উপ সম্পাদকীয়

বই পড়ি : সত্যকেই সত্য জানি

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০২-২০২০ ইং ০০:০৩:৩০ | সংবাদটি ১৯৮ বার পঠিত

ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, অফিসার, শিক্ষক ইত্যাদি হলেই মর্যাদাশীল হওয়া যায়না। এতে প্রাথমিকভাবে নিজের গন্ডিতে পরিচয় দিয়ে মেকি আত্মতুষ্টি মিলে বটে, এর বেশি গৌরবের কিছু নাই, যদি জ্ঞানশক্তি না অর্জিত হয়। আসল কথা হলো, এতো লেখাপড়া করেও যদি নিজে কথন শক্তি ও লিখন শক্তি দ্বারা অন্তত সমাজের কিছু মানুষকেও অভিভূত বা প্রভাবিত করতে না পারেন, তাহলে পরিস্থিতি আপনার শোচনীয়ই বলতে হয়। এমন শোচনীয় অবস্থা থেকে বাঁচাতে পারে বিভিন্ন শ্রেণীতে পড়া নির্দিষ্ট পাঠ্য বইয়ের বাইরে গিয়ে পাঠাগারে বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন লেখকের বই শিক্ষার্থীদের পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে। ছোটোবেলায় মা-বাবাদের অধিকাংশই চান তাদের সন্তান বড়ো হয়ে ডাক্তার, ব্যারিস্টার, বড়ো অফিসার হবে। এটা আশাব্যঞ্জক নয়; বরং দুঃখজনক যখন দেখি বড়ো পাস দিয়েও কেবল পদবি পেয়ে অনেকেই আর বেশিদূর বিকশিত হতে পারেন না। এর-ই মাঝে আমরা আশায় বুক বাঁধি যখন দেখি কেউ কেউ চান সন্তান যেনো পড়তে পড়তে শিখতে শিখতে মানুষ হয়ে ওঠে। আর সে জন্যেই আমাদের সমাজের অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদেরকে পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি বই কিনে উপহার দেন জন্মদিন ও বিভিন্ন উপলক্ষ্যে। আমাদের সমাজের অনেক বিচক্ষণ মা-বাবা আমাদের বিভিন্ন জাতীয় উৎসবের সাথে বই মেলাকেও তাই অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তারা অপেক্ষা করেন ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী বইমেলার। তবু আমি হতাশ হই, যখন দেখতে পাই এই পথে থাকা এই অল্প সংখ্যক মানুষকেও কেউ কেউ বই থেকে সরাতে নানান কথা বলেন এবং নানান রঙের মেকি জাল বিছিয়ে দেন পথে পথে। বই পড়ে মানুষ যে জ্ঞানালোকের দেখা পাবে এই সত্যটিকে মিথ্যা করে দিতে দুষ্টচক্র স্বজ্ঞানে ও অজ্ঞানে আছে ব্যস্ত। ওরা ভুলে যায় “পথের পানে ছুটে সকল মনুষ্য স্বজন/তবে সে পথের সন্ধান দেয় অল্প ক’জন/এই পথে হেঁটে গেল শত লক্ষ কোটি জন/পথ কিন্তু খুঁজে দিলো বহুজনে একজন।”
এখানে সক্রেটিসের একটি গল্পের উল্লেখ করছি ‘একবার সক্রেটিস তাঁর ছাত্রদেরকে নিয়ে বসলেন। তাঁর হাতে একটি ফল নিয়ে তিনি নাড়াছাড়া করছেন এবং ছাত্রদের বলছেন, তোমরা কি কিছু দেখতে পাচ্ছো? সবাই বললো হ্যাঁ একটি আপেল দেখতে পাচ্ছি। তারপর সক্রেটিস বললেন, তোমরা কি কোনো ঘ্রাণ পাচ্ছো? একজন ছাত্র বললো, জ্বি স্যার একটা মিষ্টি ঘ্রাণ পাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে একজন ছাড়া প্রায় সবাই বললো হ্যাঁ স্যার আমরাও মিষ্টি ঘ্রাণ পাচ্ছি। সক্রেটিস তখন সেই একজন ছাত্রকে বললেন, তুমি কি কিছু পাচ্ছো না? তখন দ্বিধা নিয়ে সেই ছাত্রটিও বললো, জ্বি স্যার আমিও ঘ্রাণ পাচ্ছি। সক্রেটিস মুচকি হাসলেন। আসলে আপেলটি থেকে কোনো ঘ্রানই বের হচ্ছিলো না। এটি ছিলো একটি নকল আপেল। এখানে যে কথাটি প্রমাণ করলেন সক্রেটিস তা হলো, একটি মিথ্যাকে যখন সবাই সত্যের কাছাকাছি বিশ্বাস করে নেয়, তখন মিথ্যা ও সত্যের মতো উদ্ভাসিত হয়। অতএব, আমাদের এখনও যারা মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে দ্বিধা করিনা এবং সত্যকে সত্য-ই বলি তাদেরকে আরেকটু ধৈর্য্যশীল হতে হবে এবং সত্যে দৃঢ় থাকার প্রবল শক্তি অর্জন করতে হবে। হ্যাঁ, উপায় একটাই। আরো বেশি বেশি বই পড়তে হবে এবং শ্রেণী পাসের নির্ধারিত পাঠ্য বই ও ভালো পাসের জন্যে বাজারের গাইড বইয়ের সীমানা ছেড়ে জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়ক বিভিন্ন লেখক ও গবেষকের পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ পাঠ করতে হবে এবং প্রকাশিত গ্রন্থ পাঠে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করার পাশাপাশি অন্যকে উৎসাহী করার উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে লেখক ও গ্রন্থ প্রকাশক এবং পত্রিকা সম্পাদক সচেতন ভূমিকা রাখবেন। লিখিত ছড়া ও কবিতা যেনো রসাত্মক ও সহজবোধ্য হয়। কারণ প্রকাশিত ছড়া ও কবিতা সবসময় কঠিন শব্দের বেড়াজালে থাকলে দুর্বোধ্যতায় পড়ে অনেকে এ অধ্যায়কে এড়িয়ে চলে। আবার সাহিত্যের গল্প ও প্রবন্ধ যেনো জীবনঘনিষ্ঠ ও প্রাঞ্জল ভাষা পায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। জীবনঘনিষ্ঠ অর্থাৎ বসবাসরত সমাজের হালচালের কাছাকাছি গদ্য পড়লে পাঠকের আগ্রহ বেড়ে যায় এবং এভাবেই গদ্য ও পদ্য পাঠে একজনের প্রেমানুভূমি জাগে। হ্যাঁ, গবেষণাধর্মী লেখা যাঁরা লিখেন তাতে ইতিহাস ও ঐতিহ্য গুরুত্ব পায়। ঐতিহ্যের কথা যদি একটু আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা যায়, তখন মানুষের জানার আগ্রহ বাড়ে। আর এভাবেই একেকজন পদ্য প্রেমিক ও গদ্য প্রেমিক ধীরে ধীরে সাহিত্য প্রেমিক হয়ে ওঠে এবং সে তার প্রেমের জগতকে জানিয়ে দেয় অন্য আরো অনেকের মাঝে। এভাবে অনেকেই সত্যের মজা বুঝতে সক্ষম হয়। তখন যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজে ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, বহুজনের তালে তালে ডাহা মিথ্যাকে সে আর সত্য বলবেনা; বরং সত্যকে-ই সে দৃঢ়তার সাথে আঁকড়ে ধরবে এবং সেও হয় কথায় না হয় লেখনির দ্বারা সত্যটাই প্রকাশ করবে।
বই মেলা এখন আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। বই মেলা বললেই আমাদের চোখের সামনে চলে আসে ঢাকার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। তবে সারা বাংলাদেশের ছোটো বড়ো শহরে বইমেলা হয় ফেব্রুয়ারি মাসে। কোথাও কোথাও মার্চ মাসে এবং ডিসেম্বরেও বইমেলা হয়ে থাকে। হ্যাঁ, ফেব্রুয়ারির একুশে বইমেলা সবসময় বাঙালির প্রাণের মেলা। তাই বাঙালির ঘরে ঘরে অপেক্ষার প্রহর গোনা শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাস ঘনিয়ে এলে। আর এই সময়েই নতুন নতুন বই অধিক পরিমাণে বাজারে আসে বিভিন্ন প্রকাশনীর মাধ্যমে। তারপর নির্দিষ্ট সময়ে মেলার স্টলে উঠে বই। এই সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় ভালোভালো বই এবং প্রকাশনীর প্রচার হয় ব্যাপকভাবে। এই প্রচার কাজটা যেনো কেবল ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে না হয় অর্থাৎ বইয়ের এবং লেখার মান যাচাই-বাছাই করে যেনো পত্রিকায় বা বিভিন্ন মাধ্যমে মানসম্পন্ন বইয়ের গুণকীর্তন করা হয়। এটুকু করলে পাঠক প্রতারিত হওয়ার সুযোগ কম থাকবে। কারণ, আজকাল অনেকেই বিজ্ঞাপন দেখে ও প্রচারে মুগ্ধ হয়ে দূরের নির্দিষ্ট ঠিকানায় টাকা পাঠিয়ে বিভিন্ন ডাক মারফত বই আনিয়ে নেন। আমি লক্ষ করেছি সিলেট, ঢাকা ইত্যাদি শহরে বই প্রকাশের পর বইয়ের মলাটে ত্রুটি, কাগজের কোয়ালিটিতে শর্ত ঠিক না রাখা, ভুল বানানের ছড়াছড়ি ইত্যাদি নিয়ে অনেক নবীন লেখক এবং পরিচিত লেখকগণ ফেসবুকে প্রকাশকের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশক ক্ষোভের বাক্য ছুঁড়েন। আমার এ পর্যন্ত প্রকাশিত ৮টি বইয়ের তিনটিতে প্রকাশকের অদক্ষতা ও অবহেলা ফুটেছে চরমভাবে। আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি। উচিত হলো ভুলের দায় মাথায় নিয়ে প্রকাশক নতুন করে বই ছাপিয়ে দিবেন। কারণ, কোনো বই ভুলভাবে পাওয়ার জন্যে কোনো লেখক প্রকাশনীর সাথে চুক্তি করেন না। তবে আমি কোনো প্রকাশনীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করিনি। এসব ভুলে ভরা বই পাঠকের হাতে যাওয়ার পর অনেক পাঠক নিশ্চয়ই বইয়ে আগ্রহ হারাবেন। অথচ আমাদের কর্তব্য হলো বইয়ে পাঠকের আগ্রহ বাড়ানো। আরেকটি দুঃখজনক খবরের মুখোমুখি হয়েছিলাম আমি জানুয়ারি ২০২০ সালে। সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে তখন আমি বিদ্যালয়ের পাঠাগারে কদাচিৎ গিয়ে বই পড়েছি মনে আছে। কিন্তু এখন জুবিলী স্কুলের শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলে বলে, স্যাররা কোনোদিন বলেননি বা লাইব্রেরি খুলেও দেন না। এখন ওই বিদ্যালয়ের অবকাঠামো আরো উন্নত হয়েছে, ভবন হয়েছে বহুতল বিশিষ্ট। কিন্তু কোনো কোনো ছাত্র জানেইনা বিদ্যালয়ের ঠিক কোথায় পাঠাগার আছে। এটি হচ্ছে প্রায় সমগ্র দেশের বিদ্যালয় সমূহের হালচালের একটি উদাহরণ। খোঁজ নিয়ে বুঝেছি, বিভিন্ন গ্রামের উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঠাগার আছে, বইও আছে, কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনো উদ্যোগ নেই। এটি খুবই নেতিবাচক দিক শিক্ষার্থীদের জ্ঞান বিকাশের ক্ষেত্রে। এ বিষয়ে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ এবং বিদ্যালয়ের অভিভাবক পক্ষ নিশ্চয়ই নজর দিবেন।
শুরু করেছিলাম বড়ো পদবিওয়ালা হওয়ার স্বপ্ন প্রসঙ্গ নিয়ে। হ্যাঁ অবশ্যই সকলেই বড়ো হতে চাই। কিন্তু আমরা যদি বড়ো পদ পদবি লাগিয়ে বড়ো মাহাত্ম বজায় রাখতে না পারি তবে তো নিজের সাথে সাথে পদ ও পদবিরও শোচনীয় পরিণতি হয়। আমার মর্যাদা গেলে সেটা কেবলই আমার; কিন্তু পদবির অমর্যাদা সমাজকেও ছোঁয়ে যায়। তাই যথা পদে বসার আগে যথাযথ জ্ঞান নিয়ে বসলে আর বিব্রত হতে হবে না। এ জন্যে চাই পড়া। শুধুই পরীক্ষা পাসের পড়ায় হবে না, আরো আরো বই পড়তে হবে, জানতে হবে, সত্যের ভিত গড়তে হবে। বই পড়ি সত্যকেই সত্য জানি। আপনি আমি সত্য না জানলে আমাদের কাছে নতুন প্রজন্ম কী দীক্ষা নিবে ভাবতে হবে। পরিশেষে সবার উদ্দেশ্যে-‘বইয়ের ভিতর ডুব না দিলে/বই হবে না পাস/যতোই করো বইয়ের প্রকাশ/পান্ডুলিপির চাষ/পাতায় পাতায় বইয়ের পাতায়/আছে যতো শিক্ষা/তোমার ভিতর থাকলে তবেই/লোকে নিবে দীক্ষা।’
লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT