উপ সম্পাদকীয়

ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০১-২০২০ ইং ০১:০৩:০৫ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

সফলতার উলটো পিঠেই আছে ব্যর্থতা। পৃথিবীতে সবাই সফল হতে চায়; কিন্তু বাস্তবতা হলো-সব সময় মানুষ সফল হতে পারে না। অনেক সময় মানুষ ব্যর্থতাকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে হতাশ হয়ে পড়ে। হাল ছেড়ে দেয়। নিজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। বিষয়টি আসলে এভাবে দেখা ঠিক নয়। জয় ও অর্জনকে আমরা সফলতা বলে চিহ্নিত করি। পরাজয় ও লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারাকে আমরা ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করি; কিন্তু বিষয়টা আসলে এমন নয়। সফলতা কিংবা ব্যর্থতা যাই বলি না কেন, বিষয়গুলো অনেকটা আপেক্ষিক। কিংবা দৃষ্টিভঙ্গিগত বিবেচনাবোধ ও মন-এই দুটো উপাদানকে কীভাবে গ্রহণ করছে তার ওপর নির্ভরশীল। জয় যদি সফলতা হয়, তবে পরাজয়কে ইতিবাচক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। ভালোমন্দ যেটাই মানুষের জীবনে ঘটুক না কেন, সেগুলোকে ইতিবাচকভাবে বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ২০০৭ সালে নেচারে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যে কোনো পরিস্থিতিতে মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক আবেগ ও মানসিক চাপ কমানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কের উপাদানগুলোকে সক্রিয় করে তোলে। এর ফলে মানুষ বিরূপ ঘটনা ও অবস্থার মধ্যে থেকেও নিজের আত্মবিশ্বাসকে ধরে রাখতে পারে। মানুষকে তার স্বপ্ন ও বিশ্বাসকে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে বিচার করতে হবে। ম্যাকলিল্যান্ড তার অ্যাচিভমেন্ট মোটিভেশন থিওরি থেকে বলছেন, মানুষের চাহিদা বা স্বপ্ন এমন হওয়া উচিত নয়, যেটি বাস্তবে অর্জন করা কঠিন। এতে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। অনেকে ভাবতে পারেন-মানুষ কি তবে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেবে। বিষয়টা এমন নয়। মানুষকে স্বপ্ন দেখতে হবে ও সে স্বপ্ন অর্জনের লক্ষ্যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। অতি আবেগ বা কল্পনা যেন মানুষের স্বপ্ন ও লক্ষ্যকে বিনষ্ট করতে না পারে সেটিও ভেবে দেখতে হবে। মানুষ তার স্বপ্নের সমান কিংবা স্বপ্নের চেয়ে বড়ো-এই বিশ্বাস তখনই সফল হবে যখন কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকবে। মানুষের সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিকল্প ভাবনা ও পরিকল্পনা থাকতে হবে। একটি পরিকল্পনায় সফল না হলে বিকল্প আরেকটি পরিকল্পনা নেবার মতো দৃঢ় মানসিকতা মানুষের মধ্যে থাকতে হবে। মানুষ যখন বার বার ব্যর্থ হয় তখন তার এই ব্যর্থতার ভার অন্যের ওপর চাপাতে চায়। এটা এক ধরনের ডিফেন্স মেকানিজম যা ফ্রাস্ট্রেশন থেকে জন্ম নেয়। মানুষ তখনই সফল হতে পারে যখন তার ব্যর্থতার দায়ভার সে নিজে নিয়ে আত্মসমালোচনা করার সক্ষমতা অর্জন করে। কেননা আত্মসমালোচনা আত্ম উপলব্ধির মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করে। মানুষের আত্মত্যাগকে অনেক সময় আমরা পরাজয় হিসেবে বিবেচনা করে থাকি; কিন্তু আত্মত্যাগের মাধ্যমে মানবিক প্রশান্তি ও উদারতার বিষয়টিকে আমরা এড়িয়ে যাই। পেনসিলভানিয়ার পিটার্সবার্গের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার অর্জিত ফলাফল থেকে দেখা গেছে, ইতিবাচক চিন্তাধারা মানুষের মধ্যে শুভ বোধ তৈরি করে। এই শুভবোধ মানুষকে অনুপ্রাণিত করে জীবনকে সফল করে গড়ে তোলে। এমনকি কঠিন ও প্রতিকূল সময়ের মধ্যেও মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও স্বপ্ন সঞ্চারিত করে সফল হবার উপযোগী মনোভাব তৈরি করে। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক যে কোনো অবস্থায় মানুষ যখন নিজেকে নিয়ন্ত্রিত করে বাস্তবতাকে গ্রহণ করার মনোবৃত্তির প্রকাশ ঘটে তখন ডোপামাইন, সেরোটোনিন এবং অক্সিটোকিন ইত্যাদি সুখী রাসায়নিক উপাদান মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত হয়; কিন্তু বিরূপ ও প্রতিকূল অবস্থাকে মানুষ যখন নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় তখন কিছু অসুখী রাসায়নিক উপাদানের নিঃসারণ মস্তিষ্ক থেকে ঘটে থাকে। আমাদের দেশের তরুণরা অনেক সময় চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে; কিন্তু চাকরি না পাওয়ার বিষয়টিকে তরুণদের ইতিবাচকভাবে দেখার মনোভাব থাকতে হবে। সবাই চাকরি পাবে-এটা যেমন সত্য নয়, ঠিক তেমনি সবাইকে চাকরি করতে হবে-এটিও সত্য নয়। যখন একজন তরুণ একটার পর একটা ইন্টারভিউ দিয়ে ব্যর্থ হয় তখন তাকে বিকল্প কর্মসংস্থানের চিন্তা করতে হবে। এই বিকল্প চিন্তার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। আমাদের তরুণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে তার জন্য উপযোগী কাজকে বেছে নিতে হবে। বিলগেটস, স্টিভ জবস, জ্যাকমা, অমিতাভ বাচ্চন, আতিউর রহমান, এ পি জে আবদুল কালাম, আইজ্যাক নিউটনের মতো মনীষীদের জীবন থেকে দীক্ষা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা থেকে ইতিবাচক ধারণাকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ওয়ারেন বাফেট তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, কখনোই সব ডিম এক ঝুড়িতে রেখ না। অর্থাৎ একটি মাত্র ক্ষেত্রে বিনিয়োগ না করে ভিন্ন ভিন্ন খাতে ইনভেস্ট কর, যাতে মূলধন হারানোর ঝুঁকি কম থাকে। আমাদের ভাবনার মধ্যেও এ ধরনের ইতিবাচক বৈচিত্র্য থাকতে হবে। তবে এক সময় নেতিবাচক ধারণাসমূহকে আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনা করে আমাদের জীবনকে বদলে ফেলতে পারব।
লেখক : অধ্যাপক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT