মহিলা সমাজ

কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০১-২০২০ ইং ০০:০৬:১৯ | সংবাদটি ১২২ বার পঠিত

রাবেয়া খাতুন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, কবি, লেখক ও ঔপন্যাসিক। ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার বিক্রমপুর মামার বাড়ি পাউসার গ্রামে রাবেয়া খাতুনের জন্ম।
তার উল্লেখযোগ্য পুরষ্কার একুশে পদক (১৯৯৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৩), হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৯), বাংলাদেশ-লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৯৪), নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯৫), শেরে বাংলা স্বর্ণপদক (১৯৯৯)।
বাবা মোহাম্মদ মুল্লুক চাঁদ, মা হামিদা খাতুন। চার সন্তানের জননী রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয় ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই সম্পাদক ও চিত্র পরিচালক এটিএম ফজলুল হকের সাথে।
পুরানো ঢাকার রায় সাহেব বাজারে অলিগলিতে কেটেছে তার শৈশবকাল। মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়িতে ও কাটিয়েছেন শৈশববের কিছু সময়।
আরমানী টোলা বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা (বর্তমানে মাধ্যমিক) পাশ করেন ১৯৪৮ সালে। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে হওয়ার বিদ্যালয়ের গন্ডির পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলের গন্ডির পর তাকে আর কলেজে যেতে দেয়া হয়নি। তখন স্কুলে মুসলমান ছাত্রীদের সংখ্যা ছিলো কম। কারণ সমাজের প্রচলিত নিয়ম ভেঙ্গে মেয়েরা তখন স্কুলে আসতে পারতো না।
রাবেয়া খাতুন ১৩-১৪ বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করেন। রাবেয়া খাতুনের লেখার হাতেখড়ি উপন্যাসের মাধ্যমে।
তাদের বাড়ির নিয়ম ছিলো সপ্তাহে দুটো বায়োস্কোপ বা টকি সিনেমা দেখা। রাবেয়া খাতুনের উপন্যাসের কাহিনী তৈরি হতো সম্ভবতঃ সেই বায়োস্কোপ বা টকি সিনেমার কাহিনীকে কেন্দ্র করে।
প্রথম উপন্যাসের নাম ছিলো নিরাশ্রয়া। পরে বিদায়, অশোক রেবা এই ধরনের নাম। কিন্তু এই উপন্যাসগুলি কখনো গ্রন্থ আকারে বের হয়নি।
সেই পঞ্চাশের দশক থেকে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় রাবেয়া খাতুনের কলম থেকে অবলীলায় ঝরে পড়েছে শব্দ আর কথামালা।
তার উপন্যাসগুলি-মধুমতি, সাহেব বাজার, অনন্ত অন্বেষা, রাজারবাগ, মন এক শ্বেত কপোতী ফেরারী সূর্য ইত্যাদি বহু উপন্যাস।
এছাড়া রাবেয়া খাতুনের লেখা জীবন ও সাহিত্য, পাবনা মানসিক হাসপাতাল, স্মৃতির জ্যোতির্ময় আলোকে যাদের দেখেছি নামক গবেষণামূলক গ্রস্থ, একাত্তরের নয় মাস, স্বপ্নের শহর ঢাকা ইত্যাদি বহু লেখা।
রাবেয়া খাতুনের অনেক লেখা ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি ও ইরানি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তাঁর লেখা কাহিনী নিয়ে ৪টি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে।
রাবেয়া খাতুন রচিত ২০০৪ সালে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক জনপ্রিয় উপন্যাস মেঘের পরে মেঘ এবং ২০১১ সালে আরেকটি ঔপন্যাস মধুমতি।
রাবেয়া খাতুন ছোটবেলায় পাঠ্য পুস্তকের তলায় গল্পের বই লুকিয়ে রাখতেন। এটি দেখে মা ভীষণ রেগে যেতেন এছাড়া তিনি যখন গল্প লিখতে বসতেন তখনও রাবেয়া খাতুনের মা খুব রাগান্বিত হতেন। কারণ সব মায়েদের মতো রাবেয়া খাতুনের মায়েরও স্বপ্ন ছিলো মেয়ে ক্লাসে ফার্স্ট হবে। সে সময় তাদের পড়াশোনা করানো হতো একটি ভালো বিয়ে দেওয়ার জন্য।
কিন্তু রাবেয়া খাতুনের মা যেমনটি চাইতেন রাবেয়া খাতুন ছিলেন তার উল্টো, কারণ পড়াশোনায় তিনি মোটেও ভালো ছিলেন না। কোন রকমে টেনে টুনে পরীক্ষায় পাশ করতেন। তার মা এজন্য দায়ী করতেন বাইরের বই পড়া ও গল্প লেখার নেশাকে।
১৯৪৮-৪৯ সালে রাবেয়া খাতুনের দু-চারটে গল্প বেশ কয়েকটি কাগজে ছাপা হয়েছে। কিশোরী রাবেয়ার চোখে তখন অনেক স্বপ্ন।
মা-বাবার হাজারো আপত্তির দেয়াল টপকে সেদিনের রাবু আজ বিশিষ্ট খ্যাতিমান কথা-সাহিত্যিক ঔপন্যাসিক রাবেয়া খাতুন।
তার কবিরাজ দাদা তাঁদেরকে প্রতিমা দেখার জন্য নৌকা করে নিয়ে যেতেন- তখন ষোলঘর থেকে শ্রীনগরে যাওয়া ছিলো বড় কষ্টের।
পুতুল খেলার প্রতি রাবেয়া খাতুনের ঝোঁক ছিলো বেশি। তাঁর পুতুল খেলা ছিলো একটু ভিন্ন ধরনের। আরেকটা খেলা খেলতেন তিনি, সেটা হলো সিনেমার বইয়ের ছবি কেটে কেটে গল্প বানাতেন। তার খাতার ভেতরে এসব করতেন বলে রাবেয়া খাতুনকে অনেক কষ্ট করতে হতো।
রাবেয়া খাতুনের বাবা ছিলেন মাছ ধরার ওস্তাদ। আর এই মৎস্য শিকারের সঙ্গে থাকতেন রাবেয়া খাতুন। নৌকা দিয়ে তাঁরা মাছ ধরতে যেতেন।
রাবেয়া খাতুনের বয়স যখন পাঁচ ছয় বছর তখন তাঁরা থাকতেন পুরানো ঢাকার রায় সাহেব বাজারের নাসির উদ্দিন সর্দার লেনে।
ছোটবেলায় গান শিখতেন রাবেয়া খাতুন। কিন্তু নিয়মিত রেওয়াজ করতে পারতেন না কারণ সে সময় গানকে ভালো চোখে দেখা হতো না।
তাঁদের বাসাটি ছিলো মসজিদ লাগোয়া। তাই হারমোনিয়াম বাজানো ছিল নিষিদ্ধ। প্রায় দিনই খালি গলায় গাইতেন। তাঁর ছোটবোন সুফিয়া গান গাইতেন। গানকে ভালো বাসতেন তিনি।
বেশির ভাগ সময় কেটেছে রাবেয়া খাতুনের ঢাকার বিভিন্ন ভাড়াটে বাসায়। পুরানো ঢাকায় থেকেছেন প্রায় ১০ বছর। প্রতিবেশিদের বাসায় যাওয়া তাঁদের জন্য নিষেধ ছিলো। কিন্তু তিনি এই নিষেধাজ্ঞার ভেতর দিয়েও সব সময় আসা যাওয়া করতেন। এজন্য তাঁকে অনেক বকুনি খেতে হতো।
লেখালেখির পাশাপাশি রাবেয়া খাতুন শিক্ষকতা এবং সাংবাদিকতা করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমির কাউন্সিলর মেম্বার, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের গঠনতন্ত্র পরিচালনা পরিষদের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জাতীয় বিতর্কের জুরী বোর্ডের বিচারক ও সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্ত ছিলেন বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, ঢাকা লেডিস ক্লাব, উইমেন্স ক্লাব, লেখক শিবির, বাংলাদেশ কথা শিল্পী সংসদ ও মহিলা সমিতি সহ আরো একাধিক সংগঠনের সাথে।
১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয়। ঢাকার টিকাটুলিতে ভাড়াটে বাসায় থাকতেন। রাবেয়া খাতুনের বয়স তখন ঊনিশ বছর। রান্নাবান্নাও জানতেন না।
অবশেষে বাবুর্চি এলো। দশটায় খেয়েদেয়ে দু’জনে অফিসে যেতেন। ওল্ড কোর্ট হাউস স্টিটের একটা বিশাল বাড়ির দোতলায় সিনেমা পত্রিকা চালাতেন মূলতঃ চারজন।
ফজলুল হক, তার ছোট ভাই ফজলুল করিম, জহির রায়হান ও কাইয়ুম চৌধুরী। তাঁদের সাথে যুক্ত হলেন রাবেয়া খাতুন। এরপর থেকে পরিচিতি হতে লাগলো উদীয়মান সাহিত্য প্রতিভাদের সাথে।
রাবেয়া খাতুন স্বপ্নের সংগ্রামী। সাহিত্য কবি ও সংগীত ব্যক্তিত্ব। মহিয়সী নারী। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এবং এই সময়ের বাঙালি লেখকদের আলোকিত ও আলোচিত নাম রাবেয়া খাতুন।
নন্দিত কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুনের গল্প ও উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে সর্বাধিক টিভি নাটক।
শিক্ষা ও গবেষণায় অধ্যাপক রাবেয়া খাতুনের অবদান চিরস্মরণীয়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT