সাহিত্য

স্মৃতির দর্পণে আবহমান বাংলা

মাজেদা বেগম মাজু প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০২-২০২০ ইং ০০:০৪:৩৮ | সংবাদটি ২৮২ বার পঠিত
Image

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করতে বইয়ের যেমন জুড়ি মেলা ভার তেমনি একজন মানুষের নিঃসঙ্গতা বা একাকিত্ব কাটিয়ে ওঠার জন্যও বইয়ের সাহচর্য তুলনাহীন। মানুষের সুখ-দুঃখ, স্মৃতিকাতরতা, আনন্দ-বেদনার অনুভূতি নিজের বুকে ধারণ করে নিয়ে অনাগত পাঠকের জন্য চির অপেক্ষমান হয়ে আছে বই। দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ পৃথিবীতে একমাত্র বইয়ের মাধ্যমেই মানুষ প্রবেশ করতে পারে আনন্দের জগতে এই উপলব্ধি থেকেই বিখ্যাত ঔপন্যাসিক টলস্তয় বলেছেন, ‘Three things are essential for life and these are books, books and books’। এই প্রসঙ্গে ভিনসেন্ট স্টারেট এর মতামত হলো- ‘When we buy a book we buy pleasure’. এই বিশ্বকে ও বিশ্বের তাবৎ বিষয়ে জ্ঞান আহরণের একমাত্র ও সহজ উপায় হচ্ছে বই বা গ্রন্থ পাঠ। বই হতে পারে বিভিন্ন আঙ্গিকের, বিভিন্ন বিষয়ের। যেমন- ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, আত্মজৈবনিক, গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিচারণমূলক ইত্যাদি। বিভিন্ন বিষয়ে বই পাঠ করে প্রতিনিয়ত মানুষ সমৃদ্ধ করছে তার আপন জ্ঞানের ভান্ডার।
বই যেমন বিভিন্ন বিষয়ের উপর হতে পারে তেমনি ভিন্ন ধরনের বই পাঠেও রয়েছে আলাদা আলাদা আমেজ ও অনুভূতি। তেমনি একটি বই বা গ্রন্থ সিলেটের সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, সাংবাদিক জনাব আবদুল হামিদ মানিক রচিত ‘স্মৃতির দর্পণে আবহমান বাংলা’। ৬৪টি জেলা পরিবেষ্টিত সমগ্র বাংলা অর্থাৎ চিরাচরিত গ্রাম বাংলার স্মৃতিবিজড়িত অপূর্ব চিত্রকল্প তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। সার্বিকভাবে বইটির সমগ্র রচনায় আবহমান বাংলার বিষয়াটি চিত্রায়িত হলেও মূলত সিলেট অঞ্চলকেই এখানে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। লেখকের জন্মস্থান সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় হওয়ার কারণে তার শৈশব, কৈশোরের স্মৃতি বিজড়িত গ্রামখানিকে ঘিরেই বইয়ের রচনাবলী আবর্তিত।
কৃষি প্রধান দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই গ্রাম নির্ভর। আর আবহমান গ্রামবাংলার প্রতিটি চিত্র মোটামুটি একই ধরনের।‘ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়’- ছোট ছোট গ্রামগুলোই মূলত সুজলা-সুফলা, শস্য শ্যামলা বাংলাদেশের মূলভিত্তি। প্রায় বিরানব্বই হাজার গ্রাম নিয়ে গঠিত এই দেশের শতকরা ৮৫ জন লোকই পল্লী গ্রামে বাস করেন। গ্রামীণ জনপদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, উৎসব-পার্বন, আচার-অনুষ্ঠান অর্থাৎ সবকিছু মিলিয়ে এই মানুষগুলোর যাপিত জীবনের মূর্তমান প্রতিচ্ছবি একে একে উঠে এসেছে গ্রন্থের রচনাবলীতে যা গ্রন্থখানির প্রধান উপজীব্য বিষয় ও স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।
সমগ্র গ্রন্থখানিতে রয়েছে মোট ৫২টি নিবন্ধ যেগুলো বিশিষ্ট লেখক রাগিব হোসেন চৌধুরী সম্পাদিত মাসিক ভিলেজ ডাইজেস্ট ও বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত। লেখকের নিবেদনে যদিও বলা হয়েছে গ্রন্থটি গবেষণাকর্ম নয় কিন্তু তারপরও সবগুলো নিবন্ধই তথ্য সমৃদ্ধ ও জৌলুসে পরিপূর্ণ। রচনাগুলোর শোভা বর্ধনের প্রেক্ষিতে সাথে রয়েছে বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের প্রবাদ-প্রবচন, গ্রামীণ ছড়া, ছড়াগান, বিয়ের গান ইত্যাদি। রচনাবলীর উপর ভিত্তি করে রয়েছে মাছ, পাখ পাখালি, পিঠা, অলংকার, খেলাধূলাসহ বিভিন্ন জিনিসের রকমারি নাম যা অনেকের কাছেই হয়তো অজানা। সেই সাথে রয়েছে জানা-অজানা অনেক নিগূঢ় তথ্য যা পাঠকের জ্ঞানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে নিঃসন্দেহে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
গ্রন্থটির শুরু ‘পান-সুপারি’ দিয়ে আর শেষ ‘প্রবাদ’-এ। দুটোই বাঙালির কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্য। শুরু থেকে শেষ এবং মাঝখানের লেখাগুলোতে পাঠক হৃদয়ের রসনাতৃপ্তির জন্য রয়েছে অনেক মূল্যবান ও শাণিত উপকরণ যা লেখকের সুনিপুণ ও দক্ষ মুন্সিয়ানারই পরিচয় বহন করে। বেশির ভাগ লেখা পাঠে পাঠক মুগ্ধ চিত্তে স্মৃতির অতলান্তে হারিয়ে গিয়ে বের করে আনতে সক্ষম হবেন মণি-মাণিক্য, হীরা-জহরত যা অনেকের জীবনের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিছু কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলোর সাথে গ্রামীণ জনজীবনের যেমন সম্পৃক্ততা রয়েছে তেমনি এইসব বিষয়ের সাথে লেখকের মতো জড়িয়ে আছে অনেকেরই অম্লমধুর, সুখ-দুঃখের স্মৃতি ব্যঞ্জনা। তাই লেখাগুলো পাঠে একবার হলেও স্মৃতির দুয়ারে কড়া নেড়ে পাঠককে নিয়ে যাবে দূর বহুদূরের অতীতের সেই স্মৃতিঘেরা দিনগুলিতে।
যে কোন বিষয়ে জ্ঞান আহরণের পিপাসা যখন প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে এবং সেটা জানার মতো কোন উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না তখনই আগ্রহী পাঠককে জ্ঞান-সাগরে হাবুডুবু খেতে হয় কিন্তু এই আকাক্সক্ষা যখন পূর্ণতায় রূপ লাভ করে তখন পাঠকের কাছে এই অজানা জিনিসকে জানার ব্যাপারে অনেকটা সিন্ধু সেঁচে মুক্তো আহরণের মতোই মনে হয়। এই গ্রন্থখানিও অনেকটা তাই। বিভিন্ন বিষয়ে লেখার রন্ধ্রে রন্ধ্রে সংযোজিত হয়েছে লেখকের অনেক সঠিক ও নির্ভুল তথ্য যা পাঠে পাঠককে অপার বিস্ময়াভিভূত হতে হয় বৈকি। পান-সুপারি, হুক্কা, কলের গান, পালা গান, পুথি, ঘুড়ি, নৌকা, ঘোড়া, দোয়াত-কলম, খড়ম, শিলপাটা, অলংকার, নববর্ষ, বটগাছ, খেলাধুলা, নরসুন্দর, চিঠি, জালালি কবুতর, মাছ প্রভৃতি লেখাগুলো অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ যা জ্ঞান পিপাসু পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণে অবশ্যই সক্ষম হবে বলে আশা বাদ ব্যক্ত করা যায়।
সংস্কৃতি হলো একটি দেশ বা সমাজের দর্পণ স্বরূপ। একটি দেশ বা সমাজের মানুষের জীবনাচরণ, একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীর পরিচয়জ্ঞাপক বৈশিষ্ট্যই হলো সংস্কৃতি। সমাজে রয়েছে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ। এই বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও আচার অনুষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে একেক রকম। তেমনি আবহমান বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও আচার আচরণও ভিন্ন। সভ্যতা ও সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত বহমান ও পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীল সংস্কৃতি ও আচার আচরণের বাস্তব চিত্রই প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে গ্রন্থটিতে। পালাগান, পুথি, ঘুড়ি, হুক্কা, পান-সুপারি, মালজোড়া, নৌকাবাইচ, গয়না নৌকা, পালকি, ভোলাভুলি, উলির ঘর, নরসুন্দর ঘাইল-ছিয়া ইত্যাদির মতো আরো অনেক আনুসঙ্গিক বিষয়াদি যা গ্রামীণ সংস্কৃতি ও আচার অনুষ্ঠানেরই অংশ তা সাবলিলভাবে লেখকের লিখন শৈলীর নৈপুণ্যে পাঠকের অক্ষির সম্মুখে ফুটে উঠেছে।
আঞ্চলিক ভাষার ছন্দোবদ্ধ উপমা ও গানে অলংকৃত হওয়ার কারণে বিভিন্ন লেখা হয়ে উঠেছে আরো আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত। যেমন- ‘পান পান করিয়া ডাকি/ দেও না কেনে পান....(সিলেটী বিয়ের গান- ‘পান-সুপারি’), আইলারে নয়া দামান......শাইল ধানর নেরা..... (সিলেটী বিয়ের গান- ‘পান-সুপারি’), ওগো সজনী গুয়া গাছো টেকসো লাগিলনি...... (গণসঙ্গীত- ‘পান-সুপারি’), পরানের হুক্কারে.......... কে রাখিল ডাব্বা........... (বহুশ্রুত লোকগীতি- ‘হুক্কা’), আরব যাইমু দুবাই যাইমু.......... আমার সিলটর আসমান (আঞ্চলিক গান- ‘পিঠা’), উদলা চুলে রইদ থাবায় তারে কয় জ্বর/ঘরর কথা বাইরে নেয়া তারে কয় পর.......... (বিশ্বজনীন সত্যবাণী, সিলেট গীতিকা- ‘পালা গান’), নবী বুলে উম্মতে.......... আল্লা বুলে.......... তুমি কি তাহার........ (হালতুননবী- ‘পুথি’) ইত্যাদি এরকম অসংখ্য ছন্দোবদ্ধ উপকরণের বুননে লেখাগুলি ঠাসা। তাছাড়া লেখার সাথে পৃষ্ঠাব্যাপী অলংকৃত হয়েছে আকর্ষণীয় সাদা কালো ছবি।
মানুষ মাত্রেই স্বভাবগতভাবে স্মৃতিকাতর। আমার ক্ষেত্রেও নিশ্চয় এর ব্যতিক্রম নয়। বইয়ে উল্লেখিত সাটবদ্ধ বিষয়াবলীর সাথে যদিও আমার সরাসরি তেমন একটা সম্পৃক্ততা নেই কিন্তু তারপরও লিখনীর পরতে পরতে কোথায় যেন জড়িয়ে আছে আমার মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদী-নানী সহ অগণিত আত্মার আত্মীয়ের আবেগাপ্লুত ও স্মৃতির ঘ্রাণ যা আমাকে এক চুম্বকীয় শক্তির মাধ্যমে হাতছানি দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে বাধ্য করেছে তাদের ফেলে আসা অনেক পেছনের সেই হিরন্ময় দিনগুলিতে। তাইতো যে কোন বই নিয়ে আলোকপাত করা দুরূপ ব্যাপার মনে হলেও লিখনির বিমোহিত একজন মুগ্ধ পাঠক হিসেবে দু’লাইন লেখার ইচ্ছে সংবরণে ব্যর্থ হয়ে বই সম্পর্কে লেখার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি......../ বিশাল বিশ্বের আয়োজন/ মনমোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারই এক কোণ। সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণ বৃত্তান্ত আছে যাহে/ অক্ষয় উৎসাহে-’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বই হোক আমাদের নিত্য সহচর।
লেখকের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত লেখাগুলি মধ্য ষাট দশক নির্ভর হলেও রচনার নির্দিষ্ট তারিখ দেয়া থাকলে সময়ের সাথে সাথে লেখার যোগসূত্র তৈরি করতে পাঠকের জন্য সুবিধা হতো বলে মনে হয়। ঝকঝকে ছাপার ২৫৬ পৃষ্ঠার বই খানিতে মুদ্রণ সমস্যা তেমন একটা নাই বললেই চলে। গ্রামীণ পটভূমির আবহে অংকিত টিটন কান্তি দাশ ও পর্ণা ধরের অলংকরণে এবং আহনাফ আমীর চৌধুরীর (আরাফ) প্রচ্ছদে শ্রীহট্ট প্রকাশনী থেকে অক্টোবর ২০১৯-এ প্রকাশিত বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ৫৮৫ টাকা। সংগ্রহে রাখার মতো বইখানি নবীন ও প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে একটি অদৃশ্য সেতুবন্ধনের সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা যায়। মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ মিশ্রিত অত্যন্ত চমকপ্রদ বই খানি পাঠক ও বোদ্ধামহলে পরম নিষ্ঠার সহিত সমাদৃত হোক এই প্রত্যাশা নিয়ে বইটির বহুল প্রচার কামনা করছি।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT