উপ সম্পাদকীয়

নৈতিক অবক্ষয় প্রতিকার

মো. সাব্বির আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০১-২০২০ ইং ০০:১৮:২৪ | সংবাদটি ৭৩ বার পঠিত


নৈতিক মূল্যবোধ বলতে সততা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা, ধৈর্য সহিষ্ণুতা, মায়া-মমতা, ক্ষমা, উদারতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, সদাচরণ প্রভৃতি মানবীয় গুণাবলির সমষ্টিকে বুঝায়। আর এসব গুণাবলি একজন সন্তান তার পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ থেকে অর্জন করে। কিন্তু পরিবার, লাখ লাখ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ থাকার পরও আমাদের নৈতিক অবক্ষয় কেন? নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য দায়ী কে?
পরিবার শিক্ষার প্রথম পর্যায়, একজন সন্তান বাবা-মা, ভাইবোন থেকে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ অর্জন করে। পারিবারিক শিক্ষাই মানুষের নৈতিক ও মূল্যবোধের ভিত্তি। মাতৃক্রোড়ই সন্তানের আদর্শ ও নীতিবান হওয়ার প্রধান বিদ্যাপীঠ। বাবা-মা আদর্শ ও নীতিবান হলে সন্তান আদর্শ ও নীতিবান হবেই। কেননা শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা যা দেখে বা শুনে তাই অনুকরণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন একজন শিশু পারিবারিক অশান্তি, কলহ, ঝগড়া-বিবাদ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাঝে বড়ো হয় এবং বাবা তার সন্তানের সামনে অশ্লীল গালিগালাজ করে এবং এক সঙ্গে অশ্লীল নাটক ও চলচ্চিত্র দেখে তাহলে সে কীভাবে নৈতিক মূল্যবোধ অর্জন করবে? এই অসুস্থ পারিবারিক পরিবেশে সন্তান অস্বাভাবিক মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। পারিবারিক অশান্তি এবং নৈতিক মূল্যবোধের অভাবই আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রধান কারণ।
নৈতিক শিক্ষার দ্বিতীয় পর্যায় হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো মানুষ গড়ার কারখানা। আর শিক্ষকগণ হচ্ছে কারিগর। আদর্শ শিক্ষকের আদর্শের গুণেই ছাত্ররা মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। এজন্য কবি বলেছেন-‘মানবকুলে জন্ম নিলে কি সবাই মানুষ হয়/আদর্শ মানুষ জন্ম দেয় আমাদের বিদ্যালয়।’ আদর্শ শিক্ষকের গুণে ছাত্ররা গুণান্বিত হয়। কিন্তু যখন শিক্ষকের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় দেখা যায় তখন ছাত্রদের নৈতিক শিক্ষার উপায় কি? ছাত্ররা কার কাছ থেকে নৈতিক শিক্ষা নিবে বা নীতিবান হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করবে? বর্তমানে আমরা প্রকাশ্য দিবালোকে দেখতে পাচ্ছি অনেক শিক্ষকই আদর্শহীন। আর এদের মাধ্যমেই নৈতিক অবক্ষয়ের শাখা-প্রশাখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রছাত্রীদের যৌন হয়রানি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার; যা আমরা দৈনিক পত্রিকা খুলতেই দেখতে পাই। এছাড়াও শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য তাদেরকে নৈতিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। নিজ কোচিংয়ে পড়ে এমন সব ছাত্রদের পরীক্ষায় নম্বর বেশি প্রদান করে এবং যারা পড়ে না তাদেরকে পরীক্ষায় নম্বর কম প্রদান করে। এমনকি প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে এই শিক্ষকরাই প্রশ্ন সংগ্রহ করে দিয়ে থাকেন।
নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য কেবলমাত্র আমাদের পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থা দায়ী নয়, সমাজব্যবস্থাও দায়ী। সামাজিক জীব হিসেবে সমাজের মধ্যেই একজন সন্তান বেড়ে ওঠে। সামাজিক পরিবেশ, আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। সামাজিক ব্যবস্থা যদি নৈতিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় তবে সে সেই মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সামাজিক ব্যবস্থায় যদি নৈতিক মূল্যবোধহীন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অপসংস্কৃতি প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে একজন সন্তান কীভাবে সংস্কৃতিমনা ও নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠবে? প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন সহজতর করেছে তেমনি এর অবাধ এবং অপব্যবহারের ফলে নৈতিক অবক্ষয় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফেসবুক, বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্রসহ অন্য সামাজিক মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে অশ্লীলতা এবং বেহায়াপনা সমাজের চারিদিক গ্রাস করে ফেলছে এবং মনোবিকৃতিকে (ঢ়ংুপযড়ঢ়ধঃযু) উসকে দিচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও পরকীয়া প্রেম এবং হত্যা, আত্মহত্যাসহ অন্যান্য অসামাজিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে না বুঝে পশ্চিমা নীতি-নৈতিকতাহীন সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ করার কারণে আমাদের মাঝ থেকে নৈতিক মূল্যবোধ উঠে যাচ্ছে। আমরা আমাদের সংস্কৃতি মেনে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে যদি তাল মিলিয়ে চলতে পারি এতে উন্নয়নের পথে অন্তরায় হওয়ার কথা নয়। মাদকদ্রব্যের প্রাদুর্ভাবও বর্তমান সমাজের সাধারণ মানুষের বিশেষ করে যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য দায়ী। মাদকাসক্তির কারণে তারা আদর্শ ও রীতিনীতি ভুলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এমনকি মা-বাবা, ভাইবোনকেও হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করছে না।
নৈতিক অবক্ষয় দূর করতে হলে পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা আনতে হবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। ইন্টারনেট ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমসহ বিজ্ঞাপন এবং চলচ্চিত্র থেকে অশ্লীলতাকে উসকে দেয় এমন সব কার্যক্রম ও দৃশ্য নিষিদ্ধ করতে হবে। ধর্মীয় ও নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে। আর এর মাধ্যমে নীতি ও আদর্শবান নাগরিক গড়ে তুলতে হবে। কারণ ধর্মীয় ও নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষা, পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা এবং নীতি ও আদর্শবান নাগরিক পারে মরণব্যাধি এই অবক্ষয় থেকে দেশ, জাতি ও সমাজকে রক্ষা করে এগিয়ে নিতে।
লেখক : শিক্ষার্থী।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT