ধর্ম ও জীবন

আল্লামা আব্দুর রহমান বর্ণী (রহ.)

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০১-২০২০ ইং ০০:৪৬:৩৫ | সংবাদটি ২৮০ বার পঠিত

প্রখ্যাত বুযুর্গ আল্লামা আব্দুর রহমান বর্ণী (রহ.) ১৯৩২ সালে সিলেট জেলার বিয়ানিবাজার উপজেলার টিকরপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন খ্যাতিমান আলেম, বুযুর্গ, ও ওলী ছিলেন। তিনি ১৯৫৭ সালে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা হতে কামিল উত্তীর্ণ হন। তৎকালীন সময়ের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসদের নিকট হতে ইলমে হাদীসের বিশেষ ইলম অর্জন করেন। তখনকার সময়ে উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ, শায়খুল হাদীস আল্লামা হরমুজ-উল্লাহ শায়দা (রহ.) এর নিকট হাদীসের উপর গভীর শিক্ষা লাভ করেন। আল্লামা শায়দা (রহ.) তার প্রিয়ছাত্র আব্দুর রহমান বর্ণীকে আদর-স্নেহ আর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছিলেন। ছোটকাল হতেই আল্লামা আব্দুর রহমান বর্ণী (রহ.) এর চেহারা-সুরতে একজন ওলীর ছাপ ফুটে উঠেছিল। তিনি তৎকালীন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ওলী আল্লাহদের সান্নিধ্যে নিজের জীবন কে উৎসর্গ করেছিলেন। বিশেষ করে যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গ, শামছুল উলামা আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.) এর একান্ত সান্নিধ্যে থেকে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিক্ষা লাভের জন্য দারুল কেরাতের সনদ লাভ করেন। সে সময়ে আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর সুহবতে ধন্য হয়ে ইলমে তাসাউফের শিক্ষা লাভ করতে থাকেন। এবং ক্রমান্বয়ে তরিক্বতের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে তাসাউফের উচ্চশিখরে আরোহন করেন।
স্বীয় মুর্শীদ আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর নির্দেশে প্রায়ই তিনি তার মুর্শীদের সাথে ঘিলাছড়া চা বাগানের পাহাড়ের গহীন কন্দরে চিশতিয়া তরিকার চিল্লায় মশগুল থাকতেন। নিজের পরিবার-পরিজন আত্মীয় স্বজনের মোহ ত্যাগ করে আল্লাহ ও তার প্রিয় রাসুল (সা.) কে পাওয়ার জন্য নির্জনবাসকেই তিনি পছন্দ করতেন। তাইতো তার স্বীয় মুর্শিদ শামছুল উলামা আল্লামা ফুলতলী (রহ.) তার শিষ্য আব্দুর রহমান বর্ণীকে তার স্বীয় পাগড়ী মাথা থেকে খুলে আব্দুর রহমান বর্ণী (রহ.) এর মাথায় পরিধান করে দিয়ে তার জন্য খাস দোয়া করেন এবং তরিকতের ইজাজত প্রদান করেন। আল্লামা আব্দুর রহমান বর্ণী (রহ.) শামছুল উলামা ফুলতলী সাহেব (রহ.) এর ইজাজত প্রাপ্ত প্রথম স্তরের খলিফা ছিলেন।
আল্লামা আব্দুর রহমান বর্ণী (রহ.) আদর্শ মানুষ গড়ার একজন শ্রেষ্ঠ কারিগর ছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষ করেই বর্ণী (রহ.) ১৯৫৭ সালে রাখালগঞ্জ দারুল কোরআন মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তারই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় রাখালগঞ্জ মাদরাসা দাখিল ও আলিম স্তরে উন্নীত হয়। আল্লামা বর্ণী (রহ.) রাখালগঞ্জ মাদরাসাকে তিলে তিলে বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মাদরাসায় রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর খাস দুয়া ও ইজাজতের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালে তিনি রাখালগঞ্জ সিনিয়র মাদরাসার প্রিন্সিপাল পদ পরিত্যাগ করে চান্দগ্রাম ইবতেদায়ী মাদরাসার সুপারের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করেন নি। আল্লামা ফুলতলী (রহ.) এর প্রতি তার ভালোবাসা এতো বেশি ছিল যে সাহেব যেকোন নির্দেশ দিলেই তিনি তা মান্য করতেন। আল্লামা বর্ণী (রহ.) এর একনিষ্ঠ ত্যাগ আর লিল্লাহিয়াতের কারণেই চান্দগ্রাম ইবতেদায়ী মাদরাসা পর্যায়ক্রমে দাখিল হতে ফাজিল পর্যন্ত উন্নীত হয়। সেজন্য আল্লামা বণী (রহ.) কে বলা হতো মাদরাসা গড়ার কারিগর। তিনি ঐ মাদরাসার অধ্যক্ষ হিসেবেই অবসর গ্রহণ করেন। তিনি প্রায় ২০টির মতো মাদরাসা, মসজিদ ও খানকা প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
হযরত মাওলানা আব্দুর রহমান বর্ণী (রহ.) একজন খাঁটি ওলী আল্লাহ ছিলেন। তার জীবন ছিল প্রিয় নবী (সা.) এর আদর্শের বাস্তব নমুনা। সুরত-সিরতে তিনি প্রিয় নবী (সা.) এর আদর্শের এক জীবন্ত মানুষ ছিলেন। সুফীদের ভাষায়, “তুমি যদি খোদার প্রেমে পরিপূর্ণতা লাভ করতে চাও, তবে তুমি দুনিয়ার ধন-দৌলত ও সোনা রূপার মুহাব্বত ত্যাগ কর; তবে খোদার ভালবাসা লাভ করিতে পারিবে। কেননা দুনিয়ার ধন-দৌলতের উপর মুহাব্বত রাখিলে খোদার মোহাব্বত হাসিল হয় না। দুনিয়ার ভালোবাসা আল্লাহর মোহাব্বত হইতে ফিরাইয়া রাখে। পার্থিব বস্তুর মোহাব্বত যত কম হইবে, ততই আল্লার মোহাব্বত বেশি হইবে। আস্তে আস্তে ক্রমান্বয়ে কামেল হইতে থাকিবে তুমি।”
আল্লামা বর্ণী (রহ.) এর জীবনের দর্শন ছিল আল্লাহর ভালোবাসায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করা। তাইতো দুনিয়ার প্রতি তার মুহব্বত খুব কমই ছিল। তার চাল-চলন, পোশাক আশাক, খুবই সাদামাটা ছিল। তিনি সবসময় সুন্নতি পোশাক পরিধান করতেন। সলফে সালেহিন বুযুর্গদের নীতি ছিল সাদামাটা জীবন পরিচালনা করা। আল্লামা বর্ণী (রহ.) ও খুব সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। টাকা-পয়সা অর্থ সম্পদের প্রতি তার কোন লোভ ছিল না। যা কিছু অর্থসম্পদ হাতে থাকতো তা তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও গরীব-দুঃখী মানুষের জন্য ব্যয় করে ফেলতেন। টাকা পয়সা তিনি জমা করে রাখতেন না, তিনি বলতেন টাকা-পয়সা হাতে বেশি থাকলে দুনিয়ার প্রতি মুহাব্বত সৃষ্টি হয়ে যাবে। আর দুনিয়ার প্রতি মুহাব্বত বেশি হয়ে গেলে আমার আল্লাহর প্রতি মুহাব্বত কমে যাবে। তাইতো দেখা যায় আল্লার ওলী আল্লামা বর্ণী রহ. একটি ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরে ও তার কাছে কোন টাকা সঞ্চিত ছিল না। এমনকি ইন্তেকালের পর ও তার সঞ্চিত কোন অর্থ ছিল না। ক্ষমতাবান বা ধন্যাঢ্য কোন ব্যক্তির সাথে দেখা হলে তিনি মসজিদ, মাদরাসার সাহায্যের কথা বলতেন। কোনদিন নিজের ব্যক্তিগত কোন প্রয়োজনের কথা কাউকে বলতেন না। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ-প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরী বলেন, আল্লামা আব্দুর রহমান বর্ণী (রহ.) ছিলেন একজন বড় মাপের আলিম। তিনি তার জীবদ্দশায় যতদিন আমার সাখে দেখা হয়েছে ততদিন দ্বীনি খেদমতের কথা বলেছেন। কোনদিন ব্যক্তিগত কোন চাওয়া-পাওয়ার আবেদন করেন নি। (শ্যামল সিলেট ৮ মে ২০০২)
আল্লামা বর্ণী (রহ.) ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত নামাজের পাশাপাশি নফল নামাজের প্রতিও পাবন্দ ছিলেন। জিকির, মুরাক্বাবা, মুশাহাদা ও তাহাজ্জুদ নামাজ তার জীবনের নিত্যসঙ্গি ছিল। রাসুল (সা.) এর প্রতি তার মুহাব্বত এতো বেশি ছিল যে, তিনি তার জীবনে ছোট খাটো সুন্নাত যেগুলোকে আমরা অনেকেই খেয়াল করিনা। যেমন জুতা পরা, পোশাক পরিধান করার সময় ডান দিক হতে ব্যবহার শুরু করা। আর খোলার সময় বাম দিক হতে খোলা। এগুলো তিনি সবসময় খেয়াল রাখতেন। ফজরের নামাজের পরে কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি হিযবুল বাহার, দালাইলুল খায়রাত ইত্যাদি ওজিফা নিয়মিত পাঠ করতেন। প্রত্যেক নামাজের সময় পরিবারের সবাইকে সাথে নিয়ে মসজিদের জামাতে শরিক হতেন। আল্লামা বর্ণী (রহ.) তার সকল সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষায় আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি সর্বক্ষেত্রেই দ্বীনদারিকেই গুরুত্ব দিতেন। এমনকি পরিবার গঠনের ক্ষেত্রে ও তিনি দ্বীনদার ও আলিম পরিবারকে গুরুত্ব দিতেন।
আল্লামা বর্ণী (রহ.) এর জীবন দর্শন ছিল আল্লাহ ও রাসুল প্রেমের দর্শন। তিনি একজন প্রসিদ্ধ ওয়াজী ছিলেন তার ওয়াজ শুনে অসংখ্য সাধারণ মানুষ আল্লাহ ওয়ালা হয়ে যেতেন। তিনি ওয়াজ মাহফিলে আল্লাহ ও রাসুল (সা.) কে ভালোবাসার গুরুত্ব অত্যন্ত সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। যার কারণে অসংখ্যা মানুষ বর্ণা (রহ.) এর ওয়াজ শুনে আল্লাহ ও রাসুল প্রেমে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিল। মহান এ মনীষির জীবনের দর্শন আমার মতো অতি নগন্য মানুষের পক্ষে ফুটিয়ে তুলা সম্ভব নয় এটাই বাস্তব। এক কথায় বলতে পারি আল্লামা আব্দুর রহমান বর্ণী (রহ.) এর জীবন দর্শন ছিলো আল্লাহ ও রাসুল (সা.) এর ভালোবাসায় উৎসর্গিত। এ মহান মনীষি ২০০২ সালের ৯ই এপ্রিল দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে মহান আল্লাহ সুবহানু ওয়াতায়ালার একান্ত সান্নিধ্যে চলে গেলেন। তিনি যে একজন সত্যিকার ওলী আল্লাহ ছিলেন তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হচ্ছে তার জানাজার নামাজ। তিনি যেদিন ইন্তেকাল করেন সেদিন অরিবাম বৃষ্টি চলছিল, কিন্তু মহান আল্লাহর কী মেহেরবাণী, তার জানাজার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা যেন তার প্রিয় বান্দাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT