ধর্ম ও জীবন সৈয়দ আহমদ

জিয়ারতে সোনার মদিনা

প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০১-২০২০ ইং ০১:১৮:৩২ | সংবাদটি ১৩১ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর] ‘মসজিদে জুমা’ মসজিদটিও রাসুল (সা.) এর স্মৃতিধন্য, প্রাচীনতম অনন্য একটি মসজিদ। হিজরতের প্রথম হিজরি সনে রাসুল (সা.) যখন মদিনায় পৌঁছেছিলেন তখন দিনটি ছিল শুক্রবার। যাত্রা পথে তিনি বনি সালেম গোত্রের এলাকায় পৌঁছলে জোহরের নামাজের সময় হয়ে যায়। সেখানে তিনি জোহরের নামাজের পরিবর্তে দু’রাকাত জুমার নামাজ আদায় করেছিলেন। ইতিহাসের আলোকে এই মসজিদে, এটাই প্রথম জুমার নামাজ। প্রায় শতাধিক সাহাবিগণকে নিয়ে মসজিদটিতে জুমার নামাজ আদায় করেছিলেন বলেই মসজিদটির নাম ‘মসজিদে জুমা’ নামকরণ করা হয়েছিল। জুমা নামে পবিত্র কোরআনে একটি স্বতন্ত্র সুরা রয়েছে। সাদা রঙের কারুকার্য খচিত জুমা মসজিদটি নবীজি (সা.) এর পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে দুনিয়াবাসীর কাছে আজও স্বাক্ষী হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। সেই স্মৃতি ধারণকৃত জুমা মসজিদটি এক নজর দেখার জন্য দুনিয়ার সকল মুমিন মুসলমান ও হাজিবৃন্দ তথায় ভীড় করে থাকেন।
রাসুল (সা.) এর ভালোবাসার পাহাড়ের নাম ‘ওহুদ পাহাড়’। পাহাড়টি মদিনা নগরী ও মসজিদে নববী থেকে মাত্র পাঁচ কি.মি দূরত্বে উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। বদর যুদ্ধের নির্মম পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে মক্কাবাসী কুরাইশবৃন্দ ওহুদ যুদ্ধের সূচনা করেছিল। এটি সেই পাহাড় যে পাহাড় প্রান্তরে মক্কার কুরাইশবৃন্দ প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধক্ষেত্রে নির্মমভাবে আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীজি (সা.) এর দান্দান মোবারক শহিদ করে নবীজি (সা.) কে রক্তাক্ত করেছিল। সেই ওহুদ পাহাড় প্রান্তরে যুদ্ধক্ষেত্রে নবী করিম (সা.) এর চাচা মহাবীর হযরত আমির হামযা (রা.) এবং হযরত আকিল ইবনে উমাইয়া (রা.) সহ ৭০ জন সাহাবি শহিদ হয়েছিলেন। হযরত আমির হামযা (রা.) সহ ৭০ জন সাহাবিকে উক্ত ওহুদ পাহাড় সংলগ্ন প্রান্তরেই সমাহিত করা হয়েছিল। আমির হামযা (রা.) এর নামে পাহাড় সংলগ্ন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মসজিদ রয়েছে। ওহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের আল ইমরান সুরায় ৫০টি আয়াত নাজিল হয়েছিল। কুরআন পাঠে ওহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। ৩৫৩৩ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন ওহুদ পাহাড় সংলগ্ন প্রান্তরে ২৩ মার্চ ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে নবীজি (সা.) এর সাথে শত্রুদের প্রধানতম যুদ্ধ সমূহের মধ্যে ওহুদ যুদ্ধ ছিল দ্বিতীয়, প্রথম যুদ্ধ হয়েছিল বদর প্রান্তরে এবং তৃতীয় যুদ্ধ হয়েছিল খন্দক প্রান্তরে পরিখা খননের মাধ্যমে। ওহুদ পাহাড়ের পার্শ্বেই রয়েছে জাবালে রোমান, যেখানে নবীজি (সা.) তীরন্দাজ বাহিনী নিয়োজিত রেখেছিলেন। রোমান পাহাড়ের তীরন্দাজ বাহিনীর ভুলের কারণেই ওহুদ যুদ্ধে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ও ৭০ জন শহিদ হয়েছিলেন এবং নবীজি (সা.) স্বয়ং আহত হয়েছিলেন। সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে, ইসলামের বিজয় নিশান যারা ধরে রেখেছিল সেই শহিদগণের ত্যাগের স্বীকৃতি দিতেই মুমিন মুসলমান ওহুদ প্রান্তর দেখতে ভীড় করে থাকেন। স্ত্রী সন্তান নিয়ে উক্ত ওহুদ পাহাড় দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ওহুদ যুদ্ধে আল্লাহর হেকমত ও মুসলমানদের চিরন্তন শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
মসজিদে আয়শা বা মসজিদে তানঈম পবিত্র মক্কানগরী থেকে প্রায় ছয় কি.মি উত্তর দিকের মক্কা মদিনা রোডের আল হিজরা অঞ্চলের তানঈম এলাকায় অবস্থিত। তাই আয়শা মসজিদকে মক্কাবাসী মসজিদে তানঈম বলে থাকেন। উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়শা (রা.) বিদায় হজের সময় হযরত রাসুল (সা.) এর নির্দেশে উক্ত মসজিদ থেকে ইহরাম বেঁধে ওমরা পালন করেছিলেন। তাই উক্ত মসজিদকে আয়শা মসজিদ বলা হয়ে থাকে এবং মক্কাবাসীরা উক্ত আয়শা মসজিদ থেকেই ইহরাম বেঁধে ওমরা করে থাকেন। ওমরা পালনের নিয়ত করতে নবী প্রেমিক হাজার হাজার হাজিগণের ভীড় লেগে থাকে আয়শা মসজিদ প্রাঙ্গণে। মসজিদটি ইসলামী শিল্প নৈপূণ্যের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। বিশাল এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত মসজিদটির সুউচ্চ দু’টি মিনার ও একটি বৃহৎ গম্বুজ মসজিদটির সৌন্দর্য অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। সুউচ্চ মিনারটি বহুদূর থেকেই দৃশ্যমান। চতুর্দিকের খেজুর বৃক্ষ মসজিদটিকে যেমন সবুজায়নে সমৃদ্ধ করেছে তদ্রƒপ মসজিদের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদটিতে ওজু, গোসল করার জন্য রয়েছে উত্তম সুব্যবস্থা। মহিলাদের জন্যও রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। তাই ইচ্ছা করলে আয়শা মসজিদ থেকেই হাজিগণকে ওজু-গোসল করতঃ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র হয়ে ওমরার জন্য নিয়ত করে ওমরা পালন করা সম্ভব এবং দেশি-বিদেশী ওমরা পালনকারী তাই করে থাকেন। আমি, স্ত্রী ও আমার ছোট ছেলে দুই দুইবার সেখান থেকে নিয়ত করে ওমরা পালন করেছিলাম এবং দেশবাসী, সহকর্মী, পিতা-মাতা ও সন্তান সন্ততিদের জন্য প্রাণ খুলে কাবাগৃহ সৃষ্টিকারীর নিকট ক্ষমা ও দোয়া করেছিলাম।
প্রিয় নবীজি (সা.) এর স্মৃতিধন্য পুণ্যভূমি মদিনা ছেড়ে আসতে ইচ্ছা হয় না, কেননা হৃদয়ের টানে অন্তর কাঁদে। মুসলমানদের রক্ত কণিকার টান, রূপ-রস-মৃত্তিকার ঘ্রাণ, হৃদয়ের টান, মহান আল্লাহর হাজার হাজার দান-অবদান দেখে কৃতজ্ঞতায় নত হয় হৃদয় মন জান। তথাপি সফরের সময় শেষ হওয়ায় বাধ্য হয়ে চলে আসতে হল। ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ মদিনা থেকে জেদ্দা বিমানবন্দর আসার জন্য রিজার্ভ করা বাসে উঠলাম। আমরা ৩০ জন যাত্রী ওমরা শেষে দেশে ফিরছিলাম। মক্কা থেকে মদিনায় আসার দিনতো বটেই, মদিনা থেকে জেদ্দা বিমানবন্দর আসার পথেও রাস্তার উভয় পার্শ্বের চিত্র দেখে মন প্রাণ ভরে উঠেছিল, হৃদয়ে এসেছিল প্রশান্তি। জেদ্দা নগরী সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের লোহিত সাগর তীরে অবস্থিত ‘তিহামাহ’ অঞ্চলের বৃহৎ, সমৃদ্ধ উন্নত সমুদ্র বন্দর। জেদ্দা সমুদ্র বন্দর থেকে ১৯ কি.মি উত্তরে জেদ্দা বিমান বন্দর অবস্থিত। জেদ্দা থেকে মদিনার দূরত্ব ৪২০ কি.মি এবং মক্কা থেকে জেদ্দার দূরত্ব ৭২ কি.মি। পাহাড় টিলা পর্বত বেষ্টিত সৌদি আরবের পুণ্যভূমি মক্কা মদিনার সৌন্দর্য্যই আলাদা। অধিকাংশ এলাকার মাটি, পাথর জড়ানো পুড়া মাটির মত শুকনা মাটি। পাহাড়, পর্বত, টিলাগুলোর মাটি শক্ত ও পাথর সমৃদ্ধ, তাই পাহাড়গুলো আমাদের দেশের পাহাড়গুলোর মত ধ্বসে পড়ে না। ছোট বড় পাহাড় কেটে পাহাড়ের ভিতর দিয়ে অথবা পাহাড়ের উপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। রাস্তার উভয় পার্শ্বের মাটি পাহাড় সমান উঁচু করে রাখা হয়েছে অথচ মাটি বা পাথর ভেঙ্গে নীচের রাস্তায় পড়ছে না। পবিত্র মক্কা থেকে মদিনায় আসার দিন দেখেছিলাম আবার মদিনা থেকে জেদ্দা বিমানবন্দরে আসার দিনও রাস্তার উভয় পার্শ্বের চিত্র দেখে হৃদয় মন ভরে গিয়েছিল। পবিত্র তায়েফ নগরী ও রাস্তা দেখেও শরীর হিম হয়ে হার্ট বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) প্রাণ খুলে দেশটির জন্য, দেশের মানুষের জন্য দোয়া করেছিলেন বলেই তারা আজ সুখী, উন্নত ও সমৃদ্ধ। [চলবে]

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT