পাঁচ মিশালী

কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ

ইসলাম জাভেদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০১-২০২০ ইং ০০:৩১:৩৪ | সংবাদটি ১৪৩ বার পঠিত

সমকালীন কথা সাহিত্যিকদের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তাঁকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হিসাবে গণ্য করা হয়। উপন্যাস হচ্ছে এক ধরনের সৃষ্টিশীল রচনা। উপন্যাস সম্পূর্ণ আধুনিককালের সৃষ্টি। মানুষের জীবনই হচ্ছে এর উৎস। মানুষের জীবনে যেসব ঘটনা ঘটে তার সঙ্গে লেখকের নিজের ভাবনার কল্পনাকে মিশ্রিত করে তৈরি করেন উপন্যাস। তাই একজন লেখকের জীবনাভূতির প্রকাশ ঘটে তার সাহিত্য কর্মে। কেউ কেউ মনে করেন ‘সুনির্দিষ্ট আয়তনের গদ্য কাহিনীই হচ্ছে উপন্যাস।’ উপন্যাসের গদ্য কাহিনী ও মানুষের জীবন চিত্র নির্মাণের দিক থেকে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এক অনন্য স্রষ্টা। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে রচনা করেন উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, চলচ্চিত্র ও গান।
নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি ছিলেন সমাদৃত। বাংলা কথা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত দাপটের সাথে বিচরণ করেছেন। তার উপন্যাস একের পর এক প্রকাশিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেছিল। তিনি লেখালেখি শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্র থাকাকালীন সময়ে একটি উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য জীবনের শুরু। তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ ১৯৭২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হওয়ার পর অধ্যাপক ডঃ আহমদ শরীফ তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘হুমায়ুন আহমেদ বয়সে তরুণ। মনে প্রাচীন দ্রষ্টা, মেজাজে জীবন রসিক, স্বভাবে রূপদর্শী, যোগ্যতায় দক্ষ রূপকার, ভবিষ্যতে তিনি বিশিষ্ট জীবন শিল্পী হবেন, এই বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করব।’ আহমেদ শরীফের সেই কাক্সিক্ষত প্রত্যাশাকে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সাহিত্য কর্মে ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। নন্দিত নরকে লেখার পর তিনি আর থামেন নি, খুব দ্রুত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপক হিসাবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। কিন্তু লেখালেখির সুবিধার্থে তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। এই জনপ্রিয় লেখকের সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্ম তার বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের অন্যতম মাপকাঠি। হুমায়ূন আহমদের ধ্যান-চেতনায় ছিল পাঠক উপযোগী সাহিত্য রচনা সৃষ্টি করা। তিনি নিজস্ব চিন্তা-চেতনায় সাহিত্যের উপাদান ও রসদ আস্বাদন করেছেন। দেশজ উপাদানে, চরিত্র সৃষ্টিতে তার স্বকীয়তা ছিল অনস্বীকার্য। ঔপন্যাসিক হিসাবে হুমায়ূন আহমেদ বিশেষ সফলতা অর্জন করেছিলেন। তার গল্পগুলি পড়তে গেলে কখনো পাঠকদের ধৈর্য্যচ্যুতি হয় না। পাঠকদের মনে বিরক্তি দানা বাঁধার আগেই তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলে নেন। তিনি ছিলেন উপন্যাস সাহিত্যে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। তাঁর অমর সৃষ্টি মিসির আলী ও হিমু চরিত্র বাংলাদেশের যুবক শ্রেণিকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছিল। বাংলা কথা সাহিত্যে তিনি সংলাপ প্রধান নতুন শৈলীর জনক। তাঁর বর্ণনায় ভঙ্গিমায়, সহজ সরল শব্দের বাক্য ব্যবহারের নিপুণতায়, শহর ও গ্রামীণ চরিত্র নির্মাণের স্বাতন্ত্র্যবোধে একজন হুমায়ূন আজ বাংলা কথা সাহিত্যের এক মহান সম্রাটের আসনে অধিষ্টিত। তাঁর উপন্যাস ও গল্পগুলোতে যে জীবনের সন্ধান পাই তা লঘু, সরল-সহজ যা আমাদের মুগ্ধ করে। উপন্যাসিক হিসাবেই তিনি বেশি সফলতা অর্জন করেছিলেন। হুমায়ূন আহমদের সাহিত্যকর্ম অনন্য সুলভ মৌলিকতার উপরই প্রতিষ্ঠিত। তিনি তাঁর লেখাগুলোকে নতুনভাবের উত্তেজনায় নবজীবনের সম্ভাবনা ঘটিয়ে গতিময়তা দান করেছেন। যা পাঠকদের এক জাদুকরী মন্ত্রের স্পর্শে মাতিয়ে তুলেছিলেন। বাংলা সাহিত্যে যা ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত।
হুমায়ূন আহমেদ লেখক হিসাবে নতুন লেখনি শক্তিতে, সৌন্দর্যের কল্পলোক সৃষ্টিতে, যুক্তিবাদী চরিত্র সৃষ্টিতে এক অভিনবত্ব ও অসাধারণ নিপূণতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর সৃষ্টি শক্তি এতই প্রখর ছিল যে, তিনি পুরাতন সীমারেখাকে ভেঙ্গে তছ-নছ করে নতুন এক আশ্চর্য লিখনীভঙ্গি তৈরি করেন। যার দ্বারা তিনি পাঠকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কথা সাহিত্যকে নতুন আকারে, সরল-সহজ ভাষায় নতুন পথে পরিচালিত করার কৃতিত্ব একমাত্র হুমায়ূন আহমেদ দেখিয়েছেন। তাইতো আমরা দেখি তিনি ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। অল্প দিনেই তার লেখনীয় সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন। মাত্রাতিরিক্ত জনপ্রিয়তায় পাঠকদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি। অল্প শিক্ষিত থেকে বুদ্ধিজীবি, কিশোর-যুবক, তরুণ-তরুণী, পৌঢ়-বৃদ্ধ, সকলই তার উপন্যাসের আগ্রহী পাঠক ও নাটকের দর্শক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ প্রায়- দুই শতাধিক। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, দেয়াল, মধ্যাহ্ন, এইসব দিনরাত্রি, দূরে কোথাও, সৌরভ, ফেরা, কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, আমার আছে জল, নিশীহিনী, বাসর, ময়ূরাক্ষী, জোছনা ও জননীর গল্প ইত্যাদি।
শিশু কিশোরদের জন্য তিনি গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য তাঁর প্রথম লেখা- ‘নীল হাতি’। শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি রহস্য উপন্যাস, ছোট গল্প, ভূতের গল্প লিখেছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা গল্প উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- বোতল ভূত, সূর্যের দিন, পুতুল, অন্যভূবন, গোবর বাবু, নিউটনের ভুল সূত্র, নিমধ্যমা, বোকা দ্বৈত্য, হলুদ পরী, আকাশ পরী, নোহাশ এবং আলাদীনের আশ্চর্য চেরাগ ইত্যাদি।
হুমায়ূন আহমেদ একজন জনপ্রিয় নাট্যকার। ৮০-এর দশকে তিনি নাটক রচনা শুরু করেন। টেলিভিশনে নাটক প্রচারের পর তিনি আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর কাহিনীর নাট্যরূপায়নে দর্শকরা বিমুগ্ধ হয়ে উঠেন। নাটকের মাধ্যমে তিনি সব ধরনের দর্শকদের হাস্যরসাত্মক বিনোদনে আকৃষ্ট করেছিলেন। তাই তো দেখি বাকের ভাইর জন্য রাস্তায় রাস্তায় মিছিল হয়। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে তার জনপ্রিয় সংলাপ- ‘তুই রাজাকার’।
হুমায়ূন আহমেদের লেখা অন্যতম নাটকগুলো হল- বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই, এইসব দিনরাত্রি, নক্ষত্রের রাত, অয়োময়, আজ রবিবার, তারা তিনজন, নিমফুল, আমরা তিন জন ইত্যাদি নাটকগুলি বেশির ভাগই ৮০ থেকে ৯০ এর দশকে নির্মিত। আরো অসংখ্য প্যাকেজ নাটক তিনি নির্মাণ করেছেন। নাটকগুলি তাঁকে আরো বেশি জনপ্রিয় করে তুলে।
চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর নির্মিত চচ্চিত্র সমূহ পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা। টেলিভিশনের জন্য একের পর এক দর্শক নন্দিত নাটক রচনার পর হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯০-এর গোড়ায় দিকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। তাঁর চলচ্চিত্রগুলি প্রথম শ্রেণির দর্শকদের কাছে দারুণ গ্রহণযোগ্যতা পায়। হুমায়ূন আহমেদের নির্মিত কয়েকটি চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- আগুনের পরশমনি, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, শ্যামল ছায়া, হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় সর্বশেষ ছবি- ‘ঘেটুপুত্র কমলা।’
হুমায়ূন গীতিকার হিসাবেও ছিলেন বেশ জনপ্রিয়, তার নির্মিত ছবিগুলোর বেশির ভাগ গান তিনি নিজে রচনা করেন এবং সুরও দেন।
এছাড়া হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র। মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত ‘দূরত্ব’, বেলাল আহমেদ পরিচালিত ‘নন্দিত নরকে’, আবু-সাঈদ পরিচালিত ‘নিরন্তর’, শাহ আলম কিরণ পরিচালিত- ‘সাজঘর’, তৌকির আহমেদ পরিচালিত- ‘দারু চিনি দ্বীপ’ ইত্যাদি।
তাই বলা যায় হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্যের যে শাখাতেই হাত দিয়েছেন সেই শাখাতেই ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। এসব কিছু সম্ভব হয়েছে তাঁর প্রখর মেধা ও প্রতিভার প্রাচুর্য থেকে। তিনি মানুষের হৃদয়ে চিরকালীন শ্রদ্ধায় আসন লাভ করেছেন। বাংলা কথা সাহিত্যে নতুন শৈলীর জনক হুমায়ূন আহমেদ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীরও পথিকৃৎ। তাঁর বহুমুখী সৃষ্টিকর্মের জন্য তিনি নানা পুরস্কারে ভূষিত হন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮১), একুশের পদক (১৯৯৪), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৪), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), মাইকেল মধুসুদন পদক (১৯৮৭), হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), জয়নুল আবেদিন স্বর্ণপদক ইত্যাদি।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার সময় তাঁর দেহে মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। অস্ত্রোপাচারের পর তাঁর কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও শেষ মুহূর্তে শরীরে অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করায় তাঁর অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কৃত্রিমভাবে লাইফ সাপোর্টে রাখার পর ১৯ জুলাই ২০১২ তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে গাজীপুরের তাঁর প্রিয় নূহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়। এই কিংবদন্তী কথা শিল্পীর মৃতুতে বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে যে শূন্যতা দেখা দিয়েছে তা কখনো পূরণ হবার নয়। তাই এই বরেণ্য কথা শিল্পীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। সাথে সাথে তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT