ধর্ম ও জীবন

শান্তি স্থাপনে সালাম বিনিময়

মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০১-২০২০ ইং ০১:০৬:৪৩ | সংবাদটি ৯৭ বার পঠিত

সালাম একটি আধুনিক সম্ভাষণ। অনেক দেশে অনেক ধরণের সম্ভাষণ প্রচলিত আছে। যে দেশের সংস্কৃতি যেমন, সে দেশের সম্ভাষণও সেরকম। ব্রিটিশ শাসন আমলে আমাদের দেশে তাদের প্রভাবে আমরাও এড়ড়ফ গড়ৎহরহম/ এড়ড়ফ ঘড়ড়হ/ ইুব ইত্যাদি বলা শুরু করেছিলাম। জাপানিরা যেমন সকালে দু‘জন দেখা হলে বাউ করে ওহাইয়ো গোজাইমাসু (এড়ড়ফ গড়ৎহরহম) বা সন্ধ্যায় দেখা হলে কনিচিউয়া/কনবাংউয়া (এড়ড়ফ বাবহরহম) বলে, চীনারা বলে, নি হাউ (ঐড়ঢ়ব ণড়ঁ ধৎব মড়ড়ফ)। ইন্ডিয়াতে বলে নমস্তে বা আদাব।
আমাদের দেশে আমরা সম্ভাষণ হিসাবে সালাম ব্যবহার করে আসছি। আসসালামু আলাইকুম। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কেউ কেউ ভুল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই ইংরেজি সম্ভাষণগুলো ব্যবহার করেন। আসলে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, এটা আমাদের মানসিকভাবেও পিছিয়ে দেয়। কেউ কেউ ঐর/ ঐবষষড় বলাটাকে সামাজিকভাবে মর্যদাসম্পন্ন মনে করেন।
মনে করেন যে, এটা আধুনিকতার প্রতীক। অথচ সালাম শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটাই সত্যিকার আধুনিকতার প্রতীক। আমরা জানি যে, আসসালামু আলাইকুম- এ কথার অর্থ আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। অর্থ থেকেই আমরা বুঝতে পারছি, সবগুলো সম্ভাষণের মধ্যে সালাম অর্থাৎ আসসালামু আলাইকুম, এই সম্ভাষণটা সবচেয়ে কল্যাণকামী, মাধুর্যময় এবং সবসময়, সকালে, বিকালে, দুপুরে, রাতে ব্যবহার করা যায়। আর মানুষের কল্যাণ কামনা করে কিছু বলা, এটাও আসলে একটি ইবাদত। এটি একটি দোয়া। নবীজী (স:) তার জীবনে সবচেয়ে বেশি যা চর্চা করেছেন তা হলো সালাম দেওয়া।
শান্তি স্থাপনে সালামের গুরুত্ব অপরিসীম। শান্তির এই বাণীর রয়েছে বহুমূখী উপকার। অন্যকে যখন সালাম দেওয়া হয় শান্তির কামনায়, তখন প্রকৃতির প্রতিদান হিসাবে নিজেরও শান্তি বাড়ে। আমরা ছোট-বড়, ধনী-গরীব নির্বিশেষে সালাম প্রদান করলে আমাদের হীনমন্যতা দূর হয়, জড়তা সংকোচ দূর হয়। আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। অন্যের প্রতি সম্মানবোধ বৃদ্ধি পায়। মানুষকে বিনয়ী ও শিষ্টাচারী হতে শিখায়। নতুন কারো সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য সালাম প্রদানে আত্মিক বন্ধন সৃষ্টি হয়। সহকর্মীদের সালাম প্রদানে কাজের প্রতি স্বতঃস্ফুর্ততা ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়। কারো সাথে ভুল বোঝাবুঝি হলে, হাসিমুখে সালাম দিলে সমঝোতার মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়। পরিবারে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি বাড়াতে ও শান্তি বজায় রাখতে সালাম অনুঘটকের কাজ করে।
আমরা জানি, কথার একটা শক্তি আছে। ভালো কথার শক্তি ইতিবাচক। মন্দ কথার শক্তি নেতিবাচক এবং আমরা ভালো কথা শুনতে ভালোবাসি। ভালো কথা শুনতে চাই। সেই কথাটাই আমাদের মনে দাগ কাটে, যা আমাদের ভালো লাগে। যত সভ্য হয়ে ওঠে মানুষ, এটার প্রকাশ ঘটে তার আচার-আচরণে। আমাদের ব্রেন হচ্ছে ট্রান্সমিটারের মতো বা মোবাইলের মতো। এটা মেসেজ রিসিভ করে, আবার পাঠায়ও। যখনই আমরা একটা ভালো কথা বলি বা ভালো চিন্তা করি, ব্রেন সেটা যেমন গ্রহণ করে, আবার মন্দ কিছু বললে বা ভাবলে সেটাও সে গ্রহণ করে। বারবার যখন এই ভালো কথা বা ভালো চিন্তা ব্রেনে যাচ্ছে, তখন বাস্তবেও আমাদের জন্যে শান্তিতে থাকা সহজ হয়ে যাচ্ছে। সবসময় মনে রাখতে হবে যে, আমরা যা চাই, আমাদের ব্রেনকে তাই বলতে হবে। যা আমরা চাই না, তা যত কম বলা যায় তত ভালো। সালামের গুরুত্ব আসলে এখানে। আমাদের চাওয়া, আমাদের শান্তিতে থাকার যে ইচ্ছা, এটারই আসলে প্রতিফলন ঘটে সালাম দেওয়ার মাধ্যমে।
ভালো কথা দিয়ে ঝগড়া হয় না। যাকেই আমরা সালাম দেব, সালামের জবাবে তিনিও আমাদের জন্যে শান্তি কামনা করবেন। তো দু‘জন শান্তিকামী মানুষের মধ্যে বিরোধের সুযোগ কম। সালামের জবাব কিভাবে দিতে হবে সেটাও আল্লাহ শিখিয়ে দিয়েছেন। সূরা নিসার ৮৬ নম্বর আয়াতে আছে, কেউ সালাম দিলে আরো বিনয়ের সাথে সালামের জবাব দাও। এ জবাব দেওয়াটা ওয়াজিব, যেখানে সালাম দেওয়াটা সুন্নত।
ঘর থেকে সালাম শুরু করা যেতে পারে। অফিস থেকে বাসায় ফিরে স্ত্রীকে চমৎকার করে একটা সালাম দিয়ে হাসিমুখে কথা শুরু করতে পারেন স্বামী। বাবা হলে ছেলে-মেয়েদের নিজে আগ্রহী হয়ে সালাম দিতে পারেন। কিছু দিন যখন তারা দেখবে বাবা সালাম দিচ্ছেন তাদেরকে। পরে তারা নিজ থেকেই সচেতন থাকবে, মা-বাবা যাতে আগে সালাম দিতে না পারেন। বিদেশি সংস্কৃতিকে আমরা মনে করি, আমাদের চেয়ে উন্নত। তাই কেউ কেউ বাচ্চাদের টাটা, বাই বাই!! হাই! হ্যালো! এসব শেখানোটাকে স্মার্টনেস মনে করেন। এটার চেয়ে সালাম অনেক ভালো। কারণ এগুলোর চেয়ে সালামের অর্থ অনেক সুন্দর। আর এগুলোর সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থও নেই। বাচ্চাদের আমরা সালাম দেওয়া শেখাব। স্পষ্ট করে, আসসালামু আলাইকুম বলা শেখাব। বিদায় নেওয়ার সময় টাটা, বাই বাই নয়, খোদা হাফেজ/আল্লাহ হাফেজ বলা শেখাব। বাচ্চারা সবসময় বড়দের অনুসরণ করে অর্থাৎ তারা যখন দেখবে আমরা সালাম বিনিময় করছি, তারাও সালাম বিনিময় শুরু করবে।
সবাইকেই সালাম দেয়া যায়। বোখারী শরীফে আছে, রাসুলুল্লাহ (স:) কে জিজ্ঞেস করা হলো, শান্তির ধর্মে সবচেয়ে উত্তম কাজ কী? তিনি বললেন, মানুষকে আহার করানো এবং পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সকলকে সালাম দেওয়া অর্থাৎ শুধু যে পরিচিত হলে সালাম দেওয়া যাবে এমনটা নয়, পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সবাইকেই সালাম দেওয়া উচিৎ। সব জায়গায়, আমরা সালামের প্রচলন শুরু করতে পারি। সালাম দিয়ে শুরু করলে স্বভাবতই পরিস্থিতি ঠান্ডা থাকবে, শান্তি বিরাজ করবে।
আমরা স্পষ্ট স্বরে আন্তরিকতার সাথে সালাম দেব, আসসালামু আলাইকুম। চিৎকার করে নয়, এমন মাত্রায় সালাম দেব যাতে যাকে দেওয়া হচ্ছে তিনি শুনতে পান। নবীজী (স:) যখন রাতে বাড়ি ফিরতেন, তিনি এমনভাবে সালাম দিতেন যাতে যারা জেগে আছে তারা শুনতে পায়, কিন্তু যারা ঘুমিয়ে আছে, তাদের যেন অসুবিধা না হয়। সালামের ক্ষেত্রে এ নীতি অনুসরণ করলে এবং সালাম বিনিময়ে সর্বক্ষেত্রে আন্তরিক হলে আমাদের জীবন সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT