ইতিহাস ও ঐতিহ্য

স্বাধীন বাংলাদেশে জনতার উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০১-২০২০ ইং ০০:২৮:৪৮ | সংবাদটি ১৭৯ বার পঠিত

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে বাংলাদেশের স্থপতি, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুখপাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী (রেসকোর্স) ময়দানে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা যেমন হৃদয় বিদারক তেমনি মর্মস্পর্শী। এই ভাষণই স্বাধীন বাংলাদেশে জনতার উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ। তিনি তার ভাষণে বলেন-আজকের এই শুভলগ্নে আমি সর্বপ্রথম আমার দেশের সংগ্রামী কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সেই বীর শহীদদের কথা স্মরণ করছি, যারা গত নয় মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামে বর্বর পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন। আমি তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার সোনার বাংলা আজ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার উদ্দেশ্যে আমি সালাম জানাই। ইয়াহিয়া খাঁন কারাগারে আমি প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করেছি। মৃত্যুর জন্য আমি প্রস্তুতও ছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যে মুক্ত হবে, এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না, তবে এই মুক্তির জন্য যে মূল্য দিতে হয়, তা কল্পনারও অতি। আমার বিশ্বাস, পৃথিবীর ইতিহাসে কোন দেশের মুক্তি সংগ্রামে এত লোকের প্রাণহানির নজীর নেই। আমার দেশের নিরীহ মানুষদের হত্যা করে তারা কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছে, সোনার বাংলার অসংখ্য গ্রাম পুড়িয়ে তারা ছারখার করে দিয়েছে। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দীশালায় থেকে আমি জানতাম, তারা আমাকে হত্যা করবে। কিন্তু তাদের কাছে আমার অনুরোধ ছিল, আমার লাশটা তারা যেন বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়, বাংলার পবিত্র মাটি আমি পাই। আমি চির প্রতিজ্ঞ ছিলাম, তাদের কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে বাংলার মানুষদের মাথা নিচু করব না।
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি। কিন্তু আজ আর কবিগুরুর সে কথা বাংলার মানুষের বেলায় খাটে না-তাঁর প্রত্যাশাকে আমরা বাস্তবায়িত করেছি। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে, তারা বীরের জাতি, তারা নিজেদের অধিকার অর্জন করে মানুষের মত বাঁচতে জানে। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ভাইয়েরা আমার, আপনারা কত অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেছেন, গেরিলা হয়ে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন, রক্ত দিয়েছেন দেশমাতার মুক্তির জন্য। আপনাদের এ রক্তদান বৃথা যাবে না।
আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এবং ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার জনগণের প্রতি আমাদের এই মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন দানের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। বর্বর পাকিস্তানী সৈন্যদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে আমার দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত সরকার ও ভারতের জনসাধারণ নিজেদের অনেক অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই ছিন্নমূল মানুষদের দীর্ঘ নয় মাস ধরে আশ্রয় দিয়েছেন, খাদ্য দিয়েছেন। এজন্য আমি ভারত সরকার ও ভারতের জনসাধারণকে আমার দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের পথ থেকে অন্তরের অন্তস্থল হতে ধন্যবাদ জানাই।
গত ৭ মার্চ এই ঘোড়দৌড় ময়দানে আমি আপনাদের বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলুন। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। আপনারা বাংলাদেশের মানুষ সেই স্বাধীনতা এনেছেন। আজ আবার বলছি, আপনারা সবাই একতা বজায় রাখুন। ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। একজন বাঙালি প্রাণ থাকতে আমরা এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দিব না। বাংলাদেশ ইতিহাসে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই টিকে থাকবে। বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে পারে, এমন কোন শক্তি নেই। আজ সোনার বাংলার কোটি কোটি মানুষ গৃহহারা, আশ্রয়হারা, তারা নি:সম্বল। আমি মানবতার খাতিরে বিশ্ববাসীর প্রতি আমার এই দুঃখী মানুষদের সাহায্য দানের জন্য এগিয়ে আসতে অনুরোধ করছি।
নেতা হিসাবে নয়, ভাই হিসাবে আমি আবার দেশবাসীকে বলছি, আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, তাহলে আমাদের এ স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে-পূর্ণ হবে না। আমাদের এখন তাই অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে। সেগুলো মেরামত করতে হবে। আপনারা নিজেরাই সেসব রাস্তা মেরামত করতে শুরু করে দিন। যার যা কাজ ঠিকমত করে যান। কর্মচারীদের বলছি, আপনারা ঘুষ খাবেন না। এদেশে আর কোন দুর্নীতি চলতে দেয়া হবে না। প্রায় চার লাখ বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানে আছে। আমাদের অবশ্যই তাদের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে।
বাংলাভাষী নয়, এমন যারা বাংলাদেশে আছে, তাদের বাঙালিদের সাথে মিশে যেতে হবে। কারও প্রতি আমার হিংসা নেই। অবাঙালিদের প্রতি কেউ হাত ভুলবেন না। আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না। অবশ্য যে সবলোক পাকিস্তান সৈন্যদের সমর্থন করেছে, আমাদের লোকদের হত্যা করতে সাহায্য করেছে, তাদের ক্ষমা করা হবে না। সঠিক বিচারের মাধ্যমে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে।
আপনারা জানেন, আমার বিরুদ্ধে একটি মামলা দাঁড় করানো হয়েছিল এবং অনেকেই আমার বিরুদ্ধে সায় দিয়েছে, আমি তাদের জানি। আপনারা আরও জানেন যে, আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি মুসলমান। আমি জানি মুসলমান মাত্র একবারই মরে। তাই আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের নিকট নতি স্বীকার করব না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময়, আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাত্রে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে বন্দী হওয়ার পূর্বে আমার সহকর্মীরা আমাকে চলে যেতে অনুরোধ করেন। আমি তখন তাঁদের বলেছিলাম, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে বিপদের মুখে রেখে আমি যাব না। মরতে হলে আমি এখানেই মরব। তাজউদ্দিন এবং আমার অন্যান্য সহকর্মীরা তখন কাঁদতে শুরু করেন। আমার পাকিস্তানি ভাইয়েরা, আপনাদের প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ নেই। আমি চাই, আপনারা সুখে থাকুন। আপনাদের সেনাবাহিনী আমাদের অসংখ্য লোককে হত্যা করেছে। আমাদের মা-বোনদের মর্যাদাহানি করেছে। আমাদের গ্রামগুলো বিধ্বস্ত করেছে। তবুও আপনাদের প্রতি আমার কোন আক্রোশ নেই। আপনারা স্বাধীন থাকুন, আমরাও স্বাধীন থাকি। বিশ্বের অন্য যে কোন দেশের সাথে আমাদের যে ধরনের বন্ধুত্ব হতে পারে, আপনাদের সাথেও আমাদের শুধুমাত্র সেই ধরনের বন্ধুত্ব হতে পারে। কিন্তু যারা অন্যায়ভাবে আমাদের মানুষদের মেরেছে, তাদের অবশ্যই বিচার হবে। বাংলাদেশে এমন পরিবার খুব কমই আছে, যে পরিবারের কোন লোক মারা যায়নি।
বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। ইন্দোনেশিয়ার পরেই এর স্থান। মুসলিম জনসংখ্যার দিক দিয়ে ভারতের স্থান তৃতীয় ও পাকিস্তানের স্থান চতুর্থ। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস, পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী ইসলামের নামে এদেশের মুসলমানদের হত্যা করেছে। আমাদের নারীদের বেইজ্জত করেছে। ইসলামের অবমাননা আমি চাই না, আমি স্পষ্ট ও দ্বার্থহীন ভাষায় বলতে চাই যে, আমাদের দেশ হবে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক। এদেশের কৃষক, শ্রমিক হিন্দু মুসলমান সবাই সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে।
আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে শ্রদ্ধা করি। তিনি দীর্ঘকাল যাবত রাজনীতি করছেন। তিনি শুধু ভারতের মহান সন্তান পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর কন্যাই নন, পন্ডিত মতিলাল নেহেরুর নাতনীও। তাঁর সাথে আমি দিল্লীতে পারস্পরিক দ্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করেছি। আমি যখনই চাইব, ভারত বাংলাদেশ থেকে তার সৈন্যবাহিনী তখনই ফিরিয়ে নিবে। ইতিমধ্যেই ভারতীয় সৈন্যের একটা বিরাট অংশ বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে।
আমার দেশের জনসাধারণের জন্য শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী যা করেছেন, তাঁর জন্য আমি তাঁকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমার মুক্তির জন্য বিশ্বের সকল দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁরা যেন আমাকে ছেড়ে দেবার জন্য ইয়াহিয়া খানকে অনুরোধ জানান। আমি তাঁর নিকট চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকব।
প্রায় এক কোটি লোক যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল এবং বাকী যারা দেশে রয়েছিল, তারা সবাই অশেষ দুঃখ কষ্ট ভোগ করেছে। আমাদের এই মুক্তি সংগ্রামে যারা রক্ত দিয়েছে সেই বীর মুক্তিবাহিনী ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক সমাজ, বাংলার হিন্দু-মুসলমান, ইপিআর, পুলিশ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও অন্য আর সবাইকে আমার সালাম জানাই।
আমার সহকর্মীরা, আপনারা মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার ব্যাপারে যে দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছেন তার জন্য আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আপনাদের মুজিব ভাই আহ্বান জানিয়েছিলেন, আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আপনারা যুদ্ধ করেছেন। তাঁর নির্দেশ মেনে চলেছেন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন। আমার জীবনের একমাত্র কামনা বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের খাদ্য পায়, আশ্রয় পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।
পাকিস্তানী কারাগার থেকে আমি যখন মুক্ত হই, তখন জনাব ভুট্টো আমাকে অনুরোধ করেছিলেন-সম্ভব হলে আমি যেন দু’দেশের মধ্যে একটা শিথিল সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করি। আমি তাকে বলেছিলাম আমার জনসাধারণের কাছে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আমি আপনাকে এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারি না। এখন আমি বলতে চাই, জনাব ভুট্টো সাহেব, আপনারা শান্তিতে থাকুন। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এখন যদি কেউ বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়, তাহলে সে স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য মুজিব সর্বপ্রথম প্রাণ দিবে। পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশে যে নির্বিচার গণহত্যা করেছে, তার অনুসন্ধান ও ব্যাপকতা নির্ধারণের জন্য আমি জাতিসংঘের নিকট একটা আন্তর্জাতিক ট্রাইবুন্যাল গঠনের আহ্বান জানাচ্ছি।
আমি বিশ্বের সকল মুক্ত দেশকে অনুরোধ জানাই, আপনারা অবিলম্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন এবং সত্বর বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্য করে নেয়ার জন্য সাহায্য করুন। জয় বাংলা।
[‘বজ্রকন্ঠ’ বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকা ঢাকা ১৯৭২ থেকে সংগৃহীত]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • লোক সাহিত্যে মননশীলতা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • স্বাধীন বাংলাদেশে জনতার উদ্দেশ্যে প্রথম ভাষণ
  • সাচনাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • একাত্তরের শরণার্থীর স্মৃতি
  • আরব বিশ্বের অনন্য শাসক
  • জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ
  • বালাগঞ্জের আজিজপুর উচ্চবিদ্যালয়
  • হারিয়ে যাচ্ছে ডাকপিয়ন ও ডাকবাক্স
  • সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতি
  • সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও শাবি
  • মরমী কবি শেখ ভানু
  • মুক্তিযুদ্ধে কানাইঘাট
  • বিপ্লবী এম.এন.রায়
  • Developed by: Sparkle IT