ধর্ম ও জীবন

জিয়ারতে সোনার মদিনা

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০১-২০২০ ইং ০১:০৪:৪৬ | সংবাদটি ১৪৬ বার পঠিত

‘মদিনা’ সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চলের একটি বৃহত্তম পবিত্র শহর এবং আল মদিনা প্রদেশের রাজধানী। ‘মদিনা’ ইসলাম ধর্মের দ্বিতীয় বৃহত্তম পবিত্র শহর। কারণ এখানে নবীজি (সা:) এর রওজা শরীফ রয়েছে। তাছাড়া হিজরতের পর হতে তিনি মদিনাতেই বসবাস করতেন তাই ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণে মদিনা মুসলমানদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান। হযরত মোহাম্মদ (সা:) নিজ জন্মভূমি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর স্মৃতিময় ইয়াসরিব ভূমি হয়ে গেলো পুণ্যভূমি ‘সোনার মদিনা’। ‘মদিনা’ হলো মক্কার পর পৃথিবীতে দ্বিতীয় বৃহত্তম, সর্বোত্তম ও পবিত্রতম স্থান। যেখান থেকে প্রিয় নবীজি (সা:) এর মাধ্যমে ইসলামের বাণী বিশ্বময় প্রচার, প্রসার ও উন্নতি লাভ করেছিল। শুধু তাই নয়, মদিনা থেকেই ইসলাম ধর্ম পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। মহান আল্লাহর বিধানাবলী তথা কুরআনের আইন বাস্তবায়ন হয়েছিল। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম মুসলিম দেশ বা ইসলামী রাষ্ট্র। তাই সোনার মদিনায় কেউ হজ, ওমরা বা ভ্রমণে আসলে মানুষ নিজের মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে থাকেন, যা অন্যত্র সফরে পাওয়া যায় না বা সম্ভব নয়। নবীজি (সা:) এর পদচারণ ও পদধূলি মিশ্রিত মদিনার পবিত্র ভূমি ও মদিনার মসজিদে নববীর পবিত্র প্রান্তরে রয়েছে পবিত্র রওজা শরীফ তাই মুসলমানদের কাছে মদিনা অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও পবিত্র নগরী। শুধু তাই নয়, মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, সংস্কৃতি, কল্যাণ-অকল্যাণসহ যাবতীয় বিষয় এই মদিনা নগরীতেই মিশে আছে, তাই মদিনাকে ‘সোনার মদিনা’ বলা হয়ে থাকে। মদিনা হল রাসুল (সা:) ও সাহাবায়ে কেরামদের হিজরতের পুণ্যভূমি ও ইসলামের পবিত্র স্থানসমূহের অন্যতম অঞ্চল। তাই কোনো মুমিন বান্দা যদি খালিছ নিয়তে আল্লাহ ও তার রাসুলের নৈকট্য লাভের আশায় অথবা সওয়াব ও কল্যাণের আশায় এবং নবী প্রেমে মক্কা, মদিনা ভ্রমণ, হজ, ওমরা পালন করেন এবং নবীজি (সা:) রওজা জিয়ারত করেন তবে অবশ্যই মহান আল্লাহ তাকে অফুরন্ত কল্যাণ ও সওয়াব দান করবেন। রাসুল (সা:) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি খালিছ নিয়তে আমার মৃত্যুর পর আমার কবর জিয়ারত করবে, সে ব্যক্তি যেন আমার জীবদ্দশাতেই আমার সাথে সাক্ষাৎ করলো।’ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ, উত্তম ও মহিমান্বিত সোনার মানুষের স্মৃতিময় স্থান ও সমাধিস্থল এর নাম ‘সোনার মদিনা’ এবং মসজিদের নাম ‘মসজিদে নববী’ বা ‘রাসুলের মসজিদ’।
মহিমান্বিত মসজিদে নববী অর্থ নবীজি (সা:) এর মসজিদ। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর তিনি আইয়ুব আল আনসারীর বাড়িতে অবস্থানকালীন সময়ে নবীজি (সা:) সাহল ও সোহাইল নামক এতিম বালকদ্বয়ের নিকট থেকে জমি ক্রয় করে নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন এই ‘মসজিদে নববী’ বা নবীজির মসজিদ। এই মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করে আল্লাহ’র দেওয়া ধর্ম, কর্ম ও দায়িত্ব সুচারুভাবে সফলতা অর্জন করতঃ বিদায় হজের ভাষণে সাহাবীগণকে সফলতার সাক্ষী করার পর তিনি মসজিদে নববীর দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তে চির নিন্দ্রায় শায়িত আছেন। আমাদের প্রাণপ্রিয় মহানবী (সা:) মদিনায় হিজরত করার পর মসজিদে নববী নিজ হাতে গড়ে তুলেন এবং মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করেই সকল কিছুই বিকশিত করেছিলেন। ইসলামী দ্বীন শিক্ষা দেওয়া থেকে শুরু করে, মুসলিম সমাজ ও মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সকল কাজ তিনি এই মসজিদে নববীতে বসেই সমাধান করতেন। সাহাবীবৃন্দ এখানেই উনার কাছে কুরআন শিক্ষা, সমাজ পরিচালনার পদ্ধতি, ধর্ম প্রচার-প্রসারের নিয়ম নীতি, রাষ্ট্র পরিচালনার পরামর্শ, সভা সমাবেশ, যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ পরিকল্পনা ইত্যাদি মসজিদে নববীতে বসেই শিক্ষা গ্রহণ করতেন। তাই তৎকালীন ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন ব্যবস্থা ও পরিচালনা ইত্যাদির প্রভাব মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। মুসলিম সমাজ ব্যবস্থার শিক্ষা কেন্দ্র, সমন্বয়কেন্দ্র, বিচার ব্যবস্থা ও আইন আদালত দেশি-বিদেশি মেহমান, রাষ্ট্রদূত ও বাণিজ্যিক আলাপ আলোচনা ইত্যাদি কার্যাদি মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করেই সমাধান করা হতো। তাই নবীজি (সা:) এর মৃত্যুর পর খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসন আমলে মসজিদে নববীই ছিল ইসলামী খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র। অর্ধ পৃথিবীর মুসলিম রাজত্ব এই মসজিদে নববীতে বসেই পরিচালিত হতো।
৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসুল (সা:) নিজ হাতে মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করলেও যুগে যুগে বহুবার সংস্কার করা হয়েছে। সর্বশেষ বর্তমান যুগের সংস্কারের ফলে মসজিদের আয়তন ও সৌন্দর্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে ফলে প্রায় ৭/৮ লক্ষাধিক মুসল্লি এক সাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। তাছাড়া স্থাপত্যশৈলী ও কারুকার্য দ্বারা আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে মূল্যবান জিনিসপত্র সংযেজান করা হয়েছে এবং মসজিদে নববীতে মহিলাদের জন্য আলাদা নামাজের জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু নবীজি (সা:) এর মাজার জিয়ারত করতে গিয়ে ভিতরে বিভিন্ন দেশের মহিলা দালাল দ্বারা, নিগৃহিত হতে হয় অথবা অর্থের বিনিময়ে অনেক সময় অবস্থান করাও সম্ভব হয়, যা সুশীল মহিলাদের জন্য ভীষণ বিরক্তিকর সমস্যা। যা ভুক্তভোগী মহিলা ও নবীপ্রেমী জিয়ারতকারীগণই ভালো বলতে পারবেন। মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য চতুর্দিকে সুউচ্চ নিরাপত্তা দেওয়াল, মসজিদ প্রাঙ্গণের খোলা জায়গায় মিনার সদৃশ ছাতা তৈরি, ইলেকট্রিক গম্বুজ, আধুনিক আন্ডার গ্রাউন্ড ল্যাট্রিন ও অযুখানা তৈরি, ৩৪৪ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন মিনার, গাড়ি পার্কিংয়ের বিশাল জায়গা, হাইওয়ে পার হয়ে সহজে মুসল্লিগণের যাতায়াতের জন্য আন্ডার পাস রাস্তা রয়েছে। বর্তমানে মসজিদে নববীতে ১০টি ৩৪৪ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন মিনার এবং প্রায় ২০০টি ছোট বড় গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের মূল আকর্ষণ, মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত মহানবী (সা:) এর রওজার উপর সবুজ গম্বুজটিই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। কেননা নবীজির মাজার জিয়ারতের জন্য বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ হজ ও ওমরা করে থাকেন। এবং রওজায়ে জান্নাত বা রিয়াজুল জান্নাতে নফল নামাজ পড়ে নিজের বা দুনিয়াবাসীর জন্য দোয়া করে থাকেন। তাই মসজিদে নববীর গুরুত্ব ও মর্যাদা বিশ্ববাসীর কাছে সর্বাধিক।
মসজিদে কুবা বা কুবা মসজিদ। পবিত্র মসজিদটি সৌদি আরবের মদিনা প্রদেশের কুবা নামক স্থানে অবস্থিত। ঐতিহাসিক এই মসজিদটি ইসলামের প্রথম মসজিদ। মক্কা হতে মদিনায় হিজরতের সময় মদিনাস্থ কুবা অঞ্চলের গোত্রপতি কুলসুম ইবনুল হিফস-এর বাড়িতে ১৪ (চৌদ্দ) দিন অবস্থান করেছিলেন। সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে গোত্রপতি ইবনুল হিফসের খেজুর শুকানোর জায়গাতে এই মসজিদটিই প্রথম নির্মাণ করেছিলেন। পবিত্র মসজিদটি মসজিদে নববী বা মদিনা নগরী হতে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে প্রায় পাঁচ কি.মি দূরত্বে অবস্থিত। কুবা একটি কূপের নাম, আর এই কূপকে কেন্দ্র করেই অত্র অঞ্চলে বসতি গড়ে উঠেছিল বলে স্থনটি কুবা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। মসজিদটি মক্কা থেকে ৩২০ কি.মি উত্তরে এবং মদিনা থেকে পাঁচ কি.মি দক্ষিণে অবস্থিত। রাসুল (সা:) এর হিজরতের সময় সাথী মুজাহিরগণকে সাথে নিয়ে কুবা মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন এবং তাদেরকে নিয়েই নামাজ পড়েছিলেন। মসজিদটির সৌন্দর্য ও স্থান বর্ধনের জন্য বিভিন্ন সময় সংস্কার হয়েছে, সর্বশেষ সংস্কারের পর বর্তমান মসজিদ আঙ্গিনা ছাড়াও রয়েছে বিরাট চত্বর, রয়েছে আবাসিক এলাকা, অফিস চত্বর, পুরুষ মহিলাদের জন্য আলাদা অজুখানা, দোকানপাট ও লাইব্রেরী। আমরা বাইরে থেকে মূল যে আকর্ষণগুলো দেখলাম, তাহলো, মসজিদটিতে একটি গম্বুজসহ চার কর্ণারে চারটি সুউচ্চ মিনার এবং মসজিদটির চতুর্দিকে মাঝে মাঝে সবুজ পাম গাছ রয়েছে, যা মসজিদের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা তওবার ১০৭নং আয়াতে পবিত্র মসজিদটির কথা উল্লেখ রয়েছে। এক হাদিসে নবীজি (সা:) বলেছেন, ‘নিজ আবাসস্থল বা বাসা থেকে অজু করে যদি কোনো ব্যক্তি এই মসজিদে এসে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন। তবে সে একটি ওমরাহ আদায়ের সওয়াব পাবে।’ বর্ণিত স্থানে স্ত্রী পুত্রসহ দু’রাকাত নামাজ পড়ার সৌভাগ্য আমাদের হ ৬-এর পৃষ্ঠায় দেখুন

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT