ধর্ম ও জীবন

‘তুমি কি বেহেশ্ত দেখেছো!’

আজিজ ইবনে গণি প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০২-২০২০ ইং ০১:০১:১৫ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

একজন মুসলমান বুদ্ধিজীবি লেখক আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন-‘তুমি কি বেহেশত দেখেছো যে কোরআন নিয়ে লেখালেখি করো?’ তিনি আরো বলেন-‘এ গুলো মানুষের তৈরী কাল্পনিক ঘটনা মাত্র। বেহেশত বলে কিছু নেই, এ দুনিয়াটাই বেহেশত। মরার পর আর কিছু নেই।” (নাউযুবিল্লাহ)
আমি সেদিন তার এ নাস্তিক্যবাদী বক্তব্য শুনে তো মূক-বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। তাকে যে আমি উত্তরে কিছু বলবো এ শক্তিটুকু আমার লোপ পেয়ে যায় সেদিন। কেননা, প্রথমত আমার জ্ঞান সীমিত, দ্বিতীয়ত আমি যা বলবো সে তা বুঝার চেষ্টাই করবে না কখনও। কারণ সে তো আল্লার নাফরমান বান্দা। তার হৃদয়ে তো আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন। সে ভালো কিছু কখনও বুঝবে না। বুঝার চেষ্টাও করবে না। কিন্তু আমার বড় আফসোস হয় তার জন্য যে মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়ে এমন কথা মুখ দিয়ে বের করতে পারলো? আফসোস তার মুসলমানী নামের জন্য। যে কোরআন-হাদিস মানে না, যে নামাজ-রোজা মানে না, যে পরকাল বেহেশত-দোজখ মানে না, যে এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের মালিক আল্লাহকে মানে না, নবী মানে না তার নামটা আবার ইসলামী নামে। সে এখনও কেন এই ইসলামী নাম তার গায়ে জড়িয়ে রেখেছে? তার কি উচিত নয় এ নামটা পরিবর্তন করা? যে বেহেশত নিয়ে এমন মন্তব্য করতে পারলো তাকে ইসলামী নাম ব্যবহার করাতে কি তার লজ্জা লাগে না? এখানে কেন তার ইসলামের প্রতি এতো দরদ?
ভদ্রলোক লেখালেখি করেন। বেশ পরিচিতি আছে তার বাংলা সাহিত্যাঙ্গণে। তার এ লেখালেখি ধর্মীয় জীবনে কি কোনো কাজে আসবে? মানুষের কোন কল্যাণ বয়ে আনবে বলে আমার মনে হয় না। কোরআন-হাদিস বিবর্জিত বুদ্ধিজীবিদের ব্যাপারে মহাগ্রন্থ আল কোরআনে আল্লাহর জলদ গম্ভীর ঘোষণা হচ্ছে-‘তাদের মধ্যে এমন কিছু নিরক্ষর-মূর্খ লোক আছে (বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে, লেখকদের মধ্যেও) যারা মিথ্যে আশা ছাড়া কুরআনের (হাদিসের) কিছুই জানে না। তাঁরা শুধু অমূলক ধারণাই পোষণ করে।’ (সূরা বাকারা ৭৮)। ইসলাম মানে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে আত্মসমর্পণ করা। কেউ যখন মনে প্রাণে বিশ্বাস করে এবং কালিমায়ে তায়্যিবা পাঠ করে নেয় তখন তার আর নিজের বলে কিছু থাকে না। পরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহ্ যখন যা বলবেন তা করতে হবে, তা মানতে হবে। আর তার উল্টো কিছু করা হলেই আর কালিমা পাঠের কোন গুরুত্ব থাকে না। কালিমা কি, নামাজ কি, বেহেশত কি, আল্লাহ এবং নবী কে? সবই তারা বুঝে। কিন্তু তারা এ সব ছেড়ে অযথা মিথ্যে আশা নিয়েই বেঁচে থাকে। আল্লাহই তো এ কথা বলেছেন। তারা যে আল্লাহ নয় এখন শয়তানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তা তাদের কথাবার্তার মাধ্যমেই প্রমাণ মিলে। ফলে তাদের কান দিয়ে কোরআন হাদিসের বাণী ঢুকে না। চোখে কোরআন হাদিসের আলো দেখে না। তারা অমূলক ধারণা নিয়েই বেঁচে থাকে। তারা বিশ্বাস করতে পারে না যে, মরার পর আরেকবার জীবিত হতে হবে। এ জীবনের হিসেব নিকেশ হবে, এ সব তারা আদৌ বিশ্বাস করতে পারে না। যারা এ রকম অবিশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে তাদের জন্মটাই তো এক অবিশ্বাসের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। যে কোরআন-হাদিসের কোন কথা বিশ্বাস করে না, সে কি তার নিজের জন্মটাকে বিশ্বাস করতে পারলো? সে যাদের তার বাবা-মা বলে জানে। তারা কি সত্যি তার বাবা-মা? তার জন্য প্রক্রিয়া অর্থাৎ তার বাবা-মার মিলন কর্ম সে কি নিজ চোখে দেখেছে যে তাদের সে বাবা-মা বলছে? সে যে তার মায়ের গর্ভে দশ মাস দশ দিন ছিল তা কি নিজ চোখে দেখেছে? নিশ্চয় সে এ সবের কোন বর্ণনা দিতে পারবে না। বড় হয়ে বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজন তাকে বলেছেন যে তারাই তার বাবা-মা তাই সে অন্ধভাবে শুধু বিশ্বাস করে নিয়েছে এ টুকুই। যদি তার বাবা-মাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে পারে যে তারাই তার বাবা-মা তবে কেন সে বেহেশত বলে একটা কিছু আছে এ কথা বিশ্বাস করতে পারে না? সে তার বাবা-মার ঘরে হয়েছে এ কথা জানে না আবার তাদের বিশ্বাস করে জন্মদাতা বাবা-মা বলে, এ আবার কেমন কথা? আসলে আল্লাহ শুধু বেহেশত তৈরী করেন নি। সাথে সাথে দোজখও সৃষ্টি করেছেন। দোজখেও তো কিছু মানুষকে স্থান দিতে হবে না? আর এদের জন্যই তো আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন দোজখ। এরাই তো পুড়বে সেখানে অনন্ত কাল। তারা মুসলমান হয়ে মুসলমানী কিছু সহ্য করতে পারে না। ইসলাম শুনলেই তাদের গায়ে জ্বালা-পুড়া আরম্ভ হয়। তাদের গায়ে যে ইসলামী নাম তাতে কি তাদের গায়ে জ্বলে না? তারা বুদ্ধিজীবি লেখক অথচ তাদের লেখনীতে আল্লাহ্-রাছুলের কোন নাম-গন্ধ থাকে না। আল্লাহ্ ও রাছুল (সা.) এর প্রশংসা কেন তারা করতে পারে না? কি অসুবিধা তাতে তাদের? তারা যেখানে বসে সেখানেও আল্লাহ্ ও তাঁর রাছুলের কথা একবারও স্মরণ করে না। ধর্ম বিশ্বাসীদের ব্যাপারে তাই তো রাছুল (সা.) বলেন-‘যে সব লোক এমন কোন বৈঠকে (লেখালেখিতে, সভা সেমিনারে তথা লেখার বৈঠকে) অংশ গ্রহণের পর উঠে আসে, যেখানে আল্লাহর নাম (ধর্মীয় বিষয়াদি) স্মরণ করা হয় না, তারা যেন মৃত গাধার লাশের স্তুপ হতে উঠে আসে। এ রূপ মজলিস (লেখালেখিও) তাদের জন্য আফসোসের কারণ হবে।’-মুসলিমসত্যি তারা একদিন কাঁদবে, এই সময়ের জন্য আফসোস করবে। তারা যে ভুল পথে হাঁটছে আজ তা বুঝছে না, বুঝতেই চায় না, যেদিন বুঝবে সেদিন তো আর কাজ হবে না। সময় তো সেদিন অন্য সময়। আমাকে যে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তার গুণগান যদি আমার লেখায় না থাকে তবে আমার এ জন্ম কি বৃথা নয়? যদি আমার লেখায় আল্লাহ রাছুলের গুণগান না থাকে তবে তো মৃত গাধার লাশের স্তুপের মত নয় আমার এ অবস্থা? তাই আমার লেখালেখিতে আল্লাহ ও রাছুলের কথাবার্তা বিদ্যমান রাখতে হবে। জানি না তা আল্লাহ্ কতটুকু গ্রহণ করবেন। ইসলামকে জানার বুঝার জন্যই আমি ইসলাম নিয়ে লেখি। এছাড়া আল্লাহর নবী রাছুল (সা.) বলেছেন-“তোমরা যদি আমার পক্ষ থেকে একটি কথাও জানো তাহলে তা অন্যের নিকট পৌঁছে দাও।”
কাজেই আমি যা জানি তা লোকের কাছে পৌঁছানো আমার দায়িত্ব মনে করি। এ দায়িত্ব যেনতেন দায়িত্ব নয়, এ হচ্ছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আদেশ। এতে আমাকে নিয়ে কে কি বলে তা জানার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আর হ্যাঁ, আমি কখনও বেহেশত দেখি নি। তবে আমি বিশ্বাস রাখি বেহেশত বলে একটা কিছু আছে পরকালে। আমার পরকালের প্রতি বিশ্বাস রয়েছে গভীরভাবে। দুনিয়াতে অনেক কিছুই রয়েছে যা নিজ চোখে দেখা যায় না অথচ বিশ্বাস করতে হয়। আমাদের শরীরের মধ্যেই অনেক বিষয় রয়েছে যা অনুভব করা যায় কিন্তু দেখা যায় না। যেমন পেটে বেদনা, মাথায় বেদনা আরো অনেক ধরনের বেদনা । যা আমরা নিজ চোখে দেখতে পাই না অথচ তা অনুভব করি, বিশ্বাস করি এবং সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারও দেখাই এ রোগ থেকে নিষ্কৃতি পাবার স্বার্থে। ডাক্তারও কখনও বেদনা দেখেন না অথচ ওষুধ দেন। রোগও সারে। এখানে কি ওই বুদ্ধিজীবি লেখক এ বেদনাকে অস্বীকার করতে পারবেন? তিনি যে সকল বই পড়ে আজ বুদ্ধিজীবি বা লেখক হয়েছেন তিনি কি সব লেখককে নিজ চোখে দেখেছেন যে ওই বইগুলো ওই লেখকই লিখেছেন? বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন, সুকুমার বড়ুয়া আরো অনেক লেখকের বই তিনি পড়েছেন অবশ্য। তিনি কি নিজ চোখে দেখেছেন যে তারা এ বইগুলো লিখেছেন? তবে কেন তিনি বিশ্বাস করে নিলেন যে বইগুলো ওই লেখকরাই লিখেছেন? এবং এ বিশ্বাস নিয়ে পাঠও করলেন। যা তিনি দেখেন নি তা কেন বইয়ের পাতায় লেখা দেখে বিশ্বাস করে নিলেন এবং পাঠ করলেন?
পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি মানুষ নবী ভক্ত। এরা কি সবাই নবীকে দেখেছেন? কেউ দেখেন নি কিন্তু সবাই বিশ্বাস করেন নবী একজন আছেন যিনি আল্লাহর রাহুল। তিনি যা বলে গেছেন তা সত্য এবং মানব কল্যাণের জন্যই বলেছেন। এই যে বিশ্বাসের ভিত্তি, তা নিয়েই তো মুসলমানরা বেঁচে থাকে। আমিও বিশ্বাস করেছি এসবে। ছোটবেলা মসজিদে-মক্তবে যে প্রথম পাঠ নিয়েছিলাম তা এখনও এ হৃদয়ে অমর-অক্ষয় হয়ে আছে। এখনও আমি প্রাণ ভরে পাঠ করি কালিমায়ে তায়্যিবাহ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)। এখনও আমি বিশ্বাস করি পাঠ করি-
ঈমানে মুফাসসাল ঃ আমানতু বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহী ওয়া কুতুবিহী ওয়া রুসুলিহী অল ইয়াওমিল আখিরি অল কাদরি খাইরিহী ওয়া শাররিহী মিনাল্লাহি তা'আলা অল বাছি বা'দাল মাউত।
অর্থ : (সাতটি বিষয়ের উপর ঈমান আনা প্রত্যেক মু'মীন-মুসলমানের জন্য অপরিহার্য) প্রথমত আমি ঈমান আনলাম আল্লাহ তায়ালার উপর। দ্বিতীয়ত ঈমান আনলাম ফেরেশতা গণের উপর। তৃতীয়ত ঈমান আনলাম তাঁর কিতাব সমূহের উপর। চতুর্থত ঈমান আনলাম তাঁর রাছুলগণের উপর। পঞ্চমত ঈমান আনলাম কিয়ামত দিবসের উপর। ষষ্ঠত ঈমান আনলাম ভালো-মন্দ তাকদীরের উপর। সপ্তমত ঈমান আনলাম (মৃত্যুর পর) জীবিত হওয়ার উপর।
এই যে কালিমা বা বাক্য এ সবে যারা বিশ্বাস করে তারাই তো আস্তিক, খাঁটি মুসলমান। তারাই তো আল্লাহর প্রিয় বান্দা। আর যারা বিশ্বাস করে না অথচ এ সব নিয়ে টাট্টা-বিদ্রুপ করে তারাই তো নাস্তিক। তাদের জন্যই তো আল্লাহ তায়ালার দুঃসংবাদ। বেহেশত্ যারা মানে না তাদের জন্যই তো দোজখ নির্ধারিত। যেদিন তারা দোজখের আগুনে জ্বলবে কেবল সেদিনই তারা বিশ্বাস করবে আল্লাহ আছেন, নবী আছেন, পরকাল আছে, বেহেশ্ত আছে, এর আগে নয়। কিন্তু তখন তাদের এ বিশ্বাসে আল্লাহ্ তায়ালার কিছুই যায় আসে না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT