সাহিত্য

বাংলা সাহিত্যের মধুসূদন দত্ত

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০২-২০২০ ইং ০০:১৮:২৯ | সংবাদটি ২০৮ বার পঠিত

বাংলা কাব্য-সাহিত্যে আছে নানান ছন্দ। যারা ছন্দ নিয়ে চর্চা করেন তারা বিভিন্ন ছন্দের ব্যাখ্যা করে পাঠকের কাছে সহজে তুলে ধরলে পাঠক ও লেখক উপকৃত হবেন। আমাদের কাব্যে ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ নামে এক মজার ছন্দ আছে, এটির প্রবর্তক হচ্ছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এখন থেকে প্রায় দুইশ বছর পূর্বে মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের মাঠে শক্ত এক ভিত গড়ে গেছেন। তাঁকে খুঁজে এ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরলে নতুনদের মন খারাপ করার কথা নয়, বরং নতুন তাদের শিকড়ের ভিত্তি খুঁজে পেয়ে মনের মাঝে পুলক অনুভব করবে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম বাঙালি কবি ও নাট্যকার হলেন মধুসূদন দত্ত।
বাংলাদেশের এক শক্তিমান কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে। এই কবির জন্যেই সাগরদাঁড়ির গ্রামটি আজ অতি পরিচিত সকলের কাছে। বহু নদ-নদী বেষ্টিত আমাদের এই ছোট্ট বাংলাদেশের বিখ্যাত কপোতাক্ষ নদের তীরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে ১৮২৪ খ্রিস্টীয় সালের ২৫ জানুয়ারি তাঁর জন্ম। তখন ছিলো ১২৩০ বাংলা সনের মাঘ মাসের ১২ তারিখ, শনিবার। কবির পূর্ব পুরুষের বাড়ি অন্যত্র ছিলো। তাঁর প্রপিতামহ রাম কিশোর দত্ত ছিলেন খুলনা জেলার তালা গ্রামের বাসিন্দা। পরে কবির পিতামহ রামনিধি দত্ত তালা গ্রাম ছেড়ে চলে যান তাঁর মাতামহের বাসস্থান সাগরদাঁড়িতে। এরপর থেকেই তারা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শিক্ষিত পরিবারে জন্ম নেয়া কবি মধুসূদন দত্তের পিতার নাম রাজনারায়ণ দত্ত। তিনি কলকাতায় ওকালতি করতেন এবং তাঁর জীবদ্দশায় প্রচুর অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। কবির মায়ের নাম জাহ্নবী এবং তিনি ছিলেন গুণবতী। মদুসূদনের মাতামহ ছিলেন তৎকালীন জমিদার। মদুসূদন দত্ত অনেক ভাষা শিখেছিলেন। তিনি ছোটোবেলায় গ্রামের মৌলভী সাহেবের কাছে ফারসি ভাষার শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে তিনি কলকাতার খিদিরপুরে ইংরেজি স্কুলে পড়াশুনা করেন। সেখান থেকে তিনি কলকাতার হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেসময় থেকেই তিনি বায়রন, মিল্টন এবং আরো অন্যান্য কবির কবিতা পড়েন এবং উপলব্ধি করেন। ওই সময় ১৮৪৩ খ্রিষ্টিয় সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মধুসূদন হিন্দু কলেজ থেকে নিখোঁজ হন। পরে খোঁজ পাওয়া যায় তিনি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়েছেন এবং তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে পাদ্রীদের সাথে সময় কাটাচ্ছেন। তখন থেকেই তিনি মাইকেল মধুসূদন। তাঁর পিতা বিষয়টা মেনে নিতে না পারলেও পুত্র স্নেহের টানে তিনি পরবর্তীতে মধুসূদনের পড়ার খরচ চালিয়ে গেছেন। বিশপস কলেজে মধুসূদন ফারসি, সংস্কৃত, ল্যাটিন, হিব্রু, আরবি, গ্রীক, ইতালি ও জার্মান ভাষা শিখে নেন। তিনি তেলেগু ও তামিল ভাষাও জানতেন। ছোটোবেলা থেকে বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলেও তিনি ছিলেন পড়াশুনায় খুব মনোযোগী। অল্প বয়সে তিনি তাঁর মায়ের কাছে রামায়ণ ও মহাভারত পড়া শিখেন এবং সেখান থেকেই তাঁর কবি মন প্রভাবিত হয়। এখান থেকে একটা শিক্ষা নেয়া যেতে পারে যে, পারিবারিক পরিবেশ সন্তানের জীবনে প্রভাব ফেলে। পরিবারে মা ও বাবার শিক্ষা ও গুণাবলী সন্তানকে সুন্দর পথে ডেকে নেয়।
প্রেম, প্রার্থনা, আকাক্সক্ষা, কবিতা, গান, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, সাহিত্য আছে বলেই পৃথিবীটা প্রাণে বাঁচে। আর এমন প্রাণের উপাদান হলো সূর্য, মাটি, বায়ু, পানি, শিশুর হাসি, মানুষ, ভাষা, পাখি, মাছ, গাছ, কীট-পতঙ্গ, আকাশের বিশালতা, অসীম দিগন্ত রেখা, প্রকৃতির সুখ-দুঃখ এবং জোয়ার-ভাটা। এসব উপাদানের সাথে যে যতোটা নিবিড় সম্পর্কিত হবে সেই হবে ততো বড়ো মাপের কবি এবং ততো বড়ো সাহিত্যিক। আরো একধাপ এগিয়ে বলা যায়, ওইসব প্রাকৃতিক উপাদানের সাথে যারা যতোবেশি উদারভাবে মিশে তারাই হয় বড়ো মানুষ। এই ব্যাপারগুলো বুঝতে পারলেই আপনি কবি এবং আপনি সাহিত্যের মূল স্রোতের মানুষ। মধুসূদন দত্ত সারাজীবন ছুটেছেন এবং জীবনের নানান বাঁকে বাঁকে ওইসব প্রাণোপাদান ভালোই বুঝতে পেরেছেন। তিনি আমাদের সাহিত্যাকাশের এক বড়ো মাপের তারকা। কবির আকাক্সক্ষা ছিলো তিনি বড়ো কবি হবেন এবং তিনি শেক্সপিয়ার ও মিল্টনের দেশ বিলেত অর্থাৎ ইংল্যান্ড গিয়ে ইংলিশ ভাষায় কবিতা লিখলেন। তিনি ইউরোপীয় ঢঙে পোশাক পড়া ও চাল-চলনে অভ্যস্ত হয়েছিলেন। তিনি ১৮৪৮ সালে মাদ্রাজ গিয়েছিলেন এবং সেখানে শিক্ষকতা করেন। সেখানে তিনি সাংবাদিক ও কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। মাদ্রাজে থাকাকালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ The Captive Ladic প্রকাশ হয় Timothy Penpoem ছদ্মনামে ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর পারিবারিক জীবনে অনেক দুঃখের ঘটনা ঘটেছে। শেষে তিনি ১৮৬২ সালে ইংল্যান্ড গিয়ে ছিলেন এবং পরবর্তীতে ১৮৬৭ সালের ৫ জানুয়ারি ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগ দেন।
পরবর্তীতে তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নানান ঘটনা ঘটে গেছে। তিনি বারবার আর্থিক সংকটে পড়েছেন এবং বিভিন্ন সময় অনেকের সহযোগিতা নিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন। তবে তিনি সাহিত্যচর্চা ও জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। কলকাতায় তাঁর সময়ে কিশোরী চাঁদ মিত্রের বাগান বাড়িতে কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা হতো। ওই আসরে উপন্যাসিক প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুর আসতেন। তিনি ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাস লিখে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। কিন্তু চলতি ভাষার উপন্যাসটি মধুসূদনের পছন্দ হয়নি এবং তিনি বিরূপ মন্তব্য করে বসেন। তখন প্যারীচাঁদ মিত্র উত্তেজিত হয়ে বলেছিলেন, তুমি বাংলা ভাষা কি বুঝবে। জেনে রেখো, আমি যে রচনারীতি চালু করলাম ওটাই বাংলা সাহিত্যে চিরদিন বেঁচে থাকবে। তখন মধুসূদন দত্ত হেসে জবাব দিয়েছিলেন, আমি যে ভাষা সৃষ্টি করবো, তাই বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী হবে। অসম্ভব প্রতিভাবান মধুসূদন দত্ত পরবর্তীতে রচনা করেন- মেঘনাদবধ কাব্য, তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য, পদ্মাবতী নাটক, কৃষ্ণকুমারী নাটক, একেই কি বলে সভ্যতা (প্রহসন), বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (প্রহসন) ইত্যাদি গ্রন্থ সমূহ।
তাঁর জীবনের একটি ঘটনা উল্লেখ করে স্বল্প পরিসরের মধুসূদন বিষয়ক লেখাটির সমাপ্তি টানছি। একদিন মধুসূদন দত্ত কলকাতার এক বাজারে হাঁটছিলেন। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন এক দোকানী খুব মনোযোগ দিয়ে মেঘনাদবধ কাব্য পড়ছেন। তিনি কৌতুহলীভাব নিয়ে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি পড়ছেন? দোকানী উত্তর দিলো একটি কাব্য। তখন মধুসূদন বলেছিলেন, বাংলা ভাষায় আবার কাব্য। জবাবে দোকানী বলেছিলো, মেঘনাদবধ কাব্য একটি জাতির ভাষাকে গৌরবময় করতে পারে। তখন মধুসূদন অনুরোধ করলে দোকানী ওই কাব্যের খানিকটা পড়ে শুনান। এরপর কবি নিজেই দোকানীর হাত থেকে বইটি নিয়ে কিছুটা পাঠ করলে দোকানী মুগ্ধ হয়েছিলো। অবশ্য মধুসূদন দোকানীর কাছে নিজের পরিচয় গোপন রেখেই চলে যান। বাংলা সাহিত্যের এই কীর্তিমান মানুষটি ১৮৭৩ খ্রিষ্টীয় সালের ২৯ জুন ৪৯ বছর বয়সে ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর কাব্য প্রতিভার গুণে আজ বাংলা সাহিত্যে অমর। সকল প্রাণীর মতো স্বাভাবিক নিয়মে তিনিও মরেছেন; কিন্তু কবি মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্যে বেঁচে আছেন মানুষের মাঝে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT