবং প্লাস্টিক-পলিথিন রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া ক্ষুদ্র পরিসরে দেখা যাচ্ছে। তবে সরকারকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। দূষণ রোধ করে বর্জ্য, প্লাস্টিক-পলিথিন সম্পদে পরিণত করার প্রয়াসকে এগিয়ে নিতে হবে। তাহলে মাটিদূষণসহ সব ধরনের দূষণ রোধ করা সম্ভব হবে।
লেখক : পরিবেশ কর্মী।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT