ধর্ম ও জীবন

নিজাম উদ্দিন আউলিয়া

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০২-২০২০ ইং ০১:০৫:০৩ | সংবাদটি ২১৬ বার পঠিত

নবী ও রাসূলগণের আগমণের পথ বন্ধ হওয়ার পর ইসলাম প্রচারের সমূহ দায়িত্ব পালন করেছেন আউলিয়ায়ে কেরামগণ। পাক ভারত উপমহাদেশে যেসব ওলির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষ সঠিক পথের সন্ধান পেয়েছেন চিশতিয়া তরিকার প্রখ্যাত সুফি সাধক শেখ খাজা সৈয়দ মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন আউলিয়া তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ‘নিজাম উদ্দিন আউলিয়া’ নামে সকলের নিকট পরিচিত। নিজাম উদ্দিন আউলিয়া ভারতের উত্তর প্রদেশের বাদাউনে ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিলেন। তাই তিনি অতি অল্প দিনের মধ্যেই কুরআন, হাদীস ও ইলমে ফিকাহ শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্য অর্জন করেন।
ছোট বয়সেই হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার পিতা খাজা আহমদ ইন্তেকাল করেন। তাঁর পিতা মৃত্যুকালে কোনো সম্পদ রেখে যাননি। খাজা নিজাম উদ্দিন ও তাঁর মাকে অত্যন্ত অভাব ও দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হত। অনেক সময় না খেয়ে থাকার মত পরিস্থিতি দেখা দিত। কিন্তু তাঁর মা ছিলেন অত্যন্ত খোদা প্রেমিক এবং বুদ্ধিমতি। যেদিন ঘরে কোনো খাদ্য থাকতো না নিজাম উদ্দিনের মা মুচকি হেসে বলতেন ‘নিজাম আজ আমরা আল্লাহর মেহমান।’ এ কথা শুনে শিশু নিজাম অত্যন্ত আনন্দিত হতেন। আল্লাহর মেহমান হওয়া নিশ্চয়ই ভাগ্যের ব্যাপার। কখনো কখনো ঘরে বেশ খাবার থাকত। কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর শিশু নিজাম উদ্দিন বলতেন, ‘মা! আমরা আর কখন আল্লাহর মেহমান হব।’ মায়ের সঠিক পৃষ্ঠপোষকতায় বালক নিজাম উদ্দিন লালিত-পালিত হয়েছেন। তাঁর মা অধিকাংশ সময় তাঁকে ওলি-আউলিয়ার কেচ্ছা-কাহিনী শোনাতেন। বালক নিজাম উদ্দিন অতি অল্প বয়সে দিনের পর দিন রোজা রাখতেন। লোকেরা বলত, নিজাম এখনও তোমার উপর রোজা ফরজ হয়নি। নিজাম বলতেন ‘খাবারের চেয়ে রোজাই আমার কাছে মজাদার, রোজাই আমার প্রিয় খাদ্য।’
ভারতবর্ষের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ওলি ছিলেন নিজাম উদ্দিন আউলিয়া। ২০ বছর বয়সে নিজাম উদ্দিন আউলিয়া সুফি ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকরের নিকট চিশতিয়া তরিকার বাইআত গ্রহণ করেন। তিনি তিনবার রমজান মাসে ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকরের দরবারে অবস্থান করেন। এখান থেকেই তিনি সুফিবাদের দীক্ষা গ্রহণ করেন। ইলমে তাসাউফে কঠোর সাধনা করে চিশতিয়া তরিকার একজন মহান সাধন হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেন।
ইলমে তাসাউফে অত্যন্ত পারদর্শী হিসেবে তিনি তাঁর পীর ও মুর্শিদ ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকরের প্রিয় শিষ্য হয়ে উঠেন ধীরে ধীরে। পরবর্তীতে তাঁর মুর্শিদ ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকর তাঁকে খলিফা হিসেবে মনোনীত করেন। এরপর তিনি চিশতিয়া তরিকার মশাল সামনে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। এর কয়েকদিন পর নিজাম উদ্দিন আউলিয়া দিল্লিতে ফিরে আসেন।
হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার আধ্যাত্মিক ইলিম ছিল অনেক উচ্চস্তরের। তাঁর আধ্যাত্মিকতার কথা এই ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়লে তাঁর নিকট হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটতে থাকে। তিনি মানুষকে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে তালিম-তরবিয়ত প্রদান করতেন। হাজার হাজার পথহারা মানুষকে তিনি সঠিক পথের সন্ধান দেন। দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে তাঁর ভক্তের সংখ্যা। শিরক-বিদআত থেকে তাঁরই মাধ্যমে অনেক মানুষ মুক্তি লাভ করে।
জিয়াউদ্দিন বারুনী নামক চৌদ্দ শতকের এক ঐতিহাসিক বলেন, ‘দিল্লির মুসলমানদের উপর নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার প্রভাব এমন ছিল যে, পার্থিব বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। মানুষ আধ্যাত্মিক ইবাদতের প্রতি মনোযোগী হয় এবং দুনিয়াবী চিন্তা থেকে পৃথক হয়ে পড়ে।’ নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার প্রায় ৬০০ জন শিষ্য ছিলেন। শিষ্য সবাই হতে পারেন না। একজন ওলির শিষ্য হতে হলে যোগ্য হতে হয়। আল্লাহর ওলিগণ যে কাউকে শিষ্য হিসেবে বরণ করেন না। আধ্যাত্মিকভাবে যাচাই-বাছাই করে আল্লাহর ওলিগণ শিষ্যত্ব দান করেন। বাইআতের মাধ্যমে আল্লাহর ওলিগণ শিষ্যত্ব দিয়ে থাকেন। এই শিষ্যরা পীরের আধ্যাত্মিক সাজারাকে বজায় রেখে চলেন। নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার কয়েকজন বিখ্যাত শিষ্য হলেন-আমির খসরু, নাসির উদ্দিন জেরাগ দেহলভী, আঁখি সিরাজ আয়নায়ে হিন্দ, বুরহান উদ্দিন গরীব, জালাল উদ্দিন ভান্ডারী, সৈয়দ মাহমুদ কাশকিনাকার, আজান ফকির প্রমুখ।
সবার মধ্যে আমির খসরু ছিলেন নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য। আমির খসরু ছিলেন একাধারে কবি, দার্শনিক ও সংগীতজ্ঞ। ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞ ছিলেন আমির খসরু। সেই আমির খসরুকে তুত-ই-হিন্দ বা ভারতের তোতা পাখি বলা হত। তাঁর হাত ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশে গজল সংগীত ও কাব্যের প্রচার ও প্রসার হয়। নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মৃত্যুর আগে তাঁর ভক্তদের নির্দেশ দিয়ে যান, আমির খসরুকে যেন তাঁর কবরের পাশে দাফন করা হয়। ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে নিজাম উদ্দিন আউলিয়া যখন ইন্তেকাল করেন তখন মাজারের পাশে গিয়ে বিলাপ করতে থাকেন সেই আমির খসরু (রঃ)। এভাবে টানা ছয় মাস কান্না করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। পরে নিজাম উদ্দিন উলিয়ার কবরের পাশে দাফন করা হয় তাঁর প্রিয় শিষ্য আমির খসরুকে। প্রখ্যাত কবি আমির খসরু যুব বয়সে নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার দরবারে হাজির হলেন। ভেতরে প্রবেশ না করে তিনি হুজরার বাইরে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। কিন্তু কেউ তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করলো না। শেষ পর্যন্ত তিনি একটা কাগজে দুই ছত্র কবিতা লিখে ভেতরে পাঠিয়ে দিলেন।
কবিতার সারমর্ম ছিল-‘তুমি তো এমন এক বাদশাহ যার মহলে কবুতর এসে বসলেও সে বাজপাখিতে পরিণত হয়। একজন অসহায় লোক দরজায় আছে, সে কি ভেতরে আসবে? না বিফল হয়ে ফিরে যাবে?’ কিছুক্ষণের মধ্যেই কাগজের অপর পৃষ্ঠায় লিখিত জবাব আসল-‘প্রার্থী যদি দিব্যজ্ঞানের আকাংখী হয় তবে তার পক্ষে ভেতরে চলে আসাই উচিত। হয়ত সে আমাদের সমব্যথী ও সাধনসঙ্গীতে পরিণত হতে পারে। আর যদি মূর্খ ও নাদন হয়ে থাকে তবে যে পথে সে এসেছে সে পথে ফিরে যাওয়াই তার পক্ষে শ্রেয়।’ এরপর আমির খসরু হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার এমন অন্তরঙ্গ ও সমব্যথীতে পরিণত হলেন যে, মৃত্যুর পরও তাঁরা একজন হতে আর একজন পৃথক হননি। উভয়েই একই স্থানে পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া দানশীলতা, অতিথি পরায়ণতায় ভারতের সকল সুফি সাধককে ছাড়িয়ে গেছেন। তিনি তাঁর সহায়-সম্পদ গরীব-দুঃখীর মধ্যে অকাতরে ব্যয় করতেন। নিজাম উদ্দিন আউলিয়া (রঃ) সম্পর্কে আমাদের সমাজে একটি মিথ্যা কল্পকাহিনী প্রচলিত আছে। আর তা হচ্ছে ‘ নিজাম উদ্দিন আউলিয়া নাকি ডাকাত ছিলেন, তিনি ৯৯টি খুন করে তাওবা করে ওলি হয়েছেন।’ নিজাম উদ্দিন আউলিয়া সম্পর্কিত এসব কল্পকাহিনী সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটা একটি গুজব মাত্র। নিজাম উদ্দিন আউলিয়া বংশগত দিক দিয়ে ছিলেন হযরত আলী (রা.)-এর উত্তরসূরী। তিনি অতি অল্প বয়সেই বেলায়তি লাভ করে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক দরবেশ হযরত শাহজালাল (১১৯৬-১৩৪৬ খ্রিঃ) দিল্লিতে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করলে তিনি একজোড়া কবুতর তাঁকে উপহার দেন। ‘জালালী কবুতর’ নামে আমাদের বাংলাদেশে যেসব কবুতর রয়েছে তা নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার দেয়া কবুতরগুলোর বংশধর।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT