ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পর্যটক ইবনে বতুতার কথা

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০২-২০২০ ইং ০০:২২:৪৫ | সংবাদটি ১৭২ বার পঠিত

আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা ছিলেন বিশ্বের সেরা মুসলিম পর্যটক, চিন্তাবিদ, বিচারক। তিনি ১৩০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মরক্কোর তাঞ্জিয়েরে জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয়া এক ঐতিহাসিক নাম ইবনে বতুতা। বিশ্ববিখ্যাত এই ভ্রমণ পিপাসু ব্যক্তি ঘুরে বেড়িয়েছেন আফ্রিকা থেকে ভারত উপমহাদেশে, ভারত থেকে তুরস্ক পর্যন্ত। এমনকি বাংলাদেশেও তাঁর পদচিহ্ন পড়েছে। তিনি এ বিশাল পথ পাড়ি দিতে কখনো পেরিয়েছেন নদীপথ, কখনো উট কাফেলায় আবার কখনো বা পায়ে হেঁটে। ২১ বছর বয়স থেকে তাঁর এ ভ্রমণ শুরু। এরপর প্রায় ৩০ বছর ভ্রমণ করেছেন। অনেকে মার্কো পালোকে তার সমকক্ষ মনে করেন। তবে মার্কো পালোর চেয়ে ইবনে বতুতা অনেক বেশি অঞ্চল ভ্রমণ করেছেন। এ কারণে সকল ঐতিহাসিকগণই ইবনে বতুতাকে বিশ্বের সেরা ভ্রমণকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। বিশ্ব ভ্রমণের সময় তিনি জীবনের অনেকটা সময় কাজির চাকরি করেছেন, মন্ত্রীর মেয়ের পানিগ্রহণ করেছেন এমনকি কখনো রাষ্ট্রদূত কখনো সেনা কমান্ডের দায়িত্বও পেয়েছেন। বেশির ভাগ ভ্রমণে ইবনে বতুতার সঙ্গে কাফেলা ছিল। তিনি নিজে একজন মহান পন্ডিত ছিলেন। তাঁর পূর্ব পুরুষরা কাজির পেশায় ছিলেন। কাজেই তিনি যে দেশে গেছেন সেখানেই রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন। নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিশেষ প্রয়োজনে তিনি কখনো কখনো পরিচয় গোপন করেছেন এবং কূটনৈতিক কারণে ভিন্ন নামও ব্যবহার করেছেন। চীনে তাঁর নাম ছিল শামসুদ্দিন এবং ভারতে তাঁর নাম ছিল মাওলানা বদর উদ্দিন। ইবনে বতুতা সারাজীবন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করে বেড়িয়েছেন। পৃথিবী ভ্রমণের জন্যই বিশ্ববিখ্যাত হয়ে আছেন তিনি। প্রথমে তিনি পবিত্র হজ পালন করার জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। জীবনের পরবর্তী ৩০ বছরে তিনি প্রায় ৭৫ হাজার মাইল বা ১,২০,০০০ কি.মি. অঞ্চল পরিভ্রমণ করেছেন। তিনি যে সময়ের সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন। সে সময়ের সুলতানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের কথা লিখে গেছেন। তিনি যেমন মহান মুসলিম শাসকদের গুণগান করেছেন তেমনি অত্যাচারী শাসকদের বর্বরতার কথাও লিখেছেন। বর্তমান পশ্চিম আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিসর, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, কাজাকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ,ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, চীনসহ আরো অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি। তার কিছুকাল আগে এমন দীর্ঘ ভ্রমণ করে বিখ্যাত হয়েছিলেন ভেনিসের ব্যবসায়ী এবং পরিব্রাজক মার্কো পালো। কিন্তু ইবনে বতুতা সেই মার্কো পালোর চেয়েও তিনগুণ বেশি পথ ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণকালে তিনি এসব দেশের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, সুফি, সুলতান, কাজী এবং আলেমদের সাক্ষাৎ লাভ করেন। ৩০ বছরে প্রায় ৪০টি দেশ ভ্রমণ করে নিজ দেশ মরক্কোয় ফেরার মরকোক্কার সুলতান আবু ইনান ফারিস তাঁর ভ্রমণ কাহিনীর বর্ণনা লিপিবদ্ধ করার জন্য একজন সচিব নিয়োগ করেন। এই ভ্রমণ কাহিনীর নাম ‘রেহলা’। এটিকে ১৪০০ শতকের পূর্ব, মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেও এসেছিলেন তিনি। বর্তমান বাংলাদেশ তৎকালীন বাংলা সম্পর্কে তিনি বলেন, টানা তেতাল্লিশ রাত সাগরে কাটিয়ে অবশেষে আমরা বাংলাদেশে পৌঁছলাম। ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সফর করেন। এখানে ইবনে বতুতা প্রথম পৌঁছেন ১৩৪৬ সালের ৯ জুলাই। সাদকাঁও (চাটগাঁও) প্রথম আসেন তিনি। সেখান থেকে সরাসরি তিনি কামাররু (কামরুপ) পার্বত্য অঞ্চল অভিমুখে রওয়ানা হন। সাদকা’ও থেকে কামাররু বর্ণনায় এক মাসের পথ। হযরত শাহজালাল (র:) এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যেই ইবনে বতুতা বাংলা সফরে আসেন। হযরত শাহজালাল (র:) এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার পর পথিমধ্যে দুই দিনের দূরত্বেই দুজন শিষ্যের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ইবনে বতুতার। তাদের কাছে নির্দেশ ছিল, পশ্চিম থেকে যে পর্যটক হযরত শাহজালালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসছেন তাকে যেন স্বাগত জানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ ইবনে বতুতার সঙ্গে হযরত শাহজালালের আগে থেকে কোনো পরিচয় ছিল না কিংবা ইবনে বতুতা তাঁর আগমনের কোনো খবরও দেননি। মূলত: এটি ছিল হযরত শাহজালালের একটি বিস্ময়কর কারামত। তিনি দিব্যজ্ঞানে ইবনে বতুতার আগমনের বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন। এজন্য হযরত শাহজালাল (র) তাঁর দুই শিষ্যকে পাঠিয়েছিলেন ইবনে বতুতাকে স্বাগত জানানোর জন্য। হযরত শাহজালাল (র:) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফেরার পথে ইবনে বতুতা একটি ছাগলের পশমের কোট উপহার পান। তিনি আন-নাহরুল আজরক (নীল নদী অর্থে) নদীর তীরবর্তী হকংক শহর অভিমুখে রওয়ানা হন। এই নদী পথে ১৫ দিন নৌকায় ভ্রমণের পর তিনি সুনুরকাঁও (সোনারগাঁ) শহরে পৌঁছেন ১৩৪৬ সালের ১৪ আগস্ট। সোনারগাঁ থেকে একটি চীনা জাহাজে করে তিনি জাভার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। যখন ইবনে বতুতা বর্তমান বাংলাদেশে এসে পৌঁছেন তখন এখানকার সুলতান ছিলেন ফখর উদ্দিন। তৎকালীন মুসলিম শাসনামলে মানুষের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সচ্ছল। দেশে খাদ্যশস্যের প্রাচুর্য এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের সব দর উল্লেখ করে তিনি বলেছেন যে, পণ্যের এমন প্রাচুর্য ও সস্তা দর তিনি পৃথিবীর আর কোথাও দেখেননি। তাঁর বর্ণনায় পাওয়া যায়, মাত্র এক দিরহাম দিয়ে তখন বাংলাদেশে আটটি স্বাস্থ্যবান মুরগি পাওয়া যেত। এছাড়াও এক দিরহামে পনেরোটা কবুতর, দুই দিরহামে একটি ভেড়া এবং এক স্বর্ণমুদ্রারও কম মূল্যে দাস-দাসী কিনতে পাওয়া যেত। ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে বাংলার জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। বাংলার সুদৃশ্য শ্যামল সবুজ প্রান্তর, পল্লীর ছায়া-সুনিবিড় সবুজের সমারোহ তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করে। তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে মন্তব্য করেন, ‘আমরা পনেরো দিন নদীর দুই পাশে সবুজ গ্রাম ও ফলফলারির বাগানের মধ্য দিয়ে নৌকায় পাল তুলে চলেছি। মনে হয়েছে যেন আমরা কোনো পণ্য সমৃদ্ধ বাজারের মধ্য দিয়ে চলছি।’ ১৩৫১ সালের এমনি এক বসন্তের সময় ইবনে বতুতা সাহারা মরুভূমির উত্তরে সিজিলমাসার উদ্দেশ্যে ফেজ নগরী ত্যাগ করেন। সিজিলমাসা থেকে ১৩৫২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি লবণের খনির শহর তাঘাজার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। তাঘাজা থেকে বিশাল সাহারা মরুভূমি পার হওয়ার পর নিগ্রোল্যাণ্ড থেকে ১৩৫৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি মরক্কোর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন এবং ১৩৫৪ সালের শুরুর দিকে ইবনে বতুতা তাঁর জন্মভূমিতে শেষবারের মতো পদার্পণ করেন। এই মহান পরিব্রাজক অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে তিনবার হজ করে তাঁর জন্মভূমিতে ফিরেছিলেন ৩০ বছর পর। ইবনে বতুতা উল্লেখ করেন- হজ পালন ও নবী (সা:) এর রওজা মোবারক জিয়ারতের আকাংখা নিয়ে যেদিন জন্মভূমি তাঞ্জিয়ের ছেড়ে মক্কার পথে যাত্রা করলাম, সেদিন ছিল ৭২৫ হিজরির ২ রজব (১৪ জুন ১৩২৫ খ্রি: বৃহস্পতিবার)। তখন আমার বয়স ছিল ২১ বছর ৪ মাস। (বাংলাদেশ প্রতিদিন : ২২ ফেব্রুয়ারি-২০১৯)

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT