পাঁচ মিশালী

প্রাচীন বাংলার রাজধানী পানামনগরে একদিন

চৌধুরী ইসফাকুর রহমান কুরেশী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০২-২০২০ ইং ০০:৪১:৪০ | সংবাদটি ২৯৫ বার পঠিত

আমি একজন ইতিহাস ও ঐতিহ্য প্রেমিক মানুষ। যুগেযুগে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রস্থল ছিল সোনারগাঁ। বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাস পড়ে সোনারগাঁ দেখার এক অদম্য বাসনা আমাকে পেয়ে বসে। ঢাকায় পূবালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বদলী হয়ে এসেই আমি ঐতিহাসিক সোনারগাঁ দেখার পরিকল্পনা করি। এই সোনারগাঁ ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে কখনও স্বাধীন বাংলার, কখনও করদ বঙ্গরাজ্যের, কখনও ভারতের বাঙ্গালা প্রদেশের রাজধানী ছিল। এখানে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ, সিকান্দর শাহ, গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ, শামসুউদ্দিন ইলিয়াস শাহের মত প্রখ্যাত মধ্যযুগীয় শাসকরা। ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ ছিলেন পূর্ব বঙ্গের প্রথম স্বাধীন সুলতান, তার শাসনামলে ১৩৪৫ সালে সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ:) জান্নাতবাসী হন। সিকান্দর শাহকে অধীনতা স্বীকারে বাধ্য করতে দিল্লী অধিপতি ফিরূজ শাহ তুঘলক আশি হাজার সৈন্য নিয়ে বাংলা আক্রমণ করলে তিনি একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। বাংলায় বর্ষার আগমণে জলাবদ্ধ পশ্চিমা সৈন্যরা অবরোধ তুলে নিয়ে কোন বিজয় অর্জন ছাড়াই দিল্লী ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
সিকান্দর শাহের পুত্র গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ ছিলেন এক আকর্ষণীয় চরিত্র। তিনি বাবার প্রথম সন্তান হওয়া সত্ত্বেও বৈমাত্রের প্ররোচনায় উত্তরাধিকার বঞ্চিত হলে বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং পিতা সিকন্দর শাহকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করে ১৩৮৯ সালে বাঙ্গালার মসনদে আসীন হন। ক্ষমতা দখল করেই বৈমাত্রের দশজন ভাইকে অন্ধ করে দেন। কিংবদন্তির এই শাসক চীনের মিং রাজবংশের সাথে সংস্কৃতি এবং দূত বিনিময় করেন। তিনি পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজের সাথে পত্র বিনিময় করেন। এই কিংবদন্তি সুলতানের চারজন সুন্দরী পত্নী ছিলেন, তাদের নাম চার ধরনের ফুলের নামে ছিল-গুল (গোলাপ), লালা (টিঊলিপ) ইত্যাদি। তিনি ছোট বউকে বেশী ভালবাসতেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে চলে গেলে ছোট বউকে তার মৃতদেহ গোসলের ওসিয়ত করেন। পরে তিনি সুস্থ হয়ে গেলে একদিন ছোটবউ অভিযোগ করেন তার সতীনরা তাকে ‘গোসলী’ বলে হাসিঠাট্টা করেন। এই ঘটনার বিহিত ব্যবস্থা কি হতে পারে জানতে চেয়ে তিনি পারস্যের কবি হাফিজের কাছে দূত প্রেরণ করেন। কবি হাফিজ একটি সুন্দর কবিতার মাধ্যমে সুলতানেকে বিহিত চিকিৎসা বাতলে দেন। গিয়াস উদ্দিন তার লিখা অসমাপ্ত কবিতা কবি হাফিজের কাছে প্রেরণ করেন, কবি হাফিজ কবিতার অসমাপ্ত অংশ নিজে লিখে তার কাছে ফেরত পাঠান।
গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ একবার শিকারে গিয়ে তীর ছুড়লে ভুলবশতঃ এক এতিম বালকের গায়ে বিদ্ধ হয় এবং ছেলেটি মারা যায়। বালকের মা কাজীর দরবারে সুলতানের বিরুদ্ধে নালিশ জানালে কাজী সুলতানকে তলব করেন। কাজি বাদীকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে এবং বালকের মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে রায় দেন। আসামী সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ রায় মাথা পেতে নেন এবং খাপ হতে তরবারি বের করে কাজিকে বললেন, কাজি আজ তুমি যদি সুলতানের ভয়ে ন্যায়বিচার না করতে তবে এই তরবারির আঘাতে তোমার মস্তক কেটে নিতাম। তার শাসনামলে ১৪০৬ সালে চীনা পর্যটক মাহুয়ান সোনারগাঁ সফর করেন। বাইশ বছর বাংলাদেশ শাসন করে ১৪১০ সালে গিয়াস উদ্দিন আজমশাহ সোনারগাঁয়ে মারা যান। বর্তমান সোনারগাঁ উপজেলার মোগড়াপাড়ায় একটি আয়তাকার পাকা সমাধিঘরে তার কবর রয়েছে। এখানে সেই রাজধানী সোনারগাঁ শহরের কোন অস্থিত্ব এখন আর নেই। আজ এই স্থানটি একটি সবুজ শ্যামল গ্রাম্য জনপদ মাত্র। গিয়াস উদ্দিন আসাম জয় করে তার রাজ্যভুক্ত করেছিলেন।
বাংলার বার ভুঁইয়াদের মধ্যে শ্রেষ্ট জমিদার ঈসা খা এখানে স্বাধীনভাবে জমিদারী পরিচালনা করতেন। লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী ঈসা খার পত্নী সোনা বিবির নামে জনপদটির নাম হয়েছে সোনারগাঁ, কিন্তু ঈসা খার দুই শতাব্দি আগে ১৩৪৫ সালে মরক্কোর মধ্যযুগীয় পর্যটক ইবনে বতুতা বিখ্যাত দরবেশ হজরত শাহজালালের (রহ:) সাথে দেখা করে নৌপথে সিলেট হতে সোনারগাঁ আসেন। নদীর দুইপারে তিনি এতই সবুজ শ্যামল প্রান্তর দেখেন যে মিশরের নীলনদের তীর ছাড়া আর কোথায়ও এত সবুজ তার চোখে পড়েনি। তার ‘রেহলা’ বা ‘ভ্রমণ’ গ্রন্থে শহরটির নাম উল্লেখ করেছেন সোনাডরকোভা। মুর আরবি ভাষায় সোনাডরকোভা সোনারগাঁর ভাষান্তর অনুবাদ। ইবনে বতুতা সোনারগাঁ বন্দরে দেশী বিদেশী অনেক পালতুলা জাহাজ দেখতে পান। এখানে বড়বড় সমুদ্রগামি জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত হতেও তিনি দেখেন। ইবনে বতুতা সোনারগাঁর দ্রব্যমূল্যের একটি তালিকা প্রদান করেন। এখানে জীবন ধারনের মালামাল ছিল সহজলভ্য ও সস্তা। এখানকার বাজারে মানুষ বেচাকিনা হত। যেখানে একটি দুধের গাভীর মূল্য ছিল সাত টাকা, সেখানে একজন সুন্দরী দাসীর মূল্য ছিল মাত্র তিন টাকা। গাভীর চেয়ে মানুষ সস্তা। তিনিও সোনারগাঁর বাজার থেকে একজন সুন্দরী দাসি ক্রয় করেন। অভিজাতরা এখানে বিলাসী জীবন যাপন করলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ ছিলনা। ইবনে বতুতা সোনারগাঁয়ের শিক্ষিত ও জনদরদি শাসক ফখরউদ্দিন মোবারক শাহের খুব প্রশংসা করেন। এই সোনারগাঁ বন্দর থেকেই ভারত সম্রাট মোহাম্মদ বিন তুঘলকের দূত ইবনে বতুতা চীনগামী জাহাজে আরোহণ করে মালাক্কা হয়ে চীন দেশে যাত্রা করেন।
বাংলাদেশের চারটি বিখ্যাত নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত অঞ্চল সোনারগাঁও। এই অঞ্চলের পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা উত্তরে ব্রক্ষ্মপুত্র এবং দক্ষিণে ধলেশ্বরী নদী বহমান। এই নদীগুলো বিভিন্ন যুগে এই নগরে এক প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ রচে দিত এবং শহরটাকে শত্রুর আক্রমণ হতে রক্ষা করত। তাই মধ্যযুগে বারবার এই অঞ্চলটি বাংলার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। এই প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁওয়ের প্রায় ২০ বর্গমাইল জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।
মুর পর্যটক ইবনে বতুতা এবং চীনা পর্যটক মাহুয়ানের বঙ্গ রাজধানী সোনারগাঁ আগমনের ছয়-সাত শত বৎসর পর এযুগের সন্তান আমরা দুইজন পর্যটক ইসফাক কুরেশী এবং সায়েদ আব্দুল্লাহ যীশু ২০১৯ সালের ৩০ মার্চ শনিবার এই ঐতিহাসিক সোনারগাঁ জনপদে প্রবেশ করি। তবে এই প্রাচীন রাজধানীতে আমরা কোন রাজদূত হয়ে কোন রাজদরবারে যাইনি, গিয়েছি সাধারণ পর্যটক হিসাবে নিছক এক আনন্দ ও শিক্ষা সফরে। আমরা মধ্যযুগের ঘোড়ার গাড়ী চড়েও যাইনি, গিয়েছি গুলিস্থানে যেয়ে এযুগের মুগরাপাড়ার বাসে চড়ে। ছোট বাসটি কাচপুর সেতু পার হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড দিয়ে প্রায় ২৭ কি.মি দূরে গিয়ে আমাদেরকে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার মুগরাপাড়া বাজারে নামিয়ে দেয়। এখানে নাস্তা করে একটি ইঞ্জিন রিকশায় পানামনগর যাই। এই শহরে ঢুকেই আমরা তীর ধনুক ও ঘোড়ার যুগের মায়াজালে হারিয়ে যাই। এই প্রাচীন নগরে রডবিহীন দুইতিন তলা চুনসুরকীর সারিবদ্ধ অনেক ভবনমালা আজও কোনমতে টিকে আছে। প্রাচীন মৃত অভিজাতদের কোলাহল ও অবিকৃত ইতিহাস যেন জড়িয়ে আছে এই নগরের প্রতিটি ইটে ইটে। নগরের পথের দু’পাশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক শত বছর আগের আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন ও কাঠামোগুলো যেন হারানো দিনের জৌলুস ও ঐশ্বর্য্যরে কথা জানান দিচ্ছে। জানান দিচ্ছে শত শত বছর আগে এই নগর সেই প্রাচীন যুগের তুলনায় কতটা উন্নত ও সমৃদ্ধ ছিল। সে সময়ের আমাদের পূর্বপুরুষদের করা যতসব কারুকাজ ফোটে আছে এই ভবনমালার দেয়ালে দেয়ালে খোটায় খোটায়। চারপাশে পরিখাবেষ্টিত পানামনগরের ভবনে ভবনে, দুতলায় তেতলায়, ছাদে, পুকুরের ঘাটে ও রাস্তায় বেশ করে ফটো তুলি আমি ও যীশু। আমাদের পায়ের আঘাতে বয়সের ভারে ন্যূজ্বপৃষ্ঠ ভবনের ছাদগুলো কেঁপে উঠে। আল্লাহ না করুক, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলেই এই ছাদগুলো ধ্বসে যেতে পারে। এ যেন অতীতের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের হারানো কংকাল। এই নগরের সামনে স্থাপিত পাথরে খোদাই করা ইতিহাস গ্রন্থস্মারকেও আমরা ছবি উঠাতে ভুলিনি।
পানামনগর হতে ফিরে এবার আমরা আসি সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে। বাংলাদেশের বিভিন্ন যুগের লোকশিল্প ও কারুকাজের বিশাল সমাবেশ ঘটেছে এই জাদুঘরে। এই জাদুঘর এতই বিশাল যে সবকিছু দেখতে গিয়ে আমাদেরকে প্রায় তিন ঘন্টা হাঁটতে হয়েছে। তিন ঘণ্টায় হাঁটা হয় কমবেশি নয় মাইল। জাদুঘরের ভবনরাজি দূরে দূরে স্থাপিত, ফাঁকে ফাঁকে হ্রদ ও ঝিল, ঝিলের মাঝে আছে দ্বীপ, আছে সুন্দর সুন্দর পুকুর এবং বড় বড় সুসজ্জিত প্রাঙ্গণ। ঝিলে বেশ কয়েকটি প্রমোদ নৌকায় হৈ চৈ করে আনন্দবিহার করছে হাইস্কুলের ছাত্র ছাত্রিদের দল। রাজহাঁস পাতিহাঁস সাঁতার কাটছে ঝিলের শান্ত জলে।
কারুকার্য্যময় পুকুর, শিল্পময় ঘাট, পুকুরপারে অশ্বারোহী সৈনিকদের ভাস্কর্য্য, ষাঁড়ের গাড়িসহ কাঠের চাকা ঘুরানোর পেশীবহুল শ্রমিকের ভাস্কর্য্য, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মূর্তি, বঙ্গবন্ধুর আপাদমস্তক এক বিশাল ভাস্কর্য্য আমাদের সামনে পড়ে। বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য্যরে পাশের পাঠাগারে রয়েছে প্রচুর মুক্তিযুদ্ধের বই। একটি শাপলাফোটা পুকুরের মাঝে ভাসমান মৎস্যপরীর ভাস্কর্য্য এক নৈস্বর্গিক পরিবেশ তৈরী করে। জাদুঘর প্রাঙ্গণের সর্বত্রই নানা ভাস্কর্য্যের ছড়াছড়ি, যেখানে আবহমান বাংলার মানুষের যাপিত জীবন ফুটে উঠেছে।
একেক ভবনে রয়েছে একেক ধরনের লোক ও কারুশিল্পের সমাহার। প্রাচীন রাজা ও জমিদারদের সিংহাসন, দরজা, জানালা, খাট পালঙ, পালকি, ঢেকি, কাঠের নৌকা, কাঠে খোদাই কারুকাজ কিছুই বাদ নেই এখানে। বস্ত্র শিল্পেও প্রাচীন মসলিন কাপড় হতে শুরু করে বর্তমান যুগের জামদানী শাড়িও মানুষের মন কেড়ে নেয়। বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের এমন কোন নিদর্শন নেই, যা এখানে পাওয়া যাবেনা।
জয়নুল আবেদিন আর্ট গ্যালারীতে বাংলাদেশের সব প্রথিতযশা শিল্পীর আঁকা শিল্পকর্মের এক সুবিশাল সংগ্রহ রয়েছে। এইসব শিল্পকর্মে বাংলাদেশের প্রকৃতি এবং জীবন রঙের তুলিতে জীবন্ত হয়ে রয়েছে। জাদুঘর প্রাঙ্গণের আনাচে কানাচে রয়েছে হস্তশিল্পের দোকানের সারি, চা-স্টল, জামদানী শাড়িঘর। কয়েকটি জামদানি শাড়িঘরে ঢুকে আমরা প্রচুর জামদানি শাড়ি দরদাম করি, কিন্তু কোন শাড়ি কেনা হয়নি। আমরা একটি নিরব দ্বীপের তরুতলে পাতা চেয়ারে বসে বেশ সময় কাটাই। সারাদিন ঘুরেফেরে সোনারগাঁয়ের সোনালী দিনটি ফুরিয়ে গেল, এবার ফিরে এলাম ধানমন্ডি লেকপারের আপন ঠিকানায়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT