পাঁচ মিশালী পিছন ফিরে দেখা

চলতি পথের সরস বচন

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০১-২০২০ ইং ০০:৩০:৫১ | সংবাদটি ১৮৯ বার পঠিত

(১)
চৈত্রের রোদেলা দুপুর। বন্দরবাজারের জনাকীর্ণ ফুটপাত। একদিক থেকে হেঁটে আসছেন সুঠামদেহী ছ’ফুট লম্বা একজন ভদ্রলোক। অপরদিকে আসছেন টেনেটুনে পাঁচ ফুট উচ্চতার আরেকজন। ঘামঝরা দুপুরে খাটো বনাম লম্বায় মুখোমুখি ধাক্কা। লম্বার হাঁটু খাটো ভদ্রলোকের তলপেটে লেগেছে। ব্যথা পেয়েছেন। কলিশনের সাথে সাথে লম্বা লোকটি নিচে তাকিয়ে লাল চোখে বললেন ঃ ‘অই মিয়া চোখে দেখনা?’ খাটো মাথা তুলে উপরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ও ভাই প্রশ্নটাতো আমিও করতে পারি।’
(২)
মেয়েটির বয়স সাড়ে তিন বছর। তাকে স্কুলে ভর্তির প্রসঙ্গ ঘরে ঘনঘন আলাপ চলছে। মেহমান, আত্মীয় স্বজন এলেই আলাপ হয় কোথায়, কোন স্কুলে ভর্তি করা হবে। মেয়েটি শুনেছে তাকে যেকোনো কে.জি স্কুলে ভর্তি করা হবে। একদিন সে খুব আগ্রহী হয়ে মা’কে প্রশ্ন করছে ঃ আম্মা, আমাকে কয় কে.জি স্কুলে ভর্তি করবেন?
(৩)
৫ মে ২০০০ খ্রীঃ। মাস খানেক থেকে চাউর হয়ে গেছে যে ঐদিন মহাপ্রলয় ঘটবে। দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার খবরে সবাই আলোড়িত। ঘরে ঘরে, ট্রেনে-বাসে, হাটে-বাজারে, স্কুল-কলেজে, অফিস-আদালতে চলছে জল্পনা কল্পনা। এমনি পরিবেশে ৪ মে বৃহস্পতিবার দিনগত রাত সাড়ে দশটা। ফুটপাতে কলা বিক্রেতার সামনে দাঁড়িয়ে একজন ক্রেতা ঃ
- মাত্রতো চাইর আলি কলা। দেও দেও দশ টাকাই নেও।
- না সাব অইব না।
- দেওনা দেও দেও। কাইল দুনিয়া থাকব কি না ঠিক নাই। জমাইয়া রাখিও না। বেচিয়া বাড়িত যাও।
- না সাব, থাকলে থাকুক। কিয়ামত হইগেলেও কাজে লাগবো।
- কও কি?
- ঠিকই কই সাব। আমার তো ঐ কামই করতে হইব। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও যে, বারা বানে।
(৪)
৪ মে ২০০০ বৃহস্পতিবার দুপুর। একজন উচ্চবিত্ত ও একজন মধ্যবিত্ত ব্যক্তির মধ্যে টেলিফোন আলাপ ঃ
ঃ হ্যালো-কে বলছেন? ওহ, আপনি, তা কি মনে করে আজ ...
ঃ না অমনিতেই। মনে পড়লো, তাই ফোন। বলা যায় নাতো কাল কি থেকে কি হয়। কেয়ামত নাকি হচ্ছে কাল!
ঃ ভয় হচ্ছে? পত্র-পত্রিকাতো লিখছে এসব ভুয়া। ঘাবড়ান কেন? মরলে তো এক সাথেই মরবো।
ঃ না ভাই, যতই লিখুক ভয় হয় যে! আখেরাতের জন্য তো কোনো সামানই হাতে নেই।
ঃ তা এক কাজ করতে পারেন। আপনার তো শহরে তিনটি বাড়ি, দুটি দোকান এবং গাড়ি আছে। এগুলো আজই আমার নামে দান করে দিন। পরশু আখেরাতে ‘একে সত্তর গুণ’ হাতে হাতে পেয়ে যাচ্ছেন।
ঃ ও, না তা, ও ...
(৫)
আট বছরের রূপা। এসেছে মামার বাড়ি। ড্রেসিং টেবিলের ফুলসাইজ স্বচ্ছ লুকিং গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে এক মনে দেখছে নিজেকে। একা কক্ষে সে বিচিত্র মুখভঙ্গি করছে আর দেখছে। হা করে, ঘাড় বেঁকিয়ে, বারবার তাকাচ্ছে। হঠাৎ রূপার ভয়ার্ত চিৎকার। আম্মা, আম্মা আর বাঁচবো না গো বাঁচবো না। ঘরের সবাই ছুটে এলেন। সে তখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে একই সুরে কাঁদছে। কেউ বলেন মোল্লা মেছাব ডাকো। কেউ বলেন ডাক্তার আন। হৈ চৈ কান্ড। একজন জানতে চাইলেন, মরবে কে বলছে তোকে? সে বলে, আমি দেখছি। দেখছি আমার গলায় গর্ত হয়ে গেছে। গলায় তো গর্ত দেখছি না আমরা। তুই কোথায় দেখলি? এই তো আয়নায় দেখেছি। সকলের ঠেলা ধাক্কায় সে এবার গিয়ে দাঁড়ায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে। যথাসম্ভব বড় হা করে দাঁড়াতেই সবাই এক সাথে হো হো করে হেসে উঠলেন। এটা তো সকলেরই আছে। রূপা এবার হতবাক।
(৬)
অজ পাড়াগাঁ থেকে শহরে ভাইর বাসায় বেড়াতে এসেছেন সহজ সরল মহিলা। একটি তিন কামরার বাসায় দমবন্ধ হয়ে আসছে। প্রতিবেশীর বাসায় এসেছেন একটু হাঁফ ছাড়বেন। ঝকমকে মোজাইক মেঝে সবকিছু গুছিয়ে চমৎকার সাজানো হাঁটছেন দেখছেন। গৃহকর্ত্রী নাশতার জন্য গেছেন কিচেনে। হঠাৎ আগন্তুক মহিলার সভয় চিৎকার। ‘ভাবী আসেন, তাড়াতাড়ি আসেন। আপনার ঐ আলমারিতে পোকা ঢুকেছে, পোকা। খালি ফর ফর করছে।’ গৃহকর্ত্রী ছুটে এলেন। কই, কই পোকা? মহিলা তখন হাত বাড়িয়ে অঙ্গুলি তুলে দেখিয়ে দিলেন-‘ফ্রিজ’ তাঁর ভাষায় আলমারি। আসল কথা-ফ্রিজ হঠাৎ করে স্বাভাবিকভাবেই অটো থেকে স্টার্ট নিয়েছে। ঐ শব্দ শুনে তাঁর মনে হয়েছে পোকার পাখা ঝাপটানোর ফর ফর শব্দ।
(৭)
সামির চঞ্চল কিশোর। বয়স আট। চিকেনপক্স হয়েছে, সাথে প্রচন্ড জ্বর। চাকরিজীবী মা-বাবা অফিসে। ঘরে মন খারাপ করে বিছানায় কষ্টদায়ক বাঁকা ভঙ্গিতে শরীর এলিয়ে পড়ে আছে। তাকে দেখতে এসেছেন গৃহশিক্ষক মৌলবী। হুজুরকে সে খুব শ্রদ্ধা করে। হুজুর বললেন, এভাবে শুয়েছ কেন, কষ্ট হবে তো। তিনি তাকে শুইয়ে দিলেন উত্তর-দক্ষিণ করে। বলে গেলেন আল্লা আল্লা কর। হুজুর চলে গেলেন। সামির এবার নীরবে কান্না শুরু করলো। কথা নেই, খাবারও বন্ধ। বাসা থেকে ঝি মা-বাবাকে ফোনে অবস্থা জানালো। সবাই উদ্বিগ্ন-কি হল। ছুটে গেলেন মা-বাবা। মা’কে জড়িয়ে সে কি আকুল কান্না সামিরের। কিন্তু এত কাঁদছে কেন? অনেক ব্যাকুল জিজ্ঞাসার মুখে তাঁর কান্না মিশ্রিত কণ্ঠের জবাব ঃ আম্মা আমি তো মরে যাব। মানুষ মরতে যেমন করে, হুজুর তেমনি আমাকে ‘উত্তর শিরানা’ করে রেখে গেছেন। হাফ ছেড়ে বাঁচলেন মা-বাবা।
(৮)
মেয়েটি কালো। কুচকুচে কালো। বয়স ১৩ থেকে ১৪ বছর। সারা জীবনই সে শুনে আসছে যে সে কালো। হঠাৎ একদিন বয়স্ক এক ভদ্রলোক বললেন-বাহ হালিমা, আজতো তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।’ উৎফুল্ল হালিমার তাৎক্ষণিক জবাব ‘চাচা, তবুও তো আমি আজ তেল মাখিনি।’
(৯)
নাম গুটিমাল। চা বাগানে জন্ম। সরকারি এক অফিসের মালী সে। অফিস সময়ের পর একদিন হঠাৎ এসে ঢুকলো অফিস চত্বরে। চৌকিদার এবং শিফটকর্মীরা জানতে চাইছেন, কেন সে এসেছে! গুটিমালের মুখে তখন দুর্বোধ্য প্রলাপ। ছুটাছুটি করে কুড়িয়ে হাতে নিল একখন্ড চেলিকাঠ। একে তাড়া করে, তাকে ধমকায়। দৌড়াদৌড়ি অফিস চত্বরে। বড়কর্তা এসে ঢুকলেন। গেট থেকে দেখলেন হুলস্থূল। গুটিমালকে ডেকে জিজ্ঞাসা করতেই চেলিকাঠ উচিয়ে তেড়ে এলো তার দিকে। পড়িমরি করে তিনি এসে নিজ কক্ষে দরজা লক করলেন। পরদিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির করা হলো বড়কর্তার কক্ষে। নতমুখে সে বললো ঃ সাড় (ঝরৎ) আমি দেখলাম সবাই আমাকে মারতে আসছে। তাই জান বাঁচানোর জন্য লাঠি নেই। কাউকে মারতে নয়। সবাই বুঝলেন বাংলা মদের কাজ।
(১০)
সাপ্তাহিক জালালাবাদের অফিস। সন্ধ্যার পর টেবিল ঘিরে জমজমাট আড্ডা। কারেন্ট নেই। মাঝখানে টিমটিম জ্বলছে মোমবাতি। হঠাৎ একজন সদস্য বললেন, ভীষণ গরম। ফ্যানটা ছাড়ুন তো। উদ্বিগ্ন আরেক সদস্যের তড়িঘড়ি বারণ ঃ না, না ফ্যান ছাড়বেন না। মোমবাতি নিভে যাবে যে! আসলে তখনো কারেন্টই নেই। তাই অন্য সদস্যদের মুখে ফুটে উঠলো সশব্দ হাসি।
(১১)
সহজ সরল মণিপুরি দক্ষ ড্রাইভার। গাড়ি চালাচ্ছে। রাস্তার মাঝখানে শুয়ে বিশাল একটি ষাঁড় জাবর কাটছে। তীব্র হর্নের পরও ষাঁড় অনড়। এবার রাগ করে ড্রাইভার নামলো। এই হালার হালা গরু উথ্।’ তবু উঠে না। এবার একটি থাপ্পড়। ড্রাইভারের মুখে গালি-উথ্, হালার হালা গরু। কথা শুনেনা। এমনে নি মে তোমারে মুসলমানে জবো করি খায়!

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT