উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : ভিক্ষাবৃত্তি

জুঁই ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০১-২০২০ ইং ০১:১৪:২৩ | সংবাদটি ২৭৫ বার পঠিত
Image

‘গিভ মি ওয়ান পাউন্ড প্লিজ, আই এ্যাম হাংগরি মেডাম, প্লিজ গিভ মি পাউন্ড ওর ডলার।’ উক্তিটির সাথে অনেকেই হয়তো আজ পরিচিত। সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজার গেলেই প্রায় সময় দেখা যায় এক মহিলা ভিক্ষুক গাড়ি বা রিক্সার যাত্রীদের কাছে থেকে ভিক্ষা চাচ্ছেন ইংরেজিতে এসব ডায়লগ বলে। আমি অনেকদিন থেকে এই ভিক্ষুক মহিলাকে জিন্দাবাজার দেখে আসছি এবং আমার মত অনেকেই এই মহিলা ভিক্ষুকের কথা হয়তো জানেন। ভিক্ষুক তো কতই আছে কিন্তু তার এই স্পষ্ট ইংরেজি উচ্চারণে ভিক্ষা নেওয়ার ভঙ্গিমা বেশ আকর্ষণীয়। তাই অনেককে সে সহজেই আকৃষ্ট করতে পেরেছে এই শহরে। তার এইভাবে ভিক্ষা চাওয়াতে যে না দেওয়ার সেও কিছু টাকা পয়সা দিয়ে যায়। বলা যায় এটা তার এক ধরনের ফন্দি যার মাধ্যমে সে খুব সহজেই টাকা পয়সা পেয়ে যায় আর আমাদের সিলেটীরা দরদে ভরপুর সামান্য কিছু আকর্ষণীয় দেখলেই হাত বাড়ায়। যাই হোক সে কতটুকু শিক্ষিত আমি জানি না তবে তার ইংরেজি উচ্চারণ খুবই সুন্দর ও স্পষ্ট।
এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে। আমাদের চারপাশে একটু ভালো করে দৃষ্টি রাখলেই দেখতে পাবেন নানা ভঙ্গিমায় ভিক্ষুক আমাদের সমাজে বিরাজমান। তবে বেশির ভাগ ভিক্ষুক কিন্তু প্রতিবন্ধী আর আমাদের সিলেটকে তো বলা যায় ভিক্ষুক রাজ্য। আপনি যেকোন কর্মবহুল স্থানে যান দেখবেন কেউ না কেউ একজন বাটি বা প্লেট এগিয়ে ভিক্ষা চাচ্ছে। বন্দর বাজার হোক, জিন্দাবাজার হোক, আম্বরখানা হোক আপনি আপনার কাজে দৌড়াচ্ছেন কিন্তু তারা বাটি বা প্লেট নিয়ে আপনার সাথে দৌড়াবে ভিক্ষা নেওয়ার জন্য। যেকোন জনবহুল এলাকায় এদের ভীড় প্রচুর থাকে। একজন ভিক্ষককে যদি আপনি ১০/২০ টাকা দিয়ে দেন, অন্যরা দেখে দৌড়ে চলে আসবে। এখন কথা হল আমরা কতজনকে ভিক্ষা দিবো? একজনকে দিলে অন্যজন যখন হাত পাতে তখন নিজের বিবেকে ধরা দেয়-আমি অন্যজনকে কেন দিচ্ছি না। এটা তো অনৈতিক। কিন্তু সাধ থাকলেও সাধ্য তো আর থাকে না সবার মুখে হাসি ফোটাবার-এই চিন্তাধারা আমাদের সমাজের অনেক ব্যক্তিরে।
শুধু যে বাজারে ভিক্ষুকদের ভীড় তা নয়। বাসা বাড়িতে কি কম দেখা যায়। অনেক সময় তো ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথে কোনো কোনো বাড়িতে দেখা যায় ভিক্ষুক এসে হাজির। সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত এদের দেখা যায় বাড়ি বাড়ি ঘুরতে। কেউ কেউ দিনে ৪/৫ কেজি চাল যোগাড় করে ফেলেন। একদিন এক ভিক্ষককে জিজ্ঞেস করলাম, সারা দিনে কয় কেজি চাল আপনি পান? বললো ঠিক না আপা কোন দিন ৫/৬ কেজি আবার কোন দিন ২ কেজিও হয় না। তিনি জানালেন, এক ভিক্ষুক প্রতিদিন এক এলাকায় আসেন না। তারা আজ এক এলাকায় গেলে পরের দিন অন্য এলাকা। এই জন্য কোনো কোনো ভিক্ষুককে সপ্তাহে দেখা যায়। তাদের রুটিন থাকে কোন এলাকায় কোনদিন যাবেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে শুধু যে চাল নেন তা না। কোন কোন বাড়ি থেকে তারা মশলা, তেল, তরকারীও যোগাড় করেন। ভিক্ষুক যে শুধু বয়স্ক বা বৃদ্ধা আসেন তা না। অনেক সময় দেখা যায় অল্পবয়সী নারী কোলে বাচ্চা নিয়ে ভিক্ষা করছেন। সবাই যে তাদের ভিক্ষা দেন তা না। অনেকে দেন অনেকে বকা ঝকা দিয়ে ফিরিয়েও দেন।
এবার আসি আমাদের ইসলাম ধর্ম ভিক্ষাবৃত্তিকে কি সমর্থন করে? ভিক্ষা একটি সামাজিক সমস্যা ও অপরাধ। বাংলোদেশের প্রচলিত আইনে ভিক্ষা নিষিদ্ধ। ভিক্ষাবৃত্তি ইসলামে জায়েজ নেই। হযরত রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আল্লাহতায়াল্লার কাছে হালাল কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট বা রাগের উদ্রেক সৃষ্টিকারী কাজ হলো ভিক্ষা করা। ভিক্ষামুক্ত শ্রমনির্ভর ও স্বনির্ভর জাতি গঠনে হযরত রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ দড়ি নিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে যাবে এবং লাকড়ি জমা করে পিঠে বোঝা বয়ে বিক্রি করবে আর এমনিভাবে আল্লাহ তার প্রয়োজন মিটিয়ে দিবেন। তা তার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা, করুণা ও লাঞ্ছনা পাওয়ার চেয়ে অনেক ভালো। (সহি বোখারি)।
আমাদের নবী করিম (স.) সৃষ্টিশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও নিজ হাতে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতেন, সেখানে কেন আমরা অপরের গলগ্রহ বা অকর্মা, পরজীবি হয়ে জীবন যাপন করব? কোনো বিবেকবান মানুষ অকর্মা হয়ে বসে থাকতে পারে না। পরগাছা, পরজীবিরা সমাজে অসম্মানিত, লাঞ্ছিত, অবহেলিত। সুস্থ, সবল শিক্ষিত ব্যক্তি পরজীবি বা পরগাছা হয়ে জীবনযাপন করতে পারে না। জনৈক সাহাবি হযরত রাসুল্লাহ (স.)-এর কাছে ভিক্ষা চাইতে এলে হযরত রাসুলুল্লাহ (স.) তাকে ভিক্ষা না দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের উপায় বাতলে দেন। আমাদের নবীজি ছিলেন আত্মনির্ভরশীল। এরপরও ভিক্ষাবৃত্তি থেমে নেই আমাদের সমাজে, উল্টো এখন ভিক্ষাবৃত্তি লাভজনক বাণিজ্য। ভিক্ষাবৃত্তি বা ভিক্ষুকদের নিয়ে মুখরোচক অনেক আলোচনা ও খবর গণমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়। সে সব খবরের প্রেক্ষিতে বলা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষুকদের নিয়ন্ত্রণ করে বেশ কিছু শক্তিশালী চক্র। তারা অবুঝ শিশু ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কাজে লাগিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এমনকি সুস্থ মানুষকে কৃত্রিম উপায়ে প্রতিবন্ধীত্বের কবলে ফেলে এ বাণিজ্য করছে। নবজাতক শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধদেরও ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করছে তারা। শুধু বেঁচে থাকা বা পেটের দায়ে নয়, ভিক্ষা করে বা ভিক্ষুকের সিন্ডিকেট করে বাড়ি-গাড়ি করার অবাক করা খবরও আমরা শুনে থাকি। এ টাকায় তাদের নিরাপত্তা ও ভিক্ষা করার জায়গার নিশ্চয়তা মেলে। এমনও শোনা যায় ভিক্ষুক সিন্ডিকেটরা শিশুদের অপহরণ করে অঙ্গহানির মত ঘটনা ঘটিয়ে তাদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করিয়ে লুফে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।
সৃষ্টিকর্তা খালিক ও মালিক দয়াবান, মেহেরবান। আল্লাহ পাক তাঁর বলেছেন, মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব। তাই সৃষ্টির এক অংশ অন্য অংশের কাছে হাত পাতবে, এটি মানবতার অবমাননা। তাই ইসলামে ভিক্ষাবৃত্তির কোন স্থানই নেই। প্রকৃতিগত কারণে বিপদগ্রস্ত, পঙ্গু রোগীদের জন্য রেখে দিয়েছেন ধনী বিবেকবান মানবসমাজ যাদের বলে দেওয়া হয়েছে সৃষ্টির সেবা মানেই স্রষ্টার সেবা। কবিও এরূপই বলে গেলেন, জীবে প্রেম করে যেই জন, সেজন সেবিছে ঈশ্বর।
জীবন বিধান আল কুরআনে যতবার নামাজের নির্দেশ এসেছে প্রায় ততবারই যাকাতের নির্দেশ রয়েছে। বিশ্বের এ যাবৎ কালের প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের তুলনামূলক অধ্যয়নে জানা যায় যাকাত বিধানের জন্য আল কুরআন অন্যান্য সকল ধর্মগ্রন্থ থেকে আলাদা ও অনন্য মর্যাদার অধিকারী! তাছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন প্রকার দান খয়রাত। এতসবের পরও মুসলিম মিল্লাতেই ভিক্ষুকের এত ছড়াছড়ি। আমাদের সমাজে ধনী ব্যক্তিরা যদি ঠিকমত যাকাত আদায় করতেন তাহলে গরীব মিসকিনরা হয়তো ভালভাবে সমাজে বেঁচে থাকার অধিকার পেতো।
যেহেতু ভিক্ষুকরা ভিক্ষাবৃত্তির মুহূর্তে ধর্মকে ব্যবহার করে, সেখানে ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূলে ধর্মের বাণী ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ, ধর্ম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছে, ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ। মানবিক কারণে বিপদগ্রস্থদের সাহায্য-সহযোগিতা অবশ্যই সওয়াবের কাজ, কিন্তু কারও যদি এটাই হয়ে যায় বেঁচে থাকার অবলম্বন সেক্ষেত্রে অবশ্যই নিন্দনীয়। ইসলাম এমন কাজের অনুমতি দেয় না। ইসলামের এই কথাগুলোর ব্যাপক প্রচার-প্রসারে আশা করা যায় সমাজ থেকে ভিক্ষাবৃত্তির অভিশাপ কিছুটা কমে আসবে।
আমাদের সিলেটকে ভিক্ষাবৃত্তি মুক্ত করতে হবে। একটা সমাজকে সুন্দর ও সাবলিল করতে হলে নির্মূল করতে হবে ভিক্ষাবৃত্তি। এই পেশাটি ধান্দার আর অলসতার। ধর্মকে পুঁজি করে সমাজের লোকদের ঠগিয়ে পেট চালানো বন্ধ করতে হবে। তাছাড়া ভিক্ষাবৃত্তি করে যারা জীবিকা নির্বাহ করে তারা কর্মবিমুখ বা অলস হয়ে পড়ে আর অলস ব্যক্তিরা সমাজের বোঝা স্বরূপ। হ্যাঁ তবে অসহায় দরিদ্রদের জন্য আমাদের উচ্চবিত্তদের কিংবা রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। তারা যদি বড় কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করে সমাজের অসহায় শ্রেণীর জন্য কোন কর্মমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করে তাদের অসহাত্ব দূর করে কাজে নিয়োগ করেন, তবেই গরীব ও অসহায়রা বেঁচে যাবেন, আর সিলেট হবে ভিক্ষুকমুক্ত।

 

 

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • স্মরণ: শেখ তজমুল আলী চেয়ারম্যান
  • করোনাকালে সঙ্কটে প্রবাসীরা
  • ব্যাংক খাত ও সাইবার নিরাপত্তা
  • আমাদের অসাধারণ মানুষের গল্প
  • প্রগতি জাতির প্রকৃতিগত অধিকার
  • নিজেকে দূরে রাখুন, সচেতন থাকুন
  • প্রগতি জাতির প্রকৃতিগত অধিকার
  • নিজেকে দূরে রাখুন, সচেতন থাকুন
  • আত্মহনন : অমূল্য জীবনের অপচয়
  • অনলাইন পাঠদান কেমন হওয়া উচিত
  • Image

    Developed by:Sparkle IT