ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০১-২০২০ ইং ০১:১১:০৫ | সংবাদটি ২২১ বার পঠিত
Image

মূল : মুফতি মুহাম্মদ শফী
অনুবাদ : মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
সূরা : বাক্বারাহ [পূর্ব প্রকাশের পর]
সকল পয়গম্বরের ধর্ম ইসলাম ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ঐক্যকেই ঐক্যের মানদ- ও কেন্দ্রবিন্দু সাব্যস্ত করেছে এবং কোটি কোটি উপাস্যের উপাসনায় বিভক্ত বিশ্বকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লহর এবাদত ও আনুগত্যের প্রতি আহবান জানিয়েছে। বলাবাহুল্য, একমাত্র এ কেন্দ্রবিন্দুতেই পূর্ব ও পশ্চিম, ভূত ও ভবিষ্যতের মানবম-লী একত্রিত হতে পারে। অতঃপর এ ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের ঐক্যকে বাস্তবে রূপায়ন এবং শক্তিদানের উদ্দেশে তৎসঙ্গে কিছু বাহ্যিক ঐক্যও যোগ করা হয়েছে। কিন্তু এসব বাহ্যিক ঐক্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি নীতির প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে যে, ঐক্যের বিষয়বন্ধ কার্যগত ও ইচ্ছাধীন হতে হবে-যাতে সমগ্র মানবম-লী স্বেচ্ছায় তা অবলম্বন করে ঐক্যসূত্রে গ্রহিত হতে পারে। বংশ, দেশ, ভাষা, বর্ণ প্রভৃতি ঐচ্ছিক বিষয় নয়। যে ব্যক্তি এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে, সে অন্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করতে পারে না। যে ব্যক্তি পাকিস্তানে অথবা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে, সে বিলেতে অথবা অফ্রিকায় জন্মগ্রহণে সক্ষম নয়। যে ব্যক্তি কৃষ্ণকায়, সে যেমন স্বেচ্ছায় শ্বেতকায় হতে পারে না, ঠিক তেমনিভাবে একজন শ্বেতকায় ব্যক্তিও স্বেচ্ছায় কৃষ্ণকায় হতে পারে না।
এমন বিষয়কে ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু সাব্যস্ত করা হলে মানবতা শতধা, এমনকি সহ¯্রধা বিভক্ত হয়ে পড়া অপরিহার্য হয়ে যাবে। এ কারণে সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত এ সব বিষয়কে ইসলাম পরিপূর্ণ সম্মান দান করলেও, মানব ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু হতে দেয়নি। তবে ইসলাম ইচ্ছাধীন বিষয়সমূহে চিন্তাগত ঐক্যের সাথে সাথে কার্যগত ও আকারগত ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রেখেছে। এতেও এমন বিষয়কে ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা স্বেচ্ছায় অবলম্বন করা প্রত্যেক পুরুষ-স্ত্রী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহুরে-গ্রাম্য, ধনী-দরিদ্রের পক্ষে সমান সহজ। কাজেই ইসলামী শরীয়ত সারা বিশ্বের মানুষকে পোশাক, বাসস্থান ও পানাহারের ব্যাপারে কোন এক নিয়মের অধীন করেনি। কারণ, প্রত্যেক দেশের আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কারণে প্রয়োজনাদিও ভিন্ন ভিন্ন। এমতাবস্থায় সবাইকে একই ধরনের পোশাক ও ইউনিফর্মের অধীন করে দিলে নানা অসুবিধা দেখা দেবে। যদি ন্যূনতম কোন ইউনিফর্মেরও অধীন করে দেয়া হয়, তাতেও মানবিক সমতার প্রতি অবিচার করা হবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত উৎকৃষ্ট পোশাক ও বস্ত্রের অবমাননা হবে। পক্ষান্তরে আরও বেশী দামের ইউনিফর্মের অধীন করে দেয়া হলে দরিদ্র ও নিঃস্ব লোকদের পক্ষে অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এ কারণে ইসলামী শরীয়ত মুসলমানদের জন্যে কোন বিশেষ পোশাক বা ইউনিফর্ম নির্দিষ্ট করেনি, বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সব পন্থা ও পোশাক প্রচলিত ছিল, সবগুলো যাচাই করে অপব্যয়, অযথা গর্ব ও বিজাতীয় অনুকরণভিত্তিক পন্থা ও পোশাক-পরিচ্ছদকে নিষিদ্ধ করেছে। অবশিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। এমনি বিষয়াদিকে ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু সাব্যস্ত করা হয়েছে, যা ইচ্ছাধীন সহজলভ্য ও সস্তা। উদাহরণতঃ জামাতের নামাযে কাতারবন্দি হওয়া, ইমামের উঠাবসার পূর্ণ অনুকরণ, হজ্বের সময় পোশাক ও অবস্থানের অভিন্নতা ইত্যাদি।
এমনিভাবে কেবলার ঐক্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহর পবিত্র সত্তা যদিও যাবতীয় দিকের বন্ধন থেকে মুক্ত তার জন্য সবদিকই সমান, তথাপি নামাযে সমষ্টিগত ঐক্য সৃষ্টি করার উদ্দেশে বিশ্ববাসীর মুখম-ল একই দিকে নিবন্ধ থাকা একটি উত্তম, সহজ ও স্বাভাবিক ঐক্য পদ্ধতি। এতে পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণের সমগ্র মানবম-লী সহজেই একত্রিত হতে পারে। এখন সমগ্র বিশ্বের মুখ করার দিক কোনটি হবে এর মীমাংসা মানুষের হাতে ছেড়ে দিলে তাও বিরাট মতানৈক্য এবং কলহের কারণ হয়ে যাবে। একারণে এর মীমাংসা আল্লাহর পক্ষ থেকে হওয়াই বিধেয়। হযরত আদম আলাইহিস সালামের পৃথিবীতে অবতরণের পূর্বেই ফেরেশতাদের দ্বারা কা’বা গৃহের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল। আদম ও আদম-সন্তানদের জন্যে সর্বপ্রথম কেবলা কাবাগৃহকেই সাব্যস্ত করা হয়। বলা হয়েছে মানুষের জন্যে সর্বপ্রথম যে গৃহ নির্মিত হয়, তা মক্কায় অবস্থিত এবং এ গৃহ বিশ্ববাসীর জন্যে হেদায়েত ও বরকতের উৎস।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT