উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ ফসলের ন্যায্যমূল্য

লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০১-২০২০ ইং ০১:১৫:২০ | সংবাদটি ৮১ বার পঠিত

একসময় বলা হতো কৃষিই বাংলাদেশের মেরুদ-। শিক্ষাকে যেমন প্রগতির বাহন বলা হয়, তেমনি কৃষি আমাদের অর্থনীতির শোণিত। বাংলাদেশ মানেই হচ্ছে গ্রাম আর কৃষি। বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক অগণিত সমস্যায় জর্জরিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আর্থিক দুরবস্থা, উপকরণের অভাব এমন হাজারো সমস্যা নিয়ে এখানকার কৃষককে কৃষিকাজ করতে হয়। তারপরেও আমাদের দেশে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষক চাষাবাদে উৎসাহ হারাচ্ছে। মানুষ বাড়ছে, সম্পদ বাড়ছে না বরং কমছে। মানুষ বৃদ্ধি পেলে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। পরিণতিতে দরিদ্র বাড়ছে।
অতিসম্প্রতি এ্যাকশন এইড ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক পরিচালিত এক জরিপে প্রকাশ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের ৮৩ শতাংশ কৃষকের আয় পরিবারের চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। আর এ কারণে ৬৫ শতাংশেরও বেশি কৃষক কৃষি পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে চায়। অন্য পেশায় যেতে চাওয়ার প্রধান কারণ উৎপাদন খরচের চেয়ে ফসলের দাম কম পাওয়া। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষক চাষাবাদে উৎসাহ হারাচ্ছে- এমন খবর প্রায় প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পাচ্ছে। কৃষকদের চাষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাজারে চাল, ডাল, তেলসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেশি হলেও কৃষক ন্যায্য দাম পায় না। এমন কি সরকারিভাবে ধান-চালের সংগ্রহমূল্য ধার্য করা হয় কম। কৃষি উপকরণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে দফায় দফায়। ক্ষেতমজুরের মজুরিও বাড়ছে দিন দিন। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকরা যদি তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পায় তবে চাষাবাদে উৎসাহ হারাতেই পারে। নিত্য লোকসান গুণে নিজের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। কিন্তু নিত্য লোকসান গুণে জাতির ভাগ্য উন্নয়ন কতদিন সম্ভব। যেখানে মধ্যস্বত্বভোগিরা লাভের অংক ভারি করতে সদা সোচ্চার থাকে।
কৃষকের প্রতিবছর বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, কমছে উৎপাদিত ফসলের দাম। কৃষক মূল্যস্ফীতির অর্থ হয়তো ঠিকভাবে বুঝতে পারে না, কিন্তু ঠিকই এর শিকার হয় তারা। ফসল ফলানোর সব উপকরণই তাদের কিনতে হয় চড়া দামে। নিজের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেশি। প্রতিনিয়ত জীবনযাপনের ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ছে। উৎপাদিত ফসলের দাম না পেলে সংসারের ব্যয় কিভাবে বহন করবে তারা। নতুন বিনিয়োগের অর্থই বা আসবে কোথা থেকে। পাট উৎপাদনে লোকসান, বোরো ধানে লোকসান, লোকসান আমনেও। কৃষক কত খেসারত দেবে? বহু বছর বাংলাদেশ ছিল খাদ্যঘাটতির দেশ। এখন এ অবস্থা আর নেই।
বিশ্বব্যাপী যখন খাদ্য সংকটের আশংকা বাংলাদেশ তখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর প্রধান অবদান কৃষকেরই। সরকারের কর্মকৌশলের অবদানও অনস্বীকার্য। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাজারে চালের দাম কম থাকলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী খুশি থাকে। শহরের বিত্তবান সচ্ছল ক্রেতাদের পছন্দ এটাই। কিন্তু এঁরা যখন কোন পণ্য বিক্রি করে তখন ঘটে উল্টোটা। এ অবস্থা কৃষি অর্থনীতির বিকাশ প্রচেষ্টায় অন্তরায়। কৃষক যখন কোন জিনিস কেনে তখন দাম বেশি হয়, আর যখন বিক্রি করতে যায় তখন দাম পড়ে কম। এ অবস্থা চলতে পারে না। ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। খাদ্য আমদানি বাবদ শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের হাত থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে। ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষকরা যদি উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, অথবা খোরাকী কৃষি উৎপাদন পর্যন্ত আগায়, তাহলে দেশের খাদ্য সমস্যা প্রকট হবে। খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার স্বপ্ন ভেঙে যাবে। এ অবস্থায় দরকার কৃষক বাঁচানোর পরিকল্পনা নেয়ার। দেশের কৃষি অর্থনীতি মজবুত রাখতে এ বিষয়টি নীতি-নির্ধারকরা যতো তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করতে পারবেন, ততই মঙ্গল। আমাদের দেশের ধানের কৃষক যদি তার ঘামের ন্যায্যমূল্য পান, তাহলে আবার সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা হবে বাংলাদেশ। তাই বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা কৃষি উন্নয়নের বড় মূলধন। যতই এসবকে খাটাতে পারবে উন্নয়নের পথ ততই প্রশস্ত হবে।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT