ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে এবং সংসদের বাইরে অনবরত বলে যাচ্ছেন, ‘নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করে সারাদেশে নাগরিকদের তালিকা তৈরি করবেন এবং চিহ্নিত অনুপ্রবেশকারীদের দেশ থেকে বিতাড়ন করবেন। ঝাড়খন্ড বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারে এসে ২ ডিসেম্বর অমিত শাহ বলেছেন, ‘বন্ধু, আমি আপনাদের আশ্বাস দিচ্ছি, ২০২৪ সালের ভোটের আগেই এই দেশে থেকে এক একজন করে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করবো। তবে সংশোধিত নাগরিকত্ব বিল সংসদে উত্থাপন করার পর থেকেই দেশব্যাপি যখন সিএএ ও এনআরসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় বইতে থাকে, তখন প্রধানমন্ত্রী ২২ ডিসেম্বর এক জনসভায় বলেন, ‘এনআরসি নিয়ে কোন কথাই হয়নি এবং দেশের কোথাও বন্দী শিবিরও নেই।’ অথচ আমাদের গোয়ালপাড়া জেলায় তিন হাজার লোকের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন যে একটি বন্দী শিবির নির্মিত হয়েছে তার ছবি বিভিন্ন দেশের প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আবার অতি সম্প্রতি পশ্চিম বাংলার বিজেপি নেতা মুকুল রায় বলেছেন, পশ্চিম বাংলায় জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধন হবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও অন্যান্য বিজেপি নেতার এনআরসি সম্পর্কিত এসব বক্তব্য দেশব্যাপি আন্দোলন দমনের অপকৌশল বলে অনেকে মনে করছেন। ইতিমধ্যে সারাদেশে এনপিআর বা জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধন শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং আগামী এপ্রিল থেকে দেশব্যাপি এ কার্যক্রম শুরু হবে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী অরুন্ধতী রায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন ‘এনপিআর’ হলো জাতীয় নাগরিকত্ব তালিকারই পূর্বধাপ। এনপিআর এর জন্য যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে তা পর্যালোচনা করলে অরুন্ধতী রায়ের বক্তব্যের সত্যতা বুঝা যায়। ২০১০ সালেও ভারতে জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধন (এনপিআর) করা হয়েছিল, তবে এবার গতবারের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে, যার একটি হলো ‘পিতামাতার জন্মতারিখ ও জন্মহারের নথিপত্র’। এ তথ্য থেকে এনআরসি-এর সাথে এমপিআর যে সম্পর্কিত তা সুস্পষ্টভাবে উপলদ্ধি করা সম্ভব। অন্যদিকে এনআরসি এর জন্য ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এর পূর্বের কয়েকটি তথ্য চাওয়া হয়েছে যার মধ্যে অন্তত একটি প্রমাণসহ দাখিল করতে হবে। এ তথ্যগুলোর মধ্যে জন্ম সনদ, জমির রেকর্ড, ভোটার তালিকায় নাম, বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট উল্লেখযোগ্য। আবার ১৯৭১ এর পরে যাদের জন্ম হয়েছে, তাদেরকেও পিতামাতার ১৯৭১ এর পূর্বের যে কোন একটি তথ্যের প্রমাণ লিপিবদ্ধ করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে জাতীয় নাগরিকত্ব তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হবেনা। ভারতে গড় শিক্ষার হার ৭৪% যার মধ্যে অনেক রাজ্যে এ হার অনেক কম। প্রায় এক চতুর্থাংশ শিক্ষাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে এসব তথ্য সংগ্রহ করে দাখিল করা কি আদৌ সম্ভব? ভারত সরকার এনআরসি নামক জুজুর ভয় দেখিয়ে দেশের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্যের বীজ রোপন করেছে। সিএএ এবং এনআরপি এর মাধ্যমে সরকার দেশের জনগণের মধ্যে যে ভীতির সঞ্চার করেছে তার ফলে আসাম, পশ্চিম বাংলা সহ অনেক রাজ্যে ইতিমধ্যে বেশ কিছু লোক আত্মহত্যা করেছে। দেশের সকল জনগণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক প্রয়াসের ফলেই একটি দেশের অর্থনীতি গতি লাভ করে। অথচ আজ ভারত সরকারের বিভাজনের রাজনীতির ফলে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে, ফলে তাদের অর্থনৈতিক প্রয়াস বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর পরিণতিতেই বর্তমানে ভারতের অর্থনীতিতে মন্দাভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
প্রায় ১৩০ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে ভারত এক বিশাল দেশ। বহু ভাষাভাষী, বহু ধর্ম ও বর্ণের মানুষ এদেশে বাস করে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ভারতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সামান্য কিছু বিচ্যুতি সত্ত্বেও এ বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেই ভারত এতদিন পথ চলেছে। বহুত্ববাদী, উদার ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিশ্বের বুকে ভারতের আছে এক গৌরবদীপ্ত অবস্থান। কিন্তু বিজেপি সরকারের বর্তমান কর্মকান্ড ভারতের সেই মহিমান্বিত অবস্থানকে করেছে কালিমালিপ্ত।
যে আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল, দেখা যাচ্ছে ভারতও আজ সেই পথে হাঁটছে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির ২৪ বছর পর সেই তত্ত্বকে অসার প্রমাণ করে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। বাংলাদেশ ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ট বন্ধু রাষ্ট্র। এদেশে এখনও প্রায় পৌণে দু’কোটি সংখ্যালঘু বাস করে। তবে বর্তমানে ভারতে সিএএ এবং এনআরসি নিয়ে যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, তা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগণের উপর নিঃসন্দেহে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার উদার, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ একটি দেশকে আজ কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে, সেটাই এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, এম.সি কলেজ, সিলেট।

 

'/> SylheterDak.com.bd
উপ সম্পাদকীয়

ভারতে সি.এ.এ, এন.আর.সি ও এন.পি.আর

রতীশ চন্দ্র দাস তালুকদার প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০২-২০২০ ইং ০০:০৭:৪৬ | সংবাদটি ২১৯ বার পঠিত

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করার মাধ্যমে ভারতের শাসন ব্যবস্থায় এক কলঙ্কতিলক সংযোজিত হলো। উদার, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের যে পরিচয় ছিল তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিজেপি সরকার তাদের গত মেয়াদেই Citizenship Amendment Bill (CAB) সংসদে অনুমোদন করার প্রচেষ্টা নিয়েছিল। তবে রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। পরে বিগত সাধারণ নির্বাচনের মেনিফেস্টোতে এ বিষয়টি সংযোজন করে এবং পুনরায় ক্ষমতায় গেলে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সি.এ.এ) বলবৎ করে সারাদেশে নাগরিক পঞ্জি তৈরি করবে-এ প্রতিশ্রুতি বিভিন্ন জনসভায় বিজেপি দুই প্রধান নেতা নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ বারবার উত্থাপন করেন। সারাদেশে এনআরসি বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও তাদের আসল টার্গেট আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্বের জাতীয় নিবন্ধন তৈরি করে তৃণমূল সরকারের কথিত ভোট ব্যাংক ভেঙ্গে দিয়ে বিজেপি সরকার গঠন করাই আসল লক্ষ্য। নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ কখনো প্রচ্ছন্নভাবে আবার কখনো সুষ্পষ্ট করে একটি বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠীকে অনুপ্রবেশকারী এবং তৃণমূলের ভোটব্যাংক আখ্যায়িত করে থাকেন এবং এদের কারণে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থহানি হচ্ছে বলে বিভিন্ন সভা সমাবেশে উল্লেখ করেন। গত নির্বাচনের সময় যে ইস্যুগুলো বিজেপি নেতৃত্ব জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিল তার অধিকাংশই ছিল ধর্মীয় বিভেদাত্মক। তাই অধিকতর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ায় সরকারের আত্মবিশ্বাস অনেকটা বৃদ্ধি পায় এবং এক বছরের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুত বিষয়গুলো একে একে বাস্তবায়ন করতে থাকে। সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের মাধ্যমে কাশ্মীরকে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা, আবার রামজন্মভূমি বাবরি মসজিদ ইস্যুটি সুপ্রীমকোর্টের মাধ্যমে ফয়সালা করে রামমন্দির নির্মাণ করার পদক্ষেপগুলোর ক্ষেত্রে ভারতব্যাপি প্রতিবাদের ঢেউ ততটা প্রকট ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার প্রত্যাশা করেছিল, ঈঅঅ বাস্তবায়নের সময়ও হয়ত ততটা বাধার সম্মুখীন হবেনা। কিন্তু সরকারের সে প্রত্যাশা আজ অনেকটা চুরমার হয়ে গেছে। ১২ ডিসেম্বর ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাদ কোবিন্দ বিলটিতে স্বাক্ষর করে আইনে পরিণত করলেও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ কিন্তু ভারতব্যাপি বেড়েই চলেছে। ২৮টি অঙ্গরাজ্য এবং ৯টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে ভারত একটি বিশাল দেশ। এদেশের ১১টি রাজ্যে এখনও বিজেপি বিরোধী সরকার ক্ষমতাসীন। ইতিমধ্যে কেরালা, পাঞ্জাব ও রাজস্তানের বিধান সভায় সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (CAA) বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ও মধ্যপ্রদেশের বিধানসভাতেও অনুরূপ প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। ঐ আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরত ছাত্র জনতার উপর গুলিবর্ষণের ফলে ২৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেক আহত হয়েছেন। এতৎসত্বেও সরকারের অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসার কোন সম্ভাবনা দৃশ্যমান হচ্ছে না, বরং সরকারের প্রধান মুখপাত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বিরোধী রাজনীতিকদের আক্রমণ করে যাচ্ছেন।
নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি ২০১৯ এর ৮ ডিসেম্বর মন্ত্রীসভায় পাস হওয়ার পর ৯-১০ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ৩১১-৮০ ভোটের ব্যবধানে লোকসভায় এবং ১১ ডিসেম্বর ১২৫-১০৫ ভোটের ব্যবধানে রাজ্যসভায় অনুমোদিত হয়। ১২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের স্বাক্ষরের পর এটি সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে (CAA) পরিণত হয়। ২০২০ এর ১০ জানুয়ারি গেজেট বিজ্ঞপ্তির পরে ঐদিন থেকেই সারাদেশে এ আইনটি কার্যকর হয়ে যায়। কট্টর বিজেপি নেতা যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। তাই রাজ্যে এর মধ্যেই এ আইনটি বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছ। বিজেপি নেতৃত্বাধীন ঘউঅ সরকার তাদের গত মেয়াদে লোকসভায় যে বিল পাশ করেছিল, বর্তমান মেয়াদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সে বিলে কিছু সংশোধন এনে সংসদে উপস্থাপন করেছেন। অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড এ সংশোধিত বিলের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। কারণ এ তিন রাজ্যে ‘ইনার লাইন পারমিট’ প্রথা অর্থাৎ ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে ঐ তিন রাজ্যে কেউ যেতে চাইলে ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের অনুমতি (Permit) এর প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের উপজাতি অধ্যুষিত ১০টি জেলায় স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ গঠনের বিধান রয়েছে। এসব অঞ্চলেও সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কার্যকর হবে না। অর্থাৎ CAA বলবৎ হওয়ার পর যেসব শরণার্থীকে নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে, তারা এ দিন রাজ্যে এবং ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত অঞ্চলে পুনর্বাসনের সুযোগ পাবে না। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দু’টি দেশের জন্ম হয়েছিল, তবে ভারত ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেনি। ভারতের জাতির পিতা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী কখনই এ বিভক্তিকে মনেপ্রাণে মেনে নেননি। তবে কোন কোন নেতার নেতৃত্বে আকাক্সক্ষা অবশ্য ভারত বিভক্তিতে প্রভাবিত করেছিল। বর্তমান বিজেপির আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (RSS) এর নেতা নাথুরাম গডসে ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করে। আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গডসে সদম্ভে বলেছিলেন ‘প্রবল অত্যাচারের ফলে হিন্দু ও শিখ জনগোষ্ঠী পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসছে, কিন্তু মহাত্মা গান্ধী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকার হিত্যা পাকিস্তানকে দেওয়ার দাবিতে অনশন করছেন। এই কারণে আমি তাঁকে হত্যা করেছি।’ আশ্চর্যের বিষয়, জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর আত্মস্বীকৃত খুনী গডসে আজ ভারতের বিভিন্ন স্থানে জাতীয় বীর হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছে। মীরাট, গোয়ালির সহ কিছু জায়গায় নাথুরামের মূর্তি তৈরি করে মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো-খুনী নাথুরাম গডসে জাতীয় বীর হলে মহাত্মা গান্ধীর অবস্থান আজ কোথায়? তিনি কি দেশদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক?
বহুল আলোচিত ও নিন্দিত যে Citizenship amendment act ১০ জানুয়ারি থেকে ভারতে কার্যকর হয়েছে, সে আইনের মাধ্যমে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, পার্সি, জৈন ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী, যারা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন তাদেরকে শরণার্থী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং ৬ বছর পর নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে ১২ বছর বসবাসের পর নাগরিকত্ব প্রদানের বিধান ছিল যা বর্তমান আইনে ৬ বছর করা হয়েছে। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের কেউ প্রবেশ করলে তাকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। ঐ আইনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ তিনটি দেশ থেকে ভারতে আশ্রয়প্রার্থী অমুসলিম জনগোষ্ঠীর কথাই উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রীলঙ্কা থেকে আগত তামিল হিন্দু বা চীনের তিব্বত থেকে আগত বৌদ্ধ জনগণের কথা এ আইনে উল্লেখ নেই। সুতরাং এ আইনটি যে বিভেদাত্মক, সাম্প্রদায়িকতাদুষ্ট এবং ভারতের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তা স্পষ্টতা প্রতীয়মান। ডঃ ভীমরাও রামজি আম্বেদকর যিনি বাবাসাহেব আম্বেদকর নামে সমধিক পরিচিত তাঁর নেতৃত্বে ভারতের সংবিধান রচিত হয় এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। ঐ সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে-''The Preamble declares India to be a sovereign, socialist, secular and democratic republic' অথচ ভারতের বর্তমান সরকার কর্তৃৃক সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে যা আদ্যন্ত সংবিধান বিরোধী। সরকার সি-এ এর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪নং অনুচ্ছেদও লঙ্ঘন করেছে। ঐ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত হয়েছে-''The state shall not deny to any person equality before law within the territory of India.' আইনের চোখে যে সব মানুষ সমান তা এ অনুচ্ছেদে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। অথচ সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে। কেরালার বামপন্থী সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বাতিলের আর্জি জানিয়ে সুপ্রীমকোর্টে আবেদন করেছে। তবে সুপ্রীমকোর্টে সে আবেদন অগ্রাহ্য করা হয়েছে। সবাই জানে, সুপ্রীমকোর্ট হলো সংবিধানের রক্ষক। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ভারতের সুপ্রীমকোর্ট কার্যত সংবিধান বিরোধী আইনেরই রক্ষক বলে প্রমাণ করলো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ আইনের বিরূপ সমালোচনা হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মনে করে সি.এ.এ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ এ আইনের মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ১৫৪ জন সদস্য একটি খসড়া তৈরি করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে ‘সিএএ ভারত সরকারের হিন্দু জাতীয়তাবাদী অ্যাজেন্ডাকে তুলে ধরেছে এবং এতে অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর যে অধিকার তার থেকে মুসলমানদের ক্ষেত্রে বিভাজন ঘটানো হচ্ছে।’ দেখা যাচ্ছে, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে শুধু ভারতের অভ্যন্তরেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও এর বিরুদ্ধে প্রবল সমালোচনা হচ্ছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে এবং সংসদের বাইরে অনবরত বলে যাচ্ছেন, ‘নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করে সারাদেশে নাগরিকদের তালিকা তৈরি করবেন এবং চিহ্নিত অনুপ্রবেশকারীদের দেশ থেকে বিতাড়ন করবেন। ঝাড়খন্ড বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারে এসে ২ ডিসেম্বর অমিত শাহ বলেছেন, ‘বন্ধু, আমি আপনাদের আশ্বাস দিচ্ছি, ২০২৪ সালের ভোটের আগেই এই দেশে থেকে এক একজন করে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করবো। তবে সংশোধিত নাগরিকত্ব বিল সংসদে উত্থাপন করার পর থেকেই দেশব্যাপি যখন সিএএ ও এনআরসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় বইতে থাকে, তখন প্রধানমন্ত্রী ২২ ডিসেম্বর এক জনসভায় বলেন, ‘এনআরসি নিয়ে কোন কথাই হয়নি এবং দেশের কোথাও বন্দী শিবিরও নেই।’ অথচ আমাদের গোয়ালপাড়া জেলায় তিন হাজার লোকের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন যে একটি বন্দী শিবির নির্মিত হয়েছে তার ছবি বিভিন্ন দেশের প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আবার অতি সম্প্রতি পশ্চিম বাংলার বিজেপি নেতা মুকুল রায় বলেছেন, পশ্চিম বাংলায় জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধন হবে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও অন্যান্য বিজেপি নেতার এনআরসি সম্পর্কিত এসব বক্তব্য দেশব্যাপি আন্দোলন দমনের অপকৌশল বলে অনেকে মনে করছেন। ইতিমধ্যে সারাদেশে এনপিআর বা জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধন শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং আগামী এপ্রিল থেকে দেশব্যাপি এ কার্যক্রম শুরু হবে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী অরুন্ধতী রায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন ‘এনপিআর’ হলো জাতীয় নাগরিকত্ব তালিকারই পূর্বধাপ। এনপিআর এর জন্য যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে তা পর্যালোচনা করলে অরুন্ধতী রায়ের বক্তব্যের সত্যতা বুঝা যায়। ২০১০ সালেও ভারতে জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধন (এনপিআর) করা হয়েছিল, তবে এবার গতবারের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে, যার একটি হলো ‘পিতামাতার জন্মতারিখ ও জন্মহারের নথিপত্র’। এ তথ্য থেকে এনআরসি-এর সাথে এমপিআর যে সম্পর্কিত তা সুস্পষ্টভাবে উপলদ্ধি করা সম্ভব। অন্যদিকে এনআরসি এর জন্য ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এর পূর্বের কয়েকটি তথ্য চাওয়া হয়েছে যার মধ্যে অন্তত একটি প্রমাণসহ দাখিল করতে হবে। এ তথ্যগুলোর মধ্যে জন্ম সনদ, জমির রেকর্ড, ভোটার তালিকায় নাম, বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট উল্লেখযোগ্য। আবার ১৯৭১ এর পরে যাদের জন্ম হয়েছে, তাদেরকেও পিতামাতার ১৯৭১ এর পূর্বের যে কোন একটি তথ্যের প্রমাণ লিপিবদ্ধ করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে জাতীয় নাগরিকত্ব তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হবেনা। ভারতে গড় শিক্ষার হার ৭৪% যার মধ্যে অনেক রাজ্যে এ হার অনেক কম। প্রায় এক চতুর্থাংশ শিক্ষাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে এসব তথ্য সংগ্রহ করে দাখিল করা কি আদৌ সম্ভব? ভারত সরকার এনআরসি নামক জুজুর ভয় দেখিয়ে দেশের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্যের বীজ রোপন করেছে। সিএএ এবং এনআরপি এর মাধ্যমে সরকার দেশের জনগণের মধ্যে যে ভীতির সঞ্চার করেছে তার ফলে আসাম, পশ্চিম বাংলা সহ অনেক রাজ্যে ইতিমধ্যে বেশ কিছু লোক আত্মহত্যা করেছে। দেশের সকল জনগণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক প্রয়াসের ফলেই একটি দেশের অর্থনীতি গতি লাভ করে। অথচ আজ ভারত সরকারের বিভাজনের রাজনীতির ফলে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে, ফলে তাদের অর্থনৈতিক প্রয়াস বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর পরিণতিতেই বর্তমানে ভারতের অর্থনীতিতে মন্দাভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
প্রায় ১৩০ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে ভারত এক বিশাল দেশ। বহু ভাষাভাষী, বহু ধর্ম ও বর্ণের মানুষ এদেশে বাস করে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ভারতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সামান্য কিছু বিচ্যুতি সত্ত্বেও এ বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেই ভারত এতদিন পথ চলেছে। বহুত্ববাদী, উদার ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিশ্বের বুকে ভারতের আছে এক গৌরবদীপ্ত অবস্থান। কিন্তু বিজেপি সরকারের বর্তমান কর্মকান্ড ভারতের সেই মহিমান্বিত অবস্থানকে করেছে কালিমালিপ্ত।
যে আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিল, দেখা যাচ্ছে ভারতও আজ সেই পথে হাঁটছে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির ২৪ বছর পর সেই তত্ত্বকে অসার প্রমাণ করে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। বাংলাদেশ ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ট বন্ধু রাষ্ট্র। এদেশে এখনও প্রায় পৌণে দু’কোটি সংখ্যালঘু বাস করে। তবে বর্তমানে ভারতে সিএএ এবং এনআরসি নিয়ে যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, তা বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগণের উপর নিঃসন্দেহে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার উদার, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ একটি দেশকে আজ কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে, সেটাই এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, এম.সি কলেজ, সিলেট।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT