ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল

হারূন আকবর প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০২-২০২০ ইং ০০:০৯:০৩ | সংবাদটি ৪৭৩ বার পঠিত
Image

প্রকৃতির লীলাভূমি সিলেটের প্রাকৃতিক প্রাচুর্যের মাঝে সাংস্কৃতিক প্রাচুর্যও প্রচুর। সাহিত্য, সাংস্কৃতিক জগতেও সিলেটের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও পৃথক পরিচয় বিদ্যমা ন। যার দরুন সিলেট সুদূর অতীতকাল থেকে স্বীয় অবস্থানকে নিজ আলোয় উদ্ভাসিত করে আসছে। তার আছে নিজস্ব সত্তা ও স্বকীয় পরিচিতি। লোকসংগীতের ক্ষেত্রেও সিলেটের যে পৃথক বৈশিষ্ট্যজ্ঞাপক পরিচিতি পাওয়া যায়, তা বাংলার আর কোথাও নেই। লোকসংগীতের প্রধান অধ্যায় ‘ধামাইল’ সিলেটের এক নিজস্ব সম্পদ। ‘ধামালি’ বা ‘ধামাইল’ নৃত্য-সম্বলিত উৎসবমুখর গান। সমবেতভাবে জটলা বেঁধে গাওয়া হয় এ গান । কবি সঞ্জয় রচিত মহাভারতের পুঁথিতে ধামালি এবং কবি দৌলত কাজী রচিত সতীময়না ও লোর চন্দ্রানী কাব্যে ধামালি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আসলে ধামলি বা ধামালি থেকে ‘ধামাইল’ শব্দের উৎপত্তি। আবার ভিন্ন মতও আছে। সিলেটে ধামলা-ধামলি, ধুম্বইল, ধুমলা-ধুমলি ইত্যাদি শব্দ উল্লাস বা আনন্দ প্রকাশ অর্থে ব্যবহৃত হয়। দুই বা ততোধিক মহিলার হাসি তামাশা বা খোশগল্পের আসরকে নিন্দাচ্ছলে বলা হয় ‘ধুম্বইল দেওয়া’। ধুম্বইলে গাওয়া গানকেই বলা হয় ‘ধামাইল’। মধ্যযুগ থেকেই ধামলি/ধামালি ধামাইল শব্দ বাংলা সাহিত্যে প্রচলিত। সুতরাং মধ্যযুগেই সিলেট অঞ্চলের লোককবিরা ধামাইল গান রচনা আরম্ভ করেন। এখনও ধামাইল গান সিলেট কাছাড় সহ তার আশপাশ এলাকায় খুবই জনপ্রিয়। ধামাইল গান সম্পর্কে সংগীত-বিশেষজ্ঞ মোবারক হোসেন খান বলেন, ‘ধামাইল’ সিলেটের প্রসিদ্ধ নৃত্যগীত। যে কোনো মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে বিশেষ করে বিয়ের উৎসবে এ গানের প্রচলন সমধিক। বিয়ের শুরুতেই স্ত্রী- আচারের সঙ্গে সঙ্গে এ গান মেয়েদের কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে। বিয়ের পরও এ গান চলতে থাকে। যুবতীরা দু’হাত তালি বাজিয়ে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে এ গান পরিবেশন করে।
লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও পুরাতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন (১৮৯৯-১৯৬৫ খ্রি.) ধামাইল গান সম্পর্কে বলেন, বিবাহ উপলক্ষে গীত হয় এরূপ ধামালি বা ধামাইল গান নামে পরিচিত এক প্রকার গান প্রচলিত আছে। পূর্বে সাধারণ মুসলমান সমাজে (ভদ্র সমাজে নহে) ওই শ্রেণীর গান প্রচলিত ছিল। বর্তমানে শরিয়তের বিধান যথাবিহিত পালন উপলক্ষে এসব উঠিয়া গিয়াছে। বিবাহাদি উপলক্ষ ব্যতীত কাহিনীমূলক কতকগুলি ধামালি প্রচলিত ছিল ও আছে। কাহিনীমূলক ধামালির গানগুলির মধ্যে আবেশ্বরী, চন্দ্রমুখি, রাধিকা, কোকিলা প্রভৃতির ধামালি উল্লেখযোগ্য।
ডক্টর নির্মলেন্দু ভৌমিক বলেন, ধামালী গান ও নাচ বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন পরিবেশে বিচিত্র বিষয়কে অবলম্বন করিয়া গীত ও রচিত হইয়া থাকে। বিবাহের সময় কন্যাকে উদ্দেশ্য করিয়া কিংবা নবপরিণীতা বধূ ঘরে আসিলে তাহাকে কেন্দ্র করিয়া যে রঙ-কৌতুকময় গান গাওয়া হয়, তাহা ধামালি বা ধামাইল গান। আবার রঙ্গ-রসিকতাই ইহার একমাত্র বিষয় নহে। প্রার্থনা ও সামাজিক ব্যাপার লইয়াও ধামালি গান রচিত হতে পারে। সামাজিক বিষয় ঘটিত ‘ধামালী’ গানে রঙ্গরসিকতার মাত্রা অনেক সময় শোভনতার সীমাকে ডিঙাইয়া যায়। ধামালি আবার রাগও হতে পারে। অবশ্য এই ‘রাগ’ ব্যাপকার্থে সুর বুঝাইলে স্বতন্ত্র কথা। ধামালী কেবল মেয়েরা গায় নাচে না। পুরুষেরাও ধামালী গাহিতে ও নাচিতে পারে, তবে ভিন্ন পরিবেশে ও ভিন্ন উদ্দেশ্যে। মুসলমান সমাজেও ইহা চলিত আছে। ধামালি বা ধামাইল-সমবেত এবং নৃত্যসম্বলিত গান। ...নৃত্য সম্বলিত ইহা ছন্দ প্রধান। ইহার সুর প্রাণোজ্জ্বল ও রসোজ্জ্বল। তবে করুণ রসাত্মক বিরহের সুরও যে ইহাতে নাই এমন নহে।
ধামাইল গানে একটি পৃথক সুর এবং গাওয়ার পৃথক ভঙ্গিমা আছে। এ সম্পর্কে ড. ভৌমিক আরও বলেন, ‘ধামাইল গানের নিজস্বতা কথায় নহে, উহার বৈশিষ্ট্য সুরে ও গায়ন রীতির মধ্যে।’
ধামাইল গান এক স্বতন্ত্র রীতির ত্রিমাত্রিক ছন্দের গান। রচনার লালিত্য বৈচিত্র্য ও মাধুর্য ধামাইল গানের বিশেষত্ব। উদাহরণস্বরূপ মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন সংগৃহীত শাশুড়ি জামাইকে কেন্দ্র করে রসালো ভাষায় রচিত ধামাইল সংগীতটি পাঠকমহলে উপস্থাপন করা গেল।
হউর বাড়ি যাইতে জামাই পন্থে পাইলা পোনারে
আজব রসিলার পোনালে ধুয়া।
পোনাটি দেখিয়া জামাই ভাবইন মনে মনেরে।
পোনাটা লইয়া গেলে বান্দিয়া দিবা হড়িয়েরে।
বান্দিয়া তুলিল পোনা জামাই কাশার রুমালে।
পাঠাই দিলা পোনাগুলি হড়িমাইয়ের আগেরে।
পোনাটি রান্দিয়া বুড়ি ছিকায় তুলি থইলরে।
ঘরখিনি হুরতে হুরতে কয়টি পোনা খাইলরে।
উছরা খিনি হুরতে হুরতে কয়টি পোনা খাইলরে।
এই মতে পোনা খাইয়া তেলাইন খালি কইলরে।
পুষ্কুন্ডিত গিয়া ব্যাটি তেলাইন ধুইয়া আনলরে।
বাড়িতে আইয়া ব্যাটি চারিদিকে চাইলরে।
পচিম দিকে চাইয় দেখে জামাই আরা ধীরেরে।
কইতে লাগিল ব্যাটি জামাইরে হুনাইয়ারে।
কালিয়া বাড়ির মালিয়া উলায় কিনা কাম কইলরে।
কি করিতু মালিয়া উলা কি করিতু তোরেরে।
জামাইয়ে আনছিলা পোনা হকল খাইলায় তুমিরে।
ধাক্কা খাওয়া মালিয়া উলায় বড় শরম দিলায়রে।
উছরাখিনি হুরিয়া ব্যাটিয়ে চিতলপাটি বিছায়রে।
চিতলপাটি বিছাই দিয়া খড়ম পানি দিলরে।
পাও ধইয়া জামাই ব্যাটা পাটিতে বসিলারে।
ঘরেতে থাকিয়া ব্যাটিয়ে উচাগলায় কয়রে।
কও কও উলাব্যাটা কি-দি দিমু ভাতরে।
জামাইয়ে আনছিলা পোনা খাইলায় চুরি করিয়ারে
বড় শরম দিলায় উলা মারমু পেছে পেছেরে।
চাঙে থাকি উলাব্যাটায় খল খলাইয়া হাসেরে।
হাসি হাসি কহে জামাই সাক্ষী দিমু আমিরে।
থুড়া থুড়া করিয়া পোনা খাইছে তোমার হড়িয়েরে।
নিজে খাইয়া তোমার হড়ি বদনাম দিলা মোরেরে।
হড়ির বিচার জামাই ব্যাটা করিয়া যাইবায় তুমিরে।
আজব রসিলার পোনারে।
বিবাহের পর কন্যার মায়ের ওপর শ্লেষ বর্ষণের উদ্দেশ্যেই ও শাশুড়িকে লজ্জা দেওয়া এবং বিয়ের মজলিশে আনন্দ ঘন পরিবেশ সৃষ্টির জন্য এ-ধরনের ধামালি পরিবেশন করা হয়। আমোদ-প্রমোদ করাই এর প্রধান লক্ষ্য।
ধামাইল গান লুপ্ত প্রায় হলেও বিশেষ করে হিন্দুসমাজে নানা অনুষ্ঠানে এখনও গাওয়া হয়। ধামাইল সংগীতের একটি জনপ্রিয় কলি হলো-
‘তোরা দেখরে আসিয়া
কমলায় নৃত্য করইন ঠমকিয়া ঠমকিয়া’।
সিলেটের লোককবিদের রচিত হাজারো সংগীতের মাঝে মিশে আছে ধামাইল সংগীত। সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও শোনা যায় :
সখি চলগো মোরে লইয়া
মথুরাতে প্রাণ বন্ধুয়ার
চরণ দেখি গিয়া।
সিলেটের লোকসংগীত নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ গবেষণা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কিন্তু অবহেলিত ‘ধামাইল গান’ নিয়ে গবেষণা-কর্ম তেমন অগ্রসর হয়নি। অতএব, সিলেটের লুপ্ত প্রায় সংগীত ‘ধামাইল’কে নিয়ে আলোচনা গবেষণার প্রয়োজন, অন্যথায় একদিন তা হারিয়ে যাবে তেপান্তরের মাঠে।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের লোকসাহিত্য : শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত, (বাংলাদেশের লোকসংগীত মোবারক হোসেন খান) বাংলা একাডেমী, ঢাকা-১১০০
২. সিলহটের ইতিহাস : মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, অক্টোবর-১৯৯০, পৃ. ৬০.
৩. শ্রীহট্টের লোকসঙ্গীত : ড. নির্মলেন্দু ভৌমিক, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৬, পৃ. ১৬৩
৪. শ্রীহট্টের লোকসঙ্গীত : ড. নির্মলেন্দু ভৌমিক, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৬, পৃ. ১৬৭
গ্রন্থ সিলেটের লোকসংগীত ঃ ধামাইল।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Image

    Developed by:Sparkle IT