কাউয়ার ছাও কা-কা রব এবং কোকিলের ছাও কুহু-কুহু তান ধরে। পরিবেশ বংশানুক্রমের কোন পরিবর্তন ঘটাইতে পারে না।
আবার কোন ব্যক্তির তালাবী, পুষ্টি বা তাহার কোন উপকার করার পর যদি সে তাহা অস্বীকার করে অথবা কোন নীচ বংশ সম্ভুত ব্যক্তি উচ্চ ছহবতে পরিপুষ্টি লাভ বা বসবাস করার পর যদি কোন ক্ষেত্র বিশেষে নিজের সাবেকী বংশ গুণের পরিচয় দেয় সেই ক্ষেত্রে ঃ
“কাউয়ার বাদাত কোকিলের ছাও
জাত আনমান কাড়ে রাও”-
রূপ মননশীলতার শেলবর্ষণ করিয়া বাজিমাত করা হয়? এইরূপ ক্ষেত্রে-
“যেই কূলে জন্ম তার সেই রূপ ধরে
খাইয়া বাঘের দুধ হুয়া হুয়া করে”-
শ্রেণীর মনন কার্টিজ সমূহও সমগোত্রীয়। সাপ যেমন নেউল (নকুল) দেখিলেই আক্রমণ করে-নেউল সাপের প্রতিও তদ্রুপ হিংসাপরায়ন। মানুষের মধ্যে সতিনআলার জ্বালা এইরূপ সাপ নেউলের সম্পর্কের মত। এই দুনিয়ায় মাইয়া মানুষের যত বড় প্রতিদ্বন্দ্বীতা থাকুক না কেন সতীন প্রতিদ্বন্দ্বীর যত রিশ (ঈর্ষা) রাখেন অন্য কাহারও প্রতি তেমন নয়।
পুত (পুত্র) “সাধ আহলাদ” আশা আকাক্সক্ষার ধন। এক পুত এর জন্য লোকে খোদার দর্গায় কত আবাগত মাংগে-কত মায় মানত হাযত নিয়াজ করে, পীরের দর্গায় শিন্নি করে, পাইলে মানিক পাওয়ার মত খুশী হয়। (এক মানিক সাত রাজার ধন বলিয়া কথিত)। না পাইলে নিজেকে দুর্ভাগা মনে করে। মনমরা হইয়া থাকে। লোকে ‘আটকুরা’ বলিয়া টিট্কারী দেয়।
পুত এর বেলায় কিন্তু লোকে সতীন আলার জ্বালাও ভুলিয়া যায়। ছেলেমেয়ে লালন পালন করিতে মায়ের বড় কষ্ট হয়। প্রথমে দশমাস গর্ভে ধারণ পরে বিশমাস ‘গু’ মুত’ নিকান মায়ের একারই দায়িত্ব।
এক বাজু পচে মায়ের গুয়ে আর মুতে
আর এক বাজু পচে মায়ের মাঘ মাইয়া শীতে।
ইত্যাকার দুঃখ-কষ্ট ভোগ করাকেও ‘মা’ দুঃখ কষ্ট বলিয়া স্বীকার করে না। এত গু’ মুত নিকাইয়াও-
গু-এ-আঞ্জন গু-এ-মাঞ্জন
গু-নাই ঘরে নিত্যই কান্দন।
বলিয়া পুতের মা গর্ব ভরে বুক টান করেন। এই ‘পুত’ রূপ পরশ মণির পরশে সতীন আলার জ্বালাও থাকে না।
আর ভাত নিজের ঘরে না থাকেত ‘পরি’র (প্রতিবেশীর) ঘরে থাকিলেও সময়ে অসময়ে পাওয়া যায়। আবার একদল লোক সততঃ ঈর্ষা পরায়নকারী। ঈর্ষার প্রাণ সর্বদা মেঘাচ্ছন্ন, কণ্টকাকীর্ণ, ক্লেদপূর্ণ। সেই নীতিতে কোন ঈর্ষীয় ব্যক্তি অন্যের ‘পুত’ কি ‘খেত’ দেখিয়া ঈর্ষী মনোভাব প্রকাশ করিলে-
“হইতনো পুত অউক
পুরিত ভাত অউক”-
বলিয়া মননশীলতার কার্টিজ আওয়াজে ঈর্ষীর মানসিক গতি পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। কাংগাল শব্দের আভিধানিক অর্থ নেহাত লাচার গরীব। না অন্ন না বস্ত্র। গরীবেরা স্বতঃই ধনে হীন, জনহীন আর বিয়াশাদী করা ইসলামী বিধান মতে কম খরচের বা খরচ বিহীন ব্যাপার হইলেও আধুনিক কালের প্রভাবে এক মহা ব্যয় সংকুল কাজে পরিণত হইয়াছে।
আমাদের দেশে বিয়ার দিনে বর কনেকে যানবাহনে যাতায়াত করিতেই হয়। বিয়ার দিনে বর নিজ বাড়ীতে ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত পথিমধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দেখা বা আলাপ হয়ই না বা পাল্কী বেহারা বাহিত হইলে পৃথক বাহন দেখা সাক্ষাতের তেমন কোন মওকা থাকেনা। নিতান্ত দীনহীন কাঙ্গাল হইলেও পাত্রের জন্য কোন যানবাহন যোগাড় না হইলে বা করার কোন সংগতি না থাকিলেও কনের জন্য তাহা বাধ্যতামূলক।
কাংগালের বিয়ার কত আয়াস, তাহা সহজেই অনুমেয়। এ ক্ষেত্রে যদি বর কনের সংগেও থাকেন তখন বর এর প্রাণে স্বতঃই শংকা জাগে কি জানী পাল্কীর ভিতর কন্যা নাই। এইরূপ সন্দেহের ক্ষেত্রে পাল্কীর ঘেরাও উদলাইয়া সন্দেহ দূর করায় অর্থাৎ খুব অকাট্য সত্যকে যদি কেহ বিশ্বাস না করিয়া ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ বা অনুসন্ধিৎসা প্রয়োগ করিলে :-
‘কাংগালে বিয়া করল পথো নি উদালী চাইলা।’
রূপ মনন বাক্যের ‘উপলখণ্ড’ দ্বারা অনুসন্ধিৎসা স্রোতের গতিরোধ করা হয়।
পান সুপারী চিবাইলে অনেক সময় সুপারীর দুষ্ট কষ পানের রস ও মুখের লালার সহিত মিশ্রিত হইয়া গলায় গাইট (গিরা) ধরে। কিন্তু গাছে গুয়া থাকিলেও গলায় গাইট লাগা কোন ক্রমেই যেমন সম্ভব নয়-কোন কাজ করিয়া যখন তখন ফায়দা পাওয়ার আশাও দুরাশা বৈ কি? সুতরাং কেহ যদি কাজের ফল হাতে হাতে পাওয়ার বা দেখার প্রবল ঔৎসুক্য করিলে-
“গাছে গুয়া/গলাত গাইট”-রূপ মনন বল্গা’ টানিয়া অতি উৎসাহীকে স্বাভাবিকতার বাগে আনার চেষ্টা করা হয়। হাতের পাঁচ আঙ্গুল যেমন সমান নয় তদ্রুপ দুনিয়াবাসী কোটি কোটি মানব গোষ্ঠীর মধ্যে সকলের চেহারা তেমন একরূপ নহে। সকলের ভাগ্যও তদ্রƒপ বিভিন্ন।
চুল স্ত্রী সৌন্দর্যের খোদাদাদ অন্যতম উপাদান। যে স্ত্রী লোকের মাথার চুল যত বেশী এবং লম্বা তিনি তত সুন্দরী বলিয়া খ্যাত। এমতাবস্থায় যার মাথার চুল স্বভাবতই কম, তিনি যদি চুলের জন্য আফসোস আহাজারী করিয়া বড় খোপা বান্দার অভিলাষে তেনাছেছরা জড়াইয়া চুল বাড়ান ও লম্বা করার প্রয়াস পান বা পাইয়া থাকিবেন, তাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু তাহা হইলে কি হয়?
“দুধের সাধ কি/ঘোলে মিটে”।
‘তেনার খোপা’ কি চুলের খোপার সমকক্ষ হয়? না মর্যাদা পায়? চুলের স্বল্পতার জন্য তেনার ‘খোপ বান্দিয়া’-চুলের দীনতা হীনতা ঢাকার প্রয়াসের মত। নিজের যে কোনরূপ অসামর্থতাকে কেহ যদি কৃত্রিম উপায়ে ঢাকিবার প্রয়াস পান তবে সেইক্ষেত্রে :
চুল নাই বেটিয়ে চুলের লাগি কান্দে
তেনা ছেছরা বেরাইয়া বড় খোপা বান্দে”।
ইত্যাকার কত নজীর দিব। লোক সাহিত্যের ক্ষেত্রটাও মননশীলতার মণি-কণায় ভরপুর।
লোক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এইগলি ‘প্রবাদ’, ‘ডাকের কথা নামে প্রচলিত। কলিকাতা হইতে ডক্টর সুনীল কুমার দে সংকলিত ‘বাংলার প্রবাদ বাক্য’, পাকিস্তান পূর্ব যুগে ঢাকা হইতে মোহাম্মদ হানিফ পাঠান পল্লী সাহিত্যের ‘কুড়ান মানিক, নাম দিয়া একখানা ছোট পুস্তিকা প্রকাশ করিয়াছেন। ইহা ছাড়া এই শ্রেণীর বহির আর কোন সংকলন প্রকাশ পাইয়াছে বলিয়া আমার জানা নাই বা দেখি নাই। আশার কথা, অধুনা ‘বাংলা একাডেমী’ লোক সাহিত্যের অন্যান্য মাল মসলার সহিত এই সব রত্নকণিকাও সংগ্রহ করিতেছেন। ক্স বই : লোক সাহিত্যের কথা/সেপ্টেম্বর ১৯৮৮

 

'/> SylheterDak.com.bd
ইতিহাস ও ঐতিহ্য

লোক সাহিত্যে মননশীলতা

চৌধুরী গোলাম আকবর প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০২-২০২০ ইং ০০:২১:০৮ | সংবাদটি ১৪৯ বার পঠিত

মানুষের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-গবেষণার ফলে চলতি জীবনের কঠোর প্রয়োজনে সদা সর্বদা যে সাহিত্যের প্রয়োজন তাহার নাম মনন সাহিত্য। ব্যঞ্জন বলিলে যেমন ‘নুনঝাল’ না থাকিয়াই পারে না, আগুন বলিলে তেমনই দাহিকা শক্তি না থাকিলেই চলবে না। “সাপ’ বলিলে যেমন ‘নির্জীব দড়ি’ হইবেনা; তেমনই মনন সাহিত্য বলিলে ইহা জনজীবনের সহিত অঙ্গা অঙ্গীভাবে জড়িত অতীব প্রয়োজনীয় অথচ :
“ভেবা আনমন্ ভেবী রূহ আনমান্ ফিরিসতা”-এর মত ‘নাকে নথে মিল’ যুক্ত সাহিত্য বুঝায়। ‘বাঘ’ শব্দটা শোনামাত্রই শ্রোতার কাল্পনিক দৃষ্টির রঞ্জনরশ্মিতে মনের মানস পর্দায় :
“গোল মুখ চেপ্টা নাক কেমন পায়ের থাবা
চোখ দেখিলে মনে হয় প্রাণ গেলরে বাবা”।
এইরূপ একটা জানোয়ারের তছবির প্রতিফলিত হইয়া উঠে। ইহাতে কেহ মতান্তর পোষণ করিলে, যে কোন ‘আকলমন্দ’ত দুরের কথা ‘গোবর গনেশ’ও তাহা কিছুতেই মানিবে না। এইরূপ কথা যেইরূপ অকাট্য সত্য ‘মনন সাহিত্য’ টাও তদ্রুপ রূঢ় বাস্তব।
মানুষ নিজ নিজ ‘আকল কুহাম’ এর শফ ছিয়রত অনুযায়ী, মনের মানসক্ষেত্রকে বুদ্ধির লাঙ্গলে ‘সজ’ করিয়া ‘চিন্তার চাষ’ করতঃ জ্ঞান বিজ্ঞান রূপ ফল ধরাইয়া আসিতেছে এই ধরায় আসার পর অবধিই। কিন্তু সৃষ্টির আদিম যুগে হাল জমানার মত কাগজ, কলম, মুদ্রণযন্ত্র ইত্যাদি না থাকায় সেই প্রাথমিক যুগের মানুষ গোষ্ঠীয় জলের বুদবুদের মত মহাকালের গর্ভে বিলীন হইয়া গিয়াছে। আর এখন লেখাপড়ার’, ‘ছাপার’ টেলিভিশন, এটম হাইড্রোজেনের যুগ হইলেও মানব গোষ্ঠীর দ্বারা যেসব বিষয় চিহ্নিত হইতেছে, তাহার কোটি কোটি ভাগের এক ভাগও কি ঠিকঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হইতেছে? আর তাহা কি সম্ভব?
বিশাল জন সমুদ্রে কোটি কোটি লোকের চিন্তাধারা দিগন্তে বিলীন হইতেছে, এই কথা যেমন ঠিক তেমনি লিপি কুশলতার বাহিরের কোন কিছুরই যে রেশ থাকিতেছে না তেমন নয়। বিরাটকায় পুস্তক পড়িয়া তাহার ক-ঢ-দাড়ি কমা মনে না থাকিলেও তাহার সারমর্ম বা সারাংশগুলি যে মন মনে থাকে, তদ্রুপ বিশাল জন সমুদ্রের চিন্তাধারা বা কথাবার্তা দিগন্তে লীন হইলেও জনসমাজে ইহার রেশ যে কিছু থাকেনাই বা থাকিতেছে না তাহা কেহ ‘কছম’ করিয়া বলিতে পারিবেন না।
পূর্বেই বলা হইয়াছে মনন সাহিত্যের প্রতিটা রূঢ় বাস্তব। আবার রূঢ় বাস্তব কোন কথা প্রকাশ বা প্রচার কিংবা ঃ
“বুনন ওলে বাঘা তেতুলে”-মুখের উপর ঠাস্ করিয়া বসাইয়া দেওয়া সকলের পক্ষে সম্ভব নহে। অনেকে পারেনা।
কথায় বলে :
“চাইরো চউখে বাঘেও গরু খায় না”।
তখন সৃষ্টির সেরা মানুষ সৃষ্টির সঙ্গে এমন কাঠকোট্টামী করিবেই কি করিয়া? আবার ক্ষেত্রবিশেষে করেও। কেন করে? কখন করে?
মানুষের সুকুমার গুণাবলীর মধ্যে ধৈয্য অন্যতম। ধৈর্য্য মানুষকে অনেক প্রকার বিপদ হইতে সরাইয়া রাখে! ‘অসূর’কে ‘সুর’ করে, অমানুষকে মানুষে পরিণত করে বটে কিন্তু এরও একটা সীমা আছে। ওটা মাতৃস্নেহের মত অতল অসীম নহে। ধৈর্য্য ইস্পাতের মত শক্ত। বজ্রের মত কঠোর হইলেও ভঙ্গুর। ধৈর্যের বাঁধ একবার ভাঙ্গিলে আর জুড়া লাগে না।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গিয়া বাক্যের স্রোত প্রবাহিত হইলে সামনে যাহা পায় তাহা দলিয়া মথিয়া লইয়া যায়। ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গিলে প্রকৃতি রূঢ় হয়। তখন স্বাভাবিক অবস্থায় যে কথাকে অপ্রিয় বলিয়া মনে করে সেই কথাই বন্দুকের গুলীর মত কড়াৎ করিয়া ছুড়িয়া দেয়।
‘মননশীলতার গুলী অব্যর্থ’। উহা কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। বন্দুকের গুলী জখম করে, বেসেবে বেজায়গায় পড়িলে প্রাণহানী ঘটায়। কিন্তু মননশীলতার গুলী কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া মনের মানসে অনুশোচনার দাবানল সৃষ্টি করিয়া বেআকলী, বেতমীজি, হঠকারিতার জন্য অনুতপ্ত করে। অনুতাপের বিষ ‘প্রেমের বিষ’ এর চাইতে মারাত্মক। তবে সুফলপ্রদ। প্রেমের বিষ মানুষকে অমানুষে, রাজাকে ভিখারীতে, শরীফকে রেজিলে পরিণত করে। পল্লী কবির ভাষায় ঃ
“জলে কি নিভাইতে পারে প্রেম আগুন যার অন্তরে
কুমারেরই হাড়ি পাতিলরে ভাই অগ্নিতে দহন করে
কি সন্ধান দিছে আগুন ভিতরে ভিতরে।
এর মত জ্বালাইয়া পুড়াইয়া ছাই করে। কিন্তু অনুতাপের বিষ নিজের কৃতকর্মের জন্য নিজেকে অনুতপ্ত করে। কর্মী আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করে। ভবিষ্যতের জন্য হুশিয়ার হয়।
এই দুনিয়ায় মানুষের বসতির পর অবধিই মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞানে, সম্মত চিন্তার চাষ করিয়া চলিয়াছে। পূর্বেই বলিয়াছি, আগেকার জমানায় আজকালকার মত লিখিয়া রাখার বা সংরক্ষণের বিশেষ কোন সুবিধা না থাকায় আজকের চিন্তা গবেষণার মত সে জমানার চিন্তা গবেষণা সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করা হয় নাই বা তেমন কোন সুবিধা মিলে নাই। একথা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি আজকালকার জনসংখ্যার এক ছোট হিস্যা লেখাপড়া জানেন। নিজেদের চিন্তা গবেষণা লিখিয়া ছাপিয়া রেকর্ড করিয়া, ফিল্ম করিয়া রাখেন, এইসব কথা আরও রূঢ় সত্য।
কেহ কেহ হয়ত বলিতে পারেন সেকালের বস্তা পচামাল ওসব কি আজকের বাজারে সচল? এর জবাব কিন্তু কঠিন নয়। মাল বস্তাপচা হইতে পারে কিন্তু দর কম নয়। বাজারেও সচল। তাজমহল এর গঠন শিল্পীরা ‘তাজ’ এর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যেইরূপ চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই, ঠিক তদ্রুপ লোক সাহিত্যের কারিগররাও “মননশীলতা” রূপ শিল্প নৈপুণ্যের ও চিন্তাশীলতার কম প্রয়াস পাননি। পাঠক যথাস্থানে কথার হাছামিছা পরখ করিতে পারিবেন, নমুনা পেশ করিতেছি।
যিনি যে কাজে বিজ্ঞ তিনি সেই কাজ করিতে কোন ওজর আপত্তি বা টালবাহানা করিবেন না। আর করিবেনই কেন? যে কাজে যিনি অভ্যস্ত সে কাজ অন্যের জন্য যতই কঠোর বা আয়াস সাধ্য হউক না কেন, তাহার নিজের জন্য তাহা তরল। কিন্তু না জানিয়া জানার বড়াই করিলে বাস্তব ক্ষেত্রে বড় বেসেবে পড়িতে হয়। তখন শুরু হয় টালবাহানা, ছলচাতুরী। এইরূপ ক্ষেত্রে-
“নাচতে না জানলে উঠান তেড়া’-রূপ মনন কাটিজের গুলী ছোড়া হয়। নাচা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থাকিলে নাচাইয়া নিজ নিজ হাতের পায়ের শরীরের ভংগীতে নাচিবেন। তাহাতে স্থানের দোষে নাচের ত্রুটি ঘটিবার সম্ভাবনা কৈ? কাজেই এইক্ষেত্রে অপারগতাই সুস্পষ্ট। এইরূপ ক্ষেত্রে :
“ভাগ নাই বেটার পরু বিয়া।
হকল কুটুমে খাইতা গিয়া”-শ্রেণীর গুলিও প্রযোজ্য। বিয়া শাদী করিতে হইলে শারীরিক, আর্থিক, সামাজিক প্রভৃতি বহু রকমের ভাগ (সামর্থ) এর জরুরত। কিন্তু ইত্যাকার কোন সামর্থ না থাকা অবস্থায় যদি কেহ এইরূপ কাজের তরদ্দদ করে বা করার চেষ্টা করে তখনই মনন সাহিত্যের উপরোক্ত অবান্তর প্রয়াসকারীর কল্পনার পাখিকে ধরাশায়ী করা হয়।
প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে যে জিনিসে যে গুণ বর্তিয়াছে বা যে, যে গুণের অধিকারী হইয়াছে, কোন বিকল্প ব্যবস্থায় রূপান্তর গুণান্তর হয় না। একই মাটি হইতে রস সংগ্রহ করিলেও ‘আখের রস’ মিষ্টি, কচুর রস চুলকানকারী, নিমের রস তিতা, গুণ ও স্বাদ বিশিষ্ট।
একই পাত্রে একই সার প্রয়োগে উক্ত ত্রিবিধ গাছ জন্মাইয়া, পর্যবেক্ষণ করিলেও গুণাগুন পৃথক পৃথক হইবে সন্দেহ নাই। বসন্ত সখা কোকিল পাখি বাসা বাধিতে জানে না। কাকের বাসায় ডিম পাড়ে।
“কাক কাল কোকিল কাল” বলিয়া স্ত্রী কাক নিজ সন্তানের মত কোকিলের ‘ছাও’কে লালন পালন করে। কিন্তু “ছাও' এর যখন জবান ফোটে তখন-
কাউয়ার ছাও কা-কা রব এবং কোকিলের ছাও কুহু-কুহু তান ধরে। পরিবেশ বংশানুক্রমের কোন পরিবর্তন ঘটাইতে পারে না।
আবার কোন ব্যক্তির তালাবী, পুষ্টি বা তাহার কোন উপকার করার পর যদি সে তাহা অস্বীকার করে অথবা কোন নীচ বংশ সম্ভুত ব্যক্তি উচ্চ ছহবতে পরিপুষ্টি লাভ বা বসবাস করার পর যদি কোন ক্ষেত্র বিশেষে নিজের সাবেকী বংশ গুণের পরিচয় দেয় সেই ক্ষেত্রে ঃ
“কাউয়ার বাদাত কোকিলের ছাও
জাত আনমান কাড়ে রাও”-
রূপ মননশীলতার শেলবর্ষণ করিয়া বাজিমাত করা হয়? এইরূপ ক্ষেত্রে-
“যেই কূলে জন্ম তার সেই রূপ ধরে
খাইয়া বাঘের দুধ হুয়া হুয়া করে”-
শ্রেণীর মনন কার্টিজ সমূহও সমগোত্রীয়। সাপ যেমন নেউল (নকুল) দেখিলেই আক্রমণ করে-নেউল সাপের প্রতিও তদ্রুপ হিংসাপরায়ন। মানুষের মধ্যে সতিনআলার জ্বালা এইরূপ সাপ নেউলের সম্পর্কের মত। এই দুনিয়ায় মাইয়া মানুষের যত বড় প্রতিদ্বন্দ্বীতা থাকুক না কেন সতীন প্রতিদ্বন্দ্বীর যত রিশ (ঈর্ষা) রাখেন অন্য কাহারও প্রতি তেমন নয়।
পুত (পুত্র) “সাধ আহলাদ” আশা আকাক্সক্ষার ধন। এক পুত এর জন্য লোকে খোদার দর্গায় কত আবাগত মাংগে-কত মায় মানত হাযত নিয়াজ করে, পীরের দর্গায় শিন্নি করে, পাইলে মানিক পাওয়ার মত খুশী হয়। (এক মানিক সাত রাজার ধন বলিয়া কথিত)। না পাইলে নিজেকে দুর্ভাগা মনে করে। মনমরা হইয়া থাকে। লোকে ‘আটকুরা’ বলিয়া টিট্কারী দেয়।
পুত এর বেলায় কিন্তু লোকে সতীন আলার জ্বালাও ভুলিয়া যায়। ছেলেমেয়ে লালন পালন করিতে মায়ের বড় কষ্ট হয়। প্রথমে দশমাস গর্ভে ধারণ পরে বিশমাস ‘গু’ মুত’ নিকান মায়ের একারই দায়িত্ব।
এক বাজু পচে মায়ের গুয়ে আর মুতে
আর এক বাজু পচে মায়ের মাঘ মাইয়া শীতে।
ইত্যাকার দুঃখ-কষ্ট ভোগ করাকেও ‘মা’ দুঃখ কষ্ট বলিয়া স্বীকার করে না। এত গু’ মুত নিকাইয়াও-
গু-এ-আঞ্জন গু-এ-মাঞ্জন
গু-নাই ঘরে নিত্যই কান্দন।
বলিয়া পুতের মা গর্ব ভরে বুক টান করেন। এই ‘পুত’ রূপ পরশ মণির পরশে সতীন আলার জ্বালাও থাকে না।
আর ভাত নিজের ঘরে না থাকেত ‘পরি’র (প্রতিবেশীর) ঘরে থাকিলেও সময়ে অসময়ে পাওয়া যায়। আবার একদল লোক সততঃ ঈর্ষা পরায়নকারী। ঈর্ষার প্রাণ সর্বদা মেঘাচ্ছন্ন, কণ্টকাকীর্ণ, ক্লেদপূর্ণ। সেই নীতিতে কোন ঈর্ষীয় ব্যক্তি অন্যের ‘পুত’ কি ‘খেত’ দেখিয়া ঈর্ষী মনোভাব প্রকাশ করিলে-
“হইতনো পুত অউক
পুরিত ভাত অউক”-
বলিয়া মননশীলতার কার্টিজ আওয়াজে ঈর্ষীর মানসিক গতি পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। কাংগাল শব্দের আভিধানিক অর্থ নেহাত লাচার গরীব। না অন্ন না বস্ত্র। গরীবেরা স্বতঃই ধনে হীন, জনহীন আর বিয়াশাদী করা ইসলামী বিধান মতে কম খরচের বা খরচ বিহীন ব্যাপার হইলেও আধুনিক কালের প্রভাবে এক মহা ব্যয় সংকুল কাজে পরিণত হইয়াছে।
আমাদের দেশে বিয়ার দিনে বর কনেকে যানবাহনে যাতায়াত করিতেই হয়। বিয়ার দিনে বর নিজ বাড়ীতে ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত পথিমধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দেখা বা আলাপ হয়ই না বা পাল্কী বেহারা বাহিত হইলে পৃথক বাহন দেখা সাক্ষাতের তেমন কোন মওকা থাকেনা। নিতান্ত দীনহীন কাঙ্গাল হইলেও পাত্রের জন্য কোন যানবাহন যোগাড় না হইলে বা করার কোন সংগতি না থাকিলেও কনের জন্য তাহা বাধ্যতামূলক।
কাংগালের বিয়ার কত আয়াস, তাহা সহজেই অনুমেয়। এ ক্ষেত্রে যদি বর কনের সংগেও থাকেন তখন বর এর প্রাণে স্বতঃই শংকা জাগে কি জানী পাল্কীর ভিতর কন্যা নাই। এইরূপ সন্দেহের ক্ষেত্রে পাল্কীর ঘেরাও উদলাইয়া সন্দেহ দূর করায় অর্থাৎ খুব অকাট্য সত্যকে যদি কেহ বিশ্বাস না করিয়া ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ বা অনুসন্ধিৎসা প্রয়োগ করিলে :-
‘কাংগালে বিয়া করল পথো নি উদালী চাইলা।’
রূপ মনন বাক্যের ‘উপলখণ্ড’ দ্বারা অনুসন্ধিৎসা স্রোতের গতিরোধ করা হয়।
পান সুপারী চিবাইলে অনেক সময় সুপারীর দুষ্ট কষ পানের রস ও মুখের লালার সহিত মিশ্রিত হইয়া গলায় গাইট (গিরা) ধরে। কিন্তু গাছে গুয়া থাকিলেও গলায় গাইট লাগা কোন ক্রমেই যেমন সম্ভব নয়-কোন কাজ করিয়া যখন তখন ফায়দা পাওয়ার আশাও দুরাশা বৈ কি? সুতরাং কেহ যদি কাজের ফল হাতে হাতে পাওয়ার বা দেখার প্রবল ঔৎসুক্য করিলে-
“গাছে গুয়া/গলাত গাইট”-রূপ মনন বল্গা’ টানিয়া অতি উৎসাহীকে স্বাভাবিকতার বাগে আনার চেষ্টা করা হয়। হাতের পাঁচ আঙ্গুল যেমন সমান নয় তদ্রুপ দুনিয়াবাসী কোটি কোটি মানব গোষ্ঠীর মধ্যে সকলের চেহারা তেমন একরূপ নহে। সকলের ভাগ্যও তদ্রƒপ বিভিন্ন।
চুল স্ত্রী সৌন্দর্যের খোদাদাদ অন্যতম উপাদান। যে স্ত্রী লোকের মাথার চুল যত বেশী এবং লম্বা তিনি তত সুন্দরী বলিয়া খ্যাত। এমতাবস্থায় যার মাথার চুল স্বভাবতই কম, তিনি যদি চুলের জন্য আফসোস আহাজারী করিয়া বড় খোপা বান্দার অভিলাষে তেনাছেছরা জড়াইয়া চুল বাড়ান ও লম্বা করার প্রয়াস পান বা পাইয়া থাকিবেন, তাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু তাহা হইলে কি হয়?
“দুধের সাধ কি/ঘোলে মিটে”।
‘তেনার খোপা’ কি চুলের খোপার সমকক্ষ হয়? না মর্যাদা পায়? চুলের স্বল্পতার জন্য তেনার ‘খোপ বান্দিয়া’-চুলের দীনতা হীনতা ঢাকার প্রয়াসের মত। নিজের যে কোনরূপ অসামর্থতাকে কেহ যদি কৃত্রিম উপায়ে ঢাকিবার প্রয়াস পান তবে সেইক্ষেত্রে :
চুল নাই বেটিয়ে চুলের লাগি কান্দে
তেনা ছেছরা বেরাইয়া বড় খোপা বান্দে”।
ইত্যাকার কত নজীর দিব। লোক সাহিত্যের ক্ষেত্রটাও মননশীলতার মণি-কণায় ভরপুর।
লোক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এইগলি ‘প্রবাদ’, ‘ডাকের কথা নামে প্রচলিত। কলিকাতা হইতে ডক্টর সুনীল কুমার দে সংকলিত ‘বাংলার প্রবাদ বাক্য’, পাকিস্তান পূর্ব যুগে ঢাকা হইতে মোহাম্মদ হানিফ পাঠান পল্লী সাহিত্যের ‘কুড়ান মানিক, নাম দিয়া একখানা ছোট পুস্তিকা প্রকাশ করিয়াছেন। ইহা ছাড়া এই শ্রেণীর বহির আর কোন সংকলন প্রকাশ পাইয়াছে বলিয়া আমার জানা নাই বা দেখি নাই। আশার কথা, অধুনা ‘বাংলা একাডেমী’ লোক সাহিত্যের অন্যান্য মাল মসলার সহিত এই সব রত্নকণিকাও সংগ্রহ করিতেছেন। ক্স বই : লোক সাহিত্যের কথা/সেপ্টেম্বর ১৯৮৮

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT