পাঁচ মিশালী

বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে

উর্দু থেকে অনুবাদ : সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০১-২০২০ ইং ০০:৩২:১৪ | সংবাদটি ৩৫১ বার পঠিত

আজ যখন ঘুরে নিজের অতীতে দৃষ্টিপাত করি, তখন আশ্চর্য হই যে, এত দীর্ঘ সময় চোখের পলকে চলে গেলো! দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের শুরু এবং শেষ মনে হচ্ছে গতকালের কথা। পাকিস্তান আন্দোলন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা এবং খুব দ্রুত অতিবাহিত ঘটনা প্রবাহ মনে হচ্ছে গতরাতের স্বপ্ন। পূর্ব পাকিস্তানের পৃথক হওয়া মনে হচ্ছে কয়েক মুহূর্ত আগের ঘটনা। কায়দে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাকে কখনও সরাসরি দেখিনি, তবে তাঁর পরের নেতাদের অনেকের সাথেই সম্পর্ক ছিলো। কারো কারো প্রভাবও ছিলো আমার ওপর। যারমধ্যে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পূর্ব পাকিস্তানের এক সময়ের গভর্নর আজম খানের কথা প্রায়ই স্মরণ হয়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের বিজেতা সংযুক্ত বাংলার এবং পরবর্তীতে অল-পাাকিস্তনের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, যাঁর জ্ঞান এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছে। যাঁর জন্য মানুষ আহাজারি এবং আফসোস করে। রাজনীতি ও জ্ঞানের দিকে এই রকমের উঁচু মাপের ব্যক্তিদের অবস্থান বর্তমানে খুব একটা চোখে ভাসে না। খাজা নাজিম উদ্দিন, মুহাম্মদ আলী বগুড়া, চৌধুরী মুহাম্মদ বগুড়া, চৌধুরী মুহাম্মদ আলী, মালিক ফিরুজ খান নুন, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, বাবা-এ উর্দূ মাওলানা জাফর আলী খান, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, কাজী নজরুল ইসলাম, মাদার-এ মিল্লাত ফাতেমা জিন্নাহ, জিএম সাইদ, শেখ মুজিবুর রহমান-এই কিছু নামগুলো লিখতে কলম থেকে কালি শেষ হয়ে যায়। তাঁরা সবাই উঁচুপর্যায়ের মানুষ ছিলেন। নিজ নিজ জায়গায় চন্দ্র-সূর্য ছিলেন। মাঝেমধ্যে ভাবিত হই, সত্যি কি এমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক আমাদের এই অঞ্চলে চলাফেরা করেছেন, বিভিন্ন ঐতিহাসিক বইয়ে যাঁদের কথা রয়েছে?
বর্তমান প্রজন্ম ভাগ্যবান যে, তারা কাজের ব্যস্ততায় তাদের নেতাদের দেখার সুযোগ পায় না। আল্লাহ ভালো জানেন এমন কী কারণ, যে জাতি নিজের দৃঢ়তায় হাজার হাজার সূর্যকে অতিবাহিত করেছে, বর্তমানে তাদের আকাশে কিছু মিটিমিটি তারা ছাড়া কিছু নেই। বর্তমানে আমরা কতটুকু স্বাধীন ও সার্বভৌমত্বশীল, তা অনুমান করা যাবে ‘আইএমএফ’ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করলেই।
আমার বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। কোনো শহরে তাঁর এক থেকে দেড় বছরের বেশি থাকা সম্ভব হয়নি। লাহোর এবং করাচি এমন দুই শহর যেখানে থাকার পরিমাণ একটু বেশি। ঢাকা আমার স্বপ্নের শহর। আর এই শহরে আমি বিভিন্ন কারণে স্বপ্নের মতো দিন কাটিয়েছি। এখনও আমি ঢাকায় গেলে সেই কারণসমূহ এসে উপস্থিত হয়। অতীতের ভালো-মন্দ সময় ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় এখনও এসে মনের পৃথিবীকে ওলট-পালট করে দেয়। পরিচিত মানুষের চলাফেরা, কথাবার্তা, হাসি-কান্না-রাগ সবকিছু নিজস্ব নিয়মে ছবির মতো ভাসতে থাকে। মন চায় সেগুলো কল্পনার মতো বাস্তবে আজীবন দেখতে। বছরের বেশিরভাগ সময় সাধারণত এই কষ্টগুলো মনে পড়ে, তবু মন চায় এই শহরে সময়টা ভালোভাবে কাটাই।
২৫ বছর কম কথা নয়। এই সময়ে পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠালগ্ন আমি নিজ চোখে দেখেছি এবং অনুভব করেছি। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের পরের সময়গুলো এতই দ্রুত গিয়েছে যে, মনে হতো সমস্ত দেশই নিউজ রোম হয়ে আছে। প্রত্যেকটি সময় গর্জন ও বিস্ময়কর হয়ে থাকতো। প্রথম সামরিক আইনের সময় মিছিল, মিটিং, অগ্নিকান্ড, লুঠ, কারফিউ ইত্যাদি জীবন অতিষ্ট করা বিষয়াদি আমি লাহোরে খুব কাছে থেকে দেখেছি। অতঃপর আসে সেনাবাহিনী এবং দু’ঘন্টার মধ্যে সবকিছু শান্ত করে দেয়। সামরিক শাসনের ভয়বহ রূপ আমি এই প্রথম দেখি, যা ছিলো আমার কর্মজীবনের শুরুর দিকের ঘটনা।
আমি একশ পনেরো রুপি মাসিক বেতনে দৈনিক জমিনদার পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করি। তবু তা আমার জন্য আনন্দের ছিলো। বর্তমান রুপির মান অনুযায়ী এই একশ পনেরো রুপি অনুমানিক সাত হাজার রুপি হবে। বেতন মাঝেমধ্যে বাকি থাকতো, তবু জীবন কঠিন ছিলো না। সাংবাদিকতা শুধু টাকা উপার্জন নয়, এর অন্য এক উদ্দেশ্য রয়েছে। তখন অর্থ না থাকলেও সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের অন্যরকম সম্মান ছিলো। তখন এই চাকুরী সহজে পাওয়া যেতো না। বর্তমানে বিষয়টি অন্য রকম হয়ে গেছে। সাংবাদিকের চাকুরী এখন খুব সহজে লাভ হয় এবং তা অনেকেরই শক্তির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সম্মান ও আদর্শ এই রাস্তায় এমনই কঠিন, যেমন অতীতে এই লাইনে চাকুরি পাওয়া ছিলো কঠিন।
রাজনৈতিক অধঃপতনের ধারা তো পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই শুরু হয়ে গিয়েছিলো। তবুও সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতিকদের অনেক ইজ্জত ছিলো। রাজনৈতিক কর্মী বা নেতাদের সম্মান কারো অনুদান নয়, তা প্রত্যেকের কর্মের ফল। কায়দে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সমস্ত উপমহাদেশে শুধু উপমা দেওয়ার মতো নেতাই ছিলেন না, বরং নেতাদের নেতাও ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় যারা নেতা ছিলেন তারাও কম ছিলেন না। মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা হাসরাত মোহনী, মাওলানা জাফর আলী খান এবং শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ এমন লোক ছিলেন, যাঁদের পায়ের সমতুল্য কোন নেতা বা ব্যক্তিত্ব আজ খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার এমন লোকও খুঁজে পাওয়া যায় না, যারা এদেরকে নিজেদের আদর্শ মনে করে। বর্তমান থেকে অতীত অনেক ভালো ছিলো এবং মানুষের সামনে বেঁচে থাকার অনেক পন্থা ছিলো। যে রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, কবি এবং সামাজিক ব্যক্তিত্বের সাথে মিশেছি, অনেক কাছ থেকে দেখেছি, কথা বলেছি কিংবা যারা আমাকে তাদের গুণ দিয়ে প্রভাবিত করেছেন, তাদেরকে হাতে গোণা যাবে না। তাদের নিয়ে ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন। আমি চেষ্টা করেছি প্রত্যেকের অবস্থানুসারে তাদের নিয়ে লেখার। তবুও যদি কেউ বাকি থাকেন, যাদের কথা বলিনি, তবে ক্ষমা প্রার্থী। আমি বিশ^াস করি তাদের নাম ইতিহাসের পাতায় নৃত্যের মতো ঝমঝম করবে।
সাংবাদিকতায় মাওলানা জাফর আলী খান, আমার মা-বাবা, আব্দুল মজিদ সালিক, মাওলানা গোলাম রাসুল মহর, হামিদ নিজামী, পীর আলী মুহাম্মদ রাশদি, আজমল খটক, শরিফ ফারুক, শায়েখ মুহাম্মদ সফর, ইকবাল জুবেরি, শহিদ জহিরুল আলম, ইউসুফ সিদ্দিকি, বাশিরুল ইসলাম উসমানি, আল্লামা হোসাইন মীর কাশ্মীরি, রফিক যাবেদি প্রমুখের কাছ থেকে আমি অনেক শিখেছি। সাংবাদিকতায় আল্লামা কাবিল গিলাউটি আমাকে অনেক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। আমি তাদের কাছ থেকে সংবাদের অনুবাদ এবং গঠনপ্রণালী শিখেছি। আমার জীবনে আল্লাহ জানেন তিনি এমন কত শিক্ষা দিয়েছেন, যা আমাকে গন্তব্যে পৌঁছতে সাহায্য করেছে। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের শহর সৈয়দপুরের এক ক্যাম্পে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। আমার এমন অনেক সাথী রয়েছেন, যারা বর্তমানে এই পৃথিবীতে নেই। ওদের কথা স্মরণ হলে কষ্টে মনে আগুন লেগে যায়। তাদের চেহারা সারিবদ্ধ হয়ে আমার সামনে আসতে থাকে। আমি তখন হয়রান হয়ে যাই। দৈনিক জমিনদার দিয়ে যে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম, তা ব্যবস্থাপনা, শয়ানপক্ষী, শঙ্খ, নির্মাণ, কর্তব্যপরায়ণের মাধ্যমে হওয়া দৈনিক ইমরোজ-এ এসে শেষ হয়। কিছুদিন সম্পর্ক ছিলো মুস্তাক আহমদ খানের ‘আকরাম’, মাওলানা কাওসার নিয়াজির ‘শাহাব’ এবং মাওলানা নসরুল্লাহ খান আজিজের ‘এশিয়া’র সাথে। সাপ্তাহিক নেদা, নেদা-এ খেলাফত, সাপ্তাহিক আইন ইত্যাদি পত্রিকায় দীর্ঘদিন লেখালেখি করেছি। লিখেছি ‘নওয়া-এ ওয়াক্ত’, ‘ফ্যামেলি’ ও বাংলাদেশের দৈনিক ইত্তেফাকেও ।
আমার সাংবাদিকতার শুরু নিজের পৈত্রিক শহর ‘গিয়া’-তে আনোয়ারুল উলূমে ছাত্র থাকা অবস্থায়। শিক্ষকরা আমার প্রতি খুব স্নেহশীল ছিলেন। আনোয়ারুল উলূমে তিন ক্লাস পড়ে লাহোরের আঞ্জুমানে হেমায়তে ইসলামে ভর্তি হই। সেখানে উর্দু প্রথম থেকে চতুর্থ কিতাব এবং ফার্সী গুলিস্তা-বোস্তা ইত্যাদি কিতাবসমূহ অর্থসহ পড়েছি। অবস্থা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, কোরআনের নাজেরা পড়ার পর সনেট কবিতাও লিখতে শুরু করি। সিলেবাসের বাইরে অনেক আউট বই পড়তে শুরু করি। বিশেষ করে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মাওলানা সৈয়দ সোলাইমান নদভীকে পড়া হয়ে গিয়েছিলো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব সহজ মনে হতো না। দখনের মাদরাসায়ে ওয়াসতানিয়া থেকে মডেল পাশ করি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরিবারের সাথে লাহোরে চলে আসি এবং ইসলামিয়া হাইস্কুলে (বর্তমানে তা কলেজ) ভর্তি হই। স্কুলের প্রিন্সিপাল প্রফেসর চৌধুরী রহমতুল্লাহর সাথে শিক্ষা সফর করি এবং তাঁর পরামর্শক্রমে সাংবাদিকতার পেশায় যোগ দেই। তবে বিষয়ভিত্তিক লেখালেখি পঞ্চম শ্রেণীতে থাকতেই শুরু করেছিলাম। আমার প্রথম লেখা পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে পটনার ‘দৈনিক সদা-এ আম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পত্রিকার সম্পাদক তখন এ বিষয়ে আরও লেখার জন্য পত্রমাধ্যমে অনুরোধ করেন। চিঠির খামে আমার নামের সাথে মিস্টার লেখা থাকায় আমি বেশ উৎফুল্ল হই এবং বাড়িতে আমি সবার কাছে দীর্ঘদিন ‘মিস্টার’ বলে তামাশার পাত্র থাকি। যখন জীবনের শেষ প্রন্তে এসে দাঁড়িয়েছি, তখন স্পষ্ট দেখছি আমার জীবনে মাদরাসায়ে নুরুল উলূম এবং মাদরাসায়ে আসতানিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, যারা আমার মধ্যে শুধু জ্ঞান অর্জনের উৎসাহ তৈরি করেননি, বরং চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজনীয়তা আমার মধ্যে এমনভাবে সৃষ্টি করে ছিলেন, যা কর্মজীবনে আমার কাছে কষ্টিপাথরের মতো প্রমাণিত হয়েছে। লেখক মানেই আমার পছন্দের মানুষ, তবে আল্লামা শিবলি নোমানী (র.), মাওলানা সৈয়দ সোলাইমান নদভী, মাওলানা আমিন হোসেন ইসলাহী, ড. ইসরার আহমদ, মুখতার মাসউদ, পীর আলী মুহাম্মদ রাশেদির জন্য আমার মনে পৃথক স্থান রয়েছে। ফার্সির মধ্যে শেখ সাদি, হাফিজ, ওমর খইয়াম, কুররাতুল আইন তাহেরা এবং উর্দুর মধ্যে মির্জা গালিব, ইকবাল, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, জৌশ এবং মোজাজ আমাকে প্রভাবিত করেছেন। আর পাঞ্জাবীর মধ্যে উস্তাদ দামন্দ এবং বাঙালির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের কথাগুলো মনের মধ্যে স্থান করে বসে আছে। তা ছাড়া জ্ঞান ও হেকমত যেখানে যেভাবে পেয়েছি সেখান থেকে সেভাবে সংগ্রহের চেষ্টা করেছি। সকল জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেন, জ্ঞান ও বুদ্ধি মুসলমানদের হারানো সম্পদ, তা যেখানে পাও সংগ্রহ করো।
জানি না কেন বরই গাছের প্রতি আমার আজীবনের মহব্বত, তবে বিশ^াস নয়। আমার জীবনে কিছু বরই গাছের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যার মধ্যে তিনটি গাছ অত্যন্ত ছায়াশীল। প্রথমটি আমার জন্ম শহরের পাশে যেখানে গৌতম বৌদ্ধের আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ হয়েছিলো। দূর থেকে গাছটি দেখা যায়। এর ছায়ায় আমি প্রচন্ড গরমে ঠান্ডা এবং প্রচন্ড ঠান্ডায় গরম অনুভব করতাম এবং ভাবতাম গৌতম বৌদ্ধ এই গাছের নিচে বসে কোন প্রকারের আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করেছেন? এই সময় আমার ক্লাসমেট মালিক আমির উদ্দিন এবং লালু প্রসাদ যাদব প্রায়ই সাথে থাকতো। মালিক আমির উদ্দিনকে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ঢাকায় পেয়েছিলাম। তবে পরে চিরদিনের জন্য আমরা আবার বিচ্ছিন্ন হই। লালুর সাথে আর কোনদিন দেখা হয়নি। যখন সে ভারতের বিহারের মূখ্যমন্ত্রী তখন এক বন্ধুর মাধ্যমে যাওয়ার জন্য দাওয়াত করেছিলো। সাথে বলেছিলো আমিরকে নিয়ে যেতে। কিন্তু শোকরিয়া ছাড়া আমার আর কিছু করার উপায় ছিলো না এবং আমির তো অনেক আগেই মারা গিয়েছিলো। আমার জানা মতে লালুর উপরও এই বরই গাছের অনেক প্রভাব ছিলো। সে উন্নতির উঁচুতে গিয়েও মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্ব বহাল রেখেছে। যখন রাজনীতিতে তার প্রভাব ছিলো তখন সেখানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন সংঘাত হয়নি এবং মুসলমানেরা আরামে শ^াস-নিঃশ^াস নিতে পেরেছে। এই বরই গাছের উপর ইচ্ছে করলে আমি একটি বই লিখতে পারবো।
দ্বিতীয় বরই গাছের ঘটনা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই গাছ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে। এই গাছের ছায়ায় অসংখ্য আন্দোলনের সূচনা হয়ে চূড়ান্ত সফলতায় গিয়েছে। ভাষা আন্দোলন হোক কিংবা যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, আয়ূব খানের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন, মাদারে মিল্লাত ফাতেমা জিন্নাহের প্রেসিডেন্সি নির্বাচনে ঐক্য ইত্যাদিতে এই গাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এক নয়, দশজনেরও বেশি অগ্নিঝরা নেতা তাদের আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করেছেন এই বরইগাছের নীচে। এখানে উল্লেখযোগ্য হলেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, প্রফেসর মতিয়া চৌধুরী (পরবর্তীতে মন্ত্রী), জাফর আহমদ (সাবেক মন্ত্রী), আব্দুল কুদ্দুস মাখন (সাবেক রাষ্ট্রদূত), শেখ হাসিনা ওয়াজেদ (প্রধানমন্ত্রী) প্রমুখ বেশিরভাগ সময় এই গাছের নিচে সভার আয়োজন করতেন। সামরিক শাসনের সময় যখন পল্টন ময়দানের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন রাজনীতিবিদরা এই গাছের নীচে ছাত্রদের সাথে, অতঃপর ওদের মাধ্যমে অন্যান্যদের সাথে যোগাযোগ করতেন। পূর্ব পাকিস্তানের দুই প্রভাবশালী গভর্নর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং জেনারেল আজম খানকে আমি বারবার দেখেছি এই গাছের নীচে ছাত্রদের সাথে কথা বলতে। শুনেছি এই গাছের গ্রহণযোগ্যতা পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে খুব বেশি ছিলো। ছাত্ররা এই গাছের নীচে বসতো এবং আগন্তুকদেরকে তারা নিজেদের মধ্যকার একজনই মনে করতো। এই গাছ উৎসাহ, সাহস, প্রেম এবং আপন করার নিদর্শন। এই গাছ নিয়েও অনেক কিছু লেখা যাবে।
তৃতীয় বরইগাছ হলো লাহোর হাইকোর্টের বার এসোসিয়েশনের পাশে। যখন দুনিয়ার ঝামেলা মুক্ত হই, তখন এর ছায়ায় বসি। এখানে জীবনের অনেক কিছুই দৃষ্টিতে আসে। এই গাছের নীচ ইনসাফ অনুসন্ধানী এবং ইনসাফদানকারী দাবীদারদের মাধ্যমে জমজমাট থাকে। এই গাছের নীচে বসলে বিভিন্ন ঘটনা, যা শুনতে কাহিনীর মতো, তা শোনা যায়। এই গাছের নীচে এমনও লোক পাওয়া যায়, যারা বছরের পর বছর ইনসাফের নামে ধোঁকা খাচ্ছে। প্রতিবার এক নতুন আশা, নিভে যাওয়া প্রদীপে একটু তেল দিয়ে তাজা করার মতো নিঃশ^াস নিতে থাকে, এই গাছের নীচে এমনও অনেককে মিলে। যার সমস্ত অনুভূতি ধ্বংস হয়ে গেছে, বংশ ধ্বংস হয়ে গেছে, তারা যখন প্রথম এসেছিলো তখন অনেক মানুষ তাদেরকে দস্তরখানায় বসাতো, বর্তমান অবস্থা এমন যে এক টাকার ছানা খেয়ে তারা সারাদিন চালিয়ে দেয় এবং এই এক রুপি তারা কীভাবে অর্জন করে, তা সেই ভালো জানে। সে তবুও ইনসাফের আশায় এখানে আসে বছর থেকে বছর, নিজের যৌবন থেকে বৃদ্ধ হওয়া পর্যন্ত। আমি কেন জানি ভাবি, যদি এসি রুমের পরিবর্তে এই বরই গাছের ছায়ায় ইনসাফের ব্যবস্থা করা হতো, তবে ইনসাফের জন্য এতটুকু তেল নষ্ট করা প্রয়োজন হতো না। তেলের মূল্য এমনি এমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু তেল যতই দামী হোক, না কেন, আমি লক্ষ করেছি সকল তেলই এই গাছের ছায়ায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
(অসমাপ্ত)

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT