স্বাস্থ্য কুশল

রোগ প্রতিরোধে ডালিম

মোঃ জহিরুল আলম শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০১-২০২০ ইং ০২:২১:০২ | সংবাদটি ১৪৬ বার পঠিত

আমাদের সবার নিকট অতি পরিচিত একটি ফল ভালিম। বাংলাদেশের সর্বত্রই প্রতিটি বসত বাড়ির আঙ্গিনায় ডালিম গাছ দেখা যায়। ছোট আকারের গাছটির ফলের নাম ডালিম। বিভিন্ন ভাষায় ডালিমের বিভিন্ন নাম রয়েছে। বাংলায় ডালিম বা বেদানা, ইংরেজিতে চড়সবমৎবহধঃব. হিন্দি উর্দু ফারসি সংস্কৃত নেপালি ভাষায় দরিম ও পশতু ভাষায় একে আনার বলা হয়। ডালিমের বৈজ্ঞানিক নাম চঁহরপধ মৎধহধঃঁস, উহা খুঃযৎধপবধপ পরিবারের একটি উদ্ভিদ। পাকা ডালিম ফল দেখতে লালচে গোলাকার। ডালিম একটি বেহেস্তি বা জান্নাতি ফল। পবিত্র কোরআন শরীফে মহান আল্লাহ যে ১১টি ফলের কথা বলেছেন ডালিম তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। মানবজাতির পথ নির্দেশক মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে আল্লাহতায়ালা জান্নাতিদের নেয়ামত প্রসঙ্গে ঘোষণা করেন। “তথায় (জান্নাতে) আছে ফল মুল, খেজুর ও আনার (ডালিম ফল), অতএব তোমরা উভয়ে (মানুষ ও জিন) তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? (সূরা আর রহমান আয়াত নং-৬৮)। এ ফলটি খুবই পুষ্টি গুণ সমৃদ্ধ ফল। নানা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, তোমরা ডালিম খাও। এতে তোমাদের পেটের ভিতরের ময়লা পরিস্কার হবে। অর্থাৎ ডালিম কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। সুতরাং এ ফলটি মানুষের জন্য খুবই উপকারি। রোগ প্রতিরোধের জন্য বলিষ্ঠ হাতিয়ার।
ব্যবহৃত অংশ ঃ ডালিম পাকা ফল দেখতে গোলাকার লালচে হয়। ফলের নরম খোসার ভিতর পুতির মালার মতো লাল রঙ্গের দানা থাকে। ছোট ছোট দানাগুলো রসে পরিপূর্ণ থাকে এবং ভিতরে বীজ থাকে। এ দানাগুলোই খাওয়া হয়।
রাসায়নিক উপাদান ঃ ডালিমের পাতায় থাকে বেটুলিক, আরসোলিক এসিড বিটা-সিটো স্টোরল। কান্ডের বাকলে থাকে ডি-ম্যানিটল, ফ্রিয়েডেলিল অক্সিম,
এসিটেড, পেলিটিয়েরিন, ফলের রসে থাকে সুক্রোজ, পেকটিন, কারোটিনয়েড, এন্থোসায়ানিন, এসকরবিক এসিড, থায়ামিন, রাইবোফ্লাভিন। মূলের বাকলে থাকে। সিউডো-পেলিটিয়েরিন, পেলিটিয়েরিন, আইসোপেলিটিয়েরিন এবং পেরিটিয়েরিন পুনিমিন।
পুষ্টি উপাদান ঃ প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগি তরতাজা ডালিমে পুষ্টি উপাদান হলো জলীয় অংশ ৭৮ গ্রাম। খাদ্য শক্তি ৬৫ কিলো ক্যালরি, প্রোটিন, ১.৬ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, ভিটামিন বি-১, ০.০৬ মিলি গ্রাম, বি-২০.১ মিলি গ্রাম। নিয়াসিস ০.৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৫৭ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৭০ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ১২ গ্রাম। তাছাড়াও কিছু পরিমাণে ম্যাগনেশিয়াম, জিংক থাকে। তবে জাত ও মাটির গুণের কারণে পুষ্টিমান কমবেশী হতে পারে।
উপকারিতা ঃ ডালিম ফলটি প্রচুর পুষ্টি গুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। ডালিমে রয়েছে অত্যন্ত উপকারী উপাদান ফাইটোকেমিক্যালস যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে। ডালিম মানব দেহের নানা রোগ প্রতিরোধ করার কার্যকারী গুনাগুণ রয়েছে। ডালিমে ভিটামিন সি, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, পটাশিয়াম, ফসফরাস উপাদান আমাদের শরীর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এ ফলের রস হজমে খুবই সাহায্য করে। সূর্য্যরে অতিবেগুনি রশ্মি থেকে চামড়াকে সুরক্ষিত রাখে ডালিম। ডালিমের রস খিদে বাড়ায়, শরীর স্নিগ্ধ করে। বল, রুচি বৃদ্ধি করে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। সর্দি, কাঁশি, শাসকষ্ট ও বাত রোগ সারাতে সাহায্য করে। তাছাড়াও দাঁতে প্লাগ জমাতে দেয় না। আরো যে সব উপকার করে তা হলো * মুখের রুচি বাড়িয়ে মুখ গহ্বরের সুরক্ষা করে। যাদের পেটের অসুখ বা হজমে সমস্যা হয় বা পায়খানা শক্ত হয় তারা পরিমাণ মত ডালিম খান উপকার পাবেন। * যারা রক্ত স্বল্পতায় ভোগছেন বা বুকের ধরফরানি বা শরীর খুব দুর্বল থাকে তারা সকাল-বিকাল ডালিম খান খুবই উপকার পাবেন। ডালিম ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে স্তন ক্যান্সার, চামড়ার ক্যান্সার ও পুরুষদের প্রস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। * যারা মাথা খাটানো কাজ করেন বা লেখাপড়া করেন তারা নিয়মিত ডালিম খান মস্তিস্ক সুরক্ষিত হবে। শিশুদের নিয়মিত ডালিম খাওয়ালে মেধা গঠনে ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। * মানব দেহের হাড়ের সংযোগস্থলে কার্টিলেজ নামে অস্থিরস থাকে। এখানে কার্টিলেজ নামক রোগ হয় এ রোগে ডালিমে থাকা পটাশিয়াম ও পলিফেনল উপাদান এ রোগ প্রতিরোধ করে। ফলে হাড় সুস্থ থাকে। যারা উচ্চ রক্তচাপে ভোগছেন তারা নিয়মিত ডালিম খান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে আসবে। * ডালিম দেহের কোলেস্টোরল ঝুঁকি কমায়। এতে রক্ত চলাচল ভালো থাকে এবং ধ্বনিতে চর্বি জমতে দেয় না। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়। * ডালিমের ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী গুণ রয়েছে। যা শরীরের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। * যারা অ্যালঝেইমার্স বা হাত, পা, মাথা কাঁপা রোগে ভোগছেন তারা নিয়মিত ডালিম খান যথেষ্ট উপকার পাবেন। স্মৃতিশক্তিও বাড়তে থাকবে। * ডালিম দেহের রক্তের হিমোগ্লোবিন বাড়াতে সাহায্য করে। দেহে রক্ত চলাচল সচল রাখে। * ডালিমের রস তারুণ্যকে ধরিয়ে রাখে। শরীরে বয়সের ছাপ পড়েনা। ডালিমে আছে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, ট্রিকোমোনিক এসিড এবং ওমেগো ৫ ফ্যাটি এসিড যা ত্বকের সজীবতা বজায় রাখে ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। * ডালিমের রস রক্তনালীকে সুরক্ষিত রাখে ও প্লাক জমতে দেয় না। ফলে স্ট্রোক বা রক্তক্ষরণ রোগ হওয়ার প্রবণতা কমে যায়। * ডালিমের বাকলে থাকে অ্যাসট্রিনজেন্ট, ফাইটোক্যামিক্যালস নামক উপাদান এর বাকল পানিতে সিদ্ধ করে সেই পানি সর্দি, গলায় খুসখুসি কাশি, গলা ব্যাথায় পান করলে যথেষ্ট উপকার পাওয়া যায়। * মানব দেহের চামড়ার উপরের দিকের স্তরটি ডামিস। এটি কোলাজেন ও ইলাস্টিক আঁশ দিয়ে তৈরী। আর এখানেই বয়সের ছাপ পড়ে। ফলে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়। তখন কোলাজেন গঠনের জন্য প্রোটিনের সরবরাহ দিতে ডালিমের ভিটামিন সি খুবই সাহায্য করে। ফলে শরীর তরতাজা থাকে।
সতর্কতা ঃ ফলটি খেলে কারো কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা খাওয়া বাদ দিতে হবে, রোগীরা সমস্যা হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT