উপ সম্পাদকীয়

আসুন নিজেকে চিনি, বিশ্বাসী হই

গোলাম সারওয়ার প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০২-২০২০ ইং ০০:২৯:২৬ | সংবাদটি ৬৩৮ বার পঠিত

পেছন ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। এরপরও আমরা বাংলাদেশের আশরাফুল মাখলুকাত সৃষ্টির সেরাগণ কেন জানি পেছন ফিরে তাকাই। কেউ ধরে ফেলল কি-না, হলো কি হলো না, খাবো কি খাবো না, যাবো কি যাবো না, করব কি করব না ভেবে পেছন ফিরে তাকাই। বারবার পেছন ফিরে তাকানোর কারণেই ফাস্টেস্ট ওয়ার্ল্ডে তাই আমরা লাষ্টেষ্ট হয়েই আছি।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেল দেখছিলাম। এক বাঘ এক হরিণকে দৌড়াচ্ছে। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ধরেও ফেলল। চিতাবাঘকে সবচেয়ে দ্রতগামী প্রাণী বলা হলেও গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে হরিণই সবচেয়ে দ্রুতগামী প্রাণী। বাঘ থেকে হরিণ ঘন্টায় ৫-১০ কিলোমিটার বেশি বেগে দৌঁড়াতে পারে। অর্থাৎ হরিণকে কিছুতেই ধরতে পারবে না বাঘ। এরপরও হরিণ ধরা খায় বাঘের কাছে। বাঘ সর্বশেষ জাম্প দিয়েই হরিণকে ধরে ফেলে। বাঘের সে জাম্প কখনোই ব্যর্থ হয় না। খুবই ক্যালকুলেটিভ বাঘ ৫ কিলোমিটার দূর থেকে জাম্প দেয় না। বাঘ জাম্প দেয় ঠিক এক জাম্পে ধরে ফেলার দূরত্বে। প্রশ্ন হলো, ৫-১০ কিলোমিটার বেশি বেগে দৌঁড়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বাঘের কাছে হরিণ ধরা খায় কেন? কারণ একটাই। সন্দেহ। সন্দেহ থেকে ভয়। এই বুঝি বাঘ ধরে ফেলল ভয়ে হরিণ একবার পেছন তাকায় আবার সামনে দৌঁড়ায়। বারবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দৌঁড়ার কারণে হরিণের গতিবেগ কমে যায়। ফলে তীক্ষ্ম নজরদারি বাঘের কাছে হরিণ সহজেই ধরা খায়। বাঘকে তীক্ষ্ম নজরদারি বলার কারণ হচ্ছে বাঘ হরিণের দলে হামলা চালালেও বাঘের নজর থাকে এক হরিণের দিকেই। নজরেও যেন একটা পলক পড়েনা! একটা মুহূর্তের জন্যও চোখের নজর এদিক-ওদিক সরে যায় না! দৌঁড়ানোর গতিবেগও একটুখানি কমে না। ভীত সন্ত্রস্ত দ্রুতগামী হরিণকে তাই বাঘের কাছে ধরা খেতেই হয়। প্রকৃতির এ অনন্য উদাহরণ পেছন ফিরে তাকানোর জন্য নয়। যার যে ক্ষমতা আছে সে ক্ষমতার দিকেই নজর দেয়া উচিত। তা না হলে হরিণের মতোই ধরা খেতে হবে।
অকারণে লই আমরা অংককে ভয় পাই। ভয়ের জন্যই আমরা মজার গণিতে দুর্বল। অংকটি হলো কি হলো না ভেবে জানা অংকটাও অনেক সময় ভুল করে বসি। ফর্মুলা জানা থাকলে অংক ভুল হবার কথা নয়। অংক আমাদের কনফিডেন্ট করে তোলে, বিশ্বাসকে আত্মবিশ্বাসে রূপান্তর করে। অংক সঠিক হলে দশে দশ, না হলে শূন্য-আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠার জন্য এটাও একটা সূত্র। সেদিন বুড়ো থেকে শুরু করে ক্লাস সিক্সের ছাত্র পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে বেশ হতবাক হই। জানতে চেয়েছিলাম উৎপাদন খরচ ১২৮ টাকা, বিক্রয়মূল্য ৩৫০ টাকা হলে কত পাসেন্ট লাভ হয়? চারপাশে পারসেনটেজের ছড়াছড়ি থাকলেও সঠিক উত্তরের বেলায় অনেকেই ঘাবড়ে যেতে দেখলাম। সঠিক উত্তরদাতা খুবই কম! হতাশাজনক! দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণে সঠিক উত্তরটিও কনফিডেন্টলি অনেকেই বলতে পারেননি!
সন্দেহ একটা রোগ। সন্দেহ ভয় সৃষ্টি করে। সন্দেহ তুষের আগুনের মত জ্বলতে জ্বলতে ছাই করে দেয়। সাহস ও মনের গতিবেগও কমিয়ে দেয় অনেকটা সেই দ্রুতগামী হরিণের মতো। সন্দেহ কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণ ডেকে আনে, শান্তির বদলে অশান্তি সৃষ্টি করে। মানবজীবনে হঠাৎ বিপর্যয়ও সন্দেহের কারণেই হয়।
সমাজে এমনও অনেক মানুষ আছে যারা অনুমান আন্দাজের ওপর নিজেকে জাহির করতে গিয়ে বিপদ, বিপর্যয় ডেকে আনে ওই ব্যাঙের মতো। একবার এক মা ব্যাঙ পথের ধারে এক ডোবায় বাচ্চা ব্যাঙগুলোকে রেখে ডাঙায় গেল। ডাঙা থেকে ডোবায় ফিরে আসতেই বাচ্চা ব্যাঙগুলি মা ব্যাঙকে বলতে লাগল-মা, মা আজ আমরা এক বিশাল প্রাণী দেখেছি, যার পাগুলি গাছের গুড়ির মতো বেশ বড় বড়, কান দু’টি বড় বড় পাতার মতো, আর পেট খানা ছিল মস্ত বড়! ব্যাঙ-ছানাদের বর্ণনায় মা ব্যাঙ রীতিমত ভাবনায় পড়ল। অনেক ভেবে মা ব্যাঙ নিজের পেটখানা ফুলিয়ে বাচ্চা ছানাদের বলল দেখতো এমন কি-না। ছানারা বলল-না, না এমন নয়, আরো অনেক বড়। মা ব্যাঙ পেট খানা আরো ফুলিয়ে বলল-এমন? আরে না, না এমন নয় আরো আরো বড়। এবার মা ব্যাঙ বিশাল সাইজের পেট ফুলাতে গিয়ে পেট ফাটিয়ে মারা গেল!
আহারে ব্যাঙ! এটা তো হাতির পেট ছিল। হাতির পেট ফোলানোর সাধ্য কি তোমার আছে? তুমি ব্যাঙ, কী করে তুমি হাতির পেট ফুলাবা? কহড়ি ঃযুংবষভ সক্রেটিসের এই বিশাল উক্তিতে আমাদের ফিরে যেতে হবে। নিজেকে না জানলে আমাদের পদে পদে বিপদ, বিপর্যয় হতে পারে। নিজেকে জানলে হরিণ কখনোই বাঘের কাছে ধরা খেত না। ব্যাঙ হাতির পেট দেখাতে গিয়ে বাচ্চাদের এতিম বানিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিত না।
এবার গল্প নয়, একটা গল্পের নীতিবাক্য উল্টে দিতে চাই। সম্ভবত ওই গল্পটি থেকেই সবাই জানে-ঝষড়ি ধহফ ংঃবধফু রিহং ঃযব ৎধপব অর্থাৎ ধীর-স্থিররাই জয় করে। আসলে তা কিন্তু নয়। আমি এটা কখনো মানিনি এবং মানবোও না। দ্রুতগামী প্রাণী খরগোশের সাথে ধীর গতির প্রাণী কচ্চপের দৌড় প্রতিযোগিতা কি চলে? লড়াই হবে হাড্ডা-হাড্ডি, দৌড় হবে দ্রুত-দ্রুতয়, প্রতিযোগিতা হবে সমানে সমান। আজকের দিনে ওই গল্পের গল্পকার বেঁচে আছেন কি-না, জানিনা। তবে আমরা যারা বেঁচে আছি এখন থেকে শুধরে নিতে চাই, তা না হলে নিজেকে জানার তাগিদ থেকে ছিটকে পড়ব। আজকের এই যুগে লক্ষ্য স্থির রেখে ধীর গতিতে চললে একদিন হয়তো সফলতা আসবে, কিন্তু শীর্ষে পৌঁছা যাবে না। শীর্ষে পৌঁছাতে হলে বা জয় নিশ্চিত করতে দ্রুতই চলতে হবে। মনে রাখতে হবে : ঋধংঃ ধহফ ংঃবধফু রিহং ঃযব ৎধপব. দ্রুত, অবিচলিত এবং সাহসী মানুষেরাই জয় করছে পৃথিবী!
নেতিবাচক আরো অনেক চর্চা আমাদের পাঠ্যবই গুলিতে সংযোজিত ছিল। এখনকার পাঠ্যসূচিতে শুধু নেতিবাচকই নয়, উল্টো-পাল্টা অনেক কথাও উঠে আসছে। হাটটিমা টিম টিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম, তাদের খাড়া দুটো শিং! শিং ওয়ালারা কি কনো ডিম পাড়ে? তেল লাগানো বাঁশে বানরের অংক আমাদের পিছিয়ে যাওয়া শিখিয়েছে। পানিতে দুধ মেশানোর অংক সেই থেকে ভেজাল শিক্ষা দিয়েছে। যার কারণে এখনও আমাদের সমাজে দুধের বেলায় খাঁটির বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ আছে। দুধ তো দুধই। কিন্তু খাঁটি-ভেজালের শঙ্কায় থাকতে হচ্ছে। মধু মধুই। খাঁটি মধু আবার কেন? খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি অবশ্য আমাদের এ দেশে প্রথম বৃটিশরাই করে গেছে। বৃটিশরা এদেশে চা-বাগান করল। চা-বাগানের চা এদেশ থেকেই রপ্তানি হতো। বৃটিশরা চিন্তা করল এদেশের মানুষকে চা খাওয়ানো শেখাতে পারলে এদেশেই চা বিক্রি সম্ভব হবে। বাঙালিদের ডেকে ডেকে চা খাওয়ানো হতো। কিন্তু বাঙালি তো লিকার চা, তিতা চা পছন্দ করে না। বাঙালি কি পছন্দ করে? দুধ পছন্দ করে। ব্যস চা-য়ে দুধ মেশানো হলো। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। বাঙালি মিষ্টি পছন্দ করে। মিশিয়ে দেয়া হলো চিনি, যা আজকের বিজ্ঞান সভ্যতায় প্রমাণ হয়েছে চিনি এবং চা-য়ে মেশানো দুধ মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। চিনি হচ্ছে সাদা বিষ!“ বর্তমান বিশ্বের চিনিকে ক্যান্সারের জনক বলেও দাবি করা হয়। আর চায়ের দুধ হজমে গন্ডগোল করে, এক সময় লিভার পঁচিয়ে দেয়। এখন অবশ্য মানুষ অনেক সচেতন। অনলাইন ইন্টারনেটের কল্যাণে সব জেনে যাচ্ছে মানুষ।
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশ এখন দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক দেশের লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করা আছে। দেশ একদিন উন্নত রাষ্ট্রের পরিণত হবে। উন্নত রাষ্ট্র ভেবে আমরা যারা আজ ইউরোপ, আমেরিকা, ফ্রান্স, কানাডা, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড পাড়ি দিচ্ছি, এক সময় এই আমরাই বাংলাদেশে ফেরত আসব উন্নত রাষ্ট্র ভেবে। আশা করি সেই দিন বেশি দূরে নয়, যদি আমরা আমাদের বদ খাইশলত পরিবর্তন করতে পারি, যদি আমরা নেতিবাচক চিন্তা থেকে ইতিবাচক চিন্তায় ফিরে আসতে পারি।
প্রিয় সুহৃদ, দেশের এবং নিজের কল্যাণে আমাদের সকলকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। তেল মাখা বাঁশে বানরের অংক পরিহার করতে হবে। খরগোশকে শুইয়ে রেছে। কচ্ছপকে জয়ী করার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। নিজেকে চিনতে হবে, জানতে হবে। নিজেকে চিনতে না পারলে বিশ্বাসী হওয়া যাবে না। জয় করতে বিশ্বাসী হওয়া বড় বেশি প্রয়োজন। আপনার আমার চিন্তা এবং কর্মে আমাদের চারপাশ যখন নিরাপদ হবে তখনই নিজেকে বিশ্বাসী বলে দাবি করা যাবে। চীনের আজ কি হয়েছে? সারা বিশ্ব চীনের পণ্যে নিজেকে ধন্য মনে করেছিল। অনেকটা নিরাপদও ভেবেছিল। কিন্তু এখন? নিজেরাই নিজেদের বিশ্বাস করতে পারছে না। করোনা ভাইরাসে ঘর থেকেই বের হতে পারছে না! নিরাপত্তার চাদর আজ কোথায়?
বিশ্বাসী হতে হবে। বিশ্বাসীরাই বিজয়ী হয়। বিশ্বাসী হওয়ার জন্য চর্চা, অনুশীলন জরুরী। চর্চা, অনুশীলন বিজয়ের মুকুট পরিয়ে দেয়। প্রয়োজনে আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জীবনাচরণ ফলো করতে হবে। বিশ্বাসের গর্জন তুলে অপলক দৃষ্টিতে বাঘের মতোই ক্ষিপ্র গতিতে ছুটতে হবে বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে। বিজয়ের মুকুট আমরা একদিন পরবোই পরব।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT