ধর্ম ও জীবন

ইসলামের খেদমতে পীর ছদর উদ্দীন (রহ.)

মো. আব্দুশ শহীদ নেগালী প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০১-২০২০ ইং ০১:১৫:৪৩ | সংবাদটি ২৪৪ বার পঠিত

ভারত উপমহাদেশে পীর মাশায়েখদের যত মকবুল ছিলছিলা রয়েছে, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে রামপুরী ছিলছিলা। এ ছিলছিলার একজন নিবেদিতপ্রাণ পুরুষ ছিলেন মাওলানা ছদর উদ্দীন পীর সাহেব। তাঁর পিতা মাওলানা শফী উদ্দীন পীর সাহেব (র.) ছিলেন একজন প্রখ্যাত বুজুর্গ। দাদা মাওলানা আব্দুর রহীম (র.) এবং পরদাদা মৌলভী রৌশন মুনসী (র.)ও ছিলেন তাসাউফ পন্থি বুজুর্গ ব্যক্তিদ্বয়।
৩০শে জানুয়ারি মোগলাবাজার ইউ.পি ও থানাধীন রাঘবপুর গ্রামে নিজ বাড়ি সংলগ্ন মাঠে বিশাল আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মাওলানা ছদর উদ্দীন পীর সাহেবের তৃতীয় বার্ষিকী এবং তাঁর পিতৃপুরুষদের ৪২তম ইসালে ছাওয়াব মাহফিল।
মাওলানা ছদর উদ্দীন পীর সাহেব (র.) এর সনদপত্র থেকে অনুধাবন করা যায় যে, ছাত্র জীবনে তিনি ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্রী। মোগলাবাজার রেবতীরমন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, দাউদপুর সিনিয়র মাদ্রাসা ও সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়ার মধ্য দিয়ে ছাত্র জীবন সমাপ্ত করেন।
ইলমে তাসাউফের শিক্ষা তাঁর পিতার কাছে শুরু করেন। তাঁর পিতা মরহুম শফী উদ্দীন (র.) এর অনেক ভক্তবৃন্দ ভারতবর্ষের রামপুর আসাম ও শ্রীকোনায় বিদ্যমান ছিলেন বিধায়, তিনি বছরে দু’একবার ভারত সফরে যেতেন। মাওলানা শফী উদ্দীন (র.) ২৩/০৮/১৯৭৮ ইং ইন্তেকাল করলে এ ছিলছিলার হাল ধরেন মাওলানা ছদর উদ্দীন পীর সাহেব (র.)। পিতার ভক্ত মুরিদানের নিমন্ত্রণে ভারত সফরে আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়ে পরিচয় ঘটে ভারত দিল্লী রামপুরের প্রখ্যাত বুজুর্গ, মরহুম মকসুদ আহমদ (র.) এর সাথে। তখন থেকে তিনিও বছরে একবার রাঘবপুর সাহেব বাড়িতে সফরে আসতেন। তাঁর কাছ থেকে মাওলানা ছদর উদ্দীন সাহেব (র.) ইলমে তাসাউফের পূর্ণতাসহ অনেক ফয়েজ ও বরকত হাসিল করতেন। ভারতবর্ষের একজন প্রখ্যাত বুজুর্গ হাফিজ মাওলানা লুৎফুছ ছামাদ (র.) ও বার্ষিক ইসালে ছওয়াব মাহফিলে রাঘবপুর সাহেব বাড়িতে তশরিফ আনতেন। তাঁর সাথে মাওলানা ছদর উদ্দীন সাহেব (র.) ইলমে তাসাউফের আদান-প্রদান করতেন। তাঁর পিতা মরহুম শফিউদ্দীন (র.) এর প্রথম ইসালে ছওয়াব মাহফিলে ভারতসহ বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্তবৃন্দের আগমন ঘটলে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। প্রিয় মুর্শিদের অনুপস্থিতিতে মাওলানা ছদর উদ্দীন সাহেবের হাতে তরিকতের বায়আত গ্রহণ করে প্রিয় মুরশিদের বিচ্ছেদ ব্যথা কিছুটা লাঘব করেন। তখন থেকে এই ইসালে ছওয়াব মাহফিলটি বিশাল আকার ধারণ করে। ভারতসহ সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তাঁর পিতার ভক্তবৃন্দরা প্রতি বছর এ মাহফিলে এসে ক্রমান্বয়ে তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করা শুরু করেন। পীরজাদা পীরকে মুর্শিদ হিসেবে পেয়ে অনেকেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। ভক্ত মুরিদানদের নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথা পাড়া-মহল্লায়, গ্রামে-গঞ্জে, ইসলাহ বা আত্মশুদ্ধির জন্য ইসলাহী মাহফিলের প্রচলন করেন।
তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ তেলাওয়াতকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। তাঁর প্রচলিত ইসলাহী মাহফিলের কর্মসূচীর মধ্যে ছিল ‘সবিনা খতম’ রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হবার পর নসিহতমূলক আলোচনা, জিকির আজকার, শেষ রাতে তরিকতের জিকির ও মোনাজাত। বাদ ফজর মিলাদ মাহফিল ও শেষ দোয়া ইত্যাদি।
ইসলাহী মাহফিলে সবিনা খতমের কর্মসূচী থাকায়, আমি নিজে তাঁর সফর সঙ্গী হবার সুযোগ পেয়ে থাকতাম। সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর সফর সঙ্গী হয়ে যাতায়াত করেছি। এবং এ রকম ইসলাহী মাহফিল যেন আমার মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল। অপসংস্কৃতি থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্য তিনি ব্যাপকহারে এ রকম মাহফিলের প্রচলন করেছিলেন এবং প্রতিটি মাহফিলে তিনি উপস্থিত থাকতেন। আমরা যখন কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতাম, তখন তিনি নিরবে দীর্ঘক্ষণ বসে তেলাওয়াত শ্রবণ করতেন।
তাঁর জীবনের মধ্যখানে মরহুম আব্দুল লতিফ ফুলতলী পীর সাহেবের সাথে সাক্ষাত করে তাঁর কাছ থেকে অনেক ফয়েজ বরকত লাভ করেন। তিনি ফুলতলী পীর সাহেবকে মুর্শিদ ও পিতার মত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন। প্রথম দিকে মাওলানা ছদর উদ্দীন সাহেব তাঁর পিতা ও পিতৃপুরুষদের ইছালে ছওয়াব মাহফিল করতেন ‘জমিয়তে রহমতিয়ার’ ব্যানারে। ফুলতলী পীর সাহেবের সাথে সাক্ষাতের পর থেকে তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষার্থে ‘জমিয়তের’ পরিবর্তে আঞ্জুমান শব্দটি ব্যবহার করে কতেক বছর ‘আঞ্জুমানে রহমতিয়া’ ব্যানারে এ বিশাল মাহফিলের আয়োজন করেন। এ ইসালে ছওয়াব মাহফিলের আকর্ষণ দিন দিন বর্ধিত হচ্ছে। মাওলানা ছদর উদ্দীন পীর সাহেব (র.) রাঘবপুরী পীর সাহেব নামে যদিও পরিচিত, কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলে তাকে নেগালী ছা-ব, নামে সম্বোধন করতেন। বর্তমানে রামপুরী ছিলছিলা থেকে রাঘবপুরী ছিলছিলা বেশ পরিচিত। মোগলাবাজার থানাধীন বিভিন্ন অঞ্চলে, বাউল গান, মালজোড়া আর পালার গানের নামে অনেক অপসংস্কৃতির আসর বসতো বছরে একবার। এ সমস্ত অপসংস্কৃতির মোকাবিলার জন্য পাড়া মহল্লায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ওয়াজ মাহফিলের। মাযারগুলোকে (আউলিয়াদের) অপসংস্কৃতি থেকে রক্ষার জন্য মাযার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যিকির ও মিলাদ মাহফিল। তিনি তার ভক্ত মুরিদানদেন সহযোগিতায় বহু অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ইসলামী সম্মেলন, ওয়াজ মাহফিল, আর খানেকার। মাওলানা ছদর উদ্দীন সাহেব (র.) ছিলেন সুন্নতে নববীর পূর্ণ অনুসারী। অপরদিকে ছিলেন ‘দা’য়ী ইল্লাল্লাহ’ মিষ্টভাষী বক্তা হিসেবে অনেক সুখ্যাতি ছিল। রাসুলে করীম (সা.) এর শান-মানকে তাঁর আলোচনায় অগ্রাধিকার দিতেন। ইসলামের খেদমতের জন্য ফুলতলী পীর সাহেব তাকে তাঁর আওলাদের মত ¯েœহ করতেন। ফুলতলী ছিলছিলা, দেওবন্দি ছিলছিলা আর রাঘবপুরী ছিলছিলা মূলত একটি বৃক্ষের শাখা প্রশাখার মত। মাওলানা ছদর উদ্দীন পীর সাহেবের অন্তর ছিল রাসুল প্রেমে সিক্ত। সমাজ ও ভক্তবৃন্দের মধ্যে আহলে সুন্নাতওয়াল জামাতের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনভর প্রাণ-পণ চেষ্টা করে গেছেন। দিল্লি রামপুরের বুজুর্গ মরহুম মকছুদ আহমদ (র.) এর কাছ থেকে ইলমে তাসাউফের পূর্ণতা অর্জন করার পর তারই নির্দেশে ভক্তবৃন্দের জাহির বাতিনকে ইসলাহ করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাঁর দাদা পীর ভারত বর্ষের দিল্লি রামপুরের ইব্রাহীম সাহেব (র.) ছিলেন সেকালের একজন শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ ব্যক্তি। তার পিতা আবু মোয়াজ্জম শফিউদ্দীন (র.) তার পূর্ব পুরুষদের ইছালে ছওয়াব মাহফিলে শুরু করতেন সাবিনা খতমের মাধ্যমে। এ নিয়মে তিনিও বাদ ফজর থেকে খতমে কোরআন, বাদ জোহর থেকে ধারাবাহিক বয়ান, বাদ মাগরিব খতমে খাজেগান, তরিকতের জিকির রাতব্যাপী ওয়াজ মাহফিল, বাদ ফজর আখেরী মোনাজাত, মধ্যরাত ও বাদ ফজর এ দু’বার সিন্নি বা তাবাররুক বিতরণের মধ্য দিয়ে সভার সমাপ্তি ঘটে। এ নিয়ম এখনও অব্যাহত রয়েছে। দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন মরহুম ছদর উদ্দীন সাহেবের তৃতীয় সাহেব জাদা মাওলানা মা’রুফ আহমদ জুনেদ।
মাওলানা ছদর উদ্দীন সাহেব নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন রাঘবপুর দরগাহ শরীফ একাডেমী। তাঁর মরহুম ছোট সহোদরের নামে ছালেহ আহমদ হাফিজিয়া মাদ্রাসা। বর্তমানে সংযুক্ত করা হয়েছে সদ্য প্রয়াত তাঁর বড় ছাহেব জাদার নাম যেমন-ছালেহ আহমদ, মুহসিন উদ্দীন হিফযুল কুরআন মাদ্রাসা। আরও রয়েছে তার প্রতিষ্ঠিত প্রতি বৃহস্পতিবারে সাপ্তাহিক খানেকা, প্রতি শুক্রবারে সাপ্তাহিক দারুল ক্বিরাত এবং আরবী শিক্ষাকেন্দ্র। ৩০শে জানুয়ারি ২০২০ সকাল থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে বিশাল আয়োজনে তরিকতের বুজুর্গদের বার্ষিক ইসালে ছওয়াব মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে মোগলাবাজার রাঘবপুর নিজ বাড়িতে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT