ধর্ম ও জীবন

আহলে বাইতের মর্যাদা

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০১-২০২০ ইং ০১:০৭:৩৮ | সংবাদটি ১২৬ বার পঠিত

মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেন-‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী। আল্লাহ সব কিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন’ (সূরা হুজরাত : আয়াত-১৩)।
উক্ত আয়াত দ্বারা দিবালোকের ন্যায় প্রমাণিত, মানুষ এক আদমের সন্তান। তবে যে বা যারা মুক্তাকী বা তাকওয়ার অধিকারী তারাই শ্রেষ্ঠ। সেই তাকওয়ার ভিত্তিতে আদম সন্তানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন নবী ও রাসুলগণ। প্রকৃত ও সঠিক তাকওয়ার অনুপম দৃষ্টান্ত হচ্ছেন নবী ও রাসুলগণ। আর সেই নবী ও রাসুলগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন সর্বকালের সকলের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
আল্লাহপাক আমাদের প্রাণের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বোচ্চ বংশে জন্মদান করেছেন। তাঁর বংশই হচ্ছে সর্বোত্তম বংশ। আল্লাহপাক তাঁর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পরিবারবর্গ তথা আহলে বাইতকে পূত-পবিত্র করে রেখেছেন, তাঁদেরকে সর্বোত্তম ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-‘হে আহলে বাইত! আল্লাহ চান তোমাদের থেকে সব পংখিলতা দূর করে তোমাদেরকে পরিপুর্ণরূপে পূত-পবিত্র করতে’ (সূরা আহযাব : আয়াত-৩৩)।
উম্মুল মুমিনিন হযরত উম্মে সালমা (রা.) এর ঘরে রাসুল (সা.) এর উপর যখন উক্ত আয়াত নাজিল হল তখন রাসুল (সা.) হযরত ফাতেমা, হযরত হাসান ও হোসাইন (রা.) কে খবর দিয়ে এনে তাঁর চাদর মোবারক দিয়ে তাদেরকে আবৃত করলেন। অতঃপর হযরত আলী (রা.)-কেও তাঁর পেছন দিকে চাদর দ্বারা আবৃত করলেন। এরপর দোয়া করলেন হে আল্লাহ এরাই আমার আহলে বাইত। এদের থেকে সব পংখিলতা দূর করে পূত-পবিত্র করে দাও। হযরত উম্মে সালমা (রা.) আরজ করলেন, হে আল্লাহর নবী! আমিও তাদের সাথী?
রাসুল (সা.) বললেন, তুমি তো তোমার অবস্থানে ভালই আছ (তিরমিযী ২য় খন্ড : পৃষ্ঠা-২১৯)। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, যখন এই আয়াত নাজিল হল-‘হে রাসূল! আপনি বলে দিন যে, আমি তোমাদের কাছ থেকে বিনিময় চাইনা, তবে কেবল আমার নিকটজনের প্রতি মুহব্বত চাই’ (সূরা শূরা : আয়াত-২৩)। তখন সাহাবাগণ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কারা আপনার নিকটজন! যাঁদের মুহব্বত আমাদের জন্য ওয়াজিব করা হয়েছে? রাসুল (সা.) ইরশাদ করলেন, আলী, ফাতেমা এবং তাদের সন্তানগণ’ (তাবরানী)।
হযরত সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, যখন এ আয়াত নাজিল হল-‘অতঃপর আপনি বলে দিন, আমাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তোমাদের সন্তান সন্ততিকে (মুবাহালার) জন্য ডেকে আনা’ (সূরা আল-ইমরান : আয়াত-৬১)। রাসুল (সা.) হযরত আলী, ফাতেমা, এবং হাসান-হোসাইনকে ডেকে আনলেন। অতঃপর বললেন-‘হে আল্লাহ! এরাই আমার পরিবার-পরিজন’ (মুসলিম, তিরমিজী)।
অগণিত হাদীসে রাসুল (সা.) এর পরিবার-পরিজন তথা আহলে বাইতের সুমহান মর্যাদার কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
আহলে বাইতের সুমহান মর্যাদা বিষয়ক কয়েকখানা হাদীস হচ্ছে : (১) হযরত মিসওয়ার ইবনে মাখরামা (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন-‘ফাতেমা আমার দেহেরই একটি টুকরা, যে তাকে রাগন্বিত করবে সে নিশ্চয়ই আমাকে রাগান্বিত করবে।’ অপর এক বর্ণনায় আছে, ‘আমাকে সে বস্তুই অস্থির করে, যে বস্তু তাকে পেরেশানীতে ফেলে এবং সে জিনিসই আমাকে কষ্ট দেয়, যা তাকে কষ্ট দেয়’ (বুখারী ও মুসলিম)। (২) হযরত বারা (রা.) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.) কে দেখেছি যে, তিনি হাসান ইবনে আলীকে নিজের কাঁধের ওপর রেখে বলতেন, হে আল্লাহ! আমি একে ভালবাসি, তুমিও তাকে ভালবাস’ (বুখারী ও মুসলিম)। (৩) হযরত জায়েদ ইবনে আবকাম (রা.) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, রাসুলে পাক (সা.) হযরত আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন (রা.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘যে কেউ তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে, আমি তাদের শত্রু। পক্ষান্তরে যে তাদের সাথে আপনজনের মত সদ্ব্যবহার করবে, আমি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করব’ (তিরমিজী)। (৪) হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হাসান ও হোসাইন দু’জন যুবক জান্নাতিদের সরকার’ (তিরমিজী ২য় খন্ড : পৃষ্ঠা-২১৭, মিশকাত : পৃষ্ঠা-৫৭০)। (৫) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হাসান এবং হোসাইন এরা দু’জন দুনিয়াতে আমার দু’টি সুগন্ধময় ফুলস্বরূপ’ (তিরমিজী)। (৬) হযরত ইয়ালা ইবনে মুররাহ (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হোসাইন আমার থেকে আর আমি হোসাইন থেকে। যে হোসাইনকে ভালবাসে আল্লাহ তাকে ভালবাসেন। হোসাইন বংশসমূহের মধ্যে একটি বংশ’ (তিরমিজী)। (৭) হযরত আবুযর গিফারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি কা’বা শরীফের দরজায় ধরে বললেন, আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘সাবধান! আমার আহলে বাইত হল তোমাদের জন্য নূহ (আ.) এর নৌকার মত। যে তাতে আরোহণ করবে, সে রক্ষা পাবে। আর যে তা থেকে পিছনে থাকবে, সে ধ্বংস হবে’ (আহমদ)। (৮) হযরত জুমাঈ ইবনে ওমায়ের (রা.) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, ‘একদা আমি আমার ফুফুর সাথে হযরত আয়শা (রা.) এর কাছে গেলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, রাসুল (সা.) এর কাছে কোন মানুষটি সর্বাপেক্ষা প্রিয় ছিলেন? তিনি উত্তরে বললেন, হযরত ফাতেমা। এবার জিজ্ঞেস করা হল, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তাঁর স্বামী’ (তিরমিজী)। (৯) হযরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসুর (সা.) ইরশাদ বলেন, ‘হে লোকসকল! আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। এ দু’টিকে আঁকড়ে ধরলে তোমরা পথভ্রস্ট হবেনা। এ দু’টি হল-আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত। অতঃপর তিনি তিনবার ইরশাদ করলেন-তোমরা কি জানো যে, আমি প্রত্যেক মুমিনের জন্য তার নিজ সত্তার চেয়েও বেশি আপন।
সাহাবাগণ বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর রাসুল (সা.) ইরশাদ করলেন, আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা’ (হাকীম)। হযরত ওমর (রা.) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘প্রত্যেক সন্তানের বংশ নির্ধারিত হয় পিতৃপক্ষ থেকে। তবে ফাতেমার সন্তানগণের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম। কেননা আমিই তাদের জন্য নিকটজন, আমিই তাঁদের পিতৃপুরুষ’ (তাবরানী)। (১১) হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবু লায়লা (রা.) স্বীয় পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার নিজ সত্তার চেয়ে প্রিয় না হই। আর আমার পরিবারবর্গ তার নিজ পরিবারবর্গের চেয়ে প্রিয় না হয়’ (তাবরানী, বায়হাকী)। (১২) হযরত আয়শা (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হে ফাতেমা! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি মুমিন নারীকুলের সরদার হবে অথবা এই উম্মাহর নারীকুলের সরদার হবে’ (বুখারী ও মুসলিম)। (১৩) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, “ফাতেমাকে আলীর সাথে বিবাহ দেয়ার জন্য আল্লাহপাক আমাকে আদেশ করেছেন’ (তাবরানী)। (১৪) হযরত আলী (রা.) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ফাতেমাকে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেন, ‘আমি, তুমি এবং এ দু’জন (হাসান ও হোসাইন) আর এ শায়িত ব্যক্তি (আলী) কিয়ামতের দিন একই স্থানে থাকবো’ (আহমদ)। (১৫) হযরত সলমান ফারসী (রা.) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, হাসান-হোসাইন আমার সন্তান। যে তাদের মুহব্বত করে সে যেন আমাকেই মুহব্বত করে। আর যে আমাকে মুহব্বত করে আল্লাহ তাকে মুহব্বত করেন। আর আল্লাহ যাকে মুহব্বত করেন তাকে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
পক্ষান্তরে হাসান-হোসাইনের প্রতি যে হিংসা পোষণ করে সে যেন আমার প্রতি হিংসা পোষণ করে। আর আমার প্রতি যে হিংসা পোষণ করে, সে যেন আল্লাহর প্রতি হিংসা হ ৬-এর পৃষ্ঠায় দেখুন

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT