মহিলা সমাজ

শিশুর মানসিক বিকাশে অভিভাবকের দায়িত্ব ও কর্তব্য

রওশন আরা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০২-২০২০ ইং ০১:৩৪:২১ | সংবাদটি ২৭৭ বার পঠিত
Image

মানব শিশু জন্মলাভের পর তার পার্থিব জীবনযাত্রা শুরু হয়। স্বাভাবিকভাবেই শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক দিকগুলো ক্রমবিকশিত হয়ে তার বিস্তার ও প্রস্ফুটন ঘটে। এখানে সংশ্লিষ্ট বিষয় শিশুদের মানসিক বিকাশে অভিভাবকের ভূমিকা সম্পর্কিত, আর এ বিষয়ে কিছু লিখতে হলে শিশু, মানসিক বিকাশ ও অভিভাবক এ সমস্ত শব্দ সমূহের সম্যক ধারণা থাকা দরকার।
জন্মের পর থেকে ১১ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলেমেয়েদেরকে শিশু ধরে নেয়া হয়। কারো কারো মতে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলেমেয়েদেরকে শিশু বলা হয়। আর ঐ সময়কেই শৈশবকাল বলা হয়।
মানসিক বিকাশ বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো শিশুর মন, মনন, চিন্তা চেতনায় উন্নয়ন উন্মেষ।
জন্মের পর থেকে শিশুরা যাদের সার্বক্ষণিক সান্নিধ্যে ও পরিচর্যায় লালিত পালিত হয়, তারাই হলেন তার অভিভাবক। আর এই অভিভাবক হলেন শিশুর মা-বাবা, নিকট আত্মীয়-স্বজন ও শিক্ষকতো বটেই।
শিশুর মানসিক বিকাশে অভিভাবকের করণীয় যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিসীম তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। যদিও আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলে অনেক কিছু জানা গেছে। এবং তা থেকে নিশ্চয়ই আমরা বর্ধিত জ্ঞান লাভ করে আলোকিত হচ্ছি কিন্তু একথা না বললেই নয়-শিশুর মা-বাবা প্রকৃতিগতভাবেই ভালো মনোবিজ্ঞানী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করে যারা মনোবিজ্ঞানী হন, তা ভাল বটে, আর মা-বাবা সহজাতভাবে অজান্তেই স্বভাবধর্মী মনোবিজ্ঞানী বনে যান।
মা-বাবা শিশুর আচার আচরণ ও Body language, অন্যদিকে আভ্যন্তরীণ আবেগ Posture ও Gesture দেখে সোনামনিদের ব্যাপারে কখন কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে তা উপলব্ধি করতে অসুবিধা হয় না। এর অর্থ এই নয় যে, প্রাতিষ্ঠানিক Mode মনস্তাত্ত্বিকদের গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে আমরা অবজ্ঞা, অবহেলার চোখে দেখছি। আধুনিক মনস্তত্ত্ববিধ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষ করে শিশু মনোবিজ্ঞানীরা পরীক্ষা নীরিক্ষা করে দেখেছেন যে শিশুরা তীব্র গন্ধ, স্বাদ-বিস্বাদ, ঠান্ডা-গরম এবং সাধারণ পানি ও মিঠা পানির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে। একটি কথা প্রচলিত আছে যে ২১ দিন বয়সেই শিশুরা মা-বাবাকে অন্যান্যদের থেকে পৃথক করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় শিশুর ভীষণ কান্নারত অবস্থায়, তা যে কারণেই হউক মায়ের সান্নিধ্যে গেলেই কান্না থেমে যায়। তারা মনে করে যে খুবই নিরাপদ ও আরামপ্রদ জায়গায় চলে গেছে। মায়ের গায়ের ও বস্ত্রের গন্ধ শুকে বুঝে নেয় সে মায়ের কোলে সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামের স্থানে আছে। বলা যেতে পারে তখন থেকেই শিশুর মানসিক দিক বিকশিত হতে শুরু হয় তবে তা ঘটে ধীরে ধীরে।
শারীরিক পরিপক্কতা, অভিজ্ঞতা ও পরিবেশ হচ্ছে শিশুর মন বিকশিত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। ভাষা শেখা হচ্ছে মানসিক বিকাশের আর একটি বড় দিক। ব্যক্তির বিকাশ লাভে বংশধারা ও পরিবেশের প্রভাব নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের মাঝে বেশ মতদ্বৈততা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা একমত যে ব্যক্তির বিকাশ নির্ভর করে বংশধারা ও পরিবেশের পারস্পরিক ক্রিয়ার (Interaction) ওপর। মনোবিজ্ঞানী কেপহার্টের এক গবেষণায় দেখা যায় যে, পারিবারিক অনুকূল ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ছেলেমেয়েদের I.Q যথাক্রমে। কম-বেশি হয়। আর এই অবস্থার সৃষ্টি করতে পারেন একমাত্র অভিভাবকরাই।
মানসিক বিকাশ কোন বয়সে থেমে যায় এ ব্যাপারে মনোবিজ্ঞানীরা একমত নন। প্রতিভাবান ব্যক্তিদের বেলায় ৫০ উর্ধেও I.Q এর উন্নতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
যেহেতু শিশুরা বয়স্কদের তুলনায় ছোট তাই বড়দের আদর যত্ন ও আশ্রয় তাদের অবশ্যই প্রাপ্য। শিশুদের মানসিক বিকাশ হয় অনেক ব্যক্তির দলগত সাহচর্যে যেমন, মা-বাবা, খেলার সাথী, পরিবার তথা স্কুলিং-এর মধ্য দিয়ে। এক কথায় শিশুর শারীরিক, মানসিক, আবেগিক, সামাজিক ও নৈতিক গড়নে-বাড়নে অভিভাবকের সঠিক দিক নির্দেশনা থাকলে তার পরিপূর্ণ পরিস্ফুটন, উন্মেষ ঘটে-যার ফলে সে ভবিষ্যতের পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হয় এবং তাতে সে নিজে ছাড়াও উপকৃত হয় পরিবার, সমাজ তথা দেশ। অন্যদিকে সঠিক পথ নির্দেশনার অভাবে সে পরিণত হয় spoil child-এ যার পরিণতি হয় বিপরীত।
বহু পুরাতন একটি কথা প্রচলিত আছে ‘Spare the rod spoil the child.’ একথাটি শাব্দির অর্থের একদিশা প্রয়োগে বিপদ আছে যা কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতায় ভরিয়ে তুলে। অনেক পিতা-মাতা সবসময় শিশুকে আগলিয়ে রেখে অজান্তেই ক্ষতি করছেন তা বুঝে উঠতে পারেন না। আবার কারো কারো অত্যধিক আদর যত্নের খোলসে প্রশ্রয় পেয়ে শিশু হয়ে ওঠে উশৃঙ্খল ও বেপরোয়া।
আসল কথা হলো অভিভাবকের করণীয় হতে হবে শিশুদের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ অর্থাৎ যেমন আদর সোহাগ তেমনি সুশাসনে শিশুকে গড়ে তুলতে হবে। কথায় বলে ‘আদর করা তারই সাজে, শাসন করেন যিনি।’ আবার শিশুর অধিকার সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। শিশু বলে তার যৌক্তিক আবদার ছুড়ে ফেলে দেয়া যাবে না।
সুঅভিভাবক হতে হলে অবশ্যই শিশু মনোবিজ্ঞানের নানা প্রসঙ্গে প্রাথমিক জ্ঞান থাকতে হবে। কালের বিবর্তনে নতুন নতুন সমস্যা যেমন রোগব্যাধি, Drug addictions সন্ত্রাস ইত্যাদির উদ্ভব ঘটছে সমাজে ও দেশে দেশে। আকাশ সংস্কৃতির কারণে পৃথিবীটা আজ হাতের মুঠোয়। বহু অজানাকে জানতে পারা, বহু অজেয়কে জয় করা সামান্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ পৃথিবীটা পরিণত হয়ে গেছে একটা Global village এ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করে যেমন দ্রুত সফলতা আসছে তেমনি পিছনে রেখে যাচ্ছে বহুবিধ সমস্যা।
যদিও মা-বাবা বা অভিভাবক শিশুদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু এরপরও সময়ের আবর্তে তারা নিজেদের। নিঃসঙ্গবোধ করে। এই সময় শিশুরা অন্যান্যদের সাথে বন্ধুত্ব করতে বেশি প্রয়োজনবোধ করে। মা-বাবার চাইতে সমবয়সী বন্ধুদের কথাই তাদের কাছে বেশি পছন্দনীয়। তখন মা-বাবার আদেশ উপদেশ গ্রহণ করতে তাদের ভাল লাগে না।
এ সময় চিত্ত বিনোদন শিশুর খুবই প্রয়োজন যা-হল তার মনের খোরাক। কিন্তু এই বিনোদন বিভিন্ন মার্জিত মাধ্যমে করতে হবে। আর প্রতিকূলতায় অপরাধ প্রবণতার বীজ বোনন এখান থেকেই আরম্ভ হতে পারে। সুতরাং মা-বাবা বা অভিভাবকের দায়িত্ব কর্তব্য অতি নিষ্ঠার সাথে পালন করতে হবে। যে কোন গাফিলতি শিশুকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
যখন শৈশব অতিক্রম করে ছেলেমেয়েরা কৈশোরের স্তরে পা বাড়ায় (বয়ঃস্বন্ধিকাল) তখন তার চাওয়া ও আবেগিক প্রকাশের ধরনের পরিবর্তন আসে। বুদ্ধিমান মা-বাবা বা অভিভাবকরা অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে। চলেন। দীর্ঘমেয়াদে যার ফল খুবই ভাল হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা ভাবেন বয়সন্ধিকালে পদার্পন জীবন চলার প্রথম কঠিন একটা পথ অতিক্রম করার ট্রাফিক সংযোগস্থল। এখানে লাল, হলুদ, সবুজ বাতির কার্যক্রম বুঝতে ভুল করলে জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। তাই অভিভাবক যেখানে মা-বাবাই দুই প্রধান চরিত্র এবং পরবর্তীতে শিক্ষক ও ৩নং চরিত্রের দায় এড়াতে পারেন না। যদি সঠিক পথ প্রদর্শনে ভুল না করে শিশুদের ভুল মোড় নেয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন, তাহলে অভিভাবকের ভূমিকা শিশুদের মানসিক বিকাশে সার্থকতা লাভ করে। শিশুদের (ভবিষ্যৎ প্রজন্ম)। কর্মজীবনে সুন্দর ও ফলপ্রসু কর্ম জীবনের সুনির্দিষ্ট মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছতে পারা অসম্ভব কিছু নয়।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT