পাঁচ মিশালী

প্রকৃতির হাতছানি

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০২-২০২০ ইং ০০:৪৩:৪৭ | সংবাদটি ১২২ বার পঠিত

আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী
ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।
কবি-গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার চিত্র এঁকেছেন চরণগুলির মাধ্যমে। তাঁর ভালো লাগার অনেকটাই এখানে প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ। এর প্রতিটি পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির অমূল্য দান। আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে প্রকৃতি অকৃপণভাবে সাজিয়ে দিয়েছে তার উপাদানসমূহ দিয়ে। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়, সাগর, ঝর্ণা, চা বাগান। আরও রয়েছে জলরাশি বেষ্টিত হাওর, নদী। ঋতুবৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি আমাদের জীবনকে করেছে ছন্দময়।
বর্ষায় বাংলার প্রকৃতি সাজে অন্যরকম বেশে। হাওর এলাকার আবহকে মনে হয় যেন ঢেউয়ে ঢেউয়ে এক অপরূপ সুরের ব্যঞ্জনা। যার মোহে পড়ে মানুষ ভাবের সাগরে ডুব দিয়ে মুক্তা তুলে আনে। বসন্তের আগমনে প্রকৃতিতে সাজ সাজ রূপ। নানারকম ফুল ফুটে চারপাশ যেন রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। বসন্তে কোকিল ডাকে। তার ডাক শুনে মানুষের মনও নেচে ওঠে। শীতকালে শিশির স্নাত প্রকৃতি মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে। বৈচিত্র্যময় নানারকম বাহারী রঙের পোশাকের সমারোহ। মানুষের মধ্যে একটা অন্যরকম আবহ সৃষ্টি করে। তাছাড়া শীতের পিঠা শীতকালের আর এক আকর্ষণ। এভাবেই ষড়ঋতুর পালা বদলের সাথে বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
আমরা বাংলাদেশের যে জেলায় বাস করি সেই সিলেটে রয়েছে অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী সমৃদ্ধ স্থান। এর মধ্যে রয়েছে প্রকৃতিকন্যা জাফলং, মাধবকুন্ড জলপ্রপাত, মালনীছড়া চা বাগানসহ অসংখ্য চা বাগান। আরও আছে টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওরের মত অসংখ্য হাওর যা মানুষের মনকে টেনে নেয় প্রকৃতির কাছে।
আমারও বেড়াতে যাবার সুযোগ হয়েছিল ডিসেম্বরের ৯ তারিখে। আমার স্কুলের অর্থাৎ ফরেস্ট হিল স্কুলের পক্ষ থেকে সহকর্মীদের সাথে আমি গিয়েছিলাম ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর নামক দর্শনীয় স্থানে। সেখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য এতই মনোরম ছিল যে আমরা সবাই দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
সত্যিই প্রকৃতির কাছে গেলে যে আমাদের মন ভাল হয়ে যায়, এটা সেখানে যাবার পর আমরা আবারও উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম।
ভোলাগঞ্জে যাবার পর সেখান থেকে নৌকায় করে যেতে হয় সাদা পাথরের দেশে। নৌকা যখন চলে তখন আশেপাশের নৈসর্গিক দৃশ্যে আমাদের মন আপ্লুত হয়। দু’পাশে মরুভূমির মত বালি আর মাঝখান দিয়ে বয়ে যায় পানি। সেই পানিতে নৌকা চলে। এই নৌকা ভ্রমণটিও এক অন্যরকম অনুভূতি জাগায়। স্বচ্ছ পানির উপর দিয়ে যখন নৌকা বয়ে চলে সামনে ও পিছনের দিকে তখন যে দৃশ্যগুলি দেখা যায় তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। তাছাড়া প্রতিবেশি দেশ ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কিয়দংশ দূরে দৃশ্যমান হয়।
পাহাড়, পাথর আর স্বচ্ছ পানির স্রোতধারায় ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর প্রকৃতির এক অনবদ্য সৃষ্টি। যা অবলোকন করে আমরা সাময়িক সময়ের জন্য হলেও স্বপ্ন-বাস্তবের টানাপোড়েনে পড়ে যাই। আর সেই স্বপ্নময় অভিজ্ঞতা নিয়ে যখন ফিরে আসি তখন বাস্তবের বেড়াজালে আবারও বন্দী হয়ে যাই।
উল্লেখ্য যে, আমাদের যাত্রাপথেই চা-বাগান পড়ে। আর রাস্তার পাশ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চা গাছগুলো যেন গাড়িতে থাকা যাত্রীদের অভ্যর্থনা জানায়। এক কথায়, যাত্রার শুরু থেকেই কেমন যেন একটা প্রকৃতির হাতছানি। আর যখন ভোলাগঞ্জে পৌঁছলাম তখনই মনে হল যেন আমি প্রকৃতির আতিথেয়তার কাছে নিজেকে সঁপে দিলাম। এর কলিময় পাথর বেষ্টিত পরিবেশ যেন আমাকে উৎফুল্ল করে তুলল। মন যেন বাঁধনহারা মুক্ত বিহঙ্গের ডানায় ভর করে উড়ে উড়ে চলল। পেছনের সংকীর্ণতার গ্লানি থেকে পরিত্রাণ পেয়ে গেলাম সাময়িক সময়ের জন্য।
আসলে এরকম দৃষ্টিনন্দন স্থানে আসতে পেরে আমরা সবাই খুব আনন্দিত। আমার সহকর্মীরা সবাই যার যার মত দলে দলে বিভক্ত হয়ে ঘুরাঘুরি করছেন। কয়েকজন পানিতে নামছেন, আবার কেউবা বড় বড় পাথরে বসে ভিডিও করছেন, ছবি তুলছেন। এভাবেই অনেক অনেক আনন্দের মধ্য দিয়ে কেটে গেল আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত সময়টুকু। এবার বাড়ি ফেরার পালা, আমরা সবাই গাড়িতে উঠে গেলাম, গাড়ি চলতে লাগল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। পেছনে ফেলে আসলাম প্রকৃতির এক অনিন্দ্য সুন্দর রূপ লাবণ্যে ঘেরা ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরের কারুকাজ। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যুক্ত হল আরেকটি নতুন উপাদান।
ভ্রমণ সব সময়ই আনন্দের হয়। আর সেটা যদি হয় সাদা পাথরের মত দর্শনীয় স্থানে তাহলে তো আর কথাই নেই। আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় স্থানগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ যেন হয় আমাদের সবার, এটাই আমার শুভকামনা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT