পাঁচ মিশালী

বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে

উর্দু থেকে অনুবাদ : সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০২-২০২০ ইং ০০:০১:৪৯ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত


মুহাম্মদ বদর মুনির, সত্তর-আশির দশকে পাকিস্তানের সাংবাদিকতায় অত্যন্ত আলোচিত-সমালোচিত এক নাম। তাঁর জন্ম ও শৈশব কেটেছে ভারতে। ১৯৪৭-এ ভারত ভাগের সময় পরিবারের সাথে পাকিস্তানে আসেন। তাঁর বন্ধুদের তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের অনেক হাইপ্রফাইল ব্যক্তি রয়েছেন। বাংলাদেশের শহিদ-বুদ্ধিজীবীদের অনেকই ছিলেন তাঁর বন্ধু। রাজনীতিতে তিনি এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে, আওয়ামী লীগে। আওয়ামী লীগই তাঁর প্রথম ও শেষ রাজনৈতিক দল। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাব আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং অল-পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মজলিসে আমেলার সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি যেভাবে দেখেছেন এবং জেনেছেন, তা নিয়ে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে উর্দুতে প্রকাশিত হয় তাঁর গ্রন্থ ‘জেয়সা কেহ ময় জানতাহু শেখ মুজিবুর রহমান’। লেখকের প্রায় পঁচিশ বছরের কর্মের ফসল দু’শত ছিয়াশি পৃষ্ঠার এই বই। বইটিতে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যের পাশাপাশি উপমহাদেশীয় রাজনীতির অনেক নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে।


[পূর্ব প্রকাশের পর] : এপ্রিল ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের কথা। দিল্লিতে সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের তিন নির্বাচিত মুসিলম সদস্য এবং ভারতের প্রাদেশিক পার্লামেন্টে নির্বাচিত মুসলিম সদস্যদের মধ্যে যৌথ মিটিং চলছে। কিছুদিন পূর্বে এখানে কংগ্রেসের নেতৃত্বে এশিয়ার বিশেষ নেতাদের বৈঠক হয়, সেই বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা ড. মুহাম্মদ হাত্তাও উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলন শুধু উপমহাদেশে নীতি নির্ধারণের জন্য হয়েছিলো বলে ঐতিহাসিক ছিলো না, বরং তা ছিলো মুসলিম ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্বাচিত প্রতিনিধি কর্তৃক নীতি নির্ধারণের বড় কনভেনশন। এই রকমের মিটিং বা কনভেশনের কোন উপমা অতীতে নেই। যারা এখানে নীতি নির্ধারণে বসেছিলেন তারা সবাই ছিলেন মুসলিম লীগের টিকেটে কায়দে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নার নেতৃত্বে নির্বাচিত প্রতিনিধি, আর এই কনভেনশনে তিনি সভাপতিত্বও করেন। মুসলিম লীগের এই বিজয় ভারতীয় জাতীয়তাবাদী মৌলভীদের একেবারে শব্দশূন্য নীরব করে দিয়েছিলো এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও তাদের সহযোগিদের চিন্তিত করে দিয়েছিলো। তারা ভাবিত হয়, এক বক্র, দুর্বল এবং জীর্ণ জাতি জেগে উঠেছে বলে। যাদেরকে ইংরেজ এবং তাদের সহযোগী হিন্দু কর্তৃক সুক্ষ্ম ষড়যন্ত্র এবং প্রতিবন্ধকতায় মাত্র ৮৩ বছরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে শাসক জাতি থেকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছিলো। এমন এক জাতিকে অল্প সময়ে জাগিয়ে দিয়ে বিজয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া কম কথা নয়। আর এ কাজটি করতে পেরেছিলেন কায়দে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তা এমন একটি ঘটনা, যা এ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব থেকে ১৯৪৬-এর দিল্লির প্রস্তাব পর্যন্ত এক অতুলনীয় সফর ছিলো, যা এশিয়া উপমহাদেশে দৈর্ঘ্য ও প্রস্তের সেই সময়ের বসতির দশ কোটি মুসলমানকে ভাষিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ভিন্নতার পরও ঐক্যবদ্ধ এক বাহিনীতে রূপ দিয়েছিলো। তা এমন এক বাহিনী ছিলো, যার মধ্যকার শক্তি তিন কোটিকে এক রাষ্ট্রের ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছিলো। তা ছিলো দিল্লির প্রস্তাব, যা কায়দে আজম মহাম্মদ আলী জিন্নার অনুমতিক্রমে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী গ্রুপের নেতা এবং বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক উপস্থাপিত হয়েছিলো।
শহিদ সোহরাওয়ার্দীর দিল্লির বক্তব্য ও প্রস্তাব :
‘কায়দে আজম ও মুসলিম লীগের সংসদ সদস্যবৃন্দ পুরুষ ও মহিলাগণ! আমাকে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উপস্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই উপমহাদেশের প্রত্যেক স্থানের প্রায় দশ কোটি মুসলমান আজ রাজনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা এবং আর্থিক বন্দিত্বে রয়েছেন, যা প্রভাবিত করছে তাদের চিন্তাগত দৃষ্টিভঙ্গি, ইবাদত ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক। অথচ এখানকার মুসলমানদের চিন্তাগত দৃষ্টিভঙ্গি, ইবাদত ও সংস্কৃতি হিন্দু দর্শন থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং মর্যাদাশীল। হিন্দু ধর্ম এবং দর্শন হাজার বছর থেকে বংশবাদকে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে, যার ফলে ছয়কোটি মানুষকে এখানে নিচু এবং গরীব ঘোষণা দিয়ে অচ্যুত করে রেখেছে, যা মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিক করে ব্যবধান তৈরি করে রেখেছে। যা এই দেশের বাসিন্দাদের অনেক বড় অংশে আর্থিক ও সামাজিক বে-ইনসাফি প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। এতে মুসলিম ছাড়াও খ্রিস্টান এবং অন্যান্যদের অবস্থা এমন হয়েছে যে তাদেরকেও সামাজিকভাবে গোলামির জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য করা হয় এবং তা থেকে মুক্তির কোন পথ এই পদ্ধতিতে নেই বলে আমরা মনে করি। প্রত্যেক স্থানে হিন্দুদের জাত বৈষম্যনীতি অবশ্যই ইসলামী রীতি-নীতির বিপরীত। ইসলামের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র এবং জীবনে একে অন্যের প্রতি সুদৃষ্টি এবং সুধারণা প্রতিষ্ঠা করা। এখানে প্রত্যেক গ্রামে হিন্দু এবং মুসলিমের ইতিহাস ভিন্ন। এদের প্রত্যেকের পৃথক ঐতিহ্য সংস্কৃতি এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিন্নতার কারণে অখন্ড ভারতের চিন্তা অযৌক্তিক এবং তা থেকে উপকৃত হওয়া কঠিন। এখানে শত শত বছর থেকে এক সাথে হিন্দু মুসলিম বসবাসের পরও উভয় পৃথক জাতি রয়ে গেছে। প্রত্যেক স্থানে বৃটিশ নীতিতে পশ্চিমা গণতন্ত্রের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠদের শাসন প্রতিষ্ঠিত। এই নীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে সংখ্যালঘুদের বিরোধীতার পরও তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। হিন্দু সংখ্যাঘরিষ্ট প্রদেশসমূহে বৃটিশের ‘গভর্ণমেন্ট অফ এন্ডিয়া এক্ট’-এর কারণে কংগ্রেস সরকার চালিছে। কংগ্রেস তার আড়াই বছরের শাসনে মুসলমানদেরকে বিভিন্নভাবে সংকটের মুখোমুখি করেছে। ফলে আজ মুসলমানদের বিশ^াসে রূপান্তরিত হয়ে যায় যে, এই নামমাত্র হেফজাত যা ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের আইন, যা ভারতের গভর্ণরদের কাছে জারি করা হয়েছিলো, তা ফালতু এবং অকার্যকর। মুসলমানেরা তা স্পষ্ট অনুভব করছে যে, যদি কোন কারণে অখন্ড ভারত হয়ে যায় তবে মুসলিম সংখ্যাঘরিষ্ট প্রদেশগুলোতেও মুসলমানদের অবস্থা হবে নিম্নশ্রেণীর নাগরিক হিসাবে এবং কেন্দ্রে হিন্দু শাসনের কাছে মুসলমানদের সম্মান ও অধিকার রক্ষা পাবে না। প্রত্যেক এলাকার মুসলমানদের বর্তমানে বিশ^াস তৈরি হয়ে গেছে যে, হিন্দুদের কব্জা থেকে মুক্তির জন্য জরুরী হলো স্বাধীন-স্বার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। উত্তর-পূর্ব দিকে আসাম ও বাংলা সহ অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাঘরিষ্ট এলাকা, উত্তর-পশ্চিম দিকে পাঞ্জাব, সিন্ধ, বেলুচিস্তান এবং সরহদ ইত্যাদি মুসলিম সংখ্যাঘরিষ্ট এলাকাসমূহ রয়েছে। প্রাদেশিক এবং কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের জামায়েত পূর্ণাঙ্গ চিন্তার পর এই ঘোষণা করে যে মুসলিম জাতি অখন্ড ভারতের পক্ষে পাশ করা কোন আইনকে অবশ্যই গ্রহণ করবে না। আর এই উদ্দেশ্যে যে পার্লামেন্ট গঠিত হবে মুসলিম সদস্যরা অবশ্যই এতে যোগ দিবে না। মুসলিম জাতিসমূহ ততক্ষণ পর্যন্ত হিন্দুস্তান বিষয়ে কোনকিছুতে সাহায্য করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত বৃটিশ সরকারের পক্ষ থেকে হিন্দুস্তানিদেরকে নিজেদের ইচ্ছে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এমন নীতি উপস্থাপন করবে না, যা ইনসাফ এবং ন্যায়সম্মত এবং যা দিয়ে দেশের আভ্যন্তরীন শান্তিÑশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। যেমন,
১. হিন্দুস্তানের দক্ষিণ-পূর্বে বাংলা-আসাম এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে পাঞ্জাব, সরহদ, সিন্ধ, বেলুচিস্তান ইত্যাদি, যারা সাধারণভাবে পাকিস্তানি দর্শনে বিশ্বাস করে স্বেচ্ছায় স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাঘরিষ্ট, এগুলোকে স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দিয়ে দ্রুত পকিস্তান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২. পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের পৃথক নীতিনির্ধারণের জন্য পৃথক নাগরিকদের নিয়ে পৃথক পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩. অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের লাহুর প্রস্তাব অনুযায়ী পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন করা হোক।
৪. মুসলিম লীগের সাহিয্য-সহযোগিতা পাওয়ার জন্য অবশ্যই শর্ত হলো সাবেক কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পেশকৃত
মুসলিম লীগের দাবী অনুযায়ী পাকিস্তানকে গ্রহণ করা এবং দ্রুত তা প্রতিষ্ঠা করা।
এই কনভেনশনে দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করছি যে, অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠায় যদি কোন নীতি প্রণয়ন কিংবা কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক মুসলিম লীগের দাবীর উল্টো শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়, তবে মুসলমানদের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া আর কোন বিকল্প পথ থাকবে না।
কায়দে আজম এবং সম্মানিত মহিলা ও পুরুষ সদস্যবৃন্দ! আমার জন্য আজ সবচে আনন্দ ও গর্বের বিষয় এই প্রস্তাব আমি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি। সবচে সম্মানের কথা হলো, আজ মুসলিম উম্মাহের যে নেতারা এখানে উপস্থিত তাদেরকে জনগণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য নেতা হিসাবে নির্বাচিত করেছে। এই কনভেনশন হিন্দুস্তানের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। একদিকে বৃটেন এবং অন্যদিকে ভারত একই সময়ের আবর্তে দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে পচনযুক্ত এবং বিস্মৃত কিছুর উপর যদি নিয়ম চালু করার চেষ্টা করা হয় তবে অবশ্যই এমন অবস্থা হবে যা হিন্দুস্তানের আইন শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। বৃটিশ সরকার চাচ্ছে তারা হিন্দুস্তানীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। বৃটেন থেকে মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা এই উদ্দেশ্যে ভারত এসেছেন যে, তারা যেন এমন পদ্ধতি আবিস্কার করতে পারেন যাতে সহজভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায়। বৃটিশ মন্ত্রীদের ভারতে আসা প্রমাণ করে তাদের সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে রয়েছেন। বিভিন্ন দল সরকারের সামনে তাদের মত প্রকাশ করেছেন। প্রশ্ন হলো, বৃটিশ সরকার কার কাছে ক্ষমতা দিয়ে যাবে? কংগ্রেসের ইচ্ছে তারা ক্ষমতা অর্জন করে, যাতে মুসলিম ও অন্যান্যদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তারা সরকারকে বলছে, আমাদের কাছে ক্ষমতা দাও আমরা সকল বিরোধীতাকারীকে শেকড় থেকে উৎখাত করে দেবো, মুসলমানদেরকে থামিয়ে দেবো, নীচুজাতের উপরও আমরা বিজয়ী হবো। তাদের সবাইকে পরিবর্তন করে দেবো। কংগ্রেস দাবী করেছে পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং অস্ত্রসমূহ তাদের অধীনে দিতে হবে। তখন তারা অখন্ড ভারতের নামে খুনাখুনি, গৃহযুদ্ধ, হত্যা এবং লুটপাটের বাজার গরম করে দিলো। আমি কংগ্রেসের এমন সকল গোলমাল, চিৎকার এবং বকবকানিকে পাগলামী মনে করি, যা শক্তি এবং পদের লোভে সৃষ্টি হয়েছে। (জোরে হাততালি)
যদি বৃটিশ সরকার ভারতের ভবিষ্যতকে প্রতিষ্ঠিত রক্তপাতকারীদের হাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তা তাদের অন্ধত্ব ও চূড়ান্ত বোকামী হবে। মুসলিমদের জন্য মুসলিমলীগ ছাড়া অন্য কোন পথ নেই, পাকিস্তান ছাড়া মুসলমানদের অন্য কোন আকাঙ্খা বা উদ্দেশ্য নেই। এমনকি সীমান্ত প্রদেশের মুসলমানেরাও পাকিস্তানের বিরোধী নয়, তারা তো তাদের নিজেদের মতো করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে। এখন এই দেশে এমন কেউ নেই যে পাকিস্তানী দৃষ্টিভঙ্গির উপর নেই। খিজির হযরতও এই কথা বলছেন না যে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে নেই। আমি তাকে বলেছি যে তিনি যেন একজন খাদিমে কৌম হিসাবে মুসলিম লীগে যোগ দেন। যদি তিনি ইজ্জত ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকেন তবে নিজে কেন জাতিকে ডাকছেন না। দুনিয়ার এমন কোন শক্তি নেই যা ভারতের মুসলমানদের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত শক্তি এবং উন্নতিকে থামাতে পারে। দশ কোটি মুসলমান ঐক্যবদ্ধ জাতি কিন্তু ত্রিশ কোটি মানুষ যারা নিজেদেরকে হিন্দু বলে দাবী করেন। এখানে এক ন্যাশনের চিন্তা ভুল। তারাই এক ন্যাশন নয়। তাদের ধর্মীয় নীতিতে শূদ্র বা নীচ জাতিগুলোর মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি করেছে। তারা উপমহাদেশে তাদের জন্য ন্যায়-নীতি চালুর প্রত্যাশী। তারা প্রশ্ন করে, পাকিস্তান কি আমাদের জন্য চূড়ান্ত প্রত্যাশা নয়? আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করবো না। অবশ্য তা আরজ করবো যে, পাকিস্তান আমাদের তরতাজা প্রত্যাশা। শুরুর দিকে হিন্দুদের বক্তব্য ছিলো, মুসলমানদের এই দেশের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। তখন উত্তর হয়েছিলো, হিন্দুস্তান যেমন তোমাদের তেমন মুসলমানদেরও। আমি কংগ্রেসকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, অতীতের বছরগুলোতে আমরা তোমাদের সাথে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছি। আমরা কম থেকে কম দাবী তোমাদের সামনে রেখেছি। আমাদের প্রত্যাশা ছিলো যে, গণতান্ত্রিক নিয়মে হিন্দু-মুসলিম সংখ্যাকে গ্রহণ করা হোক। কিন্তু তারা আমাদের দাবীকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের মতের উপর দৃঢ় থেকেছে। এখন যখন প্রস্তাবগুলোর মৃত এবং আমরা স্বাধীনতার কথা বলছি এবং তা বাস্তবায়ন হতে চলছে তখন কংগ্রেস এবং হিন্দুরা বলছেন আমরা হিন্দু-মুসলিম এক জাতি এবং ভাই ভাই। বর্তমানে মুসলমানদের দাবী ভারতে দুটি দেশ। আল্লাহর শোকর বর্তমান ভারতের দশ কোটি মুসলিম কায়দে আজমের নেতৃত্বে মুসলিম লীগের পতাকাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। এখন তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হলে তারা সর্বশক্তি দিয়ে মোকাবেলা করবে। স্মরণ রাখবেন, মুসলমান এখন মৃত জাতি নয়। তাদের কাছ থেকে কিছু প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা শুধু মৃত কিছু শব্দ নয়। যদি হিন্দুস্তানকে শান্ত রাখতে চাও তবে কংগ্রেসের উচিৎ পাকিস্তানকে স্বাগত জানানো। আমরা ভারতের মুসলমানেরা এক জাতি। আমাদেরও অধিকার রয়েছে জীবন্ত ও দায়িত্বশীল জাতি হিসাবে পৃথিবীর ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির উন্নয়নে নিজেদের দায়িত্ব আদায় করি। আমরা তো হিন্দুস্তানের শুধু দ্বিতীয় অংশ চাচ্ছি। যদি স্বদেশী ভাইয়েরা আমাদের এই আকাঙ্খা গ্রহণ না করেন এবং যুদ্ধের ময়দানে দৃঢ় থাকেন তবে আমি তা বলতে পারবো না যে, আগামীতে কী হবে, আমি বলতে পারবো না আমাদের ভবিষ্যত পদক্ষেপ কী হবে? কায়দে আজমের ঘোষণা, যদি আমাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোন নীতি পাস হয়, তবে তা আমরা প্রত্যাখ্যান করবো। আমিও আজ দশ কোটি ভারতীয় মুসলমানের পক্ষ থেকে বলছি, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করবো। (উপস্থিত সবাই বলেন- অবশ্য অবশ্য)। বর্তমানে মুসলমান ভাই ভাই হয়ে গেছে। যদি কোন প্রদেশ তাদের মতের উল্টো বাদ দেওয়া হয়, তবে তার মোকাবেলা আমরা করবো। মুসলিম লীগ মুসলমানদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে দিয়েছে এবং তাদেরকে এক জীবন্ত জাতিতে রূপ দিয়েছে। বাস্তবে নির্বাচন প্রমাণ করে দিয়েছে যে, মুসলিম লীগ মুসলমানদের মধ্যে কী গুরুত্ব রাখে। বাংলায় অতি দুর্বল এবং পঙ্গু ব্যক্তিও মাইলকে মাইল হেটে গিয়ে মুসলিম লীগকে ভোট দিয়েছে। তাদের বিশ্বাস ছিলো, মুসলিম লীগের শক্তি ও দৃঢ়তার উপর মুসলমান ও ইসলামের বিজয়। যে জাতির নিজের ঈমানের উপর ভরসা থাকে তাকে কেউ পরাজিত করতে পারে না। আমরা আপোসের সাথে থাকতে চাই, তবে ইজ্জত উন্নয়নের সাথে। আমরা আমাদের জন্য এমন ভুমি চাই যেখানে সুখ-শান্তিতে জীবন পরিচালনা করতে পারবো।
কংগ্রেসের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব হিন্দু জনগণের উপর ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেনি, যদিও কংগ্রেস শুধু হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। তারা বলে নিজেদেরকে নিচুশ্রেণীর প্রতিনিধিত্বশীলও। কিন্তু অন্তরে চাটুকারিতা বেশি। একদিকে তারা ধমক ও উত্তেজনাকর বক্তব্য দিয়ে থাকে, অন্যদিকে কবুতরের মতো নিজদেরকে নিরিহ প্রমাণের চেষ্টা করে এবং পলাতক বিড়ালের মতো ব্যবহার করে। (সবাই হাততালি)। অনেক হিন্দু আছেন যারা বিভিন্ন প্রকারের মুসিবত থেকে বাঁচতে পাকিস্তান আন্দোলনকে সাহায্য করছেন। হিন্দু সমাজের অচ্যুতেরা নির্যাতন থেকে মুক্তির

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT