পাঁচ মিশালী

জন্মভূমির টানে

সুপ্রিয় ব্যানার্জি শান্ত প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০২-২০২০ ইং ০০:০৫:৪৪ | সংবাদটি ১০২ বার পঠিত

(পূর্ব প্রকাশের পর)
মেট্রিক নবদ্বীপ; আইএসসি ও বিএসসি কলকাতা, এম.বি কলকাতা মেডিকেল কলেজ হতে ডিগ্রি লাভ করেন। কৃতিত্বের সাথে এম.বি পাশ করা পর তিনি উচ্চতর ডিগ্রি লাভের জন্য শ্রীগুরুর আদেশে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে বিলেত যাত্রা করেন। তিনি বিলেত থেকে সাফল্যের সহিত এম.আর.সি.পি ও এফ.আর.সি.এস ডিগ্রি লাভ করে এক অত্যাশ্চার্য্য ও বিরল ঘটনার জন্ম দেন। একই ব্যক্তি একাধারে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও শল্য বিশেষজ্ঞ এমনটি ইতিপূর্বে কখনও শুনা যায় নাই। ‘মন’ মানব দেহের সকল ইন্দ্রিয় কোষের রাজা। তাই মানব মনের দুর্ভেদ্য আচরণ জানার জন্য লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোরোগ (সাইকিয়াট্রিতে) বিষয়ে খ্যাতনামা গবেষক হিসেবে প্রসিদ্ধ হলেন এবং পি.এইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করলেন। শিবানন্দ বাবা মানব সেবাকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসাবে স্থির করলেন। তিনি আয়ুর্ব্বেদ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তিগত জ্ঞান লাভ করে তাঁর অর্জিত জ্ঞান জীবসেবায় প্রয়োগ করে সেবার এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন- ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ মহারাষ্ট্রে ভেষজ বিজ্ঞানী হিসাবে তাঁকে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করা হয়।
১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ গুরুদেবের আদেশে দেশে (ভারতে) প্রত্যাবর্তন করে তিনি মানব সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। গ্রিস, ফ্রান্স, মাল্টা, স্পেন, সমগ্র ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান ইত্যাদি দেশে ৩৪ বৎসর চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছেন। তার চিকিৎসাসেবা ধরণ বিনামূল্যে। কাশিতে প্রতি শনিবার তিনি আর্ত ও পীড়িত মানুষের মধ্যে চাল, ডাল, তৈল, আলু, বস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী এবং জনপ্রতি একশত টাকা দান করেন। কাশি ছাড়াও পুরী, নবদ্বীপ, বাকুড়া, পুরুলিয়া, উত্তর পূর্ব ভারতের অবিভক্ত আসাম, ত্রিপুরা প্রভৃতি রাজ্যের গরীব ছিন্নমূল উদ্বাস্ত ও উপজাতি আর্তপীড়িত মানুষদের নারায়ণ জ্ঞানে সেবা দান করেন।
২০১৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতি বছর পুরীতে পাঁচশত কুষ্ট রোগীর মধ্যে চা-বিস্কুট, পাউরুটি; আপেল, কলা, কমলা, লেবু, লজেন্স, জয়নগরের মোয়া, পুরীর খাজা, রসগোল্লা এবং শাড়ী, লুঙ্গি, বড়ক্যান, ছাতা, গামছা, পেটিকোট, চাল, ডাল, তৈল, চিনি ও অন্যান্য সামগ্রী, প্রত্যেককে নগদ দুইশত টাকা করে দান করেন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গিয়ে ভক্তি শিক্ষা ও লোকশিক্ষা দান করে থাকেন।
স্বামী শিবানন্দজীর জীবন দর্শনের একটি বিরাট বৈশিষ্ট্য হলো তিনি সম্পূর্ণ নিরহঙ্কার। তিনি এত উঁচু মানের একজন সাধক বা সিদ্ধপুরুষ হয়েও নিজেকে একজন সাধারণ লোক হিসেবে ভাবেন। তিনি বলেছেন, ‘চরণ না ধরে তোমরা আমার ‘আ-যুক্তচরণ’ আচরণকে ধর। মনে রাখবে মহাপুরুষ দর্শনেই প্রণাম হয়ে যায়।
তিনি বলেছেন, ‘selfless service is the golden way to god realisation..’ অর্থাৎ নিঃস্বার্থ সেবাই হচ্ছে ভগবান উপলব্ধির সুবর্ণ পথ। প্রত্যেক মানুষের উচিত সহজ-সরল জীবন-যাপন করা এবং উচ্চতর চিন্তা করা। কারণ সত্য সবসময় সোজা পথ ধরে চলে আর মিথ্যা চলে বাঁকা পথ ধরে।
শিবানন্দ বাবা শিষ্যদের কাছ থেকে গুরু দক্ষিণা হিসেবে শুধুমাত্র একটা হরিতকি গ্রহণ করেন। কোন অর্থ বা দান গ্রহণ করেন না। হরিতকি সম্পর্কে বলা হয় যে, ‘যস্য গৃহে মাতা নাস্তি, তস্য মাতা হরিতকি।’
তাঁর বচনগুচ্ছ ‘প্রবচন’ হয়ে রূপ নিয়েছে। মোট ১০৬টি অমিয় বচন মাধুরীর সন্ধান মিলেছে। সেগুলোর কয়েকটি এরকম-
(১) পঁজো করলে স্পিরিচুয়েল এক্সারচাইজ হয়। আর জপ হচ্ছে স্পিরিচুয়াল ফুড়।
(২) মানুষের মধ্যেই ভগবানকে দেখি। তাই মানুষের সেবা করি।
(৩) নম্রতা ঈশ্বর লাভের প্রকৃষ্ট উপায়, উগ্রতা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
(৪) যার আশা আকাক্সক্ষার শেষ নেই সে প্রকৃত দরিদ্র।
(৫) সুখ আর দুঃখের অবসানই সুখ।
(৬) ধন সম্পদ উপার্জনের জন্য আমরা স্বাস্থ্য ক্ষয় করি। পরবর্তীতে ঐ স্বাস্থ্যকে পুনরুদ্ধারের জন্য সমস্ত অর্থ ব্যয় করি।
(৭) Love ever, hate never.
(৮) ‘মানব সেবাই মাধব সেবা?
(৯) ‘জগতের কেউ আপন নয়, কেবল গোবিন্দই আপন’। ‘প্রকৃত সাধু দর্শন ও ঈশ্বর দর্শন একই কথা।’
(১০) ‘টাকা শব্দ উল্টালে হয় কাটা, কাজেই অতিরিক্ত টাকা উপার্জন জীবনে অতিরিক্ত কাটাবিদ্ধ করবে অর্থাৎ অশান্তি ডেকে আনবে।
কোন ভক্ত বাবাকে চরণ ধরে প্রণাম করতে গেলে বলতেন-‘আমার চরণ ধরনা, আচরণ ধর।’
সংসারীদের বলতেন যারা সংসারে থাকে তারা যথাবিধি সংসারে কাজ করবে। কিন্তু সংসার তার মধ্যে থাকবে না। পদ্মপত্রে যেমন জল থাকে কিন্তু পত্রের সাথে জল মিশে যায় না। ঠিক তেমনি সকলকে সংসারে লিপ্ত থাকতে হবে। এজন্য শিবানন্দ বাবা বলেন-‘সৎ চিন্তা, সৎকর্ম, সদ্ভাবনা ধর্মজীবনের মূল।’ (দৈব বলে রোগ আরোগ্য-পৃষ্ঠা-৬৬)
পরম মহাত্মা শিবানন্দ বাবা নারী শক্তির গুরুত্ব দিতে গিয়ে বলেছেন-
(১) ‘নারী জাতিকে জগৎ জননী হিসেবে জ্ঞান করতে হয়।’ জগৎ জননী মানে আদিশক্তি। যাঁর মাঝে সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় সব নিহিত, যিনি সকল শক্তির উৎস, সকল সদানন্দের কারণ। জগৎ জননী যেমন এ ধরনীর চালিকা শক্তি, তেমনি একজন নারী তার সংসারের প্রাণ। তাই বাবা নারীকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন।
(২) ‘নারীর সকল অঙ্গ তীর্থ, সকল দেব-দেবী বাস করে, ফলে কুৎসিত দৃষ্টিতে কখনও নারীকে দেখবে না। যুবতী নারী দর্শন হলেই শান্তচিত্তে মনে মনে প্রণাম করা উচিত।
(৩) ‘নারীকে কোনদিন প্রহার করবে না। নারীর প্রতি রাগ, দ্বেষ, হিংসা করবে না, নারীকে কখনও কটু কথা বা কর্কশ বাক্য বলবে না। নারীর স্বাধীন চিন্তা ও কর্মে কখনও বাধা দিবে না, কোন নারীকে যদি তোমার ভাল না লাগে তাহলে তুমি নিজেই দূরে সরে গিয়ে বসবাস করবে, তথাপি নারী নির্যাতন করা উচিত নয়।
দুশ্চরিত্র নারী থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ যে নারীর চরিত্র কলুষিত তার সংস্পর্শে এলে পুরুষের জন্য তা ক্ষতিকর হবে।
(৪) ‘বাবা, নিজের স্ত্রীর উপর বিশ্বাস রাখতে বলেছেন। এমন কি সে যদি অন্য দশজন পুরুষের সাথে কথা বলে তবুও মন দুর্বল করতে নিষেধ করেছেন। প্রত্যেক নারীর মধ্যে মাতৃরূপ অনুধাবন করার জন্য বাবা উপদেশ দিয়েছেন।
১২৩ বছর বয়সে চেন্নাইতে এ্যাপোলো হাসপাতালে বিশেষ মেডিকেল বোর্ড স্বামী শিবানন্দ বাবার শরীরে সকল প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোন রোগ পাননি। বিগত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ মঙ্গলবার ১৪ ফাল্গুন ১৪২৫ বাংলা সকাল ১০:০০টায় সিলেট নগরীর জামতলা শ্রী শ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর ধামে স্বামী শিবানন্দ স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। নীরোগ ও দীর্ঘ আয়ুর রহস্য জানতে চাইলে সাদা থান মার্কিন খণ্ড ও হাফ হাতের হালকা-পাতলা নিমা পরিহিত শিবানন্দ বাবা জানান, ‘তিনি নিয়মিত খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেন এবং প্রতিদিনই যোগব্যায়াম করেন। ভাত, রুটি আর সেদ্ধ সবজি খান। তেল, চর্বি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার, ফল-দুধ খান না।’ সদ্ভাবনা, সৎকর্ম ও সৎচিন্তা থাকলে বিশ্বে হানাহানি আর সংঘাতের ঘটনা ঘটবে না। এতে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। হিন্দু মুসলিম কিংবা জাত বর্ণের বাছবিচার করেন না জানিয়ে স্বামী শিবানন্দ বলেন, ‘বাংলাদেশের হিন্দু মুসলিমের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য অনুকরণীয়। বিশ্বে এতো অশান্তি কেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের আয়ু অনেক কম, কিন্তু বাসনা অনেক বেশি। এজন্যই আমাদের মধ্যে এতো অশান্তি।’
স্বামী শিবানন্দজী একজন সাধন মার্গের লোক। গুরু কৃপাকে অবলম্বন করে কঠোর তপস্যা ও অধ্যাবসায়ের ফলে তিনি যা উপলব্ধি করেন অর্থাৎ তার উপলব্ধির সোনালী ফসল মনুষ্যসমাজে বিতরণ করার চেষ্টা চালিয়েছেন। তা তুলে ধরলাম-
‘The world is my home, its people are my fathers and mothers, to love and serve. Them is my religion’ অর্থাৎ এ পৃথিবীটা হচ্ছে আমার বাড়ি। এর মানুষ হচ্ছে আমার পিতা মাতা। আর এদেরকে ভালোবাসা হচ্ছে আমার ধর্ম।’
সংসার গাড়ীতে উঠে বসেছি। কখন কোথায় বা গন্তব্যে কোন অবস্থায় নামিয়ে দিবেন জগৎ গাড়ির অভিজ্ঞ চালক ছাড়া কেউ বলতে পারেন না। চালকের সদ ইচ্ছার উপর নির্ভর করে অপেক্ষায় থেকে আমার লেখনীকে বিশ্রাম দিলাম। (সমাপ্ত)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT