ধর্ম ও জীবন

আলেমদের কাছে জাতির প্রত্যাশা

মাওলানা আজিজুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০১-২০২০ ইং ০১:০৫:৩৮ | সংবাদটি ১২৩ বার পঠিত

আমি সেরেফ দু’টি মুসলিম সংখ্যালঘু অঞ্চলের মুসলমানদের অতীত ও হালযামানার হালের কথা বলবো যেখানে মুসলমানরা ছিলেন একসময় অনেক প্রভাবশালী।
প্রথমত আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ আর দ্বিতীয়ত পূর্ব ইউরোপ। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম শাসকরা প্রায় ছয়শো বছর শাসন করেছেন। বিভিন্ন সময় এখানে মুসলমানের সংখ্যা কমবেশী হয়েছে। সর্বশেষ যখন মুসলমানরা এখানকার শাসনের কর্তৃত্ব হাতছাড়া করেন, তখন সেখানকার মুসলমানের সংখ্যা ২০-২২% ছিল বলে ধারণা করা হয়। এখন এই সংখ্যা ৩০-৩৫% এর মধ্যে অবশ্য কাদিয়ানী-শিয়ারাও আছে। পক্ষান্তরে পূর্ব ইউরোপে মুসলমানদের শাসনামল নির্দিষ্ট করা কিছুটা দুরূহ ব্যাপার, কেননা মুসলমানরা সেখানকার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়কাল ধরে শাসন করেছেন। যেমন তুরস্ক, সাইপ্রাস, আজারবাইজান সেই খোলাফায়ে রাশেদীনের সোনালি যুগ থেকেই। আবার কিছু কিছু অঞ্চল শত বছরও মুসলমানদের রাজত্বে ছিল। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো মোটামুটি তুরস্ক, সাইপ্রাস, আরজারবাইজান, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, ইউক্রেন, বসনিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রিস, আলবেনিয়া, কসোভো, সার্বিয়া, স্লোভেনিয়া, মন্টিনিগ্রো, মেসিডোনিয়া ও রাশিয়ার বেশ কিছু অংশ। এর মধ্যে তুরস্ক ও আজারবাইজানে প্রায় ৯৮% মুসলমান। তুরস্কের এরা ২৫% আজারবাইজানে ৮০% আলাভী আছে। এছাড়া অন্যান্য দেশগুলোতে মুসলমানের সংখ্যা, কসোভোতে ৯৫%, আলবেনিয়াতে ৯০%, বসনিয়াতে ৫০%, মেসিডোনিয়াতে ৩৫%, সাইপ্রাসে ৩০%, বুলগেরিয়া, জর্জিয়া, মন্টেনিগ্রো ও রাশিয়তে ২০% সার্বিয়ায় ২% এ সংখ্যা অবশ্য কসোভো স্বাধীন হয়ে যাবার পর, এবং স্লোভেনিয়াতে ৪% মুসলমান আছেন, আর আর্মেনিয়াতে একসময় প্রচুর পরিমাণে মুসলমান থাকলেও এখন তা ১% এর কম। মোটামুটি এ পুরো অঞ্চলে ১৫%-২০% এর মত মুসলমান আছেন। তবে এ পরিসংখ্যান জরিপ ভিত্তিক। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশী হতে পারে। ১৯২৩ সালে তুর্কি খেলাফত বিলুপ্ত হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত (কম বেশী) মুসলমানদের শাসনাধীন ছিল। ধারণা করা হয় সে সময় নাগাদ এখানে ৪৫-৫০% মুসলমানগণ বাস করতেন। এরপর ৭০-৮০ বছরের জন্য এখানে কমিউনিজমের অভিশাপ নেমে আসে। এ বছরগুলোতে মুসলমানদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা জানা যায়নি। কোনো সংবাদ মাধ্যমেও এর খবর আসেনি। আর কোনো ইতিহাসও সেভাবে পাওয়া যায় না।
ইতিহাসবিদদের ধারণানুযায়ী মুসলমানদের বেশ বড় একটা অংশ শহীদ হয়েছেন, কিছু সংখ্যক মুসলমান নাস্তিক বা ধর্মান্তরিত হয়েছেন আর কিছু হিজরত করে আরব ও পার্শবর্তী মুসলিম দেশে চলে গিয়েছেন আবার কিছু বিভিন্ন দেশগুলো যেমন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী ইত্যাদি দেশগুলোতে পাড়ি জমিয়েছেন। আর যারা থেকে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে মুসলমানিত্ব অবশ্য খুব কমই লোকদের ছিল। শুধু মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেয়া ছাড়া আর কোন আলামত ছিল না। অনেকে অবশ্য তাও দিতে চায়নি। এছাড় তাদের চলাফেরা, জীবন যাপন পদ্ধতি, বিয়ে-শাদী, চিন্তা-ভাবনা, পোষাক আষাক, সংস্কৃতি কোন দিক দিয়েও মুসলমান হিসেবে চেনার কোন উপায় নেই। বিভিন্ন মুসলিম অকেশনে এসব দেশের বাইরের মুসলমানদেরই শুধু কিছু কর্মকান্ড নজরে আসে, যাদের বেশীর ভাগই নওমুসলিম অথবা আরব বা উপমহাদেশীয় অভিবাসী। আজ অবস্থা তো এই, অধিকাংশ মানুষ জানেও না যে, এসব দেশে এতো সংখ্যক মুসলমান আছেন। মানুষ ইউরোপের মুসলমান বলতে শুধু ফ্রান্স, ইংল্যান্ড আর জার্মানীর অভিবাসী মুসলমানদেরই বুঝে। অথচ এসব এলাকায় যুগ যুগ ধরে মুসলমানরা বাস করে আসছেন।
পক্ষান্তরে আমাদের উপমহাদেশে ১৭৫৭ সালের পর থেকেই মুসলমানদের তেমন কোন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব ছিল না। আর ১৭৯৯ সালের মহীশুরের সিংহ টিপু সুলতানের পরাজয়ের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে হাত ছাড়া হয়ে যায় শাসনের চাবিকাঠি। এরপর মুসলমানদের ইতিহাস শুধু অপমান, লাঞ্ছনা, অত্যাচার আর গণহত্যার ইতিহাস। এর আগে মুসলমানদের প্রতিটি জনপদে মাদ্রাসা ছিল। এসব মাদ্রাসা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় চলত। আর বড় বড় জায়গীর ছিল এসব মাদ্রাসার নামে। এ দিয়েই এর খরচ চলত। কারও কাছে সাহায্যের হাত পাততে হতো না এসব মাদ্রাসার। কাউকে পাত্তা দেয়ার দরকারও পড়তো না। কাউকে বেতন দিয়ে পড়তে হতো না। ইংরেজরা একে একে সব মাদ্রাসা ধ্বংস করে কিলার মিশন চালায় উলামায়ে কেরামদের উপর। যাকে যেখানে যেভাবে পেয়েছে। কোন ধরণের অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই নিত্য নতুন প্রক্রিয়ার প্রাণদন্ড দিয়েছে। লোমহর্ষক সব উপায়ে শাস্তি দিতে থাকে। বিরতিহীনভাবে অত্যাচারের ষ্টিম রোলাল চালাতে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে, মুসলমানদের জমিজমা কেড়ে নিয়ে ভূমিদাস বানানো হয়। মুসলমানদের দৈনন্দিন আ’মালে বাঁধা প্রদান করা হয়। দাঁড়ির উপরও উচ্চ হারে কর বসানো হয়। মুসলমানদের ঈমান-আকীদা ধ্বংস করার জন্য সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন ফেরকা বা দলের জন্ম দেয়া হয়। একই সাথে বিভিন্নভাবে ভুল বুঝিয়ে অনেক সরলমনা মুসলমানদের খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। এর সাথে পর্তুগিজ ও ফরাসী দস্যুদের অত্যচার তো ছিলই। এদেশীয় হিন্দুদেরও মুসলমান সম্পর্কে খারাপ ধারণা ও ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করে বিবাদ বাঁধিয়ে দেয়া হয়।
এরই প্রেক্ষাপটে কিছু উলামাকেরাম অন্তরালে চলে যান। আর জনবসতীশূণ্য একটি গ্রামে আল্লাহওয়ালা, খোদাভীরু প্রকৃত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে একটি দ্বীনের দূর্গ তৈরী করেন। দেওবন্দ নামক গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় এলায়ে কালজয়ী, বিশ্বসেরা ইসলামি বিদ্যাপিঠ।
দেওবন্দ সেরেফ একটি মাদরাসার নাম নয়, এটা হচ্ছে মুত্তাকি তথা খোদাভীরু মানুষ গড়ার মিশন। দেওবন্দ শুধু দারস-তাদরিস তথা দ্বীন শেখা আর শেখানোর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং দ্বীনে এলাহির শত্রুদের দমন আর শক্তহাতে বাতিল অপশক্তির মোকাবেলা করার জন্য যার পথচলা।
দেওবন্দ মাদরাসা নতুন কোন সম্প্রদায় বা নতুন কোন আকীদা নয়। নতুন কোন ধারাও নয় আবার কোন ফেরকাও নয়। বরং উপমহাদেশের ইসলামের ধারাবাহিকতাই দেওবন্দ মাদ্রাসা। অবশ্য এরপর থেকে উপমহাদেশের ইসলামের ইতিহাস আর দেওবন্দের ইতিহাস সমার্থক। কেননা উলামায়ে দেওবন্দের নিস্বার্থ শ্রম-সাধনা আর কুরবানীর বদৌলতে, ত্যাগ তিতিক্ষা আর বিচক্ষণ কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমেই ইসলামের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রেখেছেন। বলতে পারেন মহানবী সা.’র মক্কি জীবনের এক প্রতিচ্ছবি ছিল দেওবন্দের শুরুর দিকটা । পরবর্তীতে উলামায়ে দেওবন্দের উপরও চলে ইংরেজদের লোমহর্ষক সব অত্যাচার। দেওবন্দের প্রথম ছাত্র হ ৬-এর পৃষ্ঠায় দেখুন

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT