উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : সুন্দরী শ্রীভূমি

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০১-২০২০ ইং ০০:৪০:৩৭ | সংবাদটি ৩৮৫ বার পঠিত
Image

বাংলাদেশে যতগুলো সিটি কর্পোরেশন আছে তার মধ্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশন অন্যতম। বাংলাদেশে যত মেয়র আছেন তাঁদের মধ্যে সারা বছর জুড়ে আলোচিত মেয়র হচ্ছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। সম্ভবত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী তাঁর নগরীর উন্নয়ন চিন্তায় যতটা ব্যস্ত সময় কাটান দেশে অন্য কোনো মেয়র ততটা ব্যস্ততা দেখান না। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নগরীর উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও নাগরিকের শহরে চলার পথ মসৃণ করার কাজে থাকেন সদা তৎপর। এই কথাগুলো আমার কল্পনাপ্রসূত নয়; বরং বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় পাওয়া খবর থেকে জানা। আমরা প্রায় প্রতিদিন তাঁর নানানমুখী অভিযানের খবর পাই। ফুটপাত হকারদের কবল থেকে মুক্ত করে জনগণের পায়ে চলার পথ নিশ্চিত করার কাজে অভিযান, অবৈধভাবে যত্রতত্র গড়ে উঠা গাড়ির স্ট্যান্ডে অভিযান, নগরীর ভিতরে অসময়ে ভুল পথে ট্রাক চলাচলের বিরুদ্ধে অভিযান, সিলেট শহরের পাশে বয়ে চলা সুরমা নদীকে দখল মুক্ত করা, নগরীর রাস্তাঘাট, নর্দমায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান ইত্যাদি নানা কাজে তাঁকে সশরীরে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। পাশাপাশি চলছে নগরীতে পাবলিক টয়লেট স্থাপন, ড্রেন প্রশস্তকরণ, রাস্তার উভয় পার্শ্ব বর্ধিতকরণ কাজ, সড়কে সুন্দর বাতি লাগিয়ে রাতের শহরকে ঝলমলে ও আকর্ষণীয় করার কাজ। অস্বীকার করার সুযোগ নেই বিগত দশ বছর আগে যে সড়কগুলো ছিলো অপ্রশস্ত সেগুলো এখন কোথাও কোথাও দ্বিগুণ প্রশস্ত ও সুন্দর হয়েছে। যারা সিলেটের বিভিন্ন সড়কে চলাচল করেন তারা বুঝতে পারেন। সিলেটের চৌহাট্টা থেকে পূর্বদিকে নয়াসড়ক পয়েন্ট হয়ে কুমারপাড়া পয়েন্ট পর্যন্ত এবং পশ্চিম দিকে রিকাবিবাজার পয়েন্ট পর্যন্ত রাস্তা হচ্ছে একটি উদাহরণ। এছাড়াও শহরের বিভিন্ন অলি-গলিতে রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে, পানি নিষ্কাশনের ড্রেনে গভীরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশস্তকরণ কাজ হয়েছে এবং চলছে। আমাদের শহরের একটি সড়ক দরগাগেইটে এখন বৈদ্যুতিক খুঁটিমুক্ত এবং অবশ্যই এটি বাংলাদেশে প্রথম উদ্যোগ। কিন্তু এতো যে উন্নয়ন কাজ এবং মেয়রের ব্যস্ততা তারপরও আমাদেরকে কেন অপরিচ্ছন্ন নগরীর অপবাদ শুনতে হলো? এই প্রশ্ন আজ সিলেটবাসী এবং প্রবাসী সিলেটীদের সকলের মনে।
আমরা যখন দেশের অন্য কোথাও বেড়াতে যাই, তখন অনেকে জানতে চান আপনাদের সিলেট নাকি খুব সুন্দর। আমাদের এই সিলেটকে নিয়ে বহুগুণীজনের প্রশংসা আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটকে দেখে এর সৌন্দর্যে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। নোবেল বিজয়ী এই কবিগুরু সিলেটকে ‘সুন্দরী শ্রীভূমি’ অভিহিত করেছেন এবং লিখেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে এভাবে-‘মমতাবিহীন কালস্রোতে/বাংলার রাষ্ট্রসীমা থেকে/নির্বাসিতা তুমি/সুন্দরী শ্রীভূমি ...? যারা দেশের বাইরে যুক্তরাজ্য ঘুরে এসেছেন তাদের অনেকে সুন্দরের প্রাধান্যে সিলেটকে ইউরোপের ঝলমলে শহর লন্ডন এর সাথে তুলনা করেন এবং সিলেটকে দ্বিতীয় লন্ডন বলে থাকেন। কেউ কেউ আবার সিলেটকে বাংলাদেশের লন্ডন বলেও সুখ পান। হ্যাঁ, ১৯৫০ খ্রীষ্টীয় সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত, ব্রিটিশ সরকার অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি করার আগ পর্যন্ত প্রচুর বাংলাদেশী ইউরোপের লন্ডন যান এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্যে জানা যায় প্রায় ত্রিশ লক্ষাধিক বাংলাদেশী ব্রিটেনে বসবাস করেন এবং এদের ৫৫% বাস করেন লন্ডনে। যেহেতু সিলেট থেকেই লন্ডনে গেছেন বেশি সংখ্যক মানুষ, তাই লন্ডনের অধিকাংশ বাংলাদেশীই সিলেটী।
আলোচনার শুরুতে সিলেট সিটি কর্পোরেশন উল্লেখ করেছি, তবে সিলেট বলতে কিন্তু এখানে তৎকালীন আসাম প্রদেশের সিলেটকেই বুঝায় যার কেন্দ্রে আমাদের বর্তমান সিলেট সিটি কর্পোরেশন। জানা যায়, ব্রিটেনের কোনো কোনো শহরের মানুষ রীতিমতো খাঁটি সিলেটি ভাষায় কথা বলেন সেখানে। আমাদের এই সিলেটি মানুষরা লন্ডন থেকে যে পাউন্ড রুজি করে এদেশে এনে বহু টাকায় সুন্দর সুন্দর দোকানকোঠা, বাড়ি, পুকুরঘাট, বাগান, মসজিদ, রাস্তাঘাট ইত্যাদি গড়ে তুলে আমাদের সিলেটকে সুন্দর সাজে সাজিয়েছেন তা অন্যান্য এলাকার মানুষরা এখানে এসে দেখে মুগ্ধ হন। সেজন্যেই সিলেট অন্যান্য শহরের থেকে আলাদা রকমের সুন্দর। শুধু তাই নয়, সিলেটের মানুষ লন্ডন থেকে শিখে এসে সহজে এখানকার ধনী গরীব সবশ্রেণির মানুষের সাথে সমান ব্যবহার করেন। এছাড়াও সিলেটি মানুষ এখন ব্রিটেনে রাজনীতিসহ নানান সংস্থায় স্বনামধন্য। কিন্তু ২০২০ খ্রীষ্টিয় সালের উষালগ্নে গত ৮ জানুয়ারি আমাদের অহংকার পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর সিলেটের সুনাম আর অক্ষুন্ন থাকেনি। সারা বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজের মানুষের দৃষ্টি সেদিন ছিলো সিলেটের দিকে। ৮ জানুয়ারি বুধবার বাংলাদেশের এক সুনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য রাখেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ। সমাবর্তনে তিনি লিখিত বক্তব্য রাখেন এবং পরে বলেন, ‘আমি সিলেটকে মনে করেছিলাম অনেক সুন্দর, পরিচ্ছন্ন একটা শহর। কিন্তু এখানে এসে আমার মন খারাপ হয়েছে। সিলেটে এসে দেখি রাস্তাঘাটগুলো অপরিচ্ছন্ন। যেখানে সেখানে পলিথিন, কলার ছোলা, কাগজ পড়ে আছে। বিদেশের রাস্তাঘাটে থুথু ফেলতেও মানুষ ভয় পায়, অথচ আমাদের দেশে মানুষ নোংরা করার আগেও একবারও ভাবেনা। তাদের পরিষ্কারের মানসিকতা হারিয়ে গেছে।’ হ্যাঁ, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য আমাদেরকে নাড়া দিয়েছে। আমাদের এই শহরের সুন্দরের কথা আমাদেরকে ভাবতে হবে। আমি নিজেও দৈনিক সিলেটের ডাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা বিষয়ে লিখেছি। সমাবর্তন শেষে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন সিলেট-১ সংসদীয় আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। সাংবাদিকরা সিলেটের অপরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট নিয়ে রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদের ক্ষোভ প্রকাশের প্রসঙ্গটি তুলে ধরলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যতবারই সিলেট আসি, দেখি মেয়র সাহেব সারা শহরের রাস্তাঘাট কেটে রেখেছেন। রাস্তার পাশে ময়লা আবর্জনার স্তূপ পড়ে আছে। আমি মেয়র সাহেবকে সব সময় বলি-এগুলো সরান। যে সড়কগুলোর কাজ হয়েছে সেগুলো পরিষ্কার করেন। একটা একটা করে কাজ করেন, আমি গাড়িতে চড়তে গিয়ে, বাজার করতে গিয়ে, ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে গিয়ে কানপেতে শুনেছি নগরীর সাধারণ মানুষের মুখে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথার প্রতিধ্বনি। হ্যাঁ কাজ করেন ভালো কথা। একটি একটি করে রাস্তার কাজ সম্পন্ন করেন। এভাবে সারা শহরের রাস্তায় ভাঙন ঘটালে তো নাগরিক জীবন অচল হয়ে পড়বে।
সম্প্রতি সিলেট নগরীর প্রধান প্রধান সড়কে যে ময়লা আবর্জনার স্তূপ চোখে পড়ছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নাই। পাশাপাশি প্রায় সকল শ্রেণি পেশার লোকজন বলছেন, সারা শহরে এক নাগাড়ে ভাঙ্গাভাঙ্গি ও খুঁড়াখুঁড়ি না করে পর্যায়ক্রমে একেকটি রাস্তায় কাজ করলে এ সমস্যা হতো না। বর্তমানে বন্দরবাজার থেকে জিন্দাবাজার হয়ে চৌহাট্টা পর্যন্ত নির্বিঘ্নে হাঁটা বা গাড়ি ও রিক্সাতে করে চলা কঠিন ব্যাপার। আবার জিন্দাবাজার থেকে নাইওরপুলে চলাচল দুষ্কর। সুবিদবাজার থেকে ব্লু-বার্ড স্কুল রাস্তা যেনো এক যন্ত্রণার নাম। এভাবে সবকিছুতে এলোমেলো দেখলে কে বলবে এই সিলেট একটি সুন্দর শহর!
জনমনের খবর নিশ্চয় এতোদিনে বিচক্ষণ মেয়র সাহেব বুঝে গেছেন। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। শীত শেষে সিলেটের আকাশে কালো মেঘ জমতে আর খুব বেশি দেরি নেই। বৃষ্টি নামবে, জলাবদ্ধতা দেখা দিবে, মশা-মাছির উপদ্রব বাড়বে-সেদিকেও আগে থেকেই নজর দিতে হবে। তা না হলে প্রশস্ত রাস্তা, প্রশস্ত নর্দমা নগরবাসীর জন্যে হবে মরণফাঁদ। তাই নগরবাসী চায় এলোমেলোভাবে কাজ না করে, জনদুর্ভোগ যাতে কম হয় সে চিন্তা মাথায় রেখে যেনো উন্নয়ন কাজ চলে। উন্নয়ন কাজ চলুক, তবে সেটা যেনো সুচিন্তিত পরিকল্পনা মাফিক হয়। মেয়র সাহেব নিশ্চয় মনে রেখেছেন গত বছর ফাজিলচিস্ত আবাসিক এলাকা থেকে রায়নগর পর্যন্ত কোন কোন ড্রেনে পানি উপছে পড়েছিলো, সেগুলোর কাজ কি সুসম্পন্ন হয়েছে! সবকিছুই আগে ভেবে কাজে হাত দিলে সুন্দর শহর সুন্দরই থাকবে। আর সবার আগে প্রয়োজন এই শপথ করা-আমাদের শহর আমরা নোংরা করবো না। তাহলে সুন্দরী শ্রীভূমিকে অপরিচ্ছন্ন অপবাদ সইতে হবেনা।
লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • ক্ষণজন্মা সৈয়দ মহসীন আলী
  • শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনও প্রয়োজন
  • জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
  • ম. আ. মুক্তাদির : বিপ্লবীর স্বপ্নের দেশ
  • স্মরণ: শেখ তজমুল আলী চেয়ারম্যান
  • করোনাকালে সঙ্কটে প্রবাসীরা
  • ব্যাংক খাত ও সাইবার নিরাপত্তা
  • আমাদের অসাধারণ মানুষের গল্প
  • প্রগতি জাতির প্রকৃতিগত অধিকার
  • নিজেকে দূরে রাখুন, সচেতন থাকুন
  • প্রগতি জাতির প্রকৃতিগত অধিকার
  • Image

    Developed by:Sparkle IT