পাঁচ মিশালী

সাংবাদিক জিয়া খালেদের চলে যাওয়া

শহিদ আহমদ জুলহান চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০২-২০২০ ইং ০০:৪৩:১৭ | সংবাদটি ২৩৬ বার পঠিত

গত ১১ জানুয়ারি দূরারোগ্য ব্যাধির কাছে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় জিয়াউল ইসলাম চৌধুরী। তিনি ছাত্রদের কাছে একজন শিক্ষক, একজন মানুষ গড়ার কারিগর। সুশিল সমাজের কাছে একজন সমাজ হিতৈষী ব্যক্তি যিনি সব সময় সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা করতেন। তিনি আর কেউ নয় সবার পরিচিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাথমিক শিক্ষকদের নেতা, জিয়াউল ইসলাম চৌধুরী (জিয়া খালেদ)। ফেঞ্চুগঞ্জে স্কাউটসেও তাঁর অবদান রয়েছে। তিনি একজন পরিচ্ছন্ন শিক্ষক ছিলেন শিক্ষক নেতা। শিক্ষকদের দাবী দাওয়া আদায়ে তাঁর ভূমিকা সবার উর্ধে তাইতো তিনি তাদের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর সাথে সব শ্রেণী বর্ণ পেশার মানুষের ছিল সুমধুর সম্পর্ক। তিনি কারো কাছে শিক্ষক, কারো কাছে সাংবাদিক, আবার কারো কাছে শিক্ষক নেতা। তিনি একজন আদর্শবান শিক্ষক, সৎ সাংবাদিক হিসেবে ছিলেন সাংবাদিকদের কাছে পরিচিত। তাঁকে বেশির ভাগ মানুষ শিক্ষক হিসেবে জানতো। তার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বছর সুনামধন্য দৈনিক জালালাবাদ সহ সাংবাদিকতা করেছেন সিলেটের বিভিন্ন পত্রিকায়। লিখেছেন প্রবন্ধ, কলাম সহ জরুরি বিষয় নিয়ে। দুই যুগের উপর ফেঞ্চুগঞ্জ প্রেসক্লাবের দায়িত্ব পালন করেছেন।
কর্তব্যপরায়ণ এই মানুষটির বিচরণ ছিল সব মহলে। সদালাপী সাংবাদিক জিয়া খালেদ জরুরি বিষয় নিয়ে লিখেছেন লিখেয়েছেন অসংখ্য কলাম। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, সমাজসেবা কতটুকু দেশপ্রেম বা ধৈর্য থাকলে একজন মানুষ পালন করতে পারে তা একজন জিয়া খালেদ কে না দেখলে বুঝা যেতো না। তাঁর ছিল অসিম ধৈর্য, ছিল সেবা করার মনমানসিকতা। তাই তিনি সবার কাছে প্রিয় জিয়াভাই হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ভালো গুণের জন্য শিক্ষকদের কাছে ভালো শিক্ষক সাংবাদিকদের কাছে একজন আদর্শবান সাংবাদিক, সংসারে একজন আদর্শবান পিতা, ছাত্রদের কাছে প্রিয় শিক্ষক, একজন সমাজ হিতৈষী ব্যক্তি। সমাজের প্রতিটা ক্ষেত্রে ছিল তাঁর বিচরণ। তাঁর সাথে দেখা হলেই কথা বলতেন অনেক কিছু জানাতেন, নিজে জানতেন খোঁজ খবর নিতেন। এটা ছিল তাঁর বিশেষ গুণ।
তাঁর কাছে যে কেউ পরামর্শের জন্য এলে তিনি যে কাউকে সহজেই বুঝিয়ে দিতেন। গত ১১ জানুয়ারি ২০২০ ইং রাতে তিনি সিলেটের কুচাই ইউনিয়নের একটি বাড়িতে পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তা এমনই এক জায়গা যেখানে চলে গেলে এই মোহময় পৃথিবীতে কেউ আর ফিরে আসে না। মাত্র ৬৫ বছর বয়সে বড় অসময়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এই ক্রান্তিকালে তাঁর মতো গুণী সাংবাদিক ও শিক্ষকের বড় প্রয়োজন ছিল আমাদের। হাজারো মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে শিক্ষক সাংবাদিক জিয়া খালেদ চলে গেছেন ঠিকই কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর বিশাল ভান্ডার। ছড়িয়ে রেখে গেছেন তাঁর বিস্তৃত পরিধি।
আজ বড় মনে পড়ছে তার কথা, আজ ছয় মাস আগে প্রায়ই প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে আসতেন দুই দিন তিন দিন থেকে আবার ছেলে মেয়েকে নিয়ে ফিরে যেতেন সিলেট শহর সংলগ্ন কুচাইতে। আসলেই আমার সাথে প্রায়ই যোগাযোগ করতেন। নানা বিষয়ে কথা বলতেন, তিনি বড়ই নিতীবান মানুষ ছিলেন। কোন অন্যায় বা অসংগতি মেনে নিতেন না। কখনো কোন অন্যায় কারো সাথে করতে দেখিনি তাঁকে। তিনি সব সময় সমাজের ভালো চিন্তা করতেন, সমাজকে কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেই চিন্তা করতেন সব সময়। আমাকে বলতেন যথক্ষণ সকলকে শিক্ষিত করা না যাবে তত সময় পর্যন্ত দেশ জাতী সমাজ উন্নত করা যাবে না। তিনি হয়তো বুঝেছিলেন যে তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে তাইতো সেদিন বলেছিলেন আমি হয়তো আর বাঁচব না তবে আমার আদর্শ যেন তোমাদের মধ্যে বেচে থাকে। আমার চিন্তা চেতনা যেন তোমাদের মধ্যে বেঁচে থাকে। আমার চিন্তা চেতনা নিয়ে লেখ, ভালো কর্মগুলো তুলে ধরো। আজ বুঝতে পারছি এটা হয়তো ছিল তার শেষ কথা। তিনি হয়ত তাঁর চলে যাওয়ার শেষ কথা বুঝাতে চেয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষা কর্ম চেতনা ছিল মানবিক চিন্তা বোধের। আমি তাঁর প্রিয় ছাত্র ছিলাম তাই প্রায়ই তিনি নানা বিষয়ে আমার সাথে কথা বলতেন, আমার সাথে ছাত্র শিক্ষক ছাড়াও অন্য ধরনের সম্পর্ক ছিল যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তার খুব ভালো একটি গুণ ছিল তিনি যে কোন কাজ ধরলে তাঁর শেষ না দেখে হাল ছাড়তেন না। যত কাজ তিনি করেছেন, প্রত্যেক কাজেই আমার দেখা মতে তিনি ছিলেন সফল সাংবাদিক, শিক্ষক, সফল ছিল তার নেতৃত্ব।
তিনি তাঁর কাজের মধ্যেই সকলের মন যোগাতে পেরেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় ব্যক্তি, সবার আপন মানুষ। তিনি মানুষের কাছে কতটা আপন ছিলেন মানুষের কাছে তাঁর প্রমাণ আমি সহ অনেকেই পেয়েছেন সেদিন। দূর দূরান্ত থেকে কারো প্রিয় শিক্ষক, সাংবাদিক, বন্ধু, কারো প্রিয় শিক্ষক নেতা মানুষটিকে দেখতে কত প্রিয়জন যে এসেছেন তা লিখায় প্রকাশ করার মতো নয়।
যতদূর জানি সাংবাদিক জিয়া খালেদ ১৯৫৫ সালে সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁও ইউনিয়নের কচুয়াবহর (নোয়াটিলা) গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর পিতা মাতার তৃতীয় সন্তান। তিনি ফরিদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে বর্তমান কাসিম আলী সরকারী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস এস সি ও সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচ এস সি পাস করেন, একই কলেজ থেকে বিএ পাস করে প্রাথমিক শিক্ষক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
এর পর একে একে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক সহ প্রধান শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে গত দুই বছর থেকে অবসর যাপন করছিলেন। সেই সাথে সাংবাদিকতা সহ সমাজের জনহিতৈষী কাজে নিজেকে সক্রিয় রেখেছিলেন। তার পর তিনি বেশ একাকীত্ব হয়ে পড়েছিলেন। একাকীত্বের পাশাপাশি নানা মরণব্যধি অসুখ তাঁকে ঘায়েল করে ফেলে। তাতেও তার মনোবল এতটা দুর্বল দেখিনি। তিনি বিশ্বাস রাখতেন আল্লাহর যা ফয়সালা তাই হবে। বেশ কয়েকবার ঢাকা পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। কিন্তু মরনব্যাধী তার পিছু ছাড়েনি। তাইতো গত ১১ জানুয়ারি রাতে তিনি পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে শোকাহত ফেঞ্চুগঞ্জ সাংবাদিক সমাজ ও তাঁর সহকর্মি শিক্ষকবৃন্দ।
পরপারে যাতে তিনি ভালো থাকেন, শান্তিতে থাকেন, এই কামনা করি তাঁর একজন ছাত্র হিসেবে। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন। আমিন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT