মহিলা সমাজ

জাতীয় জীবনে একুশের তাৎপর্য

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১১-০২-২০২০ ইং ০০:৪৮:২২ | সংবাদটি ১০১০ বার পঠিত
Image

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো
একুশে ফেব্রুয়ারি.....
আমি কি ভুলিতে পারি.....’
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় জীবনে গৌরবময় ও ঐতিহাসিক একটি দিন। জাতীয় জীবনে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের বড় একটি অধ্যায় মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। বাঙালির জাতীয় জীবনের সকল চেতনার উৎস এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার ঐতিহাসিক এ দিনটি।
বাঙালির রক্ত ঝরা এ দিনটি সারা বিশ্বে স্মরণীয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সারা বিশ্বে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। বাংলাদেশসহ ২৭টি দেশ সমর্থন দিয়ে সম্মতভাবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
বাংলাদেশের সমস্ত আন্দোলনের মূল চেতনা একুশে ফেব্রুয়ারি। সংগ্রামী চেতনায় বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক আন্দোলন এ দু’ধারাকে একসূত্রে গ্রথিত করে মুক্তি সংগ্রামের মোহনায় এনে দিয়েছে।
ভাষা একটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতির মাঝে যে চেতনার উন্মেষ হয় তার চরম বিস্ফোরণ ঘটে উনসত্তর থেকে একাত্তরে।
একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু শহীদ দিবস পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, তা বাঙালির জাতীয় জীবনে সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
বাঙালি জাতি নিজের রক্ত দিয়ে সারা বিশ্বকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে ভাষাকে ভালোবাসার মন্ত্র।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন দিয়ে বাঙালি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের দৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সকল মাতৃভাষাকে বিকশিত করার সুযোগ, মর্যাদা দেওয়া এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা, দুর্বল বলে কোন ভাষার ওপর গুরুত্ব আরোপের অপচেষ্টা না করে ছোট বড় সকল ভাষার প্রতি সমান মর্যাদা পোষণ করে।
একুশের চেতনাকে কেন্দ্র করে মাতৃভাষাকে ভালোবাসার প্রেরণা দেখেছে মানুষ। বাঙালির জাতীয় জীবনে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের একটি বড় অধ্যায় মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে বাংলার নির্মম মৃত্যু ভয় এবং বুকের রক্ত রঞ্জিত করে বাঙালি জাতি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। অমর একুশে আমাদের জাতীয় জীবনে বেদনা বিজড়িত এক গৌরবগাঁথা দিন।
প্রতি বছর সংগ্রামী চেতনার অমিয় ধারাকে বহন করে একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের দ্বারে ফিরে আসে। তাই জাতীয় চেতনায় এর তাৎপর্য অপরিসীম।
একুশের আন্দোলন কেবল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রথম সফল সংগ্রাম হিসেবে প্রতিটি আন্দোলনের ক্ষেত্রেই একুশের চেতনা বাঙালির জনমনে মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় একুশের চেতনায় বাঙালির আত্মজাগরণ ঘটেছিলো বলেই সম্ভব হয়েছিলো। বাঙালি জাতির আত্মপোলব্ধির উত্তরণ ঘটে ১৯৫২ এর একুশে ফেব্রুয়ারির মাধ্যমে।
বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে একুশে ফেব্রুয়ারি কোন বিশেষ দিনক্ষণ বা তিথি নয়। এটি একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস।
বাঙালি জাতির চেতনায় সমগ্র জাতি ভাবতে শেখে তার জাতীয় সত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সত্তার কথা।
সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশে একুশে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব অপরিসীম। একুশ জাতীয় চেতনার মানস পটে নতুন সাংস্কৃতিক চেতনার জন্ম নেয়। সৃষ্টি হয় চেতনা পুষ্ট শিল্প সাহিত্য।
১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে রাজবন্দী মুনীর চৌধুরীর লেখা কবর নাটকটি কেন্দ্রীয় কারাগারে অভিনীত হয়েছিলো রাজবন্দীদের উদ্যোগে।
আবদুল গাফফার চৌধুরীর অনন্য গান-
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো-
একুশে ফেব্রুয়ারি
এ গান একুশেরই ফসল।
১৯৫২ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলে বাংলা রাষ্ট্রভাষা মর্যাদা লাভ করে। ভাষা আন্দোলনের সাফল্য সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের পথ সুগম হয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে বাংলা ভাষা আপন মহিমায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫৩ সালে শহীদ দিবস উদযাপন করতে তখনকার প্রগতিশীল কর্মীরা কালো পতাকা উত্তোলন, নগ্নপায়ে প্রভাতফেরী ও সমবেত কন্ঠে একুশের গান, শহীদদের কবর ও মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পন ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করে। এ কর্মসূচীগুলো বাঙালির জাতীয় চেতনার নব জাগরণের প্রতীক। এসব প্রতীকগুলো বর্তমানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
এ ছাড়া ১৯৫৪ সালে বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা, একুশের বই মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানমালা সবকটিই একুশের চেতনার ফল।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের ক্ষেত্রে একুশের ভূমিকা অপরিসীম। মাতৃভাষা বাংলা এখন রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত এ সুদীর্ঘ পথে লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এ দেশের মাটি। কিন্তু মহান ফেব্রুয়ারি এদেশের ইতিহাসে আপোষহীন সংগ্রাম ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে জগতের সকল অনৈক্য সংঘাত ও অশান্তির বিরুদ্ধে বলিষ্ট হাতিয়ার।
কলকাতার বাবু ‘কালচার’ কেন্দ্রিক সংস্কৃতি ধারার বিপরীতে ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বাঙালি জাতীয় সংস্কৃতি ধারার বিকাশ লাভ করে একুশের সংগ্রামী চেতনার মাধ্যমে। এভাবে একুশ পরিণত হয়েছে জাতীয় উৎসবে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে সমগ্র দেশে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন জোরদার করা হয়।
পাকিস্তানী শাসক ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সকল প্রকার সমাবেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। কিন্তু প্রত্যয়ী ছাত্র সমাজ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করে। সাথে সাথে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়।
এতে সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারসহ অনেকে নিহত হয়। এ হত্যাযজ্ঞ দমননীতির ফলে আন্দোলন আরো বেগবান হয়।
৫২ এর ভাষা এ দেশের কবি সমাজকে করেছে তুমুল আলোড়িত। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আর শুধু আমাদের মাতৃভাষা দিবস নয়। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের ক্ষেত্রে একুশের ভূমিকা অপরিসীম। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি বলে আজ মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত সুদীর্ঘ পথে লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত এ দেশের মাটি।
একুশ জগতের সকল অনৈক্য, সংঘাত ও অশান্তির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ হাতিয়ার। মানুষের জাতীয় জীবনের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের বড় একটি অধ্যায় জুড়ে রয়েছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি।
মায়ের মুখের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় নির্মম মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে দুর্জয় সন্তানেরা আপন বুকের রক্তে রঞ্জিত করে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।
একুশের আন্দোলন যদিও একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিলো, কিন্তু তা কেবল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সে আন্দোলন ক্রমশই ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক পরিমন্ডলে।
১৯৫৪ সালে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় একুশের চেতনায় বাঙালি সাধারণের আত্মজাগরণ ঘটেছিলো বলেই সম্ভব হয়েছিলো।
এ ইতিহাস অগ্নিগর্ভ। কখনো অর্ন্তদাহ, গর্জন করেছে। আর কখনো চারিদিকে অগ্নি ছড়াচ্ছে। এ ইতিহাস মৃত নয়, একেবারে জীবন্ত।
বাঙালি জাতীয় চেতনায় সমগ্র জাতি ভাবতে শেখে তার জাতীয় সত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সত্তার কথা। একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে বাঙালি জাতি লাভ করেছিলো আত্মমর্যাদা। মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা মর্যাদা দানের প্রেরণা এবং অনুভব করেছিলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা।
মহান একুশে ফেব্রুয়ারি এদেশের ইতিহাসে আপোষহীন সংগ্রাম ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। একুশ সমুদ্র পথের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ অন্ধকার রাতের আশার প্রদীপ, দিক নির্দেশক আলোক বর্তিকা।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে গৃহীত হওয়ার ব্যাপারটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে বাঙালি জাতি আত্মমর্যাদার চেতনা এবং মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের প্রেরণা অনুভব করতে পেরেছিলো বলে জাতীয় জীবনে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ছিলো অপরিসীম।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT