উপ সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের শীতকাল

রঞ্জিত কুমার দে প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০১-২০২০ ইং ০০:১৬:১৩ | সংবাদটি ৭৬ বার পঠিত

আমাদের দেশে ছয়টি ঋতুর মধ্যে শীতকাল অন্যতম। হেমন্তের পর আগমন করে শীতকাল। জীবনের চাঞ্চল্যকে ম্লান করে। পৌষ-মাঘ দু’মাস শীতকালের পূর্ববর্তী সময় থেকেই উত্তর দিক থেকে কিছু কিছু মৃদুমন্দ ঠাণ্ডা বাতাস বইতে থাকে। তখন পুরাদমে শীত আরম্ভ হয় না। রাতে পাতায় পাতায় কুয়াশা পড়ে। পৌষ মাস থেকে শুরু হয় পরিপূর্ণ শীতকাল। বায়ুর দিক পরিবর্তন হয়। গ্রীষ্ম মৌসুমীর পরিবর্তে শীত মৌসুমী বায়ু উত্তর পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হতে থাকে। হিমালয় অতিক্রম করে উত্তরের অঞ্চল থেকে বায়ু প্রবাহিত হয় বলে বায়ু থাকে ঠাণ্ডা। তাছাড়া ঐ সময় সূর্য দক্ষিণ দিকে সরে যায় এবং উত্তর গোলার্ধে সূর্যের কিরণ ও তির্যকভাবে পড়ে। তাই এখানে উত্তাপ কম পড়ে, শীতকালে রাত্রি বড়, দিবাভাগ ছোট। দিবাভাগে যে উত্তাপ পড়ে রাত্রিকালে তা সম্পূর্ণ সন্ধ্যার মধ্যেই বিকিরিত হয়ে যায়। সুতরাং তাপের সঞ্চার হয় না। শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু প্রবাহিত হওয়ার সময় পথিমধ্যে কোন সমুদ্র পড়ে না বলে এই বায়ুতে জলীয় বাষ্প থাকে না। সে জন্য আমাদের দেশে শীতকালে বৃষ্টিপাত হয় না।
আমাদের দেশ ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত বলে বেশি শীতও অনুভূত হয় না। তবুও শীতের দরুন আমাদের গরম কাপড় ব্যবহার করতে হয়। অবশ্য এই দেশের অধিকাংশ লোকই শীতের সময় সূতি চাদর ব্যবহার করে থাকে। শীত প্রধান দেশে পশমী কাপড় না হলে শীত থেকে আত্মরক্ষা করা যায় না। বর্তমানে সরকার জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গরীব ও অসহায় লোকদেরকে বিনামূল্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করছে। আমাদের দেশে শীত ও গ্রীষ্মকালের তাপমাত্রার পার্থক্য মাত্র ১০ ডিগ্রী। তবে পার্বত্য অঞ্চলে শীত বেশি থাকে। সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল অপেক্ষা সমুদ্র থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে শীত বেশি পড়ে বাতাসের শুষ্কতার জন্য। শীতকালে সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে কুয়াশায় চারদিক ঘিরে ফেলে। রাত্রি যতই গভীর হতে থাকে, ততই শীত বেশি পড়তে থাকে। কুয়াশায় চারদিক অন্ধকার করে ফেলে- পথঘাট দেখা যায় না। শীতকাল এই দেশের দরিদ্রের জন্য একটা অভিশাপ। কাপড়ের অভাবে সর্বহারা মানুষ তাদের ছেলে মেয়ে নিয়ে কোন প্রকারে খড়কুটা বিছিয়ে ভাঙা কুটিরে পড়ে থাকে। তাদের গৃহে না আছে বেড়া, না আছে ছাউনি। শীতকালে হঠাৎ করে বৃষ্টিপাত হলে এই শ্রেণির লোকেরা সর্বাপেক্ষা বেশি কষ্ট পায়।
শীতের সকাল বেলায় কুয়াশার চাদর কেটে যেতে শুরু করে। পূর্বদিক থেকে সূর্য উদিত হলেও কুয়াশা না কাটা পর্যন্ত তাকে ভাল করে দেখা যায় না। আস্তে আস্তে বিরাট একটি লাল বর্ণের থালার মত পূর্ব দিগন্তে উদয়াচলের শীর্ষভাগ দেখা যায়। রোদ উঠে। রোদ পোহানোর জন্য মানুষ খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শীতকালের রোদের মত এত আরামদায়ক রোদ আর কখনও দেখা যায় না। রোদ উঠার সাথে সাথেই কুয়াশা পালাতে শুরু করে। মূর্ছাপ্রান্ত পৃথিবীতে আনন্দ সংগীত বেজে উঠে। কেউ কেউ রোদ না পোয়ায়ে খড় কুটা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে আগুন পোয়ায়। পৌষ মাসের শেষেও মাঘ মাসে প্রবল শীত পড়ে।
শীতকালে শীতের জ্বালাতন বেশি হলেও খাদ্যদ্রব্য খুবই ভাল লাগে। খাদ্যদ্রব্য সহজে হজম হয়। শীতকালে পুকুরে গোসল করতে গেলে শীতের ভয়ে কিছুক্ষণ পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু ঝুপ করে পানিতে পড়লে আর শীত লাগে না। তখন খুব আরাম লাগে। শীতকালে স্বাস্থ্য ভাল থাকে। শীতকালে আমাদের দেশে আমন ধান ঘরে উঠে। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নতুন পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়; সাথে থাকে খেজুরের রস। শীতকালে তেলে ভাজা কৈ এবং দই বড় লোভনীয় খাদ্যদ্রব্য। এই সময় মাংস খেতেও ভাল লাগে। শীতকালে রবিশস্যের চাষ হয়। তখন-শাকসবজি প্রচুর পাওয়া যায়। এ সময় গমের চাষ হয়। শীতকালে বকুল, গোলাপ প্রভৃতি ফুল দেখা যায়। এই সময় ফলের মধ্যে নারকেল বেশি পাওয়া যায়। তাছাড়া কমলা প্রচুর পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায় যা খাওয়ার স্পৃহা জাগ্রত করে।
শীতকালকে আমরা শীতের জন্যই ভয় করি। প্রকৃতপক্ষে এটা খাওয়া দাওয়ার উত্তম সময়। অন্যান্য ঋতুতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বেশি হলেও আনন্দ শীতকালেই বেশি।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT