মহিলা সমাজ

যুদ্ধদিনের খসড়া জীবন

জয়া ফারহানা প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০১-২০২০ ইং ০০:১৭:১০ | সংবাদটি ৭৫ বার পঠিত

সকালবেলা অফিস যাওয়ার পথে কথাটা প্রথম মনে হয়েছিল। গাড়িঘোড়া তো চলছেই না। পথে লোকজনও নেই কোনো। অথচ আজ কোনো হরতাল-ধর্মঘট নেই, ইটপাটকেল মারামারি নেই। কেউ গাছের গুঁড়ি টেনে এনে রাস্তায় শক্ত ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে, তাও নয়। অথচ মোড়ের মুদি দোকানটা পর্যন্ত খোলেনি। সকাল নটার একটু বেশি বাজে বোধ হয়। একবার মনে হলো, ভুল দেখছে না তো? কিন্তু না। নাইমের হাতঘড়ি রেডিও টাইম। হয়তো শীতের সকাল, এখনও লোকজন লেপের তলায় আয়েশি ঘুম দিচ্ছে। আর এবার যে ঠান্ডা পড়েছে, বাপরে! দোকানে মালও তেমন ওঠাতে পারেনি দোকানিরা। কীভাবে সম্ভব? রাস্তাঘাট বলে কিছু আছে? কোথাও ফসল আছে তো চাষি নেই। মাঠের ধান মাঠে রেখে গুলি খেয়ে মরে পড়ে আছে। কে আঁটি খুলে ধান ছাড়ায়, কে মাড়াই করে! আউশটা পুরাই মারা গেল এবার। ডাল, লবণ, চিনির বয়াম কোনোটা খালি, কোনোটার নিচে কেরি পোকা কিলবিল করছে। ক্রেতা নেই। কে আর এই সাত সকালে দোকান খুলে বসে থাকে! তারপরও দশটা বাজলে একে একে খুলতে শুরু করবে হয়তো। রাতে ফেরার সময় আবার সকালের সেই কথাটাই মনে হলো। রাস্তাঘাট একদম শূন্য। একটা কুকুর পর্যন্ত নেই। অথচ কী আশ্চর্য! শান্তিনগর বাজারের কাছ থেকে যে রাস্তাটা বেইলি রোডে চলে এসেছে, তার পাশেই একটা আধ-ভাঙা চায়ের দোকানে টিমটিম করে জ্বলছে কুপির আলো। আর সেই ঝাপসা আলোয় লোহার কড়াইয়ে আলুর চপ ভাজছে একজন বুড়ো দোকানি। দেখে সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াল নাইম। বুড়ো লোকটা শালপাতায় সেসব আলুর চপ ভেজে ভেজে রাখছে। রাস্তাঘাট সুনসান। একটা কথা বললেও যেন তা ভারি কাচ ভেঙে চুরমার হওয়ার শব্দে খানখান করে বেজে উঠবে। এমন ঘন কুয়াশা, এক হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। এর মধ্যে কেউ একজন কুপির আলোয় গাদা গুচ্ছের চপ ভেজে শালপাতায় রাখছে- দৃশ্যটা কেমন যেন পরাবাস্তব। নাইমের খুব ইচ্ছে হলো, জিজ্ঞেস করে- এই এতরাতে এসব আলুর চপ খাবে কে? পরমুহূর্তে ইচ্ছেটা দমন করল দোকানির মুখ দেখে। যেমন পাথর-মুখ করে রেখেছে, দেখে মনে হয় না আলাপ জমাবার ইচ্ছা আছে। কে জানে, প্রশ্ন করলে হয়তো উত্তরও দেবে না। কমবেশি সবাই তো মনের মধ্যে ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ কেউ কারও সঙ্গে সেই ব্যথার ভাগ নিতে পারছে না। থাক, কী দরকার ওকে বিরক্ত করার। যুদ্ধদিনে কোনো দৃশ্যই অস্বাভাবিক নয়- এই ভেবে আবার হাঁটা শুরু করল নাইম। তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরা দরকার। দেরি হলে বিশাল ঝামেলা করে ঢুকতে হয়। কত ধাপে যে তালা বসিয়েছে আব্বা! মুসলিম লীগের আজীবন সদস্য এই মানুষটি এখন আর যেন কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। মাঝরাতে বুক ধড়ফড়ানিতে উঠে বসে, বাকি রাত আর ঘুমাতে পারে না। কী কারণে যে এত ভীত হয়ে আছে লোকটা! সদর দরজায় মস্ত তালা ছিল। সিড়ির মুখে আবার কলাপসিবল গেট বসিয়েছে। সেখানেও ঝুলছে বড়-সড় তালা। তারপরও আব্বার ঘুম আসে না। কিছু বললেই বলে, আগে ছেলের বাপ হ, তখন বুঝবি কীসে ভয়, কেন ভয় । অথচ ন’ মাস আগে আব্বার কথা শুনলে মনে হতো, পুরো পাকিস্তানটাই তার। সেই আব্বা পারলে এখন প্রতিদিনই সিএল নিয়ে বাসায় বসে থাকে। তবে আব্বার ভয়। যতটা না পাঞ্জাবি সেনাদের, তার চেয়ে বেশি মুক্তিবাহিনীকে। আব্বার ধারণা, আজীবন মুসলিম লীগ করায় মুক্তিবাহিনী তাকে ছাড়বে না। বাড়িতে নাসিম ছিল সবচেয়ে প্রবলেমেটিক। ম্যাট্রিকও দেয়নি অথচ দিনেদুপুরে গুচ্ছের ইয়ার দোস্তদের নিয়ে এমনভাবে সিগারেট ফুকত যেন কতকালের সিগারেটখোর! কায়দা করে আবার চুল ফুলিয়েছিল। ঈষৎ রুক্ষ চোয়ালে আবার অকর্ষিত এবড়োখেবড়ো জমির মতো দাড়ি গজিয়েছিল। কেমন চালিয়াৎ ধরনের মনে হতো নাইমের কাছে। সেই নাসিম এখন পুরোপুরি অন্যরকম। পাড়ায় ম্যাট্রিক ক্যান্ডিডেটদের একটা লিস্ট করেছে। বাড়িতে বাড়িতে সেসব নাকি পাঠানো হবে পরীক্ষা না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে। নাসিমকে কেমন অচেনা লাগে। কাদের সঙ্গে যেন গোপনে যোগাযোগ করছে। গোপনে ফিসফাস ওর বয়সী আরও কয়েকটি ছেলের সঙ্গে। সম্ভবত সীমান্ত পার হওয়ার আলাপ-সালাপ। নাইমকে দেখলে কথা বলা থামিয়ে দেয়। যুদ্ধের আগে নাদিয়াকে হাজার বলে-কয়েও হারমোনিয়ামে বসাতে পারেনি। এখন নিয়ম করে রেওয়াজে বসে। শেষ রাতের দিকে এমন সুরেলা গলায় ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’ গায়। শুনলে চোখে পানি চলে আসে। একটা যুদ্ধ কেমন করে বদলে দিল সবাইকে!
দুই.
বাড়ির পেছনে আমগাছের ডালে কাকেরা ডেকে উঠলে ঘুমে জড়িয়ে আসতে চায় আলী ইদ্রিসের চোখ। চিরদিন শুনে এসেছে কাকের ডাক অমঙ্গলের। সেই অমঙ্গলই মঙ্গল এখন। কাকেরা ডেকে ওঠা মানে ভোর। ভোরেই যা একটু স্বস্তি। উঠোনের পাঁচিল ঘেঁষে রান্নাঘরের পেছনে যে জামগাছটা ঝামড়ে উঠেছে, তার ডালে প্রথমে দুটো কাক একসঙ্গে ডেকে ওঠে। তারপর বাদ-বাকি পাখিরা। একে একে গৃহস্থালির নানা টুকটাক শব্দ কানে আসতে থাকে। কুয়ো থেকে পানি তোলার আওয়াজ, দাওয়ায় বাটনা বাটার আওয়াজ, পেয়ালায় চিনি নাড়ার টুংটাং আওয়াজ- সবই বড় আরামের। মনে হয়, আরও একটা দিন বাঁচা হলো। অথচ প্রত্যেক রাতে মনে হয়, এটাই শেষ রাত। আর সকালে চা খাওয়ার সময় মনে হয়, সবকিছু স্বাভাবিক আছে। দেশে কোনো যুদ্ধ-টুদ্ধ চলছে না। দু'মাস ধরে রাহেলা বলছে, কাঠ নেই কেরোসিন নেই। তারপরও প্রতিদিন কীভাবে চায়ের জোগাড় হচ্ছে কে জানে! হয়তো রাহেলা কোনোভাবে ম্যানেজ করছে।
ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটেনি। এরই মধ্যে রাহেলা ঢুকে গেছে রান্নাঘরে। চল্লিশ পাওয়ারের বান্বটা জ্বালতেই মরচে পড়া মলিন হলুদ আলোয় ভরে উঠল রান্নাঘরটা। ঠিক তখনি মনে হলো, রান্না করার অবশিষ্ট কাঠটুকুও কাল রাতে শেষ হয়ে গেছে। রোজ কাঠ কাটো, কেটে রাঁধো; অত সুখে আর কাজ নেই। থাকল পড়ে হাঁড়ি; যিনি যখন আসবেন রেঁধে নেবেন। কিন্তু এই ভাবনা পাঁচ মিনিটের বেশি ধরে রাখা গেল না। আলী ইদ্রিস এসে ঢুকলেন রান্নাঘরে। কই রাহেলা, চায়ের পানি চড়িয়েছ? এক কাপ চা পেলে মন্দ হয় না। রাত জেগে চোখ দুটো কড়কড় করছে। স্বামীর দ্বিধাদ্বন্দ্বে চূর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে এই মুহূর্তে মায়া লাগছে। কেরোসিন নেই বলে অভিযোগ দিয়ে দিন শুরু করতে ইচ্ছে করল না। তা ছাড়া কাঠ না থাকলেও অজস্র অসংখ্য পাতা পড়ে উঠোনটা ঢেকে রেখেছে। রাতের বেলায় চুলোর কয়লা এখনও ধিকিধিকি জ্বলছে। তার মধ্যে একরাশ পাতা এনে দিতেই দাউ দাউ জ্বলে উঠল আগুন। এখন কেটলিতে টগবগ করে ফুটছে চায়ের জল। অনেক অভাব অনেক না পাওয়া, অনেক শূন্যতার মধ্যেও জীবনটা নেহাত মন্দ নয় বলে এ মুহূর্তে মনে হলো রাহেলার। কিছুটা মমতা মিশিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, কী অবস্থা করেছ চেহারার! আয়নায় দেখ নিজেকে? কিসের এত ভয় তোমার? তোমাকে দেখে তো মনে হয় ক’মাসে সাত বুড়োর এক বুড়ো হয়ে গেছ!
: চেহারা ধুয়ে কি পানি খাব? যমদূত পাশের বাড়ি পর্যন্ত এসে গেছে। তুমি আছ চেহারা নিয়ে।
: মরতে যখন হবে তখন কুকুর-বেড়ালের মতো মরে লাভ আছে? সাহস নিয়ে মরাই কি ভালো না? সারাক্ষণ ভয়ে সিটিয়ে থাকলেই কি রেহাই পাবা?
চায়ে চুমুক দিয়ে আলী ইদ্রিস বলল, যারা পাকিস্তান ভেঙে টুকরো টুকরো করতে চায় তাদের লিষ্ট হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে জওয়ানরা। তোমার বাড়ির পশ্চিম পাশের দু’টো বাড়ির পরের ফরিদ সাহেবকে গতকাল আর্মি জিপ এসে তুলে নিয়ে গেছে। খোঁজ রাখো?
: তুমি তো আর পাকিস্তান ভেঙে টুকরো টুকরো করতে চাও না। তোমার ভয় কী?
: হ্যাঁ, সেই সুখেই থাকো। ফরিদ সাহেব আমার বাড়িতে দাবা খেলতে আসত। যদি সে কারণে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে রাহেলার। লোকটা এত ভীত- এত বছর একসঙ্গে সংসার করেও বোঝা যায়নি। গত রাতে ফরিদ সাহেবকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা যারপরনাই ব্যথা দিয়েছে রাহেলাকে। খড়খড়ির জানালা সামান্য ফাক করে গতরাতে দেখেছে কীভাবে হুঁকোমুখো এক পাঞ্জাবি অফিসার আর ষ্টেইন কাধে তিন জওয়ান ধরে নিয়ে গেল ফরিদ সাহেবকে। ফরিদ সাহেবের বউ রেহেনা। ভাবি ওই হুঁকোমুখো অফিসারটির পায়ের ওপর পড়ে কীভাবে কেঁদেছে! মানুষের এমন অপমান দেখতে ভালো লাগে না।
: একটা নিরীহ লোককে এভাবে ধরে নিয়ে গেল, তোমরা কেউ কিছু করলে না?
: ফরিদ সাহেবকে ধরা হয়েছে একটা রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে।
কীসের রুটিন ওয়ার্ক? : তুমি যেন কচি খুকি। কেন? ফরিদ সাহেব শেখের ব্যাটার পা ধরে পাকিস্তান ভেঙে দিতে চায়নি?
সে তো আমিও চাই। নাইম চায়, নাসিম চায়, নাদিয়া চায়। পুরো বাংলাদেশ চায়। কেন, তুমি চাও না? শেখ সাহেব উচিত কাজটাই করেছে।
: হ্যাঁ, উচিত কাজ! একটা স্বাধীন দেশ ভেঙে আরেকটা দেশ করতে চাচ্ছে- এটা উচিত কাজ! কত ত্যাগের পাকিস্তান- বোঝো? জিন্নাহ সাহেব বলতেন, ইমান-একতা শৃঙ্খলা- এই তিন থাকলে পাকিস্তান ভাঙতে পারবে না
: ভাঙছে তো তোমার সাধের পাকিস্তান।
: ভাঙবে তো, দেশে কারো ইমান আছে? একতা আছে? শৃঙ্খলা আছে? নাক টিপলে দুধ পড়ে বাচ্চারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফোঁকে। গজব শুরু হয়ে গেছে চারদিকে।
: ঠিকই বলেছ; গজবই। বাঙালি যাদের ধরছে পাকিস্তানি সেনারা, তাদের ওপর গজবই নেমে এসেছে।
: শোনো, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা সম্পর্কে তোমরা কী জানো? অত্যধিক কাজের চাপে সব সময় মাথা ঠিক রাখা যায় না। দেশ ভেঙে যাচ্ছে, মাথা সব সময় ঠিক রাখা মুশকিল। দু’একটা কিলিং হয়তো হচ্ছে।
: হ্যাঁ, সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়া যাকে তাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
: মূখ মেয়েমানুষের মতো কথা বলো না তো। মিলিটারির সার্চ ওয়ারেন্ট লাগে না; পুলিশের লাগে। অবশ্য তোমাদের বুঝিয়ে লাভ নেই। শেখ মুজিব আগেই তোমাদের মগজ ধোলাই করে দিয়েছে। এমনভাবে ওনার কথায় সেঁটে থাকো, উনি যেন গুড় আর তোমরা সব মাছি। আমার কপালটাই খারাপ। বাড়ি তো নয়, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। তোমার প্রত্যেক ছেলেমেয়ের মধ্যে বাড়াবাড়ি। এটা পেয়েছে তোমার থেকে।
: বাড়াবাড়িটা কী?
: করেনি?
: না
: অবশ্যই করেছে। দিল্লি রেডিওর নিউজই রিলে করে আকাশবাণী। একটা শুনলেই হয়। তোমার ছোট ছেলের দু’টোই শোনা চাই। শুধু তাই? সাড়ে সাতটায় স্বাধীন বাংলা, আটটায় আকাশবাণী, সাড়ে আটটায় আবার স্বাধীন বাংলা, দশটায় ভয়েস অব আমেরিকা, সাড়ে দশটায় সংবাদ পরিক্রমা। যত সব মামদোবাজি। ব্যাটারি কিনতে পয়সা লাগে না? তোমার বড় ছেলে, সে তো সাক্ষাৎ শেখের চ্যালা। ছোটটাও ওর লেজ ধরে ছোট চ্যালা হতে চাচ্ছে। এই রেডিও শোনার কারণেই দেখো বলে রাখলাম, যে কোনোদিন পাঞ্জাব সেনা তোমার বাড়িতেও তশরিফ নেবে। ‘কোই হ্যায় অন্দর মে, দরওয়াজা খুলিয়ে’ বলে রাইফেলের কুঁদো দিয়ে এমনভাবে বাড়ি মারবে, তখন বাপ বাপ বলেও কূল পাবে না তোমার ছেলেরা।
: অসুবিধা কী? আসলে তুমিও বলে দেবে, ‘হামলোগ সাচ্চা পাকিস্তানি হ্যায়।’ তোমার সাথে তো মুসলিম লীগ নেতাদের ছবি-টবিও আছে।
: ওই যে বললাম না, মা থেকেই ছেলেমেয়েরা খোচা দেওয়ার অভ্যাসটা পেয়েছে। আরও শুনবে তোমাদের বাড়াবাড়ি?
: আরও আছে?
: আছে। কেউ কখনও শুনেছে, ম্যাট্রিক, আইএ- বোর্ড স্ট্যান্ড করা ছাত্র পত্রিকা অফিসে চাকরি করে? শোনেনি। যারা শোনেনি তারা এসে দেখে যাক তোমার বড় ছেলেকে। তাও যদি বেতনটা হতো বলার মতো। পঞ্চাশ টাকা বেতনে উনি চাকরি নিয়েছেন সূর্যোদয় পত্রিকায়। লুই ফিশার হবেন। লুই ফিশার সাহেবের সূর্যোদয় পত্রিকা দেশে স্বাধীনতার সূর্য উদয় করেই ছাড়বে। এদিকে সংসার যে অস্তাচলে যায়, সেদিকে খেয়াল নেই। উনি আছেন সূর্যোদয় নিয়ে। মেজো ছেলে তো আরও এক কাঠি ওপরে। আশেপাশের সব বাড়ির ছেলেরা কী সুন্দর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছে! পাশের বাড়ির কাজিমুদ্দিন সাহেবের ছেলে সাজিদ কী সুন্দর করে বলল, খালুজান, দরকার পড়লে করাচি গিয়ে ম্যাট্রিক দিয়ে আসব। আর এদিকে দেখ আমার কপাল! যে ছেলের এখন চোখকান বুজে পড়ার টেবিলে পড়ে থাকার কথা রাতদিন, সে লেগেছে ম্যাট্রিক পরীক্ষা বানচাল মিশনে। একে তো নাচুনি বুড়ি, তার ওপর ঢোলের বাড়ি। নাচুনি বুড়ি হলো নাসিম আর ঢোলের বাড়ি হলো নাইম। পঞ্চাশ বছরের জীবনে কখনও শুনিনি, বড় ভাই ছোট ভাইকে পরীক্ষা না দেওয়ার জন্য উস্কায়। কবে যে মিলিটারি আসবে!
: ভয় কী? তাদের এজেন্ট তো আছেই এ বাড়িতে। তুমি পারবে না সামাল দিতে?
: এই দেখ, দেখেছ? তোমার এই চ্যাটাং চ্যাটাং কথাই বাড়াবাড়ি।
: তোমার পাঞ্জাব সেনারাও কম বাড়াবাড়ি করছে না। বাঙালি কাউকে সন্দেহ হলে নাভি থেকে মগজ বরাবর গুলি। পায়ে গুলি করার ট্রেনিং পায়নি তোমার পাকিস্তান সেনারা? আর তুমি বলছ, রুটিন ওয়ার্ক। গ্রাম থেকে নুরু এসেছিল। সেখানে হুল্লা রাজাকারদের উৎপাতে টেকা দায়। যখন তখন যার তার গোয়াল থেকে গরু নিয়ে যাচ্ছে। ক্ষেতের ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে গোরস্তান বানাচ্ছে।
: এসব গল্প তোমাকে করেছে ওই চাষা নুরু? চিরদিন দেখে আসছি ওই ছোট জাতের লোকদের কথা তুমি প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস কর। কলু, তেলি, নিকিরি, কিষাণ- এরাই তোমার খাতিরের লোক। পলিটিক্স করতে চাও? কমন পিপল-এর পালস বুঝতে চাও? কমরেড হবা? কমিউনিস্ট?
কোনোটাই না। বেচারা নুরু কত খেটে ধার-দেনা করে ধান করেছিল! সব কেটে নিয়ে গেছে রাজাকাররা। ওদিকে তাদের তো আবার পোয়াবারো। জমি কিনছে দেদার। পেল্লাই গোলা সব টাবুটুবু ধান। বাঁশবাগান, ফলপাকুড়ের বাগান, মাছের পুকুর- সব এখন তাদের দখলে। আমি বলেছি, দুঃখ করোনা নুরু। আবার তোমার ফসল হবে, দেখো। কাঁদতে কাঁদতে ও বলল, দুঃখ আমি করি না। বুজান। বুবু গো, মজুরের গতর হলো লোহার পাত । খাটালেই ধার বাড়ে। ফেলে রাখলে মরিচা ধরে। ধান ভারি পেরানের জিনিস, বুজান! খসখসে সোনার মতো ধানগুলান... শেষের কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে এলো নুরুর।
তিন.
রান্নার আয়োজন শেষ পর্যন্ত রাহেলাকেই করতে হয়। সংসারটা কীভাবে চলছে সেই ভাবনা এ সংসারে আর কারও নেই। এর চেয়ে তুচ্ছ বিষয় যেন আর হয় না। রেডিও একটা মাঝখানে নিয়ে তিন ভাইবোনের একজন আরেকজনের দিকে প্রশ্ন ছুড়তে থাকে। শ্রীমতী গান্ধী কি যুদ্ধ ঘোষণা করবেন, না স্টেট ইমার্জেন্সি দেবেন, না বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবেন? সেদিন নাসিম এসে বলছিল, বুঝলে মা, ইয়াহিয়া খান যাকে দ্যাট উইম্যান বলে গালাগাল করে, ওই দ্যাট উইম্যান আর কেউ না; মিসেস গান্ধী। জীবন যেখানে পেন্ডুলামের মতো দুলছে সেখানে এসব শুনে কী করবে রাহেলা। ছয়-সাতজনের খোরপোষের একটা সংসার চালানো এই বাজারে যে কী কষ্টসাধ্য ব্যাপার! তার ওপর নানান অজুহাতে গ্রাম থেকে আসা আত্মীয়স্বজন তো আছেই। টানাপোড়েন দিয়েই শুরু হয়েছিল তার সংসার। মাঝে সচ্ছলতা। যখন যেমন অবস্থায় থাকুক। অসুখ-বিসুখ বা বেড়ানোর ছলে আত্মীয়স্বজন এলে মুখ শুকিয়ে যাবে, এত ছোট মন রাহেলার নয়। কিন্তু সত্যি কঠিন সময় যাচ্ছে। ধানের মন ষোল টাকা, মেরে-কেটে আঠারো, ওদিকে চালের বাজারে আগুন। কেরোসিন তো প্রায় সোনার হরিণ। এর মধ্যে যখন তখন রং জ্বলা টিনের সুটকেস বাকসো হাতে আত্মীয়স্বজন। নাইম প্রায়ই বলে, মা, তুমি দেখো, যে বাঙ্কার ওরা খুঁড়েছে, ওই বাঙ্কারে বসেই কাপতে কাপতে সাদা কাগজে সই করে পালাবে পাকিস্তানিরা। রাহেলা ভাবে, সত্যিই কি কোনোদিন হবে তা? আবার কি কখনও গ্রামে যেতে পারবে? চোখ বন্ধ করলেই রাহেলা দেখতে পায়, ওই যে বাড়ির সামনে বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড় ঘেঁষে ছোট্ট বেগুন ক্ষেত। এই শীতে মাঠের পর মাঠ হলুদ সরিষা ক্ষেত। এই জীবনে আর কি সেসব দেখা হবে? সত্যিই দেশটা স্বাধীন হবে?

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT