ইতিহাস ও ঐতিহ্য

একাত্তরের শরণার্থীর স্মৃতি

পরিতোষ ঘোষ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০১-২০২০ ইং ০০:০৯:১৪ | সংবাদটি ৩২৫ বার পঠিত

১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ রাতে ঢাকা শহরের মানুষ যখন ঘুমিয়ে ছিল, তখন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হবার আগে তারবার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
২৬শে মার্চ ১৯৭১ প্রতিরোধ যুদ্ধও শুরু হয়ে গিয়েছিল। ২৭শে মার্চ ১২ সদস্যের একটি পাকিস্তানী দল সুনামগঞ্জে আসলে ছাত্র জনতা ইপিআর আনসারের প্রতিরোধের মুখে ২৯শে মার্চ প্রবল বর্ষণের মধ্যে পালিয়ে গিয়েছিল পাক হানাদাররা। এই যুদ্ধে আনসার কমাণ্ডার আবুল হোসেন ও রিকশা চালক গণেশ মারা যান।
সুনামগঞ্জ শহরের মানুষ প্রাণভয়ে আশেপাশের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পাকিস্তানীরা পলায়নের পর শহরের মানুষ বাসায় ফিরলেও আতংকে থাকতেন। পাকিস্তানীরা প্রতিশোধ নিতে আবার সংঘটিত হয়ে বিরাট শক্তি নিয়ে আবার সুনামগঞ্জে এসে হামলা করতে পারে এই শংকায় ছিলেন। তাই সুনামগঞ্জের মানুষ প্রাণভয়ে আশেপাশের গ্রামে বা দূরে আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিতে লাগলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই ভারতের বর্ডার খোলে দিলে মানুষ শরণার্থী হিসাবে ভারতে যেতে লাগলেন।
আমাদের বাড়ি সুনামগঞ্জের সাচনায়। আমার বয়স তখন ৯/১০ বছর। সুনামগঞ্জের ন্যাশনাল ফার্মেসীর মালিক ভুবতি এষ (ধ্রুব এষের বাবা) সুনামগঞ্জের আরও একটি পরিবার কিছুদিন আমার পাশে জেঠাতো বোনের বাড়িতে ছিলেন। একদিন সকালে উঠে দেখি আমাদের বাড়ির দুই পরিবার ভারতে চলে গেছেন। পরেরদিন আরও দুটি পরিবার। এমনি করে প্রতিদিনই গ্রামের এক/দুই পরিবার শরণার্থী হিসাবে ভারতে যাচ্ছেন।
তখন ছিল চৈত্র মাসের নিদান। একমাত্র বোর ফসল নির্ভর ভাটি এলাকায় তখন অভাব অনটন থাকে। দেশে গন্ডগোলের কারণে সে বছর ফরিদপুরের বেপারি কম এসেছে। উল্লেখ্য যে এ বছর সোনার ফসল হয়েছিল।
একদিন বাড়ির পিছনে খেলার মাঠে গেলাম খেলতে। হঠাৎ দেখলাম খুব নিচ দিয়ে বিকট শব্দ করে দুটি যুদ্ধ বিমান চলে যাচ্ছে। বড়রা সবাই ভয়ে খেলা বন্ধ করে মাঠে বসে কথা বলছিলেন। পাকিস্তানী হানাদাররা আওয়ামী লীগ দেখে দেখে হত্যা করে। হিন্দুদের হত্যা করে। মানুষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। মা বোনদের ধর্ষণ করে- অগ্নিসংযোগ করে তাই আর দেশে থাকা যাবে না। মাঠ থেকে ফিরে এসে সন্ধ্যায় বাবাকে মাঠের কথাবার্তাগুলি বলি। ‘আমি বলি চল বাবা আমরাও ভারতে চলে যাই।’ বাবাকে তখন চিন্তাযুক্ত মনে হলো। বাবা বললেন, ‘ধান পাকা শুরু হয়েছে ধান কেটে যারা আমাদের বাড়িতে ছয় মাসের চুক্তিতে কাজের লোক আছে তাদের পাওনা পরিশোধ করে তবেই আমরা যাব।’
কিছুদিনের মধ্যেই ধান কাটা শেষ হলে লোকদের দেনা পরিশোধ করে আমাদের ভাগে যে ধান ছিল তা মাত্র ১০ টাকা মন দরে বিক্রি করে টাকা যোগাড় করেন। তাছাড়া ঘরে কিছু রূপার টাকা বিক্রি করেন। গোয়ালে ছিল কিছু গরু, কালীবাড়ির সুরুজ ভাইকে ডেকে এনে বাবা বললেন, ‘এই নাও গরু যদি কোনদিন দেশে আসি- তাহলে গরু আমাকে দিবা- না আসলে সব গরু তোমার।’
খুব সম্ভবত মে মাসের ১২/১৩ তারিখ সাত পুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে শূন্য হাতে আমরা শরণার্থী হিসাবে বাড়ি থেকে বের হই। মা-বোনদের চোখে বিরামহীন অশ্রু, বাবা নির্বাক। মা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির উঠানে তুলসি তলায় প্রণাম করলেন, বসত ভিটায় প্রণাম করে বললেন, ‘রক্ষা করার মালিক তুমি- ধ্বংস করার মালিকও তুমি, আমরা যেন সবাইকে নিয়ে আবার ভিটে মাটিতে ফিরে আসতে পারি, এই আশীর্বাদ করিও ঠাকুর।’
সাচ্না বাজার থেকে সকাল আটটায় আমরা নৌকায় উঠলাম। আমরা ভাই বোন ছয়জন, বাবা-মা, জেঠা-জেঠিমা, জেঠাতো ভাই বোন এবং সুনামগঞ্জের একটি পরিবারসহ ছোট বড় ১৭ জন। নৌকার মাঝি তিনজন। বিকাল ৪ ঘটিকার সময় আমরা সুনামগঞ্জের অক্ষয়নগর পৌঁছলাম। সেখানে একটি বড় বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল।
পরদিন সকালে অক্ষয় নগর থেকে বারকি নৌকা করে বালাটের শিমুল তলায় যাই। বালাট থানার নিচেই শিমুলতলা বাজার। এই বাজারের এক খাসিয়া মহিলার দোকানের পিছনে একটি ছোট কাঁচা ঘরে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করা হলো। ঘরভাড়া দৈনিক পাঁচ টাকা। একঘরে আমরা গাদা গাদি করে ঘুমাতাম। শিমুলতলা বাজারটি একটি ছড়ার পাড়ে। (অনেকটা আমাদের যাদুকাটা নদীর মত, এপারে গাঁও- ওপাড়ে সড়কটি) শিমুলতলা বাজারের পশ্চিম পাড়ে পানছড়া শরণার্থী ক্যাম্প। পানছড়ার কয়েকমাইল পশ্চিমে মৈলাম ক্যাম্প মৈলাম ক্যাম্পের কয়েকমাইল পশ্চিমে গুমাঘাট থানা ও শরণার্থী ক্যাম্প। এপাড়ে- ওপাড়ে শুধু বালি আর বালি। মাঝখানে কোথাও হাটু জল, কোথাও কোমর জল, আবার কোথাও বা গলা জল। পাহাড়ি ঢলের সময় নদী খরস্রোতা হয়, তখন নদীর আয়তন ৪/৫ গুণ বেড়ে যায়। সেখানে খাবার জলের খুব সংকট ছিল। আমরা ছড়ার পাড়ে একফুট বা আরও বেশি বালি তুলে গর্ত করতাম, তখন গর্তে স্বচ্ছ জল আসতো, সেই জল বাটিতে করে কলসে ভরে নিয়ে আসতাম। সেই জল ফুটিয়ে পান করতাম।
শিমুলতলা বাজারে ৪/৫টি স্থায়ী দোকান ছিল। সপ্তাহে দুইদিন হাট বসে। হাটের দিন বাংলাদেশ থেকেও কিছু লোক টোকেনের মাধ্যমে যেতেন। মুরগ, ডিম, দুধ, সবজি সহ কিছু পণ্য নিয়ে বিক্রি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার সয়দা করে বিকালের মধ্যেই ফিরে আসতেন। বাজারের দক্ষিণে একটি শিমুল গাছ ছিল, সেখানে বিএসএফের একটি দল থাকতো। একটু পরপরই একজন গাছে উঠে ওয়ারলেসে আলাপ করতেন।
শিমুলতলা বাজারের উত্তরদিকে অতি কাছেই বালাট বাজার। এদিকে শরণার্থী হিসাবে নাম লিখানোর পরদিন থেকেই রেশন পেলাম চাল, ডাল, তেল, লবণ এবং এক বান্ডিল বিড়ি। বাবা বিড়ির বান্ডিল বিক্রি করে দিতেন। প্রতিদিন দলে দলে শরণার্থী এসে বালাট, পানছড়া, মৈলাম, গুমাঘাটে ভীড় করতে লাগলেন। বেশি লোকসংখ্যা বাড়ায় তীব্র পানীয় জলের অভাব দেখা দেয়। অধিক লোকসংখ্যার কারণে ক্যাম্পে ক্যাম্পে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফলে ডাইরিয়া মহামারির আকার ধারণ করে। ডাক্তার ঔষধপত্রের সংকট দেখা দেয়। শরণার্থী শিবিরে এক রুমে বিয়ে হচ্ছে, পাশের রুমে শ্রাদ্ধ আবার অন্যরুমে স্বজন হারানো কান্নাকাটি। এ দৃশ্য যারা দেখেন নাই তাদের বিশ্বাস করতে হয়ত কষ্ট হবে। মৃতদের মধ্যে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বেশি। সৎকার করার জায়গা ছিল না। কেহ মারা গেলে বালিতে পুতে রাখা হতো। পাহাড়ি ঢলের সময় স্রোতের তোড়ে বালি সরে গিয়ে লাশ ভেসে যেতো। ভাটার সময় লাশ বালুর চরে আটকে যেত তখন শেয়াল কুকুর লাশ ভক্ষণ করতো। জ্বালানি কাঠের অভাব। পাহাড়ে বন জঙ্গলে জ্বালানি আনতে গেলে বন্য প্রাণীর ভয় ছিল। তাছাড়া খাসিয়াদের তাড়া খেতে হতো।
একদিন বাবার সাথে বালাট বাজারে গেলে অনেক পরিচিত মানুষ দেখে আনন্দ লাগে। তাদের কাছ থেকে আমাদের গ্রাম সহ আশপাশের এলাকার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে আমরা ভীত বিচলিত ও আতংকিত হয়ে পড়লাম।
কয়েকদিনের মধ্যে কলিকাতা থেকে আমার জেঠাতো দাদা আমাদের নিতে এসেছেন। উনার সাথে আমরা শিলং গৌহাটি হয়ে তিনদিনের জার্নি করে কলকাতা হাওড়া রেলস্টেশনে পৌঁছি। বাবা সহ পরিবারের অন্যরা থাকতেন বালিগঞ্জ জেঠাতো দাদার বাসায়। মা আমি আর আমার ছোট বোন থাকতাম উল্টাডাঙ্গা বড় দাদার বাসায়।
উল্টোডাঙ্গার বাসায় প্রতিদিন পত্রিকা আসতো ‘আনন্দবাজার’ ও ‘যুগান্তর’। মা বলতেন, দেখতো বাংলাদেশের কথা কোথায় লেখা আছে? আমি বাংলাদেশ অংশটুকু মাকে পড়তে দিতাম। মা আমাদের পড়ে শুনাতেন। রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনতাম। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ প্রচারিত হতো ‘বজ্রকন্ঠ’ অনুষ্ঠানে। এম.আর আক্তার মুকুলের চরমপত্র প্রচারিত হতো। তাছাড়া আকাশ বাণীর খবর শুনতাম সকাল বিকাল।
কলকাতায় কোন ধরনের অসুবিধা না হলেও মা সর্বদা উৎকন্ঠায় থাকতেন, কবে দেশ স্বাধীন হবে, কবে আমরা দেশে ফিরব? আদৌ দেশে ফিরে যেতে পারব কি?
একদিন শুনলাম ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতা আসছেন। তারিখটা ছিল ৩ ডিসেম্বর। আমার এক দাদার সাথে উল্টাডাংগার ভিআইপি রোডে দাঁড়িয়ে প্রথম এত বড় নেতাকে দেখতে পাই। তিনি একটি খোলা জীপে করে দমদম বিমানবন্দর থেকে নেমে বিগ্রেডে যাচ্ছিলেন। রাস্তার দুই পাশের মানুষ ফুল ছিটিয়ে তাকে বরণ করছে।
পরদিন থেকেই কলকাতা ‘ব্ল্যাক আউট’। খবর পেলাম ভারত বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। গঠন করা হয়েছে মিত্র বাহিনী। আমাদের কি আনন্দ। এবার নিশ্চয় আমাদের জয় হবে। রেডিওর অনুষ্ঠান শুনতাম।
১৬ই ডিসেম্বর আমাদের কি আনন্দের দিন। সন্ধ্যার পর কলকাতার মানুষ রাস্তায় নেমে আনন্দ উৎসব করেছিল। এমনিতেই কলকাতা শহরে শরণার্থী গিজ গিজ করতো। ঐদিনের সবার আনন্দ কে দেখে। দেশ স্বাধীনতার পর ঠিক উল্টাভাবে শরণার্থীরা দেশে ফিরে আসেন, অর্থাৎ সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ভুলে আনন্দে, নব উদ্দীপনায় স্রোতের মত যে, যেভাবে পারে স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসে।
আমরা বাড়ি এসে শুনলাম, আমাদের চৌধুরী বাড়ি নাকি কোন রাজাকার নিলামে নিয়েছিল। ঘরের দরজা জানালা সহ ঘরের ভিতরে আসবাবপত্র জিনিসপত্র কিছুই পাই নাই। আরো একটি হৃদয় বিদারক খবর পেলাম, যা লিখতে আমার কষ্ট হচ্ছে। আমাদের একেই গুষ্টির দুই বোনকে (সবিতা চৌধুরী ও নমিতা চৌধুরীকে) পাক বাহিনী অত্যাচার করে মেরেছে (তথ্যসূত্র রক্তাক্ত একাত্তর) গ্রামের অনেক প্রিয় মানুষকে পাই নাই, অনেকের ঘরবাড়ি নাই।
সাচনাবাজারে এসে দেখলাম, রহমান তালুকদারের দোকান- নির্মল চৌধুরীর দোকানসহ ৩/৪টি দোকান পুড়ে ছাই। বাজারের উত্তর দিকে হাসপাতালের পিছনে ও পোস্ট অফিসের কাছে পাকবাহিনীর বাংকারের চিহ্ন। শশি পালের দালানে নাকি যুবতী মেয়েদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। শশি পালের দালানে এখনও গুলির চিহ্ন আছে।
আমাদের গরুগুলি দেশে এসে পেলাম না। হাড়ি পাতিল সহ যাবতীয় জিনিস কিনে বাবা আবার ঘুরে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখলেন। আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় সুখে-শান্তিতে বসবাস করার স্বপ্ন দেখলাম।
‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।’
‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী।’

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT